সেনা নামিয়েও ইটানগরের পরিস্থিতি আয়ত্তে আনা যাচ্ছে না। মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডু শুক্রবার রাতেই ঘোষণা করেছিলেন অসমের দেউড়ি, সোনোয়াল-কছারি, মোরান, আদিবাসী, মিসিং ও নেপালিদের স্থায়ী আবাসিক শংসাপত্র বা পিআরসি দেওয়া সংক্রান্ত বিল আনা হবে না বিধানসভায়। কিন্তু তার পরেও বিক্ষোভ চলছে দফায়-দফায়। পরিস্থিতি সামলাতে পুলিশ গুলি চালালে আজ মৃত্যু হয়েছে দুই যুবকের। অরুণাচল প্রদেশে আগে থেকেই ভারত-তিব্বত সীমান্ত পুলিশ (আইটিবিপি)-এর ৫টি কোম্পানি রয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে অতিরিক্ত ১০ কোম্পানি আইটিবিপি পাঠিয়েছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক।

পুলিশের গুলিতে জখম এক ছাত্রের মৃত্যুর জেরে গত রাত থেকে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। আজ মুখ্যমন্ত্রী ও উপমুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ চেয়ে শুরু হয় অবরোধ, বিক্ষোভ। বিক্ষোভকারীরা জ্বালিয়ে দেয় উপ-মুখ্যমন্ত্রী চাওনা মেইনের বাড়ি, জেলাশাসকের দফতর। পোড়ানোর চেষ্টা হয় নাহারলাগুন থানা। দরজা ভেঙে মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ির ঢুকতে গেলে পুলিশের গুলিতে দুই যুবকের মৃত্যু হয়।

আগুনে ঘি পড়ে এতে। আক্রমণ হয় এসপি অফিসেও। এসপি হর্ষবর্ধন জখম হন। বানচাল হয়ে যায় প্রথম রাজ্য চলচ্চিত্র উৎসব, অরুণাচল পূর্ণরাজ্য দিবসের অনুষ্ঠান। হাঙ্গামায় পুলিশ ও প্রতিবাদকারী মিলিয়ে এ পর্যন্ত শতাধিক ব্যক্তি জখম হয়েছেন ইটানগরে।

আরও পড়ুন: কৃষি ঋণ নিয়ে বিরোধীদের নিশানা মোদীর

মুখ্যমন্ত্রীর দফতর সূত্রে খবর, গোটা বিষয়টির পিছনে রাজনৈতিক মদত রয়েছে এবং যে কোনও ছুতোয় ফের পরিস্থিতি অশান্ত করে রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করার চেষ্টা চলছে। সেই আশঙ্কায় গত কাল থেকেই কার্ফু জারি করা হয়েছিল। ডাকা হয়েছিল সেনাবাহিনী। আজ সকাল থেকে পরিস্থিতি ফের উত্তপ্ত হয়। ১৮টি সংগঠনের যৌথ মঞ্চ দাবি তোলে, পিআরসি পুরোপুরি বাতিল করতে হবে। অবিলম্বে মুখ্যমন্ত্রী ও উপ-মুখ্যমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে। গ্রেফতার হওয়া বিক্ষোভকারীদের অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে। মুখ্যসচিবকে অবিলম্বে সরাতে হবে। 

আন্দোলন জোরদার হয়ে উঠলেও প্রাণহানি এড়াতে পুলিশ ও সেনা গুলিচালনা থেকে বিরত ছিল প্রথমে। কিন্তু কার্ফু অমান্য করেই সরকারি ভবনগুলিতে হামলা চলতে থাকে। লুঠপাট হয় শপিং মল। কিন্তু প্রায় তিন হাজার জনতা মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ির দরজা ভেঙে ঢোকার চেষ্টা করলে পুলিশ গুলি চালায়। তাতেই দু’জনের মৃত্যু হয়। বিক্ষোভকারীদের পাথরে এসপি-সহ ২৫ জন পুলিশকর্মী জখম হন। পুলিশের লাঠি, গুলিতে জখম হয় অন্তত ৫০ জন আন্দোলনকারী। সকাল থেকে নাহারলাগুন স্টেশনে যাওয়ার রাস্তাও বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে রোগী ও অন্য যাত্রীরা আটকে পড়েন। তিন দিন ধরে ব্যাঙ্ক বন্ধ। টাকা নেই এটিএমগুলিতেও। বন্ধ রয়েছে ইন্টারনেট পরিষেবা।  সব ব্যাঙ্ক, দোকানপাটও বন্ধ। কংগ্রেস রাজ্য সরকারের ব্যর্থতা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি শাসন দাবি করেছে।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কিরেন রিজিজু বলেন, কংগ্রেসই অ-অরুণাচলিদের লেকাং এলাকায় পিআরসি দেওয়ার দাবিতে আন্দোলন চালাতে উস্কেছিল। তারাই ইটানগরে উল্টোসুর নিয়েছে। কংগ্রেস রাজনৈতিক স্বার্থে মানুষকে বিপথে পরিচালিত করছে। রাজ্য সরকার রাজ্যের বাসিন্দাদের সম্পূর্ণ অধিকার সুরক্ষিত রাখতে দায়বদ্ধ। মুখ্যমন্ত্রী আগেই জানিয়েছিলেন রাজ্য সরকার পিআরসি বিল আনছে না। তার পরেও জনতাকে ভুল বোঝানো হচ্ছে। এর আগে ২০১৬ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতার জেরে রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়েছিল অরুণাচল প্রদেশে। সে বারেও বিক্ষোভ-আন্দোলনে পঙ্গু হয়েছিল ইটানগর, নাহারলাগুন।

উত্তেজিত জনতা রাজ্য দিবসের অনুষ্ঠানে অসম ও নাগাল্যান্ড থেকে আসা বিভিন্ন শিল্পীর গাড়ি ও যন্ত্রপাতি পুড়িয়ে দিয়েছে। চলচ্চিত্র উৎসবের জন্য তৈরি সব কটি প্রেক্ষাগৃহ লণ্ডভণ্ড করে আগুন লাগিয়েছে। দু’দিনে ৫০টিরও বেশি গাড়ি ও বাস পোড়ানো হয়েছে। ভাঙা হয়েছে দেড়শো গাড়ি। উৎসবে যোগ দিতে আসা অতিথিরাও নাজেহাল হন।  বিপুল ক্ষতির মুখে পড়ে অসমের শিল্পীরা আজ অরুণাচল সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করে বিক্ষোভে সামিল হন।

সন্ধ্যায় সামরিক হেলিকপ্টারে ইটানগরে আসেন রাজ্যপাল অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার বি ডি মিশ্র। সর্বদলীয় বৈঠকে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত না হলেও সোমবার বিধানসভা ভেঘে দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই উত্তর-পূর্ব বিকাশ মন্ত্রক আজ অরুণাচলের সড়ক, পরিকাঠামো, সেচ ও জল পরিবহন খাতে চারশ কোটি টাকার প্রকল্পে অনুমোদন দিয়েছে। মন্ত্রকের সচিব নবীন বর্মা অরুণাচলের মুখ্যসচিব সত্য গোপাল ও অন্য আমলাদের সঙ্গে ভিডিয়ো বৈঠকে এই কথা জানিয়েছেন।