একপাল হাতি বেশ কয়েকটি বাচ্চাকে নিয়ে এলাকায় ঢুকেছে। খবরটা ছড়িয়ে পড়তেই দলে দলে লোকেরা ভিড় করেছিলেন এলাকায়। কিন্তু রাত বাড়লেও তাঁদের উত্‌সাহে ভাটা পড়েনি। আর এতেই সাঁতুড়ি থেকে ৩২টি হাতির পাল তাড়াতে নেমে বিপাকে পড়লেন হুলাপার্টির লোকেরা।

সোমবার রাতে বাঁকুড়া থেকে সাঁতুড়িতে বেশ কয়েকটি শাবককে নিয়ে ঢুকে পড়েছে হাতির দলটি। তাদের ফিরিয়ে নিয়ে যেতে বিষ্ণুপুর থেকে হুলাপার্টির কর্মীদের নিয়ে আসা হয়। কিন্তু হাতি তাড়াতে নেমে লোকজনের ভিড় দেখে প্রমাদ গোনেন তাঁরা। এত লোক থাকলে হাতি খেপে গিয়ে বিপদ ঘটিয়ে দিতে পারে! এমনটা আগে ঘটেছেও। ফলে লোক কমার অপেক্ষায় মঙ্গলবার রাতের অনেকখানি নষ্ট হয়েছে। রঘুনাথপুরের রেঞ্জ অফিসার সোমনাথ চৌধুরী বলেন, “মঙ্গলবার দিনভর একতিরা গ্রামের পাশে জঙ্গলের কাছে হাতির দলটিকে দেখতে ভিড় জমিয়েছিলেন গ্রামবাসী। ফলে একটু রাত করেই অভিযান শুরু করা হয়েছিল। কিন্তু তাতেও মানমুষের উত্‌সাহ কমেনি। এমনকী রাত ১০টা-১১টাতেও বিভিন্ন গ্রাম থেকে কাতারে কাতারে লোকজন জড়ো হন হাতি দেখতে। ফলে সমস্যায় পড়তে হয়েছে হুলাপার্টি ও বন কর্মীদের। হাতি তাড়ানোর অভিযান কিছু সময়ের জন্য কার্যত স্থগিত রেখে লোকজনদের সামাল দিতে হয়েছে।” বনকর্মীরা জানান, অতীতে একরাতে হাতি তাড়িয়ে ৩০ কিলোমিটার দূরে নিয়ে গিয়েছেন হুলাপার্টির লোকজন। এলাকায় এমন নজির থাকলেও এ বার উত্‌সাহী গ্রামবাসীর ভিড়ে একরাতে মাত্র পাঁচ-ছয় কিলোমিটার তাড়ানো গিয়েছে।

বুধবার দিনভর দলটি টাড়াবাড়ি পঞ্চায়েতের দুবরাজপুর ও কেন্দবেড়িয়া গ্রামের পাশের জঙ্গলে ছিল। এ দিন সন্ধ্যায় ফের অভিযান চালানোর চেষ্টা চলে। বন দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, কেন্দবেড়িয়াতে কিছু জমির আলু নষ্ট করা ছাড়া এ দিন পর্যন্ত এই হাতির দল আর বড় মাপের কোনও ক্ষতি করেনি।

মাঝে মধ্যে বাঁকুড়া থেকে রেসিডেন্ট হাতি সাঁতুড়ি এলাকায় ঢুকে পড়ার ঘটনা ঘটলেও এক সাথে ১০-১২টি শাবক-সহ ৩২টি হাতির দল ঢুকে পড়ার নজির এলাকায় নেই। ফলে স্বভাবতই হাতির দল ঢোকার ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও উত্তেজনা ছড়িয়েছে এলাকায়। দলে দলে উত্‌সাহী গ্রামবাসী ভিড় জমাচ্ছেন হাতির দলটিকে দেখতে। আর এতেই সমস্যায় পড়তে হচ্ছে বন দফতরকে। বস্তুত হাতি তাড়তে বিষ্ণুপুর থেকে প্রশিক্ষিত ২২ জনের একটি হুলাপার্টিকে মঙ্গলবার দুপুরেই সাঁতুড়িতে আনা হয়েছে। বনদফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, মঙ্গলবার একতিরা গ্রামের কাছে জঙ্গলের সামনে উত্‌সাহী এলাকাবাসী জড়ো হন। তখন হাতির পালটি জঙ্গলে গা ঢাকা দিয়ে ছিল। তাঁদের বুঝিয়ে সরিয়ে দেওয়ার পরে রাতে হাতি তাড়ানোর অভিযান শুরু হয়। কিন্তু জঙ্গল থেকে হাতির দল বেরিয়ে আসতেই আবার গ্রামবাসী ভিড় করে।

রেঞ্জ অফিসার সোমনাথবাবু জানান, এমনিতেই দলটিতে ১০-১২টি বাচ্চা থাকায় ধীরে হাঁটছে দলটি। তার পরে আবার উত্‌সাহী গ্রামবাসীর ভিড়ে তাদের এগিয়ে নিয়ে যেতে বেশ সমস্যা হচ্ছে। তাঁর কথায়, “সবসময়ে চেষ্টা করা হয় যাতে হাতির বাল গ্রামে না ঢুকে পড়ে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে গ্রামের পাশ দিয়ে হাতি যাচ্ছে শুনে গ্রাম ভেঙে লোকজন সামনে চলে আসছেন।” বনকর্মীদের অভিযোগ, ভিড়ের মধ্যে থেকে কয়েকজন হাতির দলটিকে লক্ষ করে পাথরও ছুড়তে শুরু করে। এতে দলটি ফের জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়ে। বনকর্মীদের সমস্যা বাড়ে। আসে পুলিশ। কিন্তু শতাধিক লোককে সামাল দেওয়া সম্ভব হয়নি গুটিকয় পুলিশ কর্মীর পক্ষেও।

মঙ্গলবার রাতে একতিরা থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম মুখে মানপুর, ভস্কো, মুক্তিপুর হয়ে দুবরাজপুর পর্যন্ত আসে দলটি। বন দফতরের এক কর্তার কথায়, “রাতেও ছেলে কোলে নিয়ে মহিলারা পর্যন্ত জড়ো হনে। এতে নিজের বিপদের সঙ্গে সন্তানেরও যে বিপদ হতে পারে, তা ভাবছেন না।” তিন-চার কিমি দূর থেকে সাইকেলে দুবরাজপর গ্রামে আসেন মালিবনার জয়ন্ত মণ্ডল, পাথরবাধেঁর বিলম মুর্মু, কার্তিক লোহার। জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে উঁকিঝুঁকি মারতেও দেখা গিয়েছে তাঁদের। তাঁরা বলেন, “এত কাছে এত হাতি এসেছে, তাই না দেখতে এসে পারলাম না।” এই অতি উত্‌সাহই ঘুম ছুটিয়ে দিয়েছে বনকর্মীদের।