প্রথম দফার মতো দ্বিতীয় দফার প্রধানমন্ত্রিত্বেও ভুটান দিয়ে শুরু হল নরেন্দ্র মোদীর বিদেশ সফর। দু’দিনের সেই সফরে আজ থিম্পুতে এসে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বললেন, ‘‘১৩০ কোটি মানুষের হৃদয়ে ভুটানের বিশেষ স্থান রয়েছে। তাই আমার আগের শাসনকালের প্রথমেই ভুটান সফর খুব স্বাভাবিক ছিল। এই সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ মানুষ আমাকে দিয়েছেন।’’ 

নানা ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে আজ বৈঠক করেছেন দুই প্রধানমন্ত্রী। মহাকাশ গবেষণা, বিমান চলাচল, তথ্যপ্রযুক্তি, বিদ্যুৎ ও শিক্ষা সংক্রান্ত দশটি সমঝোতাপত্র (মউ) সই হয়েছে। জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে এলপিজি সরবরাহ, মুদ্রা বিনিময় বাড়ানো থেকে মহাকাশ প্রযুক্তি— সবেতেই ‘অভিন্ন ও বিশেষ মিত্র’ ভুটানকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার কথা বলেছেন মোদী। তাঁর কথায়, ‘‘এ দেশে পরম্পরা ও পরিবেশের সঙ্গে এগিয়ে চলে আর্থিক বিকাশ। এমন পড়শি কে না চায়? ভারতের সৌভাগ্য যে, আমরা ভুটানের বিকাশের শরিক। ভুটানের পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় ভারতের অবদান অব্যাহত থাকবে।’’ 

ভুটানে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ‘ইসরো’-র সহযোগিতায় তৈরি ‘গ্রাউন্ড আর্থ স্টেশন’-এর আজ উদ্বোধন করেন দুই প্রধানমন্ত্রী। এই কেন্দ্র থেকে ভারতের ‘দক্ষিণ এশীয়’ (জিস্যাট-৯) উপগ্রহটিকে যোগাযোগ, সম্প্রচার ও বিপর্যয় মোকাবিলার কাজে ব্যবহার করতে পারবে ভুটান। যৌথ সহযোগিতায় নির্মিত ও ৭৪০ মেগাওয়াটের ক্ষমতাসম্পন্ন মঙ্গদেছু জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটি আজ উদ্বোধন করেন মোদী। জলবিদ্যুৎ ক্ষেত্রে ভারত-ভুটান সহযোগিতার ৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রকাশ করেন স্মারক ডাকটিকিট। মোদী জানান, দুই দেশের যৌথ উদ্যোগে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ২০০০ মেগাওয়াট পেরিয়েছে। ভুটানের আমজনতার জন্য এলপিজি সরবরাহ মাসে ৭০০ টন থেকে বাড়িয়ে ১০০০ টন করছে ভারত। সার্ক-নির্ধারিত কাঠামো অনুযায়ী ভুটানের সঙ্গে মুদ্রা-বিনিময়ের মাত্রা বৃদ্ধির বিষয়ে নয়াদিল্লি ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে এগোচ্ছে। আপাতত অতিরিক্ত ১০ কোটি ডলার মূল্যের ভারতীয় মুদ্রা পাবে ভুটান। 

মোদী জানান, রয়্যাল ভুটান বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আইআইটি-সহ প্রথম সারির ভারতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির আদান-প্রদান চলবে। প্রধানমন্ত্রী শেরিংয়ের (যিনি এক জন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিকিৎসক) স্বপ্নের ‘মাল্টি ডিসিপ্লিনারি সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতাল’ তৈরিতেও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে ভারত। ভুটানের রাজা জিগমে খেসর নামগিয়েল ওয়াংচুকের ‘দূরদৃষ্টি’, খুশির নিরিখে উন্নয়ন মাপার অনন্য নজির ভুটানকে কী ভাবে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছে, তার উল্লেখ করেন মোদী। রাজা-রানির সঙ্গেও সাক্ষাৎ হয় তাঁর। ঐতিহাসিক সিমটোখা জ়ংয়ে গাছের চারা রোপণ করেন তিনি। 

কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ডোকলাম-পরবর্তী অধ্যায়ে ভুটানের উপরে চিনা প্রভাব নিয়ে সতর্ক রয়েছে দিল্লি। মুক্ত সীমান্তের ক্ষুদ্র প্রতিবেশী রাষ্ট্রটির সঙ্গে মৈত্রী দৃঢ় করাটা তাই ভারতের কূটনৈতিক বাধ্যবাধকতা। আজ ভুটানের স্থানীয় ভাষায় একাধিক টুইট করেন মোদী। পারো বিমানবন্দরে লাল কার্পেটে তাঁকে স্বাগত জানান ভুটানের প্রধানমন্ত্রী। বিমানবন্দর থেকে থিম্পু পর্যন্ত রাস্তার ধারে দু’দেশের পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে ছিল অল্পবয়সিরা। অভিভূত মোদী গাড়ি থেকে তোলা সেই দৃশ্যের ভিডিয়ো-সহ টুইটারে লেখেন, ‘স্মরণীয় স্বাগতবার্তা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সুন্দর মানুষে ভরা এই দেশ। ভারত-ভুটানের মৈত্রী দেখতে সবাই মুখিয়ে আছেন।’