নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে গোপন নথি দেশবাসীর সামনে আসুক, নীতিগত ভাবে এমনটাই চায় কেন্দ্র। আজ তাঁর সঙ্গে বৈঠকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংহ অন্তত এ কথাই জানিয়েছেন বলে নেতাজির প্রপৌত্র সুগত বসুর দাবি। সুগতবাবুর কথায়, গোটা বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে আলোচনা করবেন বলে জানিয়েছেন রাজনাথ।

সম্প্রতি আইবি-র প্রকাশিত নথিতে দেখা গিয়েছে, স্বাধীনতার পরে দু’দশকেরও বেশি সময় ধরে বসু পরিবারের উপরে নজরদারি চালান কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা। কেন,  এমন করা হয়, তা স্পষ্ট নয় সুগতবাবুদের কাছে। বিষয়টি সংসদে তুলবেন বলে জানিয়েছিলেন তিনি। আজ সংসদের জিরো আওয়ারে তৃণমূল সাংসদ সুগত এই নিয়ে সরব হন। তিনি বক্তব্য রাখার সময়েই তাঁর কাছে একটি চিরকুট পাঠান রাজনাথ। তাতে লেখা ছিল, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অবিলম্বে এ বিষয়ে সুগতবাবুর সঙ্গে কথা বলতে চান। সুগতবাবুর বক্তব্য রাখা শেষ হলেই রাজনাথ সংসদে নিজের চেম্বারে গিয়ে বসবেন। সুগতবাবু যেন অনুগ্রহ করে তাঁর সঙ্গে সেখানে গিয়ে দেখা করেন।

সেই মতো রাজনাথের সঙ্গে দেখা করতে যান সুগতবাবু। তাঁর বক্তব্য, সেখানেই রাজনাথ তাঁকে বলেন, তিনি ইচ্ছা করেই সংসদ অধিবেশনের মধ্যে এ নিয়ে মুখ খোলেননি। কারণ প্রধানমন্ত্রী নিজে বিষয়টিতে আগ্রহী। ফলে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা না করে তিনি সংসদে  মন্তব্য করতে চাননি। সুগতবাবুর দাবি— রাজনাথ তাঁকে বলেছেন, সরকারের ইচ্ছা নেতাজি সংক্রান্ত সব গোপন তথ্য জনগণের সামনে আসুক। সুগতবাবুর আশঙ্কা, রাজনাথ চাইলেও আমলারা শেষ পর্যন্ত সব নথি প্রকাশে রাজি হবেন না।

নজরদারি-বিতর্কের পরেই নানা মহল থেকে নেতাজি সংক্রান্ত সমস্ত ফাইল সামনে আনার দাবি নতুন করে জোরালো হয়েছে। ইতিমধ্যেই বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি কমিটি গঠন করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। সরকারের গোপনীয়তা সংক্রান্ত আইনেও বদলের কোনও প্রয়োজন রয়েছে কি না, তা বিবেচনা করে দেখবে ওই কমিটি। তবে সুগতবাবুর আশঙ্কা, ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কর্তাদের নির্দেশেই নেতাজির পরিবারের উপর নজর রেখে চলেছিলেন ইনটেলিজেন্স ব্যুরোর গোয়েন্দারা। সেই সব দফতরের শীর্ষ আমলারাই এখন সরকারের তৈরি কমিটিতে রয়েছেন। ফলে পূর্বসুরিদের অতীত কীর্তি তাঁরা ফাঁস করবেন কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে সুগতবাবুর। তাই রাজনাথের কাছে তিনি আবেদন করেছেন, ‘‘সরকারের একেবারে শীর্ষ পর্যায় থেকে যেন ওই ফাইলগুলি প্রকাশ করার জন্য চাপ দেওয়া হয়।’’

সম্প্রতি দু’টি ফাইল প্রকাশ্যে এলেও কেন্দ্রের কাছে বর্তমানে আরও প্রায় ৯০টি নথি রয়েছে। আবার রাজ্য গোয়েন্দা দফতরের কাছে প্রায় ৪৬টি ফাইল রয়েছে বলে দাবি একাধিক শিবিরের। সেই ফাইলগুলি প্রকাশ্যে আনার জন্যও দরবার শুরু হয়েছে। তৃণমূল সূত্রের খবর, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘনিষ্ঠ মহলে জানিয়েছেন ওই ফাইলগুলি আদৌ আছে কিনা বা থাকলেও কোথায় আছে তা নিয়ে তাঁর কোনও ধারণা নেই। তবে তিনি ব্যক্তিগত ভাবে ফাইলগুলি প্রকাশ করে দেওয়ারই পক্ষপাতী। তিনি চান না, ফাইল গোপন করা নিয়ে কোনও রাজনীতি হোক।

একই সুর শোনা গিয়েছে আজ সুগতবাবুর কথায়। কেন্দ্রের প্রতি সুগতবাবুর আর্জি, নেতাজির বিষয়টিকে যেন রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণে দেখা না হয়। কেননা ইতিমধ্যেই যে ভাবে বিষয়টি নিয়ে শোরগোল তৈরি হয়েছে, তাতে তৃণমূল নেতৃত্বের আশঙ্কা, নেতাজিকে সামনে রেখে কংগ্রেসকে অস্বস্তিতে ফেলার কৌশল নিয়েছে বিজেপি। নেতাজি সংক্রান্ত যে দু’টি নথি সামনে এসেছে, তাতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জহওরলাল নেহরুর ভূমিকাই প্রশ্নের সামনে পড়ে গিয়েছে। তাই সরকারের হাতে থাকা অন্য নথিগুলি যেন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার না হয়, তার জন্য রাজনাথকে অনুরোধ করেছেন সুগতবাবু। পাশাপাশি তিনি এও অনুরোধ করেছেন যে, নেতাজির ‘পরিবার’ হিসেবে যদি কাউকে গণ্য করতে হয় তা হলে তা নেতাজি-কন্যা অনিতা পাফকেই করা উচিত।

সম্প্রতি জার্মানি সফর করেছেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে নেতাজিরআর এক প্রপৌত্র সূর্য বসু তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিলেন। কিন্তু সুগতবাবুর মতে, মোদী চাইলেই সরাসরি অনিতা পাফের সঙ্গে দেখা করতে পারতেন। সে কথাই তিনি রাজনাথকে জানিয়েছেন। সুগতর দাবি, জবাবে রাজনাথ তাঁকে বলেন, নেতাজি-কন্যা যে জার্মানিতে থাকেন সেটা প্রধানমন্ত্রীর জানা ছিল না।