এইমসের শয্যায় তাঁর অবস্থা যত সঙ্কটজনক হচ্ছিল, ততই স্রোতের মতো ফিরে ফিরে আসছিল স্মৃতি। প্রয়াণের খবর আসার আগেই যেন সারা দেশ শোকস্তব্ধ। চর্চা শুধু তাঁকে নিয়েই।

প্রথম বার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। আস্থা ভোটের আগে লোকসভায় এক অবিস্মরণীয় ভাষণ দিলেন।

অথবা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তৃতীয় কার্যকাল। সাম্প্রদায়িক হিংসায় বিধ্বস্ত একটি রাজ্য। সে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে পাশে বসিয়ে প্রকাশ্যে রাজধর্মের শিক্ষা দিলেন।

অথবা, তাঁর কাব্যচর্চাকে কটাক্ষ করে কংগ্রেসের তৎকালীন সভানেত্রী সনিয়া গাঁধী বললেন, শুধু কবিতা লিখলে দেশ চলে না। একটুও মেজাজ না হারিয়ে ততোধিক তীক্ষ্ণ শ্লেষে তিনি বললেন, ঠিকই, শুধু কবিতা লিখলে দেশ চলে না, লিখে রাখা ভাষণ জনসভায় গিয়ে পড়লে দেশ দৌড়য়।

তাঁর সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের এমন নানা মুহূর্তের কথা দেশবাসীর মুখে মুখে ফিরতে শুরু করেছিল তাঁর সঙ্কটজনক শারীরিক অবস্থার কথা জানতে পেরেই। জীবনে ফেরা প্রায় অসম্ভব জেনেও দেশ জুড়ে প্রার্থনা শুরু হয়ে গিয়েছিল তাঁর জন্য। এর চেয়ে বেশি সার্থকতা আর কীসে পেতে পারেন এক জন রাজনৈতিক নেতা?

এ দেশের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির আঙিনায় তিনি ছিলেন ‘নরম মুখ’। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের সঙ্গে ছিল নিবিড় যোগ। কিন্তু দেশের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর প্রতি ছিল অপার শ্রদ্ধা। এক টালমাটাল সন্ধিক্ষণে দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন— এক দিকে জোট রাজনীতির উত্থান, অন্য দিকে দেশের অর্থনীতিতে বড়সড় বদল আনার প্রক্রিয়া। কিন্তু হাজার ঝড়ঝাপ্টা সামলেও অধিকাংশ অবকাশে তাঁর মুখচ্ছবি সহাস্য। আর সর্বোপরি ছিল তাঁর অসামান্য বাগ্মিতা এবং পাণ্ডিত্য। ভারতরত্ন অটলবিহারী বাজপেয়ী ভারতীয় জনমানসে চিরস্মরণীয় হয়ে গিয়েছেন মূলত এই সব কারণেই।

আরও পড়ুন: ভারত রত্নহীন, চলে গেলেন অটলবিহারী বাজপেয়ী

জীবনের অন্তিম বছরগুলো অবশ্য খুব ভাল গেল না অটলবিহারী বাজপেয়ীর। পণ্ডিত রাজনীতিকের স্মৃতি লোপ পেয়ে গিয়েছিল ২০০৯ সালে একটি স্ট্রোকের পরে। কথা বলার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছিলেন বাগ্মী বিজেপি নেতা। কিডনি, মূত্রনালী এবং বুকে সংক্রমণ নিয়ে দু’মাসের বেশি সময় কাটল তাঁর হাসপাতালে। সেখানেই চিরতরে স্মৃতি হয়ে গেলেন অটলবিহারী বাজপেয়ী।

তাঁর চারপাশে উগ্র হিন্দুত্ববাদীর অভাব ছিল না কোনও কালেই। কিন্তু নিজেকে সেই দলে মিশিয়ে দেননি কোনও দিন। সম্ভবত সেই কারণেই, তিন-তিন বার অ-বিজেপি দলগুলির সমর্থন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী পদে শপথ নিতে পেরেছিলেন অটল।

আরও পড়ুন: ওঁর স্মিত হাসিই চিরদিনের স্মৃতি হয়ে রয়ে যাবে: আডবাণী

রাজনীতির মতো, কূটনীতিতেও ভারসাম্যের পরিচয় দিতে চেয়েছিলেন অটলবিহারী বাজপেয়ী। তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি ঘটানোর লক্ষ্যে বড়সড় পদক্ষেপ করেছিল ভারত। তৎকালীন পাক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে সঙ্গে নিয়ে ভারত-পাক বাসযাত্রার সূচনা করেছিলেন বাজপেয়ী। বলেছিলেন, ‘‘বন্ধু বদলানো যায়৷ কিন্তু প্রতিবেশী বদলানো যায় না।’’ কিন্তু কার্গিলে পাক অনুপ্রবেশ ও দখলদারির খবর পেয়েই সর্বাত্মক সামরিক অভিযানের নির্দেশ দিতে দ্বিধা করেননি তিনি।

অটলবিহারী বাজপেয়ীর আমলে পোখরানে পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটায় ভারত। তাতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হয় নয়াদিল্লিকে। কিন্তু আমেরিকার সঙ্গে ভারতের অভূতপূর্ব সুসম্পর্কের দরজাটাও খুলে দিয়ে যান অটলবিহারী বাজপেয়ী-ই। তাঁর আমলেই ভারত সফরে আসেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টন। ভারত-মার্কিন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নতুন যুগের সূচনা হয়ে যায় ক্লিন্টনের সেই ভারত সফরেই।

১৯২৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর গ্বালিয়রে জন্ম অটলবিহারী বাজপেয়ীর৷ মা কৃষ্ণা দেবী, বাবা কৃষ্ণবিহারী বাজপেয়ী৷ বাবা ছিলেন কবি, পেশায় স্কুলশিক্ষক৷ কবিতায় হাতেখড়ি বাবার কাছেই৷ গ্বালিয়রের ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে স্নাতক হন। পরে কানপুরের ডিএভি কলেজ থেকে স্নাতকোত্তরে উত্তীর্ণ হন প্রথম শ্রেণিতে। ইংরেজি, হিন্দি, সংস্কৃত— বেশ তরুণ বয়সেই তিনটি ভাষায় পারদর্শী হয়ে উঠেছিলেন বাজপেয়ী।

আরও পড়ুন: অটলজি কোনও বড় সিদ্ধান্তের আগে ডেকে পাঠাতেন আমাকে

রাজনীতি বোধ হয় ছিল তাঁর মজ্জায়। ছাত্রাবস্থাতেই ‘আর্যসমাজ’-এর সঙ্গে যুক্ত হন। বাবাসাহেব আপ্তে-র অনুপ্রেরণায় ১৯৩৯ সালে যোগ দেন আরএসএসে। কয়েক বছরের মধ্যেই হয়ে ওঠেন সঙ্ঘের প্রচারক।

দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামেও যোগ দিয়েছিলেন অটলবিহারী৷ ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে অংশ নিয়ে গ্রেফতার হয়েছিলেন৷ জেল খেটেছিলেন ২৩ দিন।

১৯৫১ সালে দীনদয়াল উপাধ্যায়ের অনুপ্রেরণায় অটল যোগ দেন ভারতীয় জনসঙ্ঘে৷ দলের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অন্যতম প্রিয়পাত্রও হয়ে ওঠেন শীঘ্রই৷ ১৯৫৭ সালে উত্তরপ্রদেশের বলরামপুর থেকে বাজপেয়ী প্রথম বার লোকসভায় নির্বাচিত হন৷ ১৯৬৮ সালে ভারতীয় জনসঙ্ঘের সর্বভারতীয় সভাপতি হন। ১৯৭৭ সালে জরুরি অবস্থার অবসান। ইন্দিরা-বিরোধী ঐক্য জোরদার করতে চরণ সিংহের নেতৃত্বাধীন ভারতীয় লোক দল এবং মোরারজি দেশাইদের কংগ্রেস (ও) এবং বাজপেয়ী-আডবাণীদের জনসঙ্ঘ মিশে যায়, তৈরি হয় জনতা পার্টি। নির্বাচনে ভরাডুবি হয় কংগ্রেসের। মোরারজি দেশাইয়ের প্রধানমন্ত্রিত্বে দেশে প্রথম অকংগ্রেসি মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। অটলবিহারী বাজপেয়ী সে মন্ত্রিসভায় বিদেশমন্ত্রী হন।

আরও পড়ুন: আমরা ছিলাম প্রাতর্ভ্রমণের সঙ্গী: প্রণব মুখোপাধ্যায়

নানান মতাদর্শের ‘জগাখিচুড়ি’ জনতা পার্টি অবশ্য বেশি দিন ঐক্যবদ্ধ থাকেনি। ১৯৮০ সালে সাবেক জনসঙ্ঘীরা বেরিয়ে যান জনতা পার্টি থেকে। তৈরি হয় ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি), যার প্রথম সভাপতি হন বাজপেয়ী।

১৯৯৬ সালে লোকসভা নির্বাচনে একক বৃহত্তম দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে বিজেপি। দেশের দশম প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেন অটলবিহারী৷ কিন্তু নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না দলের। ম্যাজিক ফিগার জোগাড়ও করতে পারেননি বাজপেয়ী। ১৩ দিনে পতন ঘটে বাজপেয়ী সরকারের। কিন্তু ইস্তফা দেওয়ার আগে যে ভাষণ অটল দিয়েছিলেন লোকসভায়, তা সংসদে প্রধানমন্ত্রীদের দেওয়া স্মরণীয় ভাষণগুলোর অন্যতম হয়ে রয়ে গিয়েছে।

আরও পড়ুন: জিন্স, টি-শার্টে কাকভোরেই সমুদ্রসৈকতে তখন প্রধানমন্ত্রী

বাজপেয়ী সরকার টেকেনি ঠিকই। কিন্তু কংগ্রেস সমর্থন নিয়ে তৈরি হওয়া সংযুক্ত মোর্চা সরকারও বছর দু’য়েকের বেশি টিকতে পারেনি। ফলে ১৯৯৮ সালে ফের নির্বাচনের মুখোমুখি হয় দেশ। আরও বেশি আসন নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে বিজেপি। ফের সরকার গঠন করে এনডিএ। কিন্তু সে বারও পূর্ণ মেয়াদ ক্ষমতায় থাকতে পারেননি বাজপেয়ী। তেরো মাসে সরকার পড়ে যায়। ১৯৯৯ সালের নির্বাচনের রায়ও ছিল বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের পক্ষেই। তৃতীয় বার সুযোগ পেয়ে প্রথম অকংগ্রেসি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পূর্ণ মেয়াদ ক্ষমতায় থাকার রেকর্ড গড়েন বাজপেয়ী।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তৃতীয় কার্যকালে অটলবিহারী বাজপেয়ী অনেকগুলি ক্ষেত্রে সাফল্যের পরিচয় দিয়েছিলেন। দেশের আর্থিক বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়েছিল। রাজকোষ দ্রুত ফুলে-ফেঁপে উঠেছিল। দেশ জুড়ে পরিকাঠামো উন্নয়ন গতি পেয়েছিল। কিন্তু নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি, সাম্প্রদায়িক হিংসা-সহ নানা বিষয় ২০০৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে আর এনডিএ-কে ক্ষমতায় ফিরতে দেয়নি৷ পরাজয়ের সমস্ত দায় নিজের কাঁধে নিয়ে বিরোধী নেতার পদ নেওয়া থেকেও সরে দাঁড়িয়েছিলেন অটল। ২০০৯ সালে আর নির্বাচনেও লড়েননি।

অকৃতদার বাজপেয়ী ছিলেন পূর্ণ সময়ের রাজনৈতিক কর্মী। পরিজন বলতে দত্তক কন্যা। ভালবাসতেন ঘুরে বেড়াতে, সিনেমা দেখতে৷ তুমুল ব্যস্ততার মধ্যেও সময় পেলেই চলে যেতেন সিনেমা দেখতে। লালকৃষ্ণ আডবাণী হতেন সঙ্গী। আর কাব্যচর্চা তো ছিল রক্তেই, তাই সে সব চলত রাজনৈতিক ব্যস্ততার ফাঁকে ফাঁকেই।

আরও পড়ুন: রাজধর্ম, বাজপেয়ী বলেছিলেন এক যুগ আগে, মোদী আজও পেরেছেন কি?

সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য অটলবিহারী বাজপেয়ী সম্ভবত ছিলেন এক আদর্শ রাজনীতিক। ঘোর রাজনৈতিক বৈরিতা ছিল যে ইন্দিরা গাঁধীর সঙ্গে, ’৭১-এর যুদ্ধে ভারতের অভূতপূর্ব বিজয়ের পরে সেই ইন্দিরাকেই সংসদে দাঁড়িয়ে ‘মা দুর্গা’ বলে সম্বোধন করেছিলেন অটলবিহারী বাজপেয়ী। কোনও অমোঘ নিয়মেই হয়তো নিজেও ফিরে পেয়েছিলেন সেই সম্মান। মতাদর্শগত দিক থেকে বাজপেয়ীর চেয়ে অনেকটা দূরত্বে অবস্থান করা মনমোহন সিংহ বলেছিলেন, ‘‘অটলবিহারী বাজপেয়ী হলেন ভারতীয় রাজনীতির ভীষ্ম।’’

শরশয্যার মতো যন্ত্রণা কখনও অনুভব করেছিলেন কি না, বলা কঠিন। কিন্তু দীর্ঘ রোগশয্যা ভোগ করতে হয়েছে শেষটায়। প্রয়াণটা বোধহয় ভীষ্মের মতোই হল। জাতীয় রাজনীতির কুরুক্ষেত্রে যুযুধান শিবিরে থাকা দু’পক্ষের মধ্যে যখন তিক্ততা চরমে, তখন বাজপেয়ীকে ঘিরে সব তিক্ততাই যেন অতীত। সব পক্ষ তাঁর শয্যাপার্শ্বে। সূর্যও উত্তরায়নেই।