রাইসিনা হিল-এ প্রবেশের আগের পাক্কা আট বছর তাঁর জন্য দিনের ২৪ ঘণ্টাও কম পড়ত! সকালের নিত্যপুজো এবং অন্তত পাঁচটি কাগজ পড়ার সময়টুকুই শুধু ছিল ব্যক্তিগত। তাঁর বাকি সময়টা ছিল রাষ্ট্রের দখলে! মন্ত্রকের স্তূপাকার ফাইলের মধ্যে ডুবে থাকা, মন্ত্রিসভার আলোচ্যসূচিতে চোখ বোলানো, সংসদ চলাকালীন নিত্যনতুন সঙ্কটমোচনের সূত্র সন্ধান, দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারণে বৈঠকের পর বৈঠক— সব সেরে রাতে যখন ১৩ তালকাটোরা রোডের বাড়িতে পৌঁছতেন, তত ক্ষণে বাইরের ঘরে অপেক্ষমান মিনি ভারতবর্ষ! বিভিন্ন রাজ্যের ছোট-বড় নেতা, প্রার্থী, মুখ্যমন্ত্রী, বাণিজ্যকর্তা, শিল্পপতি, অধ্যাপক, সাংবাদিক, গায়ক— কে নেই সেই তালিকায়! কংগ্রেসের আদি রেওয়াজ মেনে সেটি এক নেতার দরবারই যেন বা। প্রত্যেকের সঙ্গে প্রয়োজন এবং ওজন বুঝে সময় দিতেন। আর সব সেরে রাত ১২টার পর বিখ্যাত লাল ডায়েরিতে প্রিয় শেফার্স কলমে লিখতে বসতেন দিনলিপি। তার পর স্নান। খাওয়া শেষ করে বিছানায় যেতে যেতে মধ্যরাত।

রাষ্ট্রপতি ভবনের চোখধাঁধানো কক্ষে বসে তাঁর নতুন ইনিংসের গোড়ার পর্বে এক আলাপচারিতায় বলেছিলেন, ‘‘ওই উত্তেজনাময় মুহূর্তগুলোকে খুব মিস করছি।’’ টেবিলের সামনে রাখা টিভিতে চালিয়ে রাখতেন খবরের চ্যানেল। সংসদ চললে লোকসভা অথবা রাজ্যসভার সম্প্রচার।

কিন্তু তিনি, প্রণব মুখোপাধ্যায়, ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিচিত্র যাত্রাপথ পাড়ি দিয়ে এসে আত্মস্থ করেছেন এক বীজমন্ত্র। যে কোনও পরিস্থিতিতে যে কোনও পরিসরে নিজের প্রাসঙ্গিকতা তৈরি করে নেওয়া। নিজেকে সেই পরিস্থিতিতে মানিয়ে নেওয়া। সে জল নোনতাই হোক বা মিঠে, ঝিলই হোক বা সমুদ্র— সর্বত্র অনায়াসে সন্তরণ করার এক আশ্চর্য ক্ষমতার অধিকারী তিনি। ফলে রাজনৈতিক অথবা প্রশাসনিক গুরুত্বের শীর্ষবিন্দু থেকে দূরে রাষ্ট্রপতি ভবনের দরবার হল, অশোক হল-খচিত প্রোটোকল-বন্দি জীবনে মানিয়েও নিলেন মসৃণ ভাবে।

আরও পড়ুন: স্বকীয়তা বজায় রেখেই সকলকে নিয়ে চলে অনন্য প্রণববাবু

দমদম বিমানবন্দরে আবু বরকত আতাউর গনিখান চৌধুরীর সঙ্গে প্রণব মুখোপাধ্যায়।
১৯৮১। ছবি: আনন্দবাজার পত্রিকার আর্কাইভ থেকে।

সংবিধানকে গীতার মতো মান্য করেন প্রণব মুখোপাধ্যায়— এ কথা রাজনৈতিক সার্কিটে অনেকেই জানেন। রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হওয়ার পর ফের ঝালিয়ে নিলেন নিজের সীমাবদ্ধ ক্ষমতার মধ্যে থেকেও নতুন কী কী করা যায় সংবিধানকে মান্য করে। রাষ্ট্রপতি ভবনকে আমজনতার জন্য খুলে দেওয়া, গ্রন্থাগারের আমূল সংস্কার, সাহিত্যিক থেকে শিল্পী, কারুশিল্পী থেকে প্রযুক্তি উদ্ভাবক— সবার জন্য প্রেসিডেন্ট এস্টেটের মনোরম ভূস্বর্গে কিছু দিন থেকে নিজের কাজ করার সুযোগ করে দেওয়া, গোটা দেশে জুড়ি মেলা ভার এমন এক সংগ্রহশালা তৈরির মতো বিভিন্ন কর্মকাণ্ড করেছেন তিনি পাঁচ বছরে। রাষ্ট্রপতি ভবনে শুধুমাত্র রাষ্ট্রনেতা বা আমির ওমরাহ-রাই নন, প্রায় প্রতি সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন লোকায়ত শিল্পসংস্কৃতি প্রদর্শনের ব্যবস্থাও করা হয়েছে অডিটোরিয়ামে। যে প্রণব মুখোপাধ্যায় গোটা জীবনে দু’টি থেকে তিনটির বেশি সিনেমা দেখেননি (যার মধ্যে একটি ‘রং দে বাসন্তী’, যা তিনি প্রতিরক্ষামন্ত্রী থাকাকালীন দেখতে বাধ্য হয়েছিলেন ছবিটি ঘিরে বিতর্কের কারণে!), সেই তিনিই মাসে অন্তত এক দিন হাজির থাকতেন অডিটোরিয়ামে। নতুন কোনও ছবির প্রিমিয়ারে। আজীবনের গ্রন্থকীট প্রণব, সিনেমা দেখার ব্যাপারে নতুন আগ্রহ গড়ে তুলেছিলেন এই রাষ্ট্রপতিত্বের মেয়াদে।

আরও পড়ুন: রাজনীতির দাবা বারে বারে ঘুঁটি সাজিয়েছে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে

পুরনো প্রণব মুখোপাধ্যায়কে কি তা হলে কোথাও দেখা যায়নি গত পাঁচ বছরে? কিছু অর্ডিন্যান্স ফিরিয়ে দেওয়া এবং সহিষ্ণুতা ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে বক্তৃতার আড়ালে কিছু প্রশ্ন তোলা ছাড়া?  আজ তাঁর অবসরগ্রহণের সময়ে এটা স্বীকার করে নেওয়া ভাল যে নিঃশব্দে তিনি সরকারের তথা রাষ্ট্রের এমন একটি গুরুদায়িত্ব বহন করেছেন যার উদাহরণ রাষ্ট্রপতি ভবনের সাম্প্রতিক দস্তাবেজ ঘেঁটে পাওয়া বিরল। গত সপ্তাহে সাংবাদিকদের জন্য দেওয়া বিদায়ী নৈশভোজে তাঁকে ঘিরে মূল উৎসুক প্রশ্নটি ছিল, ‘এ বার কী করবেন?’ কী করবেন তা এখনই স্পষ্ট না করলেও একটি কথা তিনি বলেন যা এই প্রসঙ্গে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। বললেন, ‘‘আর যা-ই করি আর সফর করব না। বিদেশে তো বার বারই গিয়েছি গত পাঁচ বছরে। এমনকী দেশেও এমন একটি রাজ্য নেই যেখানে অন্তত ১০ বার যাইনি। বিহারেই তো গত এক বছরে গিয়েছি পাঁচ বার। রামনাথ কোবিন্দ তো সেই কারণেই আমার খুবই পরিচিত।’’

প্রণববাবুর মুখ থেকেই শোনা, অন্তত দু’টি ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে তাঁর কাছে এসে নিয়মিত পরমার্শ নিয়ে যেতেন নরেন্দ্র মোদী। এক সংবিধান, দুই বিদেশনীতি। এটা আজ বলার সময় এসেছে যে গত পাঁচ বছরে বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে দৌত্যরক্ষার কাজটা যেমন বকলমে প্রণববাবু অনেকটাই সামলেছেন, তেমনই কেন্দ্রের সঙ্গে বিভিন্ন রাজ্যের সংযোগসাধনের কাজটিও করেছেন একই রকম নিঃশব্দে।

পাশাপাশি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে। ফাইল চিত্র।

তাঁর সঙ্গে দেশে ও বিদেশে সফরে যাওয়ার অনেক সুযোগ হয়েছে গত বারো বছরে। দেখেছি বিদেশমন্ত্রী অথবা অর্থমন্ত্রী থাকাকালীন কোনও সফরে গিয়ে তিনি যতটা কর্মব্যস্ত থাকতেন, রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার থেকে একতিলও কম কিছু নয়। দূরপাল্লার যাত্রা হলে, গোটা রাস্তা চোখ বোলাচ্ছেন সেই দেশের সঙ্গে ভারতের দ্বিপাক্ষিক ব্রিফ-এ। কখনও ডেকে নিচ্ছেন বিদেশসচিব অথবা মন্ত্রকের কোনও অফিসারকে। ঝালিয়ে নিচ্ছেন সম্পর্কের সাম্প্রতিক অভিমুখ। ইজরায়েল এবং পালেস্তাইনের স্পর্শকাতর ভারসাম্য তাঁর অভিজ্ঞতা দিয়েই সামলেছিলেন মোদী। বেজিং–এর সঙ্গে বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক বিষয় নিয়ে টেনশন যখন ঊর্ধ্বমুখী, গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে তাঁর সেই চিন সফরের সঙ্গী হয়েছিলাম। আকাশপথে বিদেশসচিব এস জয়শঙ্কর বলেছিলেন, ‘‘চিন সব সময় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে ব্যক্তি বুঝে গুরুত্ব বাড়ায় কমায়। সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রনেতার ওজন ও তাঁর ইতিহাস বিচার করে। সেই হিসেবে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের মতো এক রাষ্ট্রনেতার চিন সফরে যাওয়া আমাদের জন্য কূটনৈতিক ভাবে লাভজনক। তাঁর বিপুল বিদেশনীতির অভিজ্ঞতা এবং প্রোফাইলকে বেজিং সরকার সম্মানের চোখে দেখে।’’

একই ভাবে দেশের ভিতরেও প্রতি সপ্তাহে অক্লান্ত ভাবে ছুটে বেরিয়েছেন এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে। অনুষ্ঠানসূচিতে প্রতি দিনই কম করে চারটি অনুষ্ঠান। অন্তত চারটি বক্তৃতা। এবং সেই চারটি হয়তো সম্পূর্ণ পৃথক পৃথক বিষয়ে। উপস্থিত শ্রোতা হিসাবে মনে হয়েছে, গোটা জীবনে পড়ে আসা রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং বিদেশনীতির একটি ফলিতরূপ তাঁর সামনে খুলে যাচ্ছে। এই সফরগুলির মাধ্যমে অনেক নির্ভার হয়ে তিনি একটি মহৎ গ্রন্থেরই পাতা উল্টোচ্ছেন একটি একটি করে। তার ফলে সরকারের যা লাভ হওয়ার তো হচ্ছে। কিন্তু তিনিও দেশ, মানুষ, গোষ্ঠী, সমাজ, বিবিধ কর্মযজ্ঞকে দেখতে পাচ্ছেন অনেক নিরপেক্ষ চোখে। কোনও রাজনৈতিক দলের প্রিজমে নয়।

গোড়াতেই যে কথা বলেছিলাম। যে কোনও পরিসর থেকে প্রণব মুখোপাধ্যায় খুঁজে নিতে পারেন কাজ এবং প্রাসঙ্গিকতা। প্রায় দেড় দশক তাঁকে ‘কভার’ করা এক জন কলমচি হিসেবে এটাও আমার ধারণা, অবসর জীবনেও কোনও না কোনও ভাবে প্রাসঙ্গিক থাকবেন প্রণব মুখোপাধ্যায়।

কী ভাবে এবং কোন পথে, এখন সেটাই দেখার।