কমল কি কামাল দেখাবেন, তবে কোন কমল?
শিকারপুরের বাংলোর সামনে জমায়েতের চোখ রাস্তার দিকে নয়। আকাশের দিকে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই হেলিকপ্টার এসে নামে বাংলোর ঠিক পাশের জমিতে। নানা আর্জি নিয়ে ভিড় করা জনতা নিশ্চিন্ত হয়। খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হবে না।
Photo

‘ভুট্টার শহর’— এই নামেই পরিচিত ছিন্দওয়াড়া। নিজস্ব চিত্র

সাহেব আসছেন, সাহেব আসছেন।

শিকারপুরের বাংলোর সামনে জমায়েতের চোখ রাস্তার দিকে নয়। আকাশের দিকে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই হেলিকপ্টার এসে নামে বাংলোর ঠিক পাশের জমিতে। নানা আর্জি নিয়ে ভিড় করা জনতা নিশ্চিন্ত হয়। খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হবে না।

কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে বি-কম পড়ার সময় নিয়মিত পার্ক স্ট্রিটে আড্ডা দিতেন। সেখান থেকে ছিন্দওয়াড়া শহরের বাইরে শিকারপুরের গাছগাছালি ঘেরা ১৫ কোটি টাকা মূল্যের প্রাসাদোপম বাংলো। সব মিলিয়ে ১২৫ কোটি টাকার ঘোষিত সম্পত্তি। গত ৪০ বছর ধরে ছিন্দওয়াড়ার অঘোষিত সম্রাট কমলনাথের দরবার থেকে কেউই খালি হাতে ফেরে না। সে কংগ্রেসের লোক হোক বা বিজেপি।

দিল্লি দখলের লড়াইলোকসভা নির্বাচন ২০১৯ 

ছেলের চিকিৎসার কাগজপত্র নিয়ে বসে থাকা সুবল নাগবংশী বলেন, ‘‘নরেন্দ্র মোদী আয়ুষ্মান ভারত চালু করেছেন। ছিন্দওয়াড়ায় কমলনাথ থাকতে ও সবের দরকার নেই। উনি হাসপাতালে ফোন করে দেবেন। বিল মেটাতে চেক পাঠিয়ে দেবেন। তা সে যত টাকারই হোক না কেন। উনিই আমাদের স্বাস্থ্য বিমা।’’

মধ্যপ্রদেশে ১৫ বছর পরে বিজেপিকে হঠিয়ে গত ডিসেম্বরে কংগ্রেস ক্ষমতায় এসেছে। কমলনাথ মুখ্যমন্ত্রীর গদিতে। ছিন্দওয়াড়া তাঁর হাতের মুঠোয়। কিন্তু আসল চ্যালেঞ্জ, লোকসভা ভোটে ‘দেশ কে দিল’ মধ্যপ্রদেশ থেকে কংগ্রেসের ঝুলিতে যত বেশি সম্ভব আসন পোরা। ২০১৪-র মোদী-ঝড়ে রাজ্যের ২৯টি আসনের মধ্যে ২৭টিই বিজেপি জিতেছিল। একমাত্র কমলনাথ ও জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া নিজেদের দুর্গ ধরে রাখতে পেরেছিলেন। এবার কমলনাথের স্লোগান, ‘দেশ কে দিল সে দিল্লি তক—অব কংগ্রেস’। কিন্তু পারবেন?

লোকসভা ভোটের সেমিফাইনালে ছত্তীসগঢ়, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থানের মতো তিন রাজ্যের বিধানসভায় জিতেছিল কংগ্রেস। কিন্তু ছত্তীসগঢ়ে দেখে আসা কংগ্রেস নেতাদের আত্মবিশ্বাস মধ্যপ্রদেশে পা দিতে অনেকটাই ফিকে। মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনে বসেই এক কংগ্রেস নেতার ভবিষ্যৎবাণী, ‘‘খুব বেশি হলে ১৪-১৫টা আসন।’’

কোথায় দুশ্চিন্তা? বিধানসভা ভোটে কংগ্রেসের তুরুপের তাস ছিল চাষিদের ঋণ মকুব। কমলনাথ শপথ নিয়েই ঋণ মকুবের ঘোষণা করেছেন বটে। কিন্তু ৫০ লক্ষ কৃষকের ২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ঋণ মকুবের সুফল সব ঘরে পৌঁছয়নি। লোকসভা ভোটপর্ব শুরুর আগে নির্বাচনী বিধির কারণ দেখিয়ে সেই ঋণ মকুবের কাজ স্থগিত রাখা হয়েছে।

কী বলছেন কমলনাথ? তাঁর জবাব, ‘‘২২ লক্ষ চাষির ঋণ মাফ করে দিয়েছি। চাইলে সবার নাম-ঠিকানা দিয়ে দিতে পারি। আপাতত কাজ আটকে রয়েছে। কিন্তু আরও ৩৮ লক্ষ চাষির ঋণ মাফ হবে।’’ কিন্তু অভাব-অভিযোগের এখানেই শেষ নয়। ছিন্দওয়াড়া ‘ভুট্টার শহর’ হিসেবে খ্যাত। কিন্তু সরকার ঘোষিত দামই মিলছে না। কমলনাথের আশ্বাস, তিনি অভাব মেটাবেন। ছত্তীসগঢ়ের ধান চাষিরা কংগ্রেস সরকারের থেকে বাড়তি দাম পেয়ে খুশি। কিন্তু রেকর্ড পরিমাণ গম ফলিয়ে মধ্যপ্রদেশের চাষিদের মাথায় হাত। কমলনাথের দাবি, তিনি বোনাস ঘোষণা করেছেন। কিন্তু সেই দামে গম বিকোচ্ছে কোথায়?

অতএব ‘হিন্দুত্ব’! কমলনাথ মুখ্যমন্ত্রী হয়েই কুম্ভমেলার জন্য বিশেষ চারটি ট্রেনের ব্যবস্থা করেছিলেন। মন্দিরের পুরোহিতদের জন্য ভাতা বাড়িয়ে তিন গুণ করেছেন। সরকারি খরচে এক হাজার গোশালা খোলার ঘোষণা করেছেন। যে সব মন্দির কর্তৃপক্ষ তাদের জমিতে গোশালা খুলবে, তারা আর্থিক সাহায্য পাবে। কমলনাথের জবাব, ‘‘বেওয়ারিশ গরুদের জন্য গোশালা তো চাষিদের কথা ভেবেই। না হলে ফসল নষ্ট হচ্ছে।’’ এর সঙ্গে হিন্দুত্বের সম্পর্ক রয়েছে বলে মানতে রাজি নন তিনি। কংগ্রেসের নেতাদের দাবি, পুরোহিতদের সঙ্গে ইমামদেরও ভাতা বেড়েছে। কমলনাথ কোনও ভেদাভেদ করেন না।

ছিন্দওয়াড়ার জেলা কংগ্রেস সভাপতি গঙ্গাপ্রসাদ তিওয়ারির থেকে গল্প শোনা গেল। ১৯৮৪-তে কমলনাথের বিরুদ্ধে ভোটে লড়েছিলেন বিজেপির প্রত্যুলচাঁদ দ্বিবেদী। সঙ্ঘপরিবারের এই নেতার অসুস্থতার সময়ে কমলনাথই সবরকম সাহায্য করেছিলেন। মৃত্যুর পর ছিন্দওয়াড়ায় তাঁর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে দেন। 

১৯৮০ থেকে লোকসভা ভোটে লড়ছেন। ১৯৯৬-এর উপনির্বাচন বাদ দিলে আর কখনও হারেননি। মুখ্যমন্ত্রী হয়ে এবার ছিন্দওয়াড়া বিধানসভার উপনির্বাচনে। ছিন্দওয়াড়ায় তাঁর জয় নিশ্চিত। কিন্তু গোটা মধ্যপ্রদেশে কমলনাথ কি কামাল দেখাতে পারবেন! না কি কমলের রাজত্বে সংখ্যায় কম হলেও ‘কমল’ ফুটবে! ‘দেশ কে দিল’-এর ‘দিল’-এ কী রয়েছে, তা দিল-ই জানে। (চলবে)

২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের ফল

আপনার মত