লোকসভা ভোটের আগেও কংগ্রেসের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে বিজেপি-বিরোধী মঞ্চ তৈরি করার চেষ্টা করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভোটের ফল প্রকাশের পরে সরকার গড়ার স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু বিজেপি-বিরোধিতার প্রশ্নে সংসদের ভিতরে-বাইরে কংগ্রেসের সঙ্গে কোনও রকম সমন্বয়ের রাস্তায় হাঁটতে নারাজ তিনি।

কাল প্রধানমন্ত্রীর ডাকা নৈশভোজে যাচ্ছেন না তৃণমূলের সাংসদেরা। গত তিন সপ্তাহে, তিন তিন বার প্রধানমন্ত্রীর ডাকা বৈঠকে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দিয়ে তৃণমূল নেত্রী বুঝিয়ে দিয়েছেন, কট্টর বিজেপি-বিরোধী অবস্থান বজায় রাখবে তাঁর দল। বস্তুত, পশ্চিমবঙ্গে যা ভাবে বিজেপির উত্থান ঘটছে, তাতে কেন্দ্রের শাসক দলের বিরুদ্ধে ‘অল আউট’ আক্রমণে যাওয়া ছাড়া তৃণমূলের গত্যন্তরও নেই। কিন্তু রাজ্য ও জাতীয় স্তরেও সেই লড়াই মমতা একই লড়তে চাইছেন। তবে সূত্রের খবর, কংগ্রেসের সঙ্গে শীতলতা বজায় রাখলেও অকংগ্রেসি বিরোধী দলগুলির সঙ্গে দিল্লিতে যোগাযোগ রেখে চলছে তৃণমূল।

গত কাল সনিয়া গাঁধী সমস্ত বিরোধী দলের সংসদীয় নেতাদের ডেকেছিলেন সংসদীয় রণকৌশল নিয়ে আলোচনার জন্য। তৃণমূল তাতে যোগ দেয়নি। শুধু তাই-ই নয়, এসপি, বিএসপি-সহ অন্যান্য বিরোধী দলকে এই ধরনের বৈঠক সম্পর্কে সতর্কও করেছিল তারা। শেষ পর্যন্ত বৈঠকটি ভেস্তে যায়। তৃণমূলের এক নেতার কথায়, ‘‘সবে নতুন লোকসভা শুরু হল। এখন প্রতিটি দল নিজেদের ইনিংস নিজেদের মতো করে শুরু করবে, এটাই তো কাম্য। সামনে কোনও ভোটও নেই। ফলে এখনই অন্য দলের সঙ্গে সমন্বয়ের প্রয়োজন নেই। আঞ্চলিক দলগুলি একলা চলে, নিজেদের মতো করে রাজ্যের সমস্যা নিয়ে লড়াই শুরু করুক।’’

তৃণমূলের পরামর্শ মেনে আগামী দিনে বিরোধী আঞ্চলিক দলগুলি পৃথকভাবে বিজেপি-বিরোধিতায় এগোবে কি না, সেটা বলবার সময় এখনও আসেনি। কিন্তু রাজনৈতিক শিবিরে এই প্রশ্ন উঠছে যে মোদীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য এখন কি আরও বেশি করে বিরোধী শক্তিগুলির সমন্বয় প্রয়োজন নয় ? সে ক্ষেত্রে কংগ্রেসকে বিচ্ছিন্ন করে রাখলে বিরোধিতা কি অনেকটাই লঘু হয়ে যায় না? ভোটের আগে এই বিরোধী জোট গঠনের চেষ্টাকে ব্যঙ্গ করে করে বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ বলেছিলেন এটি ‘মহাভেজাল’ জোট। ভোটের পর তাঁরা যদি ছত্রভঙ্গ হয়ে যান, তা হলে সেই বক্রোক্তিই তো সত্যি প্রমাণিত হবে!

তৃণমূল সূত্রের পাল্টা যুক্তি, কংগ্রেস ক্রমশই কোণঠাসা হচ্ছে। রাজ্যে রাজ্যে তাদের সাবেক ভোটব্যাঙ্ক ক্ষীয়মান। এক সময় তারা বিভিন্ন রাজ্যের আঞ্চলিক আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করেছে। কিন্তু ক্রমশ এলিটতন্ত্রের প্রতিনিধিত্ব করতে করতে আঞ্চলিক আবেগ থেকে তারা সরে গিয়েছে। জন্ম নিয়েছে দ্রাবিড় থেকে লোহিয়া আন্দোলনের। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলও তৈরি হয়েছে কংগ্রেসের ভোটব্যাঙ্ক ভেঙেই। ফলে তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক পরিসর ভাগ করে নিলে নিজেদেরই শক্তিক্ষয় হবে। আখেরে লাভ হবে কংগ্রেসের। আর তাই আপাতত কারও সঙ্গেই সংযুক্ত না হয়ে বিধানসভা ভোটকে সামনে রেখে সর্বস্তরে কট্টর বিজেপি বিরোধিতা করে যাওয়া হবে। পাশাপাশি অকংগ্রেসি দলগুলির সঙ্গে তলায় তলায় যোগাযোগ বজায় রেখে দিল্লির বিরোধী রাজনীতিতে নিজের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টাটাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লক্ষ্য।