‘খান ইয়া বান’, ঔরঙ্গাবাদ জুড়ে ‘সুরক্ষা’র মায়াজাল
মরাঠাওয়াড়া মুলুকে বাকি সব সমস্যা, যেমন, কৃষকের দুর্দশা, বেকারত্ব, তীব্র খরা, নোটবন্দি, জিএসটি-র মতো জ্বলন্ত সমস্যাগুলি এখন ‘ব্যাকবেঞ্চে’।
marathawada

ঔরঙ্গাবাদ শহরের বাহান্ন গেট। —নিজস্ব চিত্র।

অ্যাকোয়ারিয়ামের সাইজ মেরেকেটে চার ফুট বাই দু’ফুট। সেখানে খেলা করে বেড়াচ্ছে বড় আকারের একটি গোল্ড ফিশ আর সাদা রঙের ছোট দু’টি অস্কার। ঘণ্টাখানেকের প্রতীক্ষাকালে এক বারও গোল্ডেন ফিশের অবস্থানের বদল চোখে পড়ল না। তার অবস্থান সদাই উপরে।নীচে খেলা করে বেড়াচ্ছে জোড়া অস্কার। আর তাঁদের উপরে খবর্দারির ঢঙে ধীর লয়ে সাঁতরে বেড়াচ্ছে ওই গোল্ড ফিশ!

ঘণ্টাখানেক পরে বাড়ির মালিককে জানানো গেল, ওই গোল্ড ফিশ দেখে তাঁর কথাই মনে হচ্ছিল!। কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা...তার পরেই অট্টহাস্য! ‘‘আপনি এ সব দেখছিলেন না কি,’’ হালকা মেজাজে চন্দ্রকান্ত খৈরে। ঔরঙ্গাবাদে শিবসেনার বিদায়ী সাংসদের প্রশ্ন: ‘‘আর নীচের দু’জন?’’ এক জন যেন বঞ্চিত বহুজন আগাড়ি জোটের এআইএমআইএম প্রার্থী ইমতিয়াজ জলিল, আর এক জন কংগ্রেস-এনসিপি জোটের প্রার্থী সুভাষ জামবাদে। অন্তত গোল্ড ফিশ‌ের হাবভাবে ‌সে রকমটাই তো মনে হচ্ছে!

ঔরঙ্গাবাদ রেলস্টেশনের কাছেই জালান নগরেরবাড়ির একতলার বসার ঘরে উপচে পড়া ভিড়।দলীয় কর্মী-সমর্থক ছাড়াও নানা প্রয়োজনে আসা মানুষজন। ভিতরের অফিসঘরে সদ্য স্নান সেরে এসে বসেছেন সেই ১৯৯৯ থেকে টানা চার বার এই কেন্দ্র থেকে সাংসদ হওয়া চন্দ্রকান্ত খৈরে। যিনি শিবসেনার সংসদীয় দলের নেতাও বটে। পরনে গেরুয়া পাঞ্জাবি, উপরে জ়েড ব্লু রঙের জহর কোট। কপালে লাল টিপ।

 

আরও পড়ুন: ‘চৌকিদার চোর হ্যায়’ বিতর্কে দুঃখপ্রকাশ করলেন, ‘প্রচারের উত্তেজনা’য় মন্তব্য, দাবি রাহুলের​

এ বারে তো তাঁর জেতার রাস্তা আরও মসৃণ? তাঁর বিরুদ্ধে কংগ্রেসের সুভাষ জামবাড দাঁড়ালেও কংগ্রেসের ভোট ব্যাঙ্কে চিড় ধরাতে চলেছেন এআইএমআইএম প্রার্থী ইমতিয়াজ জলিল। ভোটের পাটিগণিত বলছে, এর ফলে ফায়দা বিজেপি-শিবসেনারই। যদিও বিষয়টিতে গুরুত্ব দিতে নারাজ খৈরে। তাঁর কথায়: ‘‘মুসলিমরা আমাদের এমনিতেই ভোট দেন না। তাঁদের বেশির ভাগ ভোট ও দিকেই যায়। এতে আমাদের বড় একটা কিছু এসে যায় না।’’

ঔরঙ্গজেবের স্মৃতি বিজড়িত ঔরঙ্গাবাদের সঙ্গে আরও এক বীরের নাম জড়িয়ে। ছত্রপতি শিবাজি। ঔরঙ্গজেবের জমানায় ফতেনগরের নতুন নামকরণ হয়েছিল— ঔরঙ্গাবাদ। আর দীর্ঘ কাল ধরেই সেই ঔরঙ্গাবাদের নাম বদলে শিবাজির জ্যেষ্ঠপুত্র সম্ভাজির নামে সম্ভাজি নগর রাখার দাবি জানিয়ে আসছে শিবসেনা।ফলে, ঔরঙ্গাবাদের মানুষজন বলেন, মরাঠাওয়াড়ারএই প্রাণকেন্দ্রে ভোট হয় ‘খান ইয়া বান’-এর ভিত্তিতে। খানের অর্থ মুসলিম ভোট, আর ‘বান’ বলতে শিবাজির তির! আরও সহজ কথায়: এখানে ভোট হয় ধর্মের ভিত্তিতে।

সেই ‘ট্র্যাডিশন’-এর যে বিশেষ বদল হয়েছে এমন নয়।ঔরঙ্গাবাদ ওল্ড সিটির মনজুরপুরা সার্কেলের বাজারে মোবাইলের দোকানের মালিক সৈয়দ মইজ যেমন বললেন, ‘‘এই যে ধর্মের ভিত্তিতে শহরের নামবদল শুরু হয়েছে, এতে সত্যিই কি কারও কোনও লাভ হচ্ছে? কেন স্বাধীনতার এত কাল পরেও স্রেফ ধর্মের ভিত্তিতে গা-জোয়ারি করে এ সব চলবে? বরং, ইতিহাসকে মনে রাখার জন্য অতীতকে ধরে রাখার চেষ্টাটাই তো ভাল! তা সে ইতিহাস যত কালোই হোক না কেন!’’

শিবসেনার বিদায়ী সাংসদ চন্দ্রকান্ত খৈরে। —নিজস্ব চিত্র।

সাম্প্রদায়িকতার কথা ভুলে স্রেফ উন্নয়নকেই হাতিয়ার করতে চান এআইএমআইএম প্রার্থী ইমতিয়াজ জলিল-ও। একটি সর্বভারতীয় টিভি চ্যানেলের সাংবাদিক ছিলেন জলিল। ঔরঙ্গাবাদ শহরের ৫২ গেটের কাছে তাঁর বাড়িতে বসে জলিল বলতে থাকেন, ‘‘কংগ্রেস-এনসিপি-র এই ধর্মনিরপেক্ষতার নৌটঙ্কি আর কত দিন ধরে সহ্য করব? এখানে গত কুড়ি বছর ধরে জিতে আসছে শিবসেনা। পুরসভার নির্বাচনেও শিবসেনা জোট জিতছে ২৫ বছর ধরে। এত দিন কংগ্রেস-এনসিপি কী করেছে? আর এখন বঞ্চি

প্রচারের খরচ উঠছে কী ভাবে? জলিল নতুন এক স্লোগানের কথা শোনান। বলেন, ‘‘ভোট ভি দেঙ্গে, নোট ভি দেঙ্গে’। আমরা জনগণকে এটাই বলছি।’’ কী রকম? জলিল বলেন, ‘‘গঙ্গাপুরের কথাই ধরুন। সেখানে প্রত্যেকে ২৫ টাকা করে দিয়েছেন। আমরা সবাইকেই বলেছি, ঠিক ২৫ টাকাই দেবেন, তার এক টাকাও বেশি নয়। এই করেই এক দিনে ৭০ হাজার টাকা উঠেছে। এই নির্বাচনকে আমরা জনতার নির্বাচনে পরিণত করব। অ-মুসলিম ভোটও আমার সঙ্গে আছে। বাণিজ্য সংগঠনগুলোও বলছে, উন্নয়নের স্বার্থেই আপনাকে দরকার।’’

ইমতিয়াজ জলিল (এআইএমআইএম প্রার্থী)। —নিজস্ব চিত্র।

আরও পড়ুন: দূষণ দেখে বিরক্ত ‘তারকা’ মুনমুন, বাবুলের আসল প্রতিদ্বন্দ্বী ‘মেয়র সাহেব’​

কে যে শেষমেশ কার সঙ্গে থাকবে বলাটা মুশকিল, তবে ‘সুরক্ষা’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট চাওয়ার অভিযোগও উঠছে বইকি। ঔরঙ্গাবাদ সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামার শিকার। গত বছরেই এখানে হাঙ্গামা হয়। অভিযোগ উঠছে, শিবসেনার বিদায়ী সাংসদ চন্দ্রকান্ত খৈরে হিন্দুদের ‘সুরক্ষিত’ রাখার শর্তে তাঁদের ভোট চাইছেন। যদিও চন্দ্রকান্ত সে কথা মানতে চাননি।

মুশকিলটা হল, এই মরাঠাওয়াড়া মুলুকে বাকি সব সমস্যা, যেমন, কৃষকের দুর্দশা, বেকারত্ব, তীব্র খরা, নোটবন্দি, জিএসটি-র মতো জ্বলন্ত বিষয়গুলি এখন ‘ব্যাকবেঞ্চে’। ‘খান ইয়া বান’-এর দেশে ‘সুরক্ষা’ই এখন ভোটার মননের একমাত্র চর্চা!

২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের ফল

আপনার মত