Militants make an outline to attack with pakistani ship - Anandabazar
  • জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

পাক জাহাজ নিয়ে হামলার ছক জঙ্গিদের

Advertisement

ছাব্বিশে নভেম্বরের সেই ভয়ঙ্কর রাতে মৎস্যজীবীদের নৌকা ছিনতাই করে করাচি থেকে মুম্বই এসেছিল জঙ্গিরা। এ বার করাচি বন্দর থেকে একেবারে পাকিস্তানি যুদ্ধজাহাজ ছিনতাই করে হামলা চালাতে চায় তারা। ইতিমধ্যে দু’-দু’বার সেই চেষ্টাও চালিয়েছে সদ্য গঠিত আল কায়দা ইন ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট (একিউআইএস)। যুদ্ধজাহাজ ছিনতাইয়ে সফল হলে ভারত ও আমেরিকার নৌবহর বা ভারতীয় বন্দরে হামলা চালানোই তাদের ছক বলে ধারণা গোয়েন্দাদের।

এই খবর পেয়ে মুম্বই উপকূলে পাহারারত যুদ্ধজাহাজগুলিকে আরও সতর্ক হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ভারতীয় নৌসেনার সদর দফতর। ওই নির্দেশে বলা হয়েছে, উপকূলে পাক রণতরী এমনকী বাণিজ্যতরী দেখলেও পুরোদস্তুর যুদ্ধ প্রস্তুতি নিয়ে তাদের মুখোমুখি হতে হবে। শুধু মুম্বই নয়, পূর্বাঞ্চলের বিশাখাপত্তনম এবং দক্ষিণের কোচি নৌসেনা ঘাঁটিতে থাকা যুদ্ধজাহাজগুলির নিরাপত্তাও জোরদার করতে বলা হয়েছে।

নৌসেনা সূত্রে বলা হচ্ছে, করাচিতে আল কায়দার জোড়া প্রয়াস বিফলে গিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সফল হলে জঙ্গিরা ওই জাহাজ নিয়ে কোনও ভারতীয় যুদ্ধজাহাজ বা নৌঘাঁটির উপরে হামলা চালানোর চেষ্টা করত বলেই গোয়েন্দাদের আশঙ্কা। ভারতের দুশ্চিন্তা আরও বাড়িয়েছে পাক নৌবাহিনীর মধ্যে আল কায়দার জাল বিস্তারের খবর। এর আগে ২৬/১১-র মুম্বই হামলায় জঙ্গিরা করাচি থেকেই নৌকা নিয়ে ভারতে ঢুকেছিল। এ বার যদি তারা যুদ্ধজাহাজ নিয়ে হামলা চালায়, তা মোকাবিলার জন্য সব রকম ভাবে সতর্ক থাকতে চাইছে ভারতীয় নৌবাহিনী।

ভারতীয় গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, গত বছর ৩ সেপ্টেম্বর করাচি বন্দরে প্রথম হামলা চালায় আল কায়দা। সে দিন পাক যুদ্ধজাহাজ পিএনএস আসলাত দখল করার পরিকল্পনা ছিল তাদের। কিন্তু পাক নৌবাহিনীর তৎপরতায় শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।

এর তিন দিন পরে ৬ সেপ্টেম্বর, পাক নৌসেনা দিবসে করাচি বন্দরে নোঙর করে থাকা যুদ্ধজাহাজ পিএনএস জুলফিকরে ফের হামলা চালানো হয়। এ বার আল কায়দা জঙ্গিরা জাহাজে উঠে পড়তে পেরেছিল। পাক নৌ কম্যান্ডোদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় লড়াই চলে তাদের। গোয়েন্দা সূত্রে বলা হচ্ছে, পাক নৌবাহিনীর মধ্যেই এখন আল কায়দার অনুপ্রবেশ ঘটেছে। প্রাক্তন পাক নৌসেনা অফিসারদের অনেকে তো বটেই বর্তমান অফিসারদেরও কেউ কেউ সরাসরি আল কায়দার খাতায় নাম লিখিয়েছেন। পিএনএস  হামলার ঘটনায় আল কায়দা-পন্থী ওই বর্তমান ও প্রাক্তন পাক নৌসেনা অফিসারদের হাতের ছাপ স্পষ্ট। সে দিন পাক নৌসেনার স্পেশ্যাল সার্ভিসেস গ্রুপের কমান্ডোদের হাতে যে ৮ জন হামলাকারীর মৃত্যু হয়, তাঁদের মধ্যে এক জন ছিলেন প্রাক্তন নৌসেনা কমান্ডার ওয়াইশ জাখরানি।

ভারতীয় নৌ গোয়েন্দা সূত্রের খবর, ৬ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটা নাগাদ ডক থেকে জাহাজে যাওয়ার রাস্তা (গ্যাংওয়ে) ধরে ৬  জন জঙ্গি জাহাজটিতে ওঠে। তারা পাক নৌসেনার পোশাক পরে ছিল। এর সোয়া ঘণ্টা পরে যুদ্ধজাহাজটিকে যে ছোট ছোট নৌকা দিয়ে নিরাপত্তারক্ষীরা ঘিরে রাখে, সেই ‘জেমিনি’রও একটি দখল  করে নেয় জঙ্গিরা। নৌকাটি নিয়ে জাহাজের কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা করে তারা। তবে পাঁচ মিনিটের মধ্যেই নৌকার জঙ্গিদের কাবু করে ফেলা হয়। ছ’জন জঙ্গি মারা যায়। কিন্তু জাহাজে উঠে পড়া জঙ্গিদের তখনও কব্জা করা যায়নি। তারা জাহাজের একটি অংশে আগুন লাগিয়ে দেয়। সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ পাক নৌ কম্যান্ডো বাহিনী জাহাজে পৌঁছয়। জঙ্গিদের সঙ্গে তাদের গুলির লড়াই চলে। জঙ্গি হামলায় পাক নৌবাহিনীর এক নিচুতলার অফিসার মারা যান। গুলিবিদ্ধ হন ৭ জন নাবিক। ক্ষতিগ্রস্ত হয় জাহাজটিও। একটা অংশে আগুন লাগা ছাড়াও তার খোলের বিভিন্ন জায়গায় গুলি লাগে। অন্য দিকে, কম্যান্ডোদের গুলিতে মারা যায় দুই জঙ্গি।

প্রায় এক ঘণ্টা অপারেশন চলার পরে জাহাজটি কম্যান্ডোদের নিয়ন্ত্রণে আসে। একটি তালাবন্ধ কেবিন থেকে পাকড়াও করা হয় ৪ জঙ্গিকে। তাদের কাছ থেকে ৩টি একে ৪৭ রাইফেল, ৪টি নাইন এমএম পিস্তল, ৪টি সুইসাইড জ্যাকেট, ৩টি হ্যান্ডকাফ, ৩টি স্যাটেলাইট ফোন, ওয়াকিটকি এবং ৭টি জেহাদি বই মেলে। জাহাজে নিহত দুই জঙ্গির এক জন কয়েক মাস আগে বরখাস্ত হওয়া নৌসেনা অফিসার জাখরানি। পিএনএস জুলফিকর থেকেই জঙ্গিদের সঙ্গে আঁতাঁতের সন্দেহে গ্রেফতার করা হয় চার নৌসেনা অফিসারকে। ঘটনার দু’দিন পরে পরে আফগান সীমান্তের কোয়েট্টা থেকে আরও তিন জন নৌসেনা অফিসারকে ধরা হয়। তাঁরা আফগানিস্তানে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন বলে অভিযোগ। জানা গিয়েছে, গোটা অপারেশনের পিছনে মূল মাথা তাঁরাই।

এ দেশের নৌসেনা অফিসারেরা বলছেন, পাক নৌ অফিসারদের এই জঙ্গি-যোগই ভারতের মাথাব্যথার মূল কারণ। তাঁদের বক্তব্য, পাকিস্তানে এর আগেও নৌবাহিনীর উপর আল কায়দার হামলা হয়েছে। ২০০২ সালে ফরাসি নৌসেনাদের উপর, ২০১১ সালে ২৬-২৮ এপ্রিল নৌবাহিনীর বাসে, সেই বছরই ২২ মে পিএনএ মেহরান নামে একটি যুদ্ধজাহাজে হামলা হয়। কিন্তু এখন পাক নৌসেনা অফিসারেরাই যদি আল কায়দার লোক হন, তা হলে যে কোনও দিন যুদ্ধজাহাজ দখলের পরিকল্পনা সফল হয়ে যেতে পারে। আর সেই যুদ্ধজাহাজ নিয়ে জঙ্গিরা হামলা চালাতে পারে ভারতের উপরে। ৩ ও ৬ সেপ্টেম্বরের ব্যর্থ চেষ্টার পরে আল কায়দার তরফেও বিবৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, করাচি বন্দরে পরপর দু’টি যুদ্ধজাহাজে হামলা ও দখল নেওয়ার ঘটনা সাময়িক ভাবে ব্যর্থ হলেও আজ নয় কাল ভারতীয় এবং মার্কিন যুদ্ধজাহাজে হামলা চালানো হবে। তারই প্রস্তুতি চলছে।

সূত্রের খবর, পিএনএস জুলফিকর চিনে তৈরি এফ-২২ গোত্রের ফ্রিগেট। গত বছরই চিনের কাছ থেকে জাহাজটি কিনেছে পাকিস্তান। এতে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার যে ব্যবস্থা আছে, তা দিয়ে ৩০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যেও আঘাত হানা সম্ভব। জাহাজটি দখল করে আরব সাগরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি মার্কিন অয়েল ট্যাঙ্কারে হামলার ছক ছিল আল কায়দার।

ভারতীয় নৌ অফিসারেরা বলছেন, আল কায়দা জঙ্গিরা যদি কোনও পাকিস্তানি যুদ্ধজাহাজ নিয়ে হামলা চালাতে আসে, তা হলে প্রাথমিক ভাবে কোনও সন্দেহ না হওয়ারই কথা। জঙ্গিরা সেটারই সুযোগ নেবে। আর তাই ভারতীয় যুদ্ধজাহাজগুলিকে পুরোমাত্রায় সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। সম্প্রতি নৌসেনা ঘাঁটিগুলিতে বিশেষ বার্তা পাঠিয়ে পাক যুদ্ধজাহাজের মোকাবিলায় কী রকম প্রস্তুতি নিতে হবে, তা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি এমনই যে যুদ্ধজাহাজে কর্মরত নৌবাহিনীর সমস্ত অফিসার, নাবিকদেরও ঘটনা সম্পর্কে জানিয়ে রাখা হয়েছে। মুম্বই উপকূলে আন্তর্জাতিক জলসীমায় পাক জাহাজ দেখলে তার কাছাকাছি না গিয়ে দীর্ঘক্ষণ ধরে পর্যবেক্ষণ চালাতে বলেছে নৌবাহিনীর সদর দফতর। পাক জাহাজের তরফে কোনও রকম অস্বাভাবিক আচরণ দেখলে তা মোকাবিলার প্রস্তুতি নিয়েই এখন ভারতের যুদ্ধজাহাজগুলি আন্তর্জাতিক জলসীমায় নিয়মিত নজরদারি চালাচ্ছে।

করাচির ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ভারতীয় যুদ্ধজাহাজগুলি ওই বন্দরে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। কোনও দেশের নৌবাহিনীর আমন্ত্রণে অন্য দেশের যুদ্ধজাহাজ সে দেশের বন্দরে গিয়ে নোঙর করে। তখন সামাজিক ভাবে মেলামেশা করেন দু’দেশের নৌসেনারা। নৌবাহিনীর পরিভাষায় একে বলে ‘পোর্ট কল’। ভারত এড়িয়ে গেলেও এখনও অনেক দেশের যুদ্ধজাহাজ করাচিতে ‘পোর্ট কল’ করে। তা ছাড়া, ভারত মহাসাগরে রুটিন টহলদারি, জলদস্যু মোকাবিলা বা বাণিজ্যিক জাহাজগুলিকে নিরাপত্তা দিতে মার্কিন যুদ্ধ জাহাজগুলি পাক নৌবাহিনীর সঙ্গে একযোগে কাজ করে। তারা অনেক সময় করাচি বন্দরে নোঙরও করে। আল কায়দা জঙ্গিরা তেমন কোনও জাহাজ দখল করে আক্রমণ শানাতে পারে, এই আশঙ্কার কথাও এখন মাথায় রাখতে হচ্ছে ভারতীয় নৌবাহিনীকে।

নৌবাহিনীর সদর দফতর জানাচ্ছে, মুম্বই উপকূলে মোতায়েন যুদ্ধজাহাজগুলিকে যেমন ‘প্রস্তুত’ থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তেমনই নিশ্ছিদ্র করা হয়েছে গ্যাংওয়ের নিরাপত্তা। এ ছাড়া যে সব ঘাঁটিতে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন থাকে সেখানেও নানা-স্তরীয় নিরাপত্তার বেড়াজাল তৈরি করা হয়েছে। যাতে কোনও ভাবেই করাচির মতো ঘটনা এখানে না ঘটে।

সবাই যা পড়ছেন

Advertisement

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন
বাছাই খবর

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন