বাজির আঁতুরঘরে শব্দবাজির আর এক নাম গরিবের বাজি।

দক্ষিণ শহরতলির মহেশতলায় নুঙ্গির বাজির বাজার নিজেকে শিলিগুড়ির ব্যবসায়ীর পরিচয় দিতেই আশপাশ থেকে এক সঙ্গে জনা তিনেক যুবক প্রায় হুড়মুড়িয়ে এসে দাঁড়ালেন। তিন জনের একই প্রশ্ন, “চকোলেট লাগবে তো?”

এক জন তো বলেই বসলেন, “গত বার কিন্তু আপনি আমার কাছ থেকেই নিয়েছিলেন।” তার পরেই হাত ধরে এক টান মেরে সামনের দিকে হাঁটা শুরু করলেন। কিছুটা যাওয়ার পরে ওই যুবক একটু হেসে বলেন, “খুব কম্পিটিশন তো। তাই ওদের একটু ঝটকা দিয়ে আপনাকে নিয়ে এলাম। ওদের বোঝালাম আপনি আমার বাঁধা খরিদ্দার।” রাস্তায় একটা ভ্যান রিকশা দাঁড় করিয়ে ওই যুবক বললেন, “উঠে পড়ুন। একেবারে কারখানায় চলুন। তার পরে দরদাম করে চকোলেট ফাটিয়ে আওয়াজ শুনে অর্ডার দেবেন।” মিনিট দশেক পরে রাস্তার ধারে বাঁশ বাগানের পাশে গিয়ে থামল ভ্যান রিকশা। পকেট থেকে একটা ১০ টাকার নোট ভ্যান রিকশাওয়ালা হাতে গুঁজে দিয়ে সরু আঁকা-বাঁকা পথ দিয়ে ওই যুবকের পিছনে চললাম। কিছুটা যাওয়ার পরে বাঁশবাগান শেষ। ছোট একটা মাঠের মধ্যে চার দিক খোলা একটা প্রায় আড়াই হাজার বর্গফুটের টালির চালের ঘর।

ওই যুবককে দেখেই চলে এল একটি প্লাস্টিকের চেয়ার। আর একটি বছর আটকের ছেলে এক গ্লাস জল নিয়ে এসে সামনে দাঁড়াল। ওই যুবক বললেন, “বসুন, একটু জল খান। অনেকটা হেঁটে এলেন তো।”

চারদিক খোলা একচালার ঘরের মধ্যে এক দিকে কাগজের চারকোনা খোলের মধ্যে বারুদ ভরা হচ্ছে। আর এক দিকে বারুদ ভরা ওই খোল পাটের সুতলি দিয়ে বাঁধা হচ্ছে। চকোলেট বোমের আঁতুরঘর। তার পরে কয়েকটি চকোলেট হাতে নিয়ে ওই যুবক বললেন, “চলুন, বাঁশ বাগানে গিয়ে ফাটাই। এক হাতে ধুপকাঠি। চকোলেটের সলতে আগুন ধরিয়ে ছুড়ে দিলেন বাঁশবাগানে। বিকট শব্দে ফাটল চকোলেট। তার পরেই এক মুখ হাসি নিয়ে ওই যুবকের মন্তব্য, “আওয়াজ নিয়ে কোনও কথা হবে না। এ বার সব চকোলেট একটু ছোট সাইজ করা হয়েছে। কিন্তু বারুদ ঠাসা। আওয়াজেই তো টের পেলেন।” তার পরে ফের হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলেন একটা দরমা ঘরে। কয়েকটি তক্তপোশের উপরে প্লাস্টিকের প্যাকেটে ঠাসা থরে থরে সাজানো চকোলেট। একটা প্যাকেট হাতে নিয়ে যুবক বললেন, “১০০ চকোলেটের প্যাকেট আপনি দেবেন ৮০ টাকা। আরও একটা ভাল কোয়ালিটি আছে, দাম ১১০ টাকা।

একটু দরদাম করা শুরু করতেই ওই যুবক হাত চেপে ধরে বলেন, “দাদা শব্দবাজি গরিবের বাজি। যাঁরা তৈরি করেন তাঁরা যেমন খুব গরিব, আর গরিব মানুষই এই বাজি কেনে। গরিব মানুষ আর দামি আতসবাজি ফাটাবে কোথা থেকে বলুন তো?” কিছুক্ষণ চুপ থাকার পরে ওই যুবক ফের বলেন, “শব্দবাজিতে লাভও অনেক। তেমন ক্রেতার কাছেও কিন্তু সস্তা।” দিন চারেক পরে ফেরার কথা ঠিক করে ৫০০ টাকার নোট গুঁজে দেওয়া গেল ওই যুবকের হাতে। দু’প্যাকেট চকোলেট একটা কালো প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে সঙ্গে দিয়ে দিলেন ওই যুবক। “তা হলে আসুন। কোথায় ডেলিভারি দেব, তা ঠিক করুন। ট্রেনে না বাই রোড, ভেবে নিন। আমি সব ব্যবস্থা করে দেব।”

চকোলেটের আঁতুরঘর থেকে রাস্তায় এসে একটা ভ্যান রিকশায় উঠলাম। প্রায় তিন কিমি রাস্তার পাশে ছোট ছোট কারখানায় তৈরি হচ্ছে গরিবের বাজি। দক্ষিণ শহরতলির মহেশতলা-বজবজ-চম্পাহাটি এলাকায় রমরমিয়ে তৈরি হচ্ছে গরিবের বাজি। চম্পাহাটি এলাকার এক আতসবাজির ব্যবসায়ীর কথায়, “আতসবাজির সঙ্গে যদি আপনি শব্দবাজি না দিতে পারেন তা হলে অধিকাংশ খরিদ্দার খুব বিরক্ত হন। গত বছর তো অনেক ব্যবসায়ী হাজার টাকার আতসবাজি কিনলে এক প্যাকেট করে চকোলেট ফ্রি দিয়েছেন। এ বছর কী হয়, দেখা যাক।”

ওই সব গ্রামগুলিতে রাস্তার পাশেই চটের উপরে সুতলি মোড়া চকোলেট শুকোচ্ছে। দিন তিনেক রোদে শোকানোর পরে রাংতা দিয়ে মোড়া হবে চকোলেট। বড় কারখানা নয়, গরিবের বাজি তৈরি হচ্ছে গৃহস্থ বাড়িতেও। দুপুরের অবসরে চকোলেট বোমা তৈরি করছেন গৃহবধূরাও। চম্পাহাটি এলাকার এক গৃহবধূর কথায়, “আমরা চকোলেট তৈরি করে কারখানার মহাজনদের কাছে বিক্রি করি। লাভ ভালই।” সব খরচ বাদ দিয়ে প্যাকেট প্রতি কুড়ি টাকা থাকে বলে জানালেন বাজির কারিগর ওই বধূ। ওই সব এলাকায় এখন সন্ধ্যার কিছুটা আগে পরিচিত এক দৃশ্য, শিশুদের হাতে ছোট ছোট ব্যাগ। আর ওই ব্যাগে ঠাসা চকোলেটের প্যাকেট। বাড়ির বৌদের হাতে তৈরি গরিবের বাজি মহাজনদের কাছে পৌঁছে দেয় শিশুরাই।

দক্ষিণ ২৪ পরগনার পুলিশকর্তারা অবশ্য তল্লাশি অভিযান চালাচ্ছেন বলে দাবি করেছেন। প্রায় তিন হাজার কুইন্টাল শব্দবাজি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে বলে দাবি। কিন্তু কালীপুজোর দিন তো শব্দবাজি ফাটবেই। এই প্রশ্নের উত্তরে এক পুলিশকর্তা বলেন, “গরিবের বাজি তৈরি বন্ধ করা অসম্ভব। তল্লাশি অভিযান চালিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না কি?” তাঁর সংযোজন, শব্দবাজি ফাটবেই। কেউ আটকাতে পারবে না।”