শহর থেকে হারিয়ে যাচ্ছে গাছ। সেই তালিকায় রয়েছে বর্ণঝাউ, রক্তঝাউ, মুচকুন্দ, কাঠবিড়লা, জয়ন্তীর মতো অনেক মূল্যবান গাছও। এক সময়ে শহরে সহজেই এদের দেখা মিললেও এখন আর দেখা যায় না বলে জানিয়েছেন উদ্ভিদবিদ্রা। তাঁদের অভিযোগ, বছরভর বিভিন্ন সংস্থা কোনও পরিকল্পনা ছাড়াই চারাগাছ রোপণের কর্মসূচি নেয়। কিন্তু রোপণের পরে তার রক্ষণাবেক্ষণ ঠিক মতো করা হয় না। ফলে বহু গাছ হারিয়ে যায়। একাধিক উদ্ভিদবিজ্ঞানী জানান, শহরের বিভিন্ন এলাকায় দেশি-বিদেশি মিলিয়ে ২৭৬ রকমের গাছ দেখা যেত। যার মধ্যে ৬৮-৭০ রকমের গাছ হারিয়ে গিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে শিবপুর বটানিক্যাল গার্ডেনের অধিকর্তা অরবিন্দ প্রামাণিক বলেন, “অনেক সময় বিভিন্ন সংস্থা প্রচার পেতে চারা রোপণের কর্মসূচি নেয়। পরে তারা আর রক্ষণাবেক্ষণ করে না। এই প্রবণতার জন্য গাছের ক্ষতি হয়। অনেক গাছ হারিয়ে যায়। যা পরিবেশের উপরে যথেষ্ট নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। কোনও বড় দুর্যোগ বা প্রাকৃতিক বিপর্যয় হলে বোঝা যায় এর প্রভাব।”

সূত্রের খবর, ২০০৯ সালে আয়লার দুর্যোগে শহরের বহু গাছ পড়ে যাওয়ার পরে প্রেসিডেন্সির উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের প্রাক্তনীর তরফে শহরের কোন রাস্তায় কী ধরণের গাছ লাগানো যেতে পারে, তার একটি তালিকা কলকাতা পুরসভার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাদের কাছে সেই তালিকা কোনও দিনই গুরুত্ব পায়নি বলে অভিযোগ। প্রেসিডেন্সির উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের প্রাক্তন প্রধান এবং উদ্ভিদবিদ্ তিমিরকুমার ঝা বলেন, “পরিকল্পনা না করে বৃক্ষরোপণ করলে চারা লাগানোর উদ্দেশ্যটাই সার্থক হয় না। তাই এই ধরনের প্রস্তাবকে সংশ্লিষ্ট সংস্থার সব সময়ে গুরুত্ব দেওয়া উচিৎ।”

যদিও এই সব যুক্তি মানতে রাজি নন পুরসভার উদ্যান বিভাগের মেয়র পারিষদ দেবাশিস কুমার। তিনি বলেন, “এক সময়ে কলকাতা পুরসভার কোনও উদ্ভিদবিদ্ ছিলেন না। তখন যেমন খুশি গাছ লাগানো হত। আমাদের বোর্ড আসার পরে কয়েক জন উদ্ভিদবিদ্ নিযুক্ত করা হয়েছে। তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করেই আমরা গাছ লাগাই।”

নব্বইয়ের দশকেও রাজ্যের একাধিক উদ্ভিদবিদ্ এবং পরিবেশ বিশেষজ্ঞ মিলিত হয়ে শহরে গাছ লাগানো নিয়ে বন দফতরের নগরায়ণ বিভাগকে লিখিত প্রস্তাব জমা দিয়েছিলেন। প্রাণী ও উদ্ভিদবিদ্ আশিস ঘোষ বলেন, “সেই প্রস্তাবকেও কোনও দিন গুরুত্ব দেয়নি সরকার।”

বনমন্ত্রী বিনয়কৃষ্ণ বর্মণ বলেন, “আগে যা হয়েছে তা নিয়ে আমার কিছু বলার নেই। তবে যাঁরা এই বিষয়ে জানেন, তাঁদের সঙ্গে নতুন করে আলোচনায় বসতে চাই। তাঁদের পরামর্শ অনুযায়ী এই বিষয়ে ব্যবস্থাও নিতে চাই।”

একাধিক উদ্ভিদবিদ্ জানিয়েছেন, যে সব গাছের শিকড় মাটির গভীরে যায়, এমন চারা রোপণ করতে হবে। যে সব গাছ সোজা হয়ে উঠে অনেকটা উপরে শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে এবং অনেক পরিমাণে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মতো বিষ শুষে নিতে পারে, সেই সব গাছকেই চারা রোপণের সময় গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি, শহরে চারা রোপণের পরে খেয়াল রাখতে হবে তাদের শিকড় যেন খোঁড়াখুঁড়ির জন্য ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

পরিকল্পনা ছাড়া চারা রোপণ করলে বা কোনও গাছ শহর থেকে হারিয়ে গেলে তার প্রভাব কী হতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তরে রাজ্য জীব বৈচিত্র পর্ষদের সদস্য এবং উদ্ভিদ গবেষক নন্দদুলাল পারিয়া বলেন, “শহরে গাছের মধ্যে রকমভেদ কমে যাবে। হারিয়ে যাবে আরও অনেক গাছ। ফলে পরিবেশে দূষণ আরও বাড়বে।”