একটু একটু করে চেনা ছন্দে ফিরছে কাশ্মীর। বদলাচ্ছে উপত্যকার পরিস্থিতি। আর সেই আবহেই মঙ্গলবার খুলে গেল শ্রীনগরের ঐতিহ্যশালী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এনআইটি)। কিন্তু, নিরাপত্তা নিয়ে এখনও আশঙ্কায় রয়েছেন এনআইটি-র পড়ুয়ারা। তাই প্রতিষ্ঠান খুললেও এখনও সেখানে পা দিতে ভরসা পাচ্ছেন না অনেকেই। দীর্ঘ দিন ধরেই পড়াশোনা ও ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় চরম বিপাকে পড়েছেন ছাত্রছাত্রীরা।

সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বিলোপ এবং সেই সঙ্গে জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার— কেন্দ্রীয় সরকারের এই দুই পদক্ষেপে উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে কাশ্মীর। এই আশঙ্কায় একাধিক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল উপত্যকায়। নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে ফেলা হয়েছিল সব জায়গা। ফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারেও লাগাম দেওয়া হয়েছিল। সেই সময় থেকেই এক টানা ৭৪ দিন বন্ধ ছিল এনআইটি-র মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এর পর, গত মাসেই ওই প্রতিষ্ঠান খোলার কথা ঘোষণা করে মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক। এনআইটি-র ওয়েবসাইটেও সেই ঘোষণাপত্র আপলোড করা হয়েছিল।

কিন্তু, প্রথম দিনেই কিছুটা ধাক্কা খেতে হয়েছে এনআইটি কর্তৃপক্ষকে। ছাত্রছাত্রীদের অনেককেই এখনও সেই আতঙ্ক তাড়া করে বেড়াচ্ছে। ফলে, এনআইটি খুললেও, পড়ুয়ারা এখনও দ্বিধায় রয়েছেন। যতই ঐতিহ্যশালী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হোক না কেন, নিরাপত্তার স্বার্থে অনেকেই ফিরতে চাইছেন না সেখানে। গত ৫ অগস্ট সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বিলোপের ঘোষণার দু’দিন আগে অর্থাৎ, গত ৩ অগস্ট বাসে চড়ে বাড়ি ফেরার সময়েই পড়ুয়ারা বুঝতে পেরেছিলেন গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটতে চলেছে। সে কথা উঠে এসেছে এনআইটি-র ছাত্রী পূজার (নাম পরিবর্তিত) বয়ানেও। তিনি বলেন, ‘‘আমরা জানতাম বড় কিছু হতে চলেছে। আমাদের বাসে তুলে দেওয়া হয়েছিল এবং উপত্যকা ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। তার পর থেকে পরিস্থিতি কোন অবস্থায় রয়েছে তা আমাদের জানানো হয়নি।’’ এর পরই তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন কাশ্মীরের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও। পূজা বলেন, ‘‘আমি মনে করি না, ওখানে ফিরে যাওয়া আমার পক্ষে নিরাপদ। কারণ, আমি জম্মুর মেয়ে। আর জম্মু-কাশ্মীরের মানুষের মধ্যে উত্তেজনা রয়েছে।’’ পূজার সুরে সুর মিলিয়েছেন দিল্লিবাসী এনআইটি-র আরেক ছাত্র সূরজ প্রসাদও। তাঁর দাবি, ২০১৬ সালে বুরহান ওয়ানি নিহত হওয়ার পর থেকেই উপত্যকায় চাপা উত্তেজনা বজায় ছিল। তার পর পরিস্থিতির উন্নতি হলেও তা সাময়িক। সূরজ প্রসাদ বলেন, ‘‘আমি এখান থেকে অন্যত্র চলে যাওয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু, এটা সহজ নয়। যদি, আমি অন্য কোনও এনআইটি-তে সুযোগ পাই তবে আমি চলে যাব।’’

এনআইটি ছাড়ছেন পড়ুয়ারা। ফাইল চিত্র

আরও পড়ুন: জরুরি অবস্থা চলছে! ডেকে নিয়ে গিয়ে অপমান করা হয়েছে আমাকে: কার্নিভাল নিয়ে বিস্ফোরক রাজ্যপাল

সূত্রের খবর, এনআইটি-তে মোট পড়ুয়ার সংখ্যা দু’হাজার আটশো। তার মধ্যে আঠেরোশো ছাত্রছাত্রী হস্টেলে থাকেন। আশা করা হচ্ছে, প্রত্যেকেই চলতি শিক্ষাবর্ষে ফিরে আসবেন। নিরাপত্তা নিয়ে অবশ্য আশ্বাস দিচ্ছে পুলিশ। জম্মু-কাশ্মীরের এডিজি মুনির খানের কথায়, ‘‘কেউ অযথা আতঙ্কিত হবেন কেন? আমরা গোটা নিরাপত্তা পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। দয়া করে আপনারা আশ্বস্ত হোন, যে কোনও পরিস্থিতির মোকাবিলায় জম্মু-কাশ্মীর পুলিশ সক্ষম।’’

আরও পড়ুন: জিয়াগঞ্জ তদন্ত: নানান সন্দেহে ঘুরপাক খেতে খেতে কী ভাবে উৎপলকে ধরতে পারল পুলিশ

উপত্যকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপনও দিতে হয়েছে স্থানীয় প্রশাসনকে। দোকান খোলার জন্য ব্যবসায়ীদের আহ্বান জানানো হয়েছে। সাধারণ মানুষকে তাঁদের সন্তানের স্কুলে পাঠানোর জন্যও আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু, ভিন্ন আশঙ্কার কথা তুলে ধরেছেন শ্রীনগরের এনআইটি-তে পাঠরত বাইরের পড়ুয়ারা। সূরজ প্রসাদের কথায়, ‘‘আমরা অনেক দিন ধরেই কাশ্মীরের বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করছি। আমরা জম্মু বা লেহ-তে পড়াশোনা করতে পারি। কিন্তু, কাশ্মীরে পড়াশোনা করা খুবই শক্ত ব্যাপার। আমার কথা ভাবুন। আমি কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র। আমি ইন্টারনেট ছাড়া কী ভাবে কাজ করব?’’ যদিও, দীর্ঘ দিন ধরে বিপর্যস্ত থাকার পর সোমবার থেকে কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে উপত্যকার টেলি যোগাযোগ ব্যবস্থা। কিন্তু, শেষমেশ জল কতদূর গড়ায় তা দেখতে অপেক্ষা করতে চাইছেন এনআইটি-র অনেক পড়ুয়াই।