সর্ষের মধ্যেই ভূত! যার জেরে কড়া ব্যবস্থা নিয়েও নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না শহরের বায়ুদূষণের মাত্রা। মহানগরে চলা গাড়ির বায়ুদূষণের মাত্রা পরীক্ষা করে যারা ছাড়পত্র দেবে, সেই সব দূষণ পরীক্ষাকেন্দ্রগুলির নিজেদের শংসাপত্রই ঠিক নেই। 

অভিযোগটা ছিলই। বিভিন্ন সময়ে পরিবেশবিদ-সহ নানা বিশেষজ্ঞেরা এই অভিযোগ করেছেন। কিন্তু ফল হয়নি। সম্প্রতি পরিবহণ দফতরের তরফে এ ব্যাপারে কড়া হতেই আসল সত্যিটা সামনে এসে পড়েছে। প্রতি বছর ধোঁয়া পরীক্ষা কেন্দ্রগুলির নিজেদের যন্ত্রপাতি এবং সেগুলি চালানোর কর্মী ঠিকঠাক আছে কি না, তা সরকারকে দেখিয়ে শংসাপত্রের নবীকরণ করা হয়। বছরের পর বছর এই পরীক্ষাতেই ঘাটতি ছিল। এ বছর কড়া হাতে সরকার ওই কেন্দ্রগুলির পরীক্ষা করতে গিয়েই তা ধরা পড়েছে। সরকারি নিয়মের তোয়াক্কা না করেই ইচ্ছেমতো দূষণ নিয়ন্ত্রণের শংসাপত্র দিয়ে চলছিল ওই কেন্দ্রগুলি।

এ নিয়ে রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের উপদেষ্টা সৌমেন্দ্রমোহন ঘোষ বলেন, “সরকারি নজরদারিতে ঘাটতির জন্যই এই বিপত্তি। বেশির ভাগ দূষণ পরীক্ষা কেন্দ্রগুলির যন্ত্রপাতি বছরের পর বছর পরীক্ষা করানো হয় না।”

পরিবহণ দফতর সূত্রের খবর, ধোঁয়া পরীক্ষা কেন্দ্রগুলির ক্ষেত্রে সরকারি নিয়ম বলছে, সেখানে এক জন করে মুখ্য পরীক্ষক থাকবেন। তাঁর সঙ্গে থাকবেন দু’জন সহকারী। মুখ্য পরীক্ষককে সরকারি মান্যতাপ্রাপ্ত কোনও আইটিআই সংস্থা থেকে নির্দিষ্ট পাঠ্যক্রম পাশ করে আসতে হবে। তা ছাড়া, কেন্দ্রগুলিতে চলা স্মোক মিটার এবং গ্যাস অ্যানালাইজার যন্ত্রদু’টি সঠিক রয়েছে কি না, তা-ও পরীক্ষা করাতে হয়। 

২০১৪ সালে বিষয়টি নিয়ে নজরদারি চালাতে গিয়েই অনিয়ম ধরা পড়ে পরিবহণ দফতর এবং রাজ্য পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের চোখে। অভিযোগ, দেখা যায় কলকাতা শহরে প্রায় ৬০টি ধোঁয়া পরীক্ষা কেন্দ্রে মুখ্য পরীক্ষক থাকলেও তাঁদের আইটিআই বা তেমন কোনও প্রতিষ্ঠান থেকে পাশ করার কোনও শংসাপত্র নেই। কোথাও আবার পরীক্ষাই করা হয়নি স্মোক মিটার এবং গ্যাস অ্যানালাইজার। প্রতিটিকেই জানিয়ে দেওয়া হয়, সরকারি নিয়ম না-মানলে তাদের ঝাঁপ বন্ধ করে দেওয়া হবে।

পরিবহণ দফতরের এক কর্তা জানিয়েছেন, প্রতি বছরই ওই কেন্দ্রগুলিকে শংসাপত্র নবীকরণ করাতে হয়। নবীকরণ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে তাঁদের ‘পাশ’ সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। নবীকরণ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে সরকারের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রকে ধোঁয়া পরীক্ষার ছাড়পত্র ছাপিয়ে দেওয়া হয়। অনিয়ম ধরা পড়ার পরে বেশির ভাগ কেন্দ্রকেই আর নতুন শংসাপত্র দেয়নি পরিবহণ দফতর। তার ফলে চাইলেও গাড়িগুলিকে ধোঁয়া পরীক্ষার ছাড়পত্র দিতে পারার কথা নয়। এই অবস্থায় মজুত থাকা পুরনো ছাড়পত্র ব্যবহার করেই গত এক বছর ধরে ধোঁয়া পরীক্ষা চালিয়ে আসছিল ওই সমস্ত কেন্দ্র। মজুত থাকা ছাড়পত্র শেষ হওয়াতেই সমস্যায় পড়ে যায় কেন্দ্রগুলি। কারণ, চাইলেও তখন আর ধোঁয়া পরীক্ষার ছাড়পত্র দিতে পারছিল না তারা। সে কথা তারা পাবলিক ভেহিক্লস দফতরে (পিভিডি) জানালে তখনই ধরা পড়ে শংসাপত্র ছাড়াই পুরনো ছাড়পত্র ব্যবহার করা হচ্ছিল।

কলকাতা পিভিডি-র ডিরেক্টর সি মুরুগান বলেন, “সরকারি নির্দেশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পুরনো ছাড়পত্র দিয়ে এত দিন ধরে কাজ চালাচ্ছিল ধোঁয়া পরীক্ষা কেন্দ্রগুলি। অথচ কেন্দ্রগুলির শংসাপত্র পাওয়া গাড়ি পরীক্ষা করতে গিয়ে আমরা দেখছি, তারা আমাদের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হচ্ছে না। এর পরেই আমরা নতুন করে শংসাপত্র ছাড়া বন্ধ করি। শংসাপত্র যত দিন মজুত ছিল, তত দিন ওরা কাজ চালিয়েছে। এ বার শেষ হতেই ফ্যাসাদে পড়েছে।” মুরুগান জানিয়েছেন, কেন্দ্রগুলিকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে কেন্দ্রগুলিকে সমস্ত শর্ত মানতে হবে। অন্যথায় তাদের লাইসেন্স বাতিল করে দেওয়া হতে পারে। কড়া অবস্থান নিয়েছে রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদও। সংস্থার চেয়ারম্যান কল্যাণ রুদ্র বলেন, “বাযুদূষণ প্রতিরোধে যা যা করণীয়, তা তো করতেই হবে। সরকার এ ব্যাপারে বদ্ধপরিকর।”

সরকারের কড়া অবস্থানে অবশ্য নরম হয়েছে ধোঁয়া পরীক্ষা কেন্দ্রগুলি। চাপে পড়ে তারা পরিবহণ দফতরকে জানিয়েছে, আইটিআই প্রশিক্ষিত পরীক্ষকই রাখা হবে। এমনকী, দূষণের মাত্রা পরীক্ষায় যাতে কোনও অনিয়ম না হয়, তা মানার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে কেন্দ্রগুলি। ধোঁয়া পরীক্ষা কেন্দ্রগুলির অ্যাসোসিয়েশনের এক নেতার কথায়, “সমস্যা মোটামুটি মিটেই গিয়েছে। আশা করছি, ৩১ জানুয়ারির মধ্যেই সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে।”