দুই সমাজকর্মীকে গ্রেফতার করতে গিয়ে গত কালই আদালতে ধাক্কা খেয়েছিল মহারাষ্ট্রের পুলিশ। গৌতম নওলাখা এবং সুধা ভরদ্বাজকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়ার বদলে বাড়িতেই নজরবন্দি রাখার নির্দেশ দিয়েছিল দিল্লি ও পঞ্জাব-হরিয়ানা হাইকোর্ট। আজ ভারাভারা রাও-সহ বাকি তিন জনের ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ আদালতে আর এক প্রস্ত মুখ পুড়ল পুলিশের। তাঁদেরও বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ বলল, বিরুদ্ধ মতই গণতন্ত্রের ‘সেফটি ভাল্‌ভ’। তা না-থাকলে প্রেশার কুকারটাই ফেটে যাবে।

প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার ষড়যন্ত্রে যোগ এবং মাওবাদী-ঘনিষ্ঠতার অভিযোগে মঙ্গলবার এই পাঁচ সমাজকর্মীকে গ্রেফতার করেছিল পুণে পুলিশ। তাঁদের মধ্যে ভারাভারা রাও, ভার্নন গঞ্জালভেস এবং অরুণ ফেরেরাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল পুণেতে। আজ সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, আপাতত পাঁচ জনের কাউকেই পুলিশি হেফাজতে পুণেতে নিয়ে যাওয়া যাবে না। ৬ সেপ্টেম্বরের পরবর্তী শুনানি পর্যন্ত নিজেদের বাড়িতেই গৃহবন্দি করে রাখা যেতে পারে তাঁদের। এই নির্দেশের পরে পুণের জেলা আদালতও ভারাভারা ও অন্যদের বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়।

প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার ছকের অভিযোগ তুললেও সুপ্রিম কোর্ট তো দূরের কথা, দিল্লি হাইকোর্ট বা পুণের আদালতেও পুলিশ এ নিয়ে আজ টুঁ-শব্দ করেনি। মাওবাদীদের একটি চিঠি দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলেছিল পুণে পুলিশ। সেই চিঠিও আদালতে দেখাতে পারেনি তারা। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, খোদ প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা নিয়ে আদালতে এমন গা-ছাড়া মনোভাব কেন? আজ ধৃতদের বিষয়ে পুলিশের বক্তব্য তলব করেছে সুপ্রিম কোর্ট। মহারাষ্ট্র সরকারকে নোটিস দিয়েছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনও।

আরও পড়ুন: ‘সরকার কাপুরুষ’, বিবৃতিতে তোপ ধৃত দুই সমাজকর্মীর

পাঁচ সমাজকর্মীকে গ্রেফতারের বিরুদ্ধে আজ সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন দেশের পাঁচ জন বিশিষ্ট নাগরিক— ইতিহাসবিদ রোমিলা থাপার, অর্থনীতিবিদ প্রভাত পট্টনায়ক ও দেবকী জৈন, সমাজতত্ত্বের অধ্যাপক সতীশ দেশপাণ্ডে এবং ফিল্ড মার্শাল স্যাম মানেকশ-র কন্যা, মাজা দারুওয়ালা। দিনের কাজের সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরে, বিকেল সাড়ে চারটেয় শুনানি শুরু হয়। বিশিষ্টদের হয়ে সওয়াল করেন অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি, রাজীব ধবন, ইন্দিরা জয়সিংহ, দুষ্মন্ত দাভে, রাজু রামচন্দ্রন, প্রশান্ত ভূষণ, বৃন্দা গ্রোভারের মতো বাঘা আইনজীবীরা।

শুনানির শুরুতেই মনু সিঙ্ঘভি বলেন, গত জানুয়ারিতে মহারাষ্ট্রের ভীমা-কোরেগাঁওয়ের দলিত বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে হিংসার মামলায় পাঁচ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু এফআইআর-এ ওই পাঁচ জনের নামই নেই। এঁরা কেউ সমাজকর্মী, কেউ জাতীয় আইন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। মহারাষ্ট্র সরকারের হয়ে কেন্দ্রের অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল তুষার মেটা যুক্তি দেন, যাঁরা আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে এই মামলার কোনও সম্পর্কই নেই। বিচারপতি ধনঞ্জয় ওয়াই চন্দ্রচূড় তাঁকে থামিয়ে বলেন, ‘‘এঁরা অধ্যাপক। এঁদের উদ্বেগের কারণ হল, আপনারা বিরুদ্ধ মতের কণ্ঠ রোধ করছেন।’’ মনু সিঙ্ঘভির যুক্তি, এখানে সংবিধানের ২১তম অনুচ্ছেদের মৌলিক অধিকার ও জীবনের অধিকারের প্রশ্নটি জড়িত। এই ভাবে কাউকে গ্রেফতার করা হলে এখানেই গণতন্ত্রের ইতি। বিচারপতি চন্দ্রচূড় তখনই বলেন, ‘‘বিরুদ্ধ মতই গণতন্ত্রের সেফটি ভাল্‌ভ। সেফটি ভাল্‌ভ না-থাকলে প্রেশার কুকারটাই ফেটে যাবে।’’

দাভের যুক্তি, ধৃতদের পুরনো অপরাধের রেকর্ড নেই। মনু সিঙ্ঘভিরা গ্রেফতারির উপরে স্থগিতাদেশ চাওয়ায় মেটা পাল্টা যুক্তি দেন, ধৃতদের অনেককে আগেও গ্রেফতার করা হয়েছে। ধবন বলেন, ‘‘ধৃতদের অনেকে আইনজীবী। তাঁরা আমার সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন। ওঁদের গ্রেফতার করা হলে এর পরে তো আমাকে গ্রেফতার করা হবে। গণতন্ত্র কী ভাবে রক্ষা হবে?’’ প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্র বলেন, ‘‘সেই কারণেই আমরা নোটিস জারি করছি।’’ তবে আদালত জানিয়েছে, এটি অন্তর্বর্তী নির্দেশ এবং সব দিকই খোলা রয়েছে। এই নির্দেশের পরে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী করুণা নন্দীর মত, ‘‘বেকারত্ব, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির মতো সমস্যা, সনাতন সংস্থার হিন্দু-সন্ত্রাস থেকে নজর ঘোরাতে জরুরি অবস্থা জারির চেষ্টা আজ সুপ্রিম কোর্ট রুখে দিল।’’

সমাজকর্মীদের গ্রেফতার নিয়ে আজ দিল্লি হাইকোর্টেও প্রশ্নের মুখে পড়ে পুণে পুলিশ। বিচারপতি মুরলীধরের প্রশ্ন, গৌতম নওলাখার গ্রেফতারি পরোয়ানা কেন মরাঠিতে লেখা? কী করে উনি বুঝবেন, কেন তাঁকে গ্রেফতার করা হচ্ছে? অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল আমন লেখি যুক্তি দেন, অনুবাদ হয়নি। ক্ষুব্ধ বিচারপতি মুরলীধর বলেন, ‘‘কোনও ব্যক্তির পুলিশি হেফাজতে কাটানো প্রতিটি মিনিটই উদ্বেগের কারণ।’’ গ্রেফতারের সময়ে পুলিশের লোককেই সাক্ষী রাখা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। গৌতমকে পুলিশি হেফাজতে পুণেতে নিয়ে যাওয়া সংক্রান্ত নিম্ন আদালতের নির্দেশের আইনি বৈধতা নিয়েও বিচার হবে বলে দিল্লি হাইকোর্ট জানিয়েছে। কারণ, সেখানেও মরাঠিতে নথি পেশ করা হয়েছিল। প্রশ্ন, দিল্লির ম্যাজিস্ট্রেটের আদালত ওই নথি বুঝল কী করে?

সুপ্রিম কোর্টে যাওয়া রোমিলা থাপারের মতে, ‘‘খুন, গণপিটুনির মাধ্যমে যারা সমাজে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে, গ্রেফতার তো তাদের করা উচিত। যাঁরা মানবাধিকার, গণতন্ত্রের হয়ে লড়ছেন, তাঁদের নয়। নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব হয়েছে। এই সব গ্রেফতারি কি তারই নমুনা?’’ অর্থনীতিবিদ প্রভাত পট্টনায়কের যুক্তি, ‘‘সরকার যে কৃষক, শ্রমিক, সিংহভাগ মানুষের মধ্যে সমর্থন হারিয়ে ঘাবড়ে গিয়েছে, এটি তার নমুনা। তার জন্যই একটা শত্রু খাড়া করা দরকার। সমাজের বিপদ, জরুরি অবস্থার আবহ তৈরি করা দরকার। তবে আমি নিশ্চিত, ওদের উপরেই উল্টে ধাক্কা আসবে।’’