দিনের বেলাও রাস্তায় বেরোলে হাঁচি-কাশি শুরু হচ্ছে। রাত যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে সেই জ্বালা। গভীর রাতে ধোঁয়াশায় ঢেকে যাচ্ছে ভেপারের আলোও!

রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ সূত্রের খবর, বাতাসে ভাসমান ধূলিকণা ও নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড মাত্রাতিরিক্ত হওয়ার ফলেই এই অবস্থা। অক্টোবর থেকে মার্চ এই দূষণের পরিমাণ স্বাভাবিকের থেকে অন্তত তিন-চার গুণ বেশি থাকছে বলেই পর্ষদ সূত্রের দাবি।

একই কথা সরকারি ভাবে মানছেন পর্ষদের কর্তারাও। কলকাতায় জাতীয় পরিবেশ আদালতের পূর্বাঞ্চলীয় বেঞ্চে পরিবেশকর্মী সুভাষ দত্তের দায়ের করা এক মামলায় হলফনামা দিয়ে তা জানিয়েছেন তাঁরা। এবং এর পিছনে শহরের গাড়িকেই দায়ী করেছে পর্ষদ।

পর্ষদ সূত্রের খবর, কলকাতায় পুরনো গাড়ি এবং অন্য উত্‌স থেকে ভাসমান ধূলিকণা এবং নাইট্রোজেন যৌগ বাতাসে ছড়ায়। গরম ও বর্ষায় ঝড়বৃষ্টি ও জলীয় বাষ্পের আধিক্যের জন্য তা ততটা ধরা পড়ে না। অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত শুকনো আবহাওয়ায় তা বেশি ধরা পড়ে। সে কথাই পর্ষদ কর্তারা আদালতে জানান। বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত পর্ষদের স্বয়ংক্রিয় দূষণ পরিমাপ যন্ত্রেও হলফনামার এই ছবি ধরা পড়েছে।

পর্ষদের সূত্রে খবর, বৃহস্পতিবার রাত আটটার পর থেকে শুক্রবার বিকেল তিনটে পর্যন্ত কলকাতার বাতাসে প্রতি ঘনমিটারে ভাসমান ধূলিকণার সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৪৭৯ ও ৮৯ মাইক্রোগ্রাম। রাজ্যের এক পরিবেশবিজ্ঞানী বলছেন, “বাতাসে ভাসমান ধূলিকণার দৈনিক স্বাভাবিক গড় প্রতি ঘনমিটারে ১০০ মাইক্রোগ্রাম। এই মাত্রা অনেক বেশি।” একই অবস্থা নাইট্রোজেন অক্সাইডের। বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত বেশির ভাগ সময়েই তা স্বাভাবিকের উপরে ছিল, আবার কখনও স্বাভাবিক মাত্রার চার-পাঁচ গুণ বেশিও ধরা পড়েছে যন্ত্রে।

কলকাতা যে বায়ুদূষণে আক্রান্ত, তা অবশ্য নতুন কিছু নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)-র সমীক্ষাতেও তা ধরা পড়েছিল। গত বছরই ওই সমীক্ষায় হু জানিয়েছিল, বায়ুদূষণের নিরিখে দেশের তৃতীয় দূষিত শহর কলকাতা। দ্বিতীয় স্থানে তারই ‘সহোদর’ হাওড়া। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বায়ুদূষণ যত বাড়বে, ততই ফুসফুসের ক্যানসার, হাঁপানির মতো অসুখে আক্রান্ত হবেন বাসিন্দারা।

এই সতর্কবাণীর পরেও অবশ্য রাজ্য পরিবেশ দফতরের কর্তারা এই বিপদের কথা মানতেন না। দূষণ রুখতে রাজ্য যে ব্যর্থ, তা-ও স্বীকার করতেন না তাঁরা। এ নিয়েই মামলা ঠুকেছিলেন সুভাষবাবু। হলফনামা দিতে গিয়ে সেই সত্যিটাই বেরিয়ে পড়েছে বলে দাবি করছেন পরিবেশবিদদের একটি বড় অংশ। সুভাষবাবু বলছেন, “শীতের রাতে শহর যেন একটি গ্যাস চেম্বারে পরিণত হয়।”

পরিবেশবিদেরাই বলছেন, কলকাতা ও দিল্লির (দূষণের নিরিখে দেশে প্রথম) মতো মহানগরীতে গাড়ি থেকেই বেশি দূষণ ছড়ায়। তার জন্য পুরনো গাড়ির পাশাপাশি দায়ী ডিজেল বা কাটা তেলের ব্যবহার। মাস কয়েক আগে পরিবেশ গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের এক আলোচনাতেও সেই কথা উঠেছিল। পরিবেশবিদরা বলেছিলেন, পুরনো গাড়ি ব্যবহার ও পরিশোধিত জ্বালানি ব্যবহারে কড়াকড়ি না করলে দূষণ আটকানো সম্ভব নয়। সুভাষবাবু বলেন, “২০০৮ সালে কলকাতা হাইকোর্ট শহরে ১৫ বছরের পুরনো বাস-লরি-ট্যাক্সি বাতিলের নির্দেশ দেয়। সেই কাজ পুরো শেষ হয়নি। এ ব্যাপারে পরিবেশ আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি।”

তা হলে কি এ ভাবেই দূষণের কবলে থেকে যাবে মহানগরী?

পর্ষদের এক কর্তা বলছেন, শহরে কয়েক লক্ষ গাড়ি চলে। সব গাড়ি পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। গাড়ির দূষণ ছাড়পত্র নেওয়ার সময়সীমা ছ’মাসের বদলে তিন মাস করার জন্য পরিবেশ আদালতের কাছে আর্জি জানানো হয়েছে। কিন্তু শহরে এমনিতেই দূষণ পরীক্ষা কেন্দ্র বেশি নেই। আবার অনেক সময়ে সেগুলি ঠিকমতো কাজও করে না। এ বিষয়টিও পরিবেশ আদালতের নজরে এসেছে।

এই মামলায় পরিবেশ আদালতের বিচারপতি প্রতাপ রায় ও বিশেষজ্ঞ-সদস্য পি সি মিশ্রের ডিভিশন বেঞ্চ নির্দেশ দিয়েছে, শহরে ক’টি দূষণ পরীক্ষা কেন্দ্র রয়েছে, তার মধ্যে ক’টি ঠিকমতো কাজ করছে, তা পর্ষদকে জানাতে হবে। তিন মাস অন্তর গাড়ি পরীক্ষা করার পরিকাঠামো গড়ে তুলতে আরও কতগুলি পরীক্ষা কেন্দ্র গড়া সম্ভব, তাও জানাতে নির্দেশ দিয়েছে আদালত।