কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে নানা প্রকল্পে বরাদ্দ কমানোর অভিযোগে গত কাল রাজ্য বিধানসভায় সর্বসম্মত (বিজেপি বাদে) প্রস্তাব গ্রহণ করেছিল পশ্চিমবঙ্গের শাসক ও বিরোধী দলগুলি। আজ সেই অভিযোগের জবাব দিলেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি। রীতিমতো পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝালেন, পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বঞ্চনা তো দূর, উন্নয়ন খাতে এখন অনেক বেশি যোজনা বরাদ্দ পাচ্ছে রাজ্য। তাঁর আরও দাবি, গত পাঁচ বছরের তুলনায় আগামী পাঁচ বছরে কেন্দ্রীয় করের অংশ বাবদ দ্বিগুণেরও বেশি অর্থ পাবে পশ্চিমবঙ্গ।

গত কাল বিধানসভায় শাসক ও বিরোধী দলগুলি মিলে দু’টি সর্বসম্মত প্রস্তাব গ্রহণ করে। তাতে যেমন মোদী সরকারের জমি বিলের বিরোধিতা করা হয়, তেমনই এও বলা হয়, কেন্দ্রের অনুদানে চলা প্রকল্পগুলিতে ঠিক মতো অর্থ বরাদ্দ করছে না নরেন্দ্র মোদী সরকার। উল্টে প্রভূত বরাদ্দ ছাঁটা হচ্ছে। তাতে নিচু স্তরে উন্নয়নের কাজ ব্যাহত হচ্ছে।

রাজ্য বিজেপি-র কাছ থেকে এই বিষয়ে রিপোর্ট পেয়ে আজ এই অভিযোগের সবিস্তার জবাব দেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী। সোশ্যাল মিডিয়ায় জেটলি বলেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গের কিছু বন্ধু আরও বেশি কেন্দ্রীয় সাহায্যের দাবি জানাচ্ছেন। কিন্তু দেখা যাক পশ্চিমবঙ্গ কেন্দ্রীয় সাহায্য বাবদ প্রকৃত কী পাচ্ছে?’’ এই কথা বলেই সবিস্তার পরিসংখ্যান তুলে ধরেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী। তাঁর দাবি, পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতিতে চতুর্দশ অর্থ কমিশনের প্রভাবটা গোড়ায় বোঝা দরকার। ইউপিএ সরকারের শেষ বছরে অর্থাৎ ২০১৩-১৪ আর্থিক বছরে অর্থ কমিশনের অনুদান, যোজনা বরাদ্দ এবং কেন্দ্রীয় করের অংশ মিলিয়ে ৪২,০৯৯.২২ কোটি টাকা পেয়েছিল রাজ্য। এনডিএ সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ আর্থিক বছরে অর্থাৎ ২০১৫-১৬ সালে ওই সংখ্যাটিই গিয়ে দাঁড়াবে ৬৩,৫৭৮ কোটি টাকায়। গত পাঁচ বছরে কেন্দ্রীয় করের অংশ হিসাবে পশ্চিমবঙ্গ ১,০৩,৫৩৯ কোটি টাকা পেয়েছিল। কিন্তু ২০১৫-২০ সালে কেন্দ্রীয় করের অংশ বাবদ আনুমানিক ২,৮৫,২০০ কোটি টাকা পাবে রাজ্য। এ ছাড়াও নীতি আয়োগের আওতায় সরকার যে বিশ হাজার কোটি টাকার তহবিল রেখেছে তারও কিছু অংশ পাবে পশ্চিমবঙ্গ।

এই ব্যাখ্যার পরেই অর্থমন্ত্রী পাল্টা প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘‘এত কিছু লাভের পরেও কি বলা যায় চতুর্দশ অর্থ কমিশনের ফলে কোনও লাভই হল না পশ্চিমবঙ্গের?’’

ক’দিন আগেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশ সফরে গিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ঢাকায় বন্ধুত্বের পরিবেশে মোদী-মমতা বৈঠকও হয়েছিল। সন্দেহ নেই, তার ঠিক পরেই রাজ্য ও কেন্দ্রের ওই সওয়াল জবাবে কোথাও তাল কাটছে! বিজেপি-র কেন্দ্রীয় নেতাদের মতে, বাংলাদেশের সঙ্গে স্থলসীমান্ত চুক্তি বা তিস্তা চুক্তির বিষয় ভিন্ন। সে ক্ষেত্রে রাজ্যের সঙ্গে প্রতি মুহূর্তে সহযোগিতা করে চলতে চাইছেন নরেন্দ্র মোদী। উন্নয়নের প্রশ্নেও তিনি সহযোগিতায় আগ্রহী। কিন্তু বঞ্চনার অভিযোগ তুলে রাজ্যে শাসক দল রাজনীতি করলে বিজেপি তথা কেন্দ্র অবশ্যই জবাব দেবে। কারণ, প্রশাসনিক স্তরে বোঝাপড়া যাই থাকুক না কেন, পশ্চিমবঙ্গে নিজেদের রাজনীতিটাও গুরুত্ব দিয়েই করতে চান মোদী-অমিত শাহ-অরুণ জেটলিরা। সন্দেহ নেই, কেন্দ্রের বিরুদ্ধে বঞ্চনার অভিযোগ তুলে সরব হওয়াটা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনীতির পক্ষেও অনুকূল।

তবে ডেরেক ও’ব্রায়েনের মতো তৃণমূল নেতাদের মতে, রাজনীতির বিষয় এনে মূল সমস্যা গুলিয়ে ফেললে চলবে না। চতুর্দশ অর্থ কমিশনের দোহাই দিয়ে বিভ্রান্ত করতে চাইছেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী। রাজ্যকে কেন্দ্রের অর্থ বরাদ্দ মাত্র .৯ শতাংশ বেড়েছে। ১৭টি প্রকল্পের বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া বা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পুলিশের আধুনিকীকরণ-সহ কেন্দ্রীয় অনুদানে চলা ৮টি প্রকল্প রাজ্যের ঘাড়ে পুরোপুরি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাতে আগের থেকে অনেক বেশি চাপে পড়ছে রাজ্যগুলি। এই বিষয়ে কংগ্রেস শীর্ষ নেতা আনন্দ শর্মাও এক মত। তাঁর কথায়, ‘‘বড় বিষয় হল, সামাজিক সুরক্ষা খাতে মোটা বরাদ্দ ছাঁটছে মোদী সরকার। তাতে শুধু পশ্চিমবঙ্গ কেন, সমস্যায় পড়ছে সব রাজ্যই।’’