চলতি বছরে ‘বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস’এর কোনও নির্দিষ্ট থিম বাছা হয়নি। এই বছরটিকে ১৯৯৪ সালের আন্তর্জাতিক সম্মেলনের সিদ্ধান্ত পূরণ করার উপরে জোর দিতে বলা হয়েছে। ১৯৯৪ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ১৭৯টি দেশের সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, প্রজনন ও যৌন স্বাস্থ্য এবং লিঙ্গসাম্য বজায় রাখা ভীষণ জরুরি। তা না হলে উন্নয়নের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া যাবে না। 

জনসংখ্যা দিবসের গুরুত্ব কোথায়: রাষ্ট্রপুঞ্জের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় আট কোটি ৩০ লক্ষ অতিরিক্ত জনসংখ্যা যোগ হয় দুনিয়ায়। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ জরুরি।

ভারতের পক্ষে তো আরও জরুরি। বিশ্বে মোট জমির দুই শতাংশ রয়েছে ভারতে। কিন্তু সেই সঙ্গেই বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ১৬ শতাংশ বাস করে এই দেশেই। ভারতের জনসংখ্যার ৩৫ শতাংশ তিনটি রাজ্যে বাস করে। সেগুলি হল, বিহার, উত্তরপ্রদেশ এবং মহারাষ্ট্র। হিসেব বলছে, ভারত ২০২৭ সালের মধ্যে চিনকে টপকে জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের প্রথম দেশ হবে। জনসংখ্যার এই বিশাল চাপ দেশের আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে নানা পার্থক্য গড়ে তোলে। বিশেষ করে দারিদ্র বেড়ে যায় বহুলাংশে।

জনসংখ্যা দিবস পালনের ইতিহাস: ১৯৮৯ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জের ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (ইউএনডিপি) পরিষদ জনসংখ্যা নিয়ে একটি সম্মেলন করে। পরের বছর রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভা সিদ্ধান্ত নেয়, জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে লাগাতার সচেতনতা চালানো প্রয়োজন। পরিবেশ এবং উন্নয়নের সঙ্গে জনসংখ্যার যোগ নিয়েও সচেতনতা বৃদ্ধি প্রয়োজন। ১৯৯০ সালে ১১ জুলাই প্রথম ৯০টি দেশ দিনটি পালন করে। এখন সারা বিশ্বে দিনটি পালিত হয়।

ভারত জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগী হয়েছে বহুদিন। জেলা স্বাস্থ্য দফতরও বিভিন্ন ভাবে প্রচার চালাচ্ছে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সচেতনতা বাড়াতে। এর জন্য একটি সিডি প্রকাশ করেছে তারা। সেই সিডির মূল বক্তব্য হল, ‘দম্পতি হলে সমঝদার, পরিকল্পনা করে পরিবার’। দেশের উন্নতির জন্য, নিজেদের ভাল থাকার জন্য, আর্থ-সামাজিক বিকাশের জন্য পরিবার পরিকল্পনার কোনও বিকল্প নেই। প্রতিটি সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে, উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে, হাসপাতালে জন্মনিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন পদ্ধতির সুবিধাগুলো পাওয়া যায়। সব দম্পতিকে এই সুবিধাগুলি গ্রহণ করার জন্য আবেদন জানিয়েছে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। আবেদনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে তারা ভাষ্য-সহ গানের একটি সিডি প্রকাশ করেছে। সেই গানে বলা হয়েছে, ছোট পরিবার না হলে পরিবারে সুখ শান্তি বজায় রাখা সম্ভব নয়। এর জন্য মূল মন্ত্র হওয়া দরকার ‘হাম দো, হামারো দো’। 

গানে রয়েছে কিছু জরুরি তথ্যও। যেমন, ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী, ভারতের জনসংখ্যা ১২১ কোটির বেশ। যা বিশ্বের জনসংখ্যার ১৬ শতাংশ। ২০০১ সালে ২০১১ সাল পর্যন্ত জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ১.৭৬ শতাংশ। এই ভাবে বৃদ্ধির হার চলতে থাকলে ভারত এমন একটা দিক থেকে বিশ্ব সেরা হবে যার ভার বইতে হবে দেশের প্রতিটি জনগণকে। স্থানীয় প্রশাসন থেকে দেশের সরকার কেউ বাদ যাবে না জনবিস্ফোরণের এই কুপ্রভাব থেকে। কারণ জনসংখ্যা যত বাড়বে ততই বাড়বে বেকারত্ব, অশিক্ষা। কিন্তু সবচেয়ে আশঙ্কার হল, দেখা দেবে খাদ্য সংকট। যার ফল ভুগতে হবে শুধু সেই দেশকে নয়, সারা বিশ্বের মানুষকে। জন্মনিয়ন্ত্রণ ছাড়া অনাগত ভবিষ্যত্যের এই ভয়ঙ্করতাকে রোখা অসম্ভব। 

জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যয়বহুল নয়। শুধু দরকার কোথায় কী মেলে তা জানা। জন্মনিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন পদ্ধতির হদিস মেলে স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রেই। বেশ কয়েকটি পদ্ধতি সম্পর্কে এখন অনেকেই জেনে গিয়েছেন। যেমন, ‘ওরাল পিল’। অর্থাৎ গর্ভনিরোধক বড়ি, যা খাওয়া যায়। এ ছাড়াও রয়েছে কপার-টি এবং কন্ডোম। এগুলো বিনামূল্যে সমস্ত সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকেই পাওয়া যায়। সদ্য বিবাহিত দম্পতি, যাঁরা দু’টি বাচ্চার মধ্যে ন্যূনতম তিন বছরের ব্যবধান রাখতে চান বা এখনই বাচ্চা চান না, তাঁরা এই অস্থায়ী পদ্ধতিগুলির সাহায্য নিতে পারেন। 

জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, কম বয়সে মেয়ের বিয়ে না দেওয়া। পাত্রপক্ষেরও উচিত, বিয়ের সময়ে পাত্রীর বয়স ১৮ বছর হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত করা। কম বয়সে সন্তানের জন্ম দিলে মায়ের স্বাস্থ্যে নানারকম জটিলতা দেখা দেয়। আর কম সময়ের ব্যবধানে বাচ্চার জন্ম দিলে সেই মায়ের এবং সন্তানের, উভয়ের শারীরিক নানা জটিলতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। দুই সন্তানের মধ্যে জন্মের ব্যবধান রাখার বেশ কয়েকটি সুবিধাজনক এবং সহজলভ্য পদ্ধতি রয়েছে। বিশেষ করে প্রসবের পরে হাসপাতালে পিপিআইইউসিডি বা প্রসব পরবর্তী কপার-টি ধারণ করা উচিত। ফলে প্রসব পরবর্তী সন্তানসম্ভবা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। এই সুবিধাগুলি সমস্ত সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে পাওয়া যায়। তাই প্রসবের পরে কপার-টি ব্যবহার করা উচিত। এই পদ্ধতি মেয়েদের জন্য। এগুলি সবই অস্থায়ী পদ্ধতি।

এবার জন্ম নিয়ন্ত্রণের স্থায়ী পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। যে সকল দম্পতি আর বাচ্চা নিতে চান না তাঁরা স্থায়ী পদ্ধতির ব্যবহার করতে পারেন। এই পদ্ধতি ছেলে এবং মেয়ে উভয় পক্ষেরই নেওয়া সম্ভব। যেমন, মায়েদের বন্ধ্যাত্বকরণ বা লাইগেশন। পুরুষদের জন্য রয়েছে নির্বীজকরণ বা ভেসেকটমি। এই দুই পদ্ধতির সুযোগ বিনামূল্যে মেলে। সেই সঙ্গে মেলে সরকারি অনুদানও। ভেসেকটমি অস্ত্রোপচার রক্তপাতহীন। ছুরি, কাঁচি লাগে না। মাত্র পাঁচ মিনিটেই এই অস্ত্রোপচার সম্ভব। এই অস্ত্রোপচার নিয়ে ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকে মনে করেন, ভেসেকটমি করালে কর্মক্ষমতা কমে যায়। এটা একেবারেই ভুল। এসব কিছুই হয় না। বরং অস্ত্রোপচারের পরে পরেই বাড়ি চলে যাওয়া যায়। স্বাভাবিক কাজকর্ম করা যায়। আরেকটি ভুল ধারণা হল, ভেসেকটমিতে যৌন জীবনের উপরে প্রভাব পড়ে। কিন্তু এর কোনও সারবত্তা নেই। ভেসেকটমির পরেও যৌন সক্ষমতা একই থাকে।

কৃতজ্ঞতা: পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ