দিদা বাষট্টি বছর বয়সে তিন তালাকের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেছিলেন ঠিকই। কিন্তু তা বলে তিন তালাককে ফৌজদারি অপরাধের তকমা দিলে মহিলাদের কোনও সুবিধা হবে না, ইনদওর থেকে ফোনে জানালেন জুবের আহমেদ। শাহ বানোর নাতি। তাঁর বড় মেয়ে সিদ্দিকিয়া আহমেদের পুত্র।

তিন তালাক বিল পাশ করাতে গিয়ে মোদী সরকার বারবার শাহ বানোর উদাহরণ টেনে এনেছে। প্রয়াত রাজীব গাঁধীর সরকার শাহ বানোর মতো মুসলিম মহিলাদের সঙ্গে অন্যায় করেছিল বলে অভিযোগ তুলেছে। মোদী সরকারের আইনমন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদের দাবি, সেই অন্যায় শুধরে শাহ বানো থেকে সায়রা বানোর মতো মুসলিম মহিলাদের ন্যায় পাইয়ে দিতেই তিন তালাক বিল। তাতে তিন তালাকের অপরাধে তিন বছরের জেলের শাস্তির ব্যবস্থা।

শাহ বানোর পরিবার অবশ্য এর সঙ্গে একমত নন। তিন তালাক বিল নিয়ে দেশের রাজনীতিতে যখন আলোচনা চলছে, তখন ইনদওরে শাহ বানোর পরিবারের চা-নাস্তার টেবিলেও এ নিয়ে আলোচনার ঝড়। শাহ বানোর কন্যা সিদ্দিকিয়া, তাঁর স্বামী সাব্বির আহমেদ খান, পুত্র জুবের—সকলেই একমত যে, এই আইনের অপব্যবহার হবে। জুবের বলেন, ‘‘আমার মা-ও মনে করেন, এই আইনের ফলে কোনও মহিলা তাঁর স্বামীকে ব্ল্যাকমেল করতে পারেন। বধূ নির্যাতন প্রতিরোধ আইনের মতো এরও অপব্যবহার হবে।’’

শাহ বানোকে যখন তাঁর স্বামী মহম্মদ আহমেদ খান তিন তালাক দেন, তখন তিনি তিন পুত্র, দুই কন্যা— এই পাঁচ সন্তানের জননী। বড় মেয়ে সিদ্দিকিয়ার তত দিনে বিয়ে হয়ে গিয়েছে। মহম্মদ আহমেদ স্ত্রীকে কোনও খোরপোষ দিতে রাজি হননি। নিজের ও সন্তানদের ভরণপোষণের জন্যই আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন শাহ বানো। সালটা ১৯৭৮। নিম্ন আদালত নির্দেশ দেয়, তাঁর স্বামীকে মাসে ২৫ টাকা খরচ দিতে হবে। খোরপোষের অঙ্ক বাড়ানোর আর্জি নিয়ে শাহ বানো মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টে যান। হাইকোর্ট মহম্মদ আহমেদকে মাসে ১৭৯ টাকা ২০ পয়সা খোরপোষ দিতে হবে। তাতেও রাজি হননি আহমেদ। তিনি সুপ্রিম কোর্টে মামলা করে দাবি তোলেন, মুসলিম পার্সোনাল আইনে তাঁর কোনও খোরপোষ দেওয়ার দায় নেই। কারণ তিনি দ্বিতীয় বিবাহ করেছেন।

সুপ্রিম কোর্ট শাহ বানোর পক্ষেই রায় দিয়েছিল। আহমেদকে খোরপোষের নির্দেশ দিয়েছিল। শাহ বানোর নাতি জুবের বলেন, ‘‘এ ক্ষেত্রেও খোরপোষের অঙ্ক বাড়িয়ে দিয়ে জরিমানার ব্যবস্থা করলেই হত। মুসলিম বিবাহের চুক্তিতে মেহর বা টাকার অঙ্ক বলা থাকে, যা স্ত্রীকে দেন স্বামী। আইনে বলে দেওয়া যেত, তিন তালাক দিলে মেহরের ১০ গুণ, ২৫ গুণ বা ৫০ গুণ খেসারত দিতে হবে।  তা হলে পারিবারিক কোর্টেই সমস্যা মিটে যেত।’’ সুপ্রিম কোর্ট শাহ বানোর পক্ষে দাঁড়িয়ে, তিন তালাকের পরে মুসলিম মহিলাদের খোরপোষের পক্ষে রায় দিলেও, রাজীব গাঁধীর সরকার নতুন আইন এনে তা খারিজ করে দেয়। মোদী সরকারের আইন বলছে, স্বামী তিন তালাকের অপরাধে জেলে গেলেও তাঁকে খোরপোষের দায়িত্ব নিতে হবে। জুবের বলেন, ‘‘এখন কেউ রাগের মাথায় তিন তালাক বলে ফেললেও তাঁর স্ত্রী আদালতে যেতে পারেন।
গ্রেফতার হলে জামিন পেতে দশ দিন লেগে যাবে। মামলা-মোকদ্দমা বাড়বে। ছেলে জেলে গেলে শ্বশুর-শাশুড়ি কি আর পুত্রবধূকে বাড়িতে রাখতে চাইবেন?’’

শাহ বানোর পরিবারের মতে, তিন তালাক আইনের একটাই ফায়দা। কোরান বা শরিয়ত আইনেও তিন তালাকের বিরুদ্ধে মত রয়েছে। অনেকেই জানতেন না। এখন তিন তালাক বিলে আলোচনা, তাতে আইনি অপরাধের তকমা দেওয়ায় সকলেই জেনে গেলেন, তিন তালাক ইসলামেও পাপ ছিল, আইনেও অপরাধ হয়ে গেল।