পাথর শিল্পাঞ্চল এলাকার দূষণ নিয়ে ফের সরব হল বীরভূম জেলা আদিবাসী গাঁওতা। পাথরের ধুলো, দূষণ নিয়ন্ত্রণ-সহ কয়েক দফা দাবিতে বৃহস্পতিবার পাঁচামি এলাকায় গাঁওতার পক্ষ থেকে একটি মিছিল বের করা হয়। আর মিছিলে ভিড় দেখে সিঁদুরে মেঘ দেখছে প্রশাসন।

স্থানীয়দের দাবি, “এলাকার পাথরকলগুলির দূষণ নিয়ন্ত্রণে কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। প্রশাসনের কাছে এ ব্যাপারে বার বার আবেদন জানিয়েও কোনও লাভ হয়নি। ফের আন্দোলনের পথে যেতে বাধ্য হল গাঁওতা।”যদিও দূষণের অভিযোগ মানতে চাননি পাঁচামি মাইনস অ্যান্ড ক্রাসার ওনার অ্যাসোসিয়েশন। মালিক সংগঠনের দাবি, দূষণ নিয়ন্ত্রণে প্রতিদিন নিয়ম মেনে জল দেওয়া হয়।

ঘটনা হল, মালিক সংগঠন মুখে যাই বলুক কয়েক বছর আগে এই গাঁওতার আন্দোলনের জেরেই জেলার শিল্পাঞ্চলের অর্থনীতিতে জোর প্রভাব পড়েছিল। সে ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা করছে এখন প্রশাসন। এমনিতেই জেলায় রাজনৈতিক কোন্দলে জেরে জেরবার পুলিশ-প্রশাসন। তার উপর নতুন করে এ দিন আবার গাঁওতারা আন্দোলনে নামায় কার্যত কপালে ভাঁজ পড়ল জেলা প্রশাসনের। 

এ দিন চাঁদা গ্রাম থেকে বেলা সাড়ে এগারোটা নাগাদ মিছিল বেরিয়ে সাগরবাঁধি হয়ে পাঁচামি পর্যন্ত যায়। গাওঁতার মিছিলকে কেন্দ্র করে যাতে কোনও গণ্ডগোল না হয়, সে জন্য আগে থেকেই মহম্মদবাজারের ওসি চয়ন ঘোষের নেতৃত্বে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মহম্মদবাজার এলাকার পাথর শিল্পাঞ্চলের দূষণ নিয়ে দীর্ঘ দিন থেকে সরব আদিবাসী গাঁওতা। পাথর খাদানে বিস্ফোরণ ও পাথর কলের দূষণ নিয়ে গাঁওতার আন্দোলনে মাঝে স্তব্ধ হয়ে যায় এই শিল্পঞ্চল। উভয় পক্ষের সংঘর্ষে কয়েকজন মারাও যায়। বহু পাথরকল ও গাড়ি ভাঙচুরের পাশাপাশি গাড়ি ও পাথরকলে আগুন ধরিয়ে দেয় আন্দোলনকারীরা।

ঘটনা হল, ২০০৯ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত সময় কালের মধ্যে প্রায় আড়াই বছর সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় মহম্মদবাজার শিল্পাঞ্চল। তার আঁচ গিয়ে পড়ে জেলার অন্যান্য পাথর শিল্পাঞ্চলগুলিতে। হাজার হাজার শ্রমিক মানুষ কাজ হারিয়ে রাতারাতি বেকার হয়ে পড়েন। জেলাস্তর ও রাজ্যস্তরে একাধিক বৈঠক করেও পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মহম্মদবাজারে এসে গাঁওতা নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করেন। এরপরই পরিস্থিতি ক্রমশ স্বাভাবিক হতে থাকে।

এ দিন দূষনের প্রতিবাদে চাঁদা, মথুরাপাহাড়ি, সাগরবাঁধি, গাবারবাথান, হাবড়াপাহাড়ি, বারোমেশিয়া, পাঁচামি এলাকার মানুষ চাঁদা থেকে পাঁচামি পর্যন্ত মিছিল করে। তাঁদের দাবি যে কোনও মূল্যে দূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ও নিয়ম মেনে পাথর খাদান ও পাথরকল চালাতে হবে। না হলে, ফের বৃহত্তর আন্দোলনের গড়ে তোলার হুমকি দেয় তারা। সংগঠনের নেতা শিক্ষক সুনীল সোরেন বলেন, “মহম্মদবাজারের পাথর শিল্পাঞ্চল জেলার অন্যতম অর্থনৈতিক জোন হিসাবে চিহ্নিত। অথচ ওই এলাকার মানুষজনের অর্থনৈতিক দৈনতা সবচেয়ে বেশি। শুধু তাই নয়, সমস্ত সরকারি পরিষেবার মানও যথেষ্ট নয় রাস্তাঘাটের এমন অবস্থা যে অধিকাংশ পথে চলা যায় না। এখানকার দূষণ দ্রুত নিয়ন্ত্রণ না হলে মানুষের সুস্থ হয়ে বেঁচে থাকাটাই কঠিন হয়ে পড়বে।”

মিছিলে অংশ নেওয়া কালীচরণ টুডু, খোকন মাড্ডি, বাহামুনি টুডু, সিধু টুডু, সুমিতা সোরেন, সাগরবাঁধি সংসদের পঞ্চায়েত সদস্যা মানি হাঁসদারা বলেন, “দূষণের কারণে আমাদের শ্বাস প্রশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। রাস্তা ও পাথরের ধুলোয় পথে বের হতে কষ্ট হয়। ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করেও শান্তিতে থাকা যায় না। এই ক্ষতিকর দূষণকে কমাতে হবে।”

গাঁওতা সম্পাদক রবিন সোরেনের দাবি, “২০০৯-১১-র আন্দোলনের পর এলাকার মানুষের দাবি মেনে প্রশাসন দূষণ নিয়ন্ত্রণ করেনি। খাদান ও পাথরকল চালানোর ব্যাপারে যে সব আশ্বাস দিয়েছিল তা এখন আর মানা হচ্ছে না। আধিকাংশ খাদানে বিস্ফোরনের সময় সরকারের ঘোষিত নিয়ম মানা হচ্ছে না। যে কোনও সময় বিপদের আশঙ্কা আছে। ক্ষোভ বাড়ছে সরকারের ভূমিকায়। এ দিনের মিছিল তারই প্রতিফলন।”

মহম্মদবাজারের বিডিও সুমন বিশ্বাস বলেন, “দূষণ বা ধুলো ওড়ার ব্যাপারে ওই এলাকার পাথর শিল্পে যুক্ত খাদান ও পাথরকল মালিকদের সুনির্দিষ্ট গাইড লাইন দেওয়া হয়েছে। মাঝে মধ্যে তা খতিয়ে দেখাও হয়। তবে দূষন নিয়ে যখন নতুন করে অভিযোগ উঠছে, তখন বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হবে।”