বালুচিস্তান নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কিন্তু এ বার বেশ জেরবার।

১৫ অগস্ট লালকেল্লায় প্রধানমন্ত্রীর তোলা বালুচ প্রসঙ্গ এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে যে আজ খোদ বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্রকে স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা দিতে হল। বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র বললেন, অহেতুক বালুচিস্তান নিয়ে জলঘোলা করা হচ্ছে। বালুচিস্তান নিয়ে প্রধানমন্ত্রী যা বলেছেন, তা নতুন কোনও নীতি নয়। বালুচিস্তানে ভারতের কোনও আগ্রাসী মনোভাবও নেই। বিদেশ মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে, বালুচিস্তান এবং গিলগিট থেকে বহু সংগ্রামী মানুষের অভিনন্দন বার্তা এসেছে  প্রধানমন্ত্রীর কাছে। প্রধানমন্ত্রী তা সাধারণ মানুষকে জানিয়েছেন মাত্র। এক কথায়, বালুচিস্তান নিয়ে মোদী সরকার এক কদম এগিয়ে দু’কদম পিছিয়ে এল।

মনমোহন সিংহ যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তখন মিশরের শর্ম-অল-শেখে ভারত ও পাকিস্তান একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করে। সেই বিবৃতিতে কাশ্মীরে সন্ত্রাসের পাশাপাশি, বালুচ সন্ত্রাসের প্রসঙ্গ উল্লেখ করার যে শর্ত পাকিস্তান দিয়েছিল, ভারত তাতে রাজি হয়ে গিয়েছিল। বিজেপি তখন সেই সরকারি সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে। বালুচিস্তানে সন্ত্রাসের উল্লেখ যৌথ বিবৃতিতে রাখার শর্ত মেনে নিয়ে যে ভারত আসলে নিজের কৃতকর্মের কথাই স্বীকার করে নিল, এমনটাই তখন বলেছিল বিজেপি। এ বার নরেন্দ্র মোদী খোলখুলি বালুচিস্তানের বিদ্রোহীদের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করায়, তিনিও সেই একই অভিযোগে বিদ্ধ হচ্ছেন।

স্বাধীনতা দিবসে প্রধানমন্ত্রীর বালুচ-মন্তব্যের পর প্রাক্তন বিদেশ মন্ত্রী সলমন খুরশিদ নিজে প্রবন্ধ লিখে প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্যের সমালোচনা করেছেন। খুরশিদ লিখেছন, মোদীর বালুচ-মন্তব্য একটি বড় কূটনৈতিক মূর্খামি। খুরশিদের মতে, সর্বদলীয় বৈঠকে অভ্যন্তরীণ কাঠামোর ভিতরে বালুচিস্তান নিয়ে কথা বলা আর ১৫ অগস্ট লালকেল্লার ভাষণে সে কথা বলা এক বিষয় নয়। লালকেল্লা থেকে প্রধানমন্ত্রী ওই মন্তব্য করার ফলে গোটা দুনিয়ার কাছে বালুচ নীতি নিয়ে নিয়ে এখন প্রধানমন্ত্রীকে জবাবদিহি করতে হচ্ছে।

সাউথ ব্লক সূত্রের খবর, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল বালুচিস্তান নিয়ে এমন আগ্রাসী অবস্থান নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। নভেম্বর মাসে সার্ক সম্মেলনে যোগ দিতে ইসলামাবাদ যাওয়ার কথা নরেন্দ্র মোদীর। তখন নওয়াজ শরিফের সঙ্গে যদি তাঁকে কাশ্মীর নিয়ে আলোচনা করতেই হয়, তা হলে তার আগে বালুচিস্তানের ক্ষতটা তৈরি করে রাখা জরুরি। কারণ সে ক্ষেত্রে পাকিস্তান চাপে থাকবে। ফলে কূটনৈতিক দর কষাকষিতে যাওয়া মোদী সরকারের পক্ষে অনেকটা সহজ হবে। কিন্তু যেমনটা ভেবেছিল মোদী সরকার, ঠিক তেমনটা হয়নি। কারণ পাকিস্তানও শঠে শাঠ্যং। তারাও ভিতরে ভিতরে ট্র্যাক টু কৌশলের মাধ্যমে মোদী সরকারকে জানিয়ে দিয়েছে, কাশ্মীরে পাকিস্তানের গোপন কার্যকলাপ যা রয়েছে, তা কোনও মতেই বন্ধ করা হবে না। পাকিস্তান মনে করিয়ে দিয়েছে, গোটা বালুচিস্তানে ১০ লক্ষ মানুষের বাস। আর জম্মু-কাশ্মীরের শুধু মাত্র রাজধানীতে অর্থাৎ শ্রীনগরেই ৮৫ লক্ষ মানুষের বাস। তাই বালুচিস্তানে নাশকতা হলে তার অভিঘাত যতটা হবে, কাশ্মীরে যে কোনও নাশকতার অভিঘাত তার চেয়ে অনেক বেশি হবে। পাকিস্তানের এই ট্র্যাক টু বার্তা থেকে স্পষ্ট যে কোনও মতেই তারা উপত্যকতায় সন্ত্রাস এবং জিহাদি কার্যকলাপ বন্ধ রাখবে না। বরং কাশ্মীরের আন্দোলনকে স্বাধীনতা সংগ্রাম আখ্যা দিয়ে নতুন কৌশলে লড়াই হবে। কৌশলগত ভাবেই কাশ্মীরের সমস্যাকে স্বাধীনতা সংগ্রাম আখ্যা দিচ্ছে পাকিস্তান। একে আর জিহাদি আখ্যা দিতে তারা রাজি নয়। পাকিস্তানের মুখপাত্র বলছেন, কাশ্মীরের আন্দোলনকে জিহাদ বললে তার সঙ্গে ইসলামিক প্রেক্ষিত যুক্ত হয়ে যায়। কিন্তু এটা নিছক ইসলামিক বিষয় নয়। কাশ্মীরের স্বাধীনতার বিষয়। ধর্মীয় নয়, রাজনৈতিক বিষয়। অর্থাৎ পাকিস্তান স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিচ্ছে, বালুচিস্তান নিয়ে ভারত যা-ই বলুক, পাকিস্তান কাশ্মীর নীতি পরিবর্তন করবে না। বরং আরও আগ্রাসী হয়ে প্ররোচনা দেবে। ভারতের অন্যান্য প্রান্তে, নাশকতামূলক কার্যকলাপে যাতে পাকিস্তানের কোনও জঙ্গি সংগঠনের ভূমিকা না থাকে, সেটা ভবিষ্যতে দেখা হবে বলে ইসলামাবাদ আশ্বাস দিয়েছিল। তবে কাশ্মীর নিয়ে কোনও প্রতিশ্রুতি তারা দিতে রাজি হয়নি। সেই প্রতিশ্রুতি আদায়ের জন্যই বালুচ প্রসঙ্গ তোলার সিদ্ধান্ত হয়েছিল মন্ত্রিসভার নিরাপত্তা বিষয়ক কমিটির বৈঠকে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তে হিতের বদলে খানিকটা বিপরীতই হয়েছে।

সলমন খুরশিদ ব্যক্তিগত প্রবন্ধে মোদীর বালুচ নীতির সমালোচনা করলেও, কংগ্রেস কিন্তু আনুষ্ঠানিক ভাবে বা প্রকাশ্যে এর বিরোধিতা করেনি। উল্টে গুলাম নবি আজাদ মোদীর সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে বলেছেন, শর্ম-অল-শেখের বিবৃতির ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে সরকার। কিন্তু তাতে আরও প্যাঁচে পড়ে গিয়েছে মোদী সরকার। কারণ বিরোধী দলের সমর্থন পাওয়ার পর বালুচ নীতি থেকে পিছিয়ে আসার পথও কঠিন হয়ে গিয়েছে।

আরও পড়ুন: ভারত-পাক সংঘাতের নয়া কেন্দ্র চিরবিদ্রোহী বালুচিস্তান

সার্কভুক্ত দেশগুলির অর্থ মন্ত্রীদের যে বৈঠক ইসলামাবাদে হতে চলেছে, অরুণ জেটলি তা বয়কট করতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে। কিন্তু ভারত পুরোপুরি অনুপস্থিত থাকার পথ নিচ্ছে না। জেটলি না গেলে অর্থ সচিবকে সেই সম্মেলনে পাঠানো হবে। কারণ সার্ক-এর নিয়ম অনুযায়ী, কোনও একটি সদস্য দেশ বৈঠকে না থকলেই, তা বাতিল হয়ে যায়। সার্ক অর্থ মন্ত্রীদের সম্মেলন বাতিল হয়ে যাক, ভারত তেমনটা চাইছে না। কারণ তাতে নেপাল, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ সকলেই রুষ্ট হবে। সার্ক-এর এই সদস্য দেশগুলির বক্তব্য, ভারত-পাকিস্তানের দ্বিপাক্ষিক ঝগড়ার জন্য সার্কের মতো বহুপাক্ষিক সংগঠনের সম্মেলন ভেস্তে যাওয়া কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। ভারত সরকারের উপর আগেও সার্ক সম্মেলন ভেস্তে যাওয়ার দায় বর্তেছিল। কার্গিল যুদ্ধের পর অটলবিহারী বাজপেয়ী সার্ক সম্মেলনে না যাওয়ায়, সে সম্মেলন ভণ্ডুল হয়ে যায়। মোদী সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে ইচ্ছুক নন। তিনি বিলক্ষণ জানেন, ভারত-পাক দ্বন্দ্বে ইসলামাবাদে আয়োজিত সার্ক সম্মেলন ভেস্তে গেলে পাকিস্তানেরও মুখ পুড়বে। তাতে নওয়াজ শরিফের কর্তৃত্ব আরও দুর্বল হবে। মোদী জানেন, পাকিস্তানে এই মুহূর্তে নওয়াজ দুর্বল হলে সেনা, আইএসআই আর মোল্লাতন্ত্রের দাপট আরও বাড়বে। অর্থাৎ মোদীর সামনে এখন অনেক বাধ্যবাধকতা। নওয়াজ শরিফকে দুর্বল করলে চলবে না। পাকিস্তানকে চাপেও রাখতে। বালুচিস্তান নিয়ে সুর খুব একটা নরম করাও যাবে না।

সব মিলিয়ে ‘শ্যাম রাখি, না কুল রাখি’ পরিস্থিতিতে মোদী সরকার।