সরস্বতী পুজোরই দিন দুয়েক পর মধ্যমগ্রাম এলাকার একটি পাড়া। রাত তখন পৌনে ১২টা। মাইক বাজছে তারস্বরে। এলাকার কয়েক জন বাসিন্দা অতিষ্ঠ হয়ে ফোন করেন স্থানীয় থানায়। কিন্তু তাঁদের অভিযোগ, থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে যেতে শুধু অস্বীকার করে তা-ই নয়, উল্টে বলে, অভিযুক্তদের ফোন নম্বর আগে জোগাড় করে দিতে হবে, তার পর পুলিশ দেখবে, কী করা যায়। স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযুক্তদের ফোন নম্বর থানাকে দিতে পারেননি। পুলিশও যায়নি ঘটনাস্থলে। শব্দের প্রবল তাণ্ডব সহ্য করেই বাকি রাতটুকু কাটাতে হয়েছিল ওই তল্লাটের মানুষদের।

গত বছর কালীপুজোর বিসর্জনে বালিতে ডিজে-কে মাঝরাস্তায় আটকে প্রহৃত হয়েছিলেন খোদ এসিপি (নর্থ) ও ট্রাফিক আইসি। গ্রেফতার হয়েছিলেন বেশ কয়েক জন।

আবার ইংরেজি নববর্ষের উদযাপনকে কেন্দ্র করে বাগুইআটির একটি পাড়ায় ডি জে-র সঙ্গে উদ্দাম নাচ কার্যত মাঠ থেকে রাস্তায় নেমে এসেছিল। স্থানীয় সূত্রের খবর, কয়েক জন প্রতিবাদ করেছিলেন। কিন্তু নাচগান বন্ধ হয়ইনি, বরং প্রতিবাদ করার ‘শাস্তি’ হিসেবে গানের শব্দমাত্রা আরও বাড়িয়ে দেওয়া হয়। কাছেই বাগুইআটি থানা। বাসিন্দাদের একাংশের অভিযোগ, ফোন করেও কোনও লাভ হয়নি, বরং, থানা থেকে বলা হয়, এ সব ঝামেলা নিজেদের মধ্যেই মিটিয়ে নেওয়া ভাল।

এই নিরবচ্ছিন্ন ‘প্রক্রিয়ারই’ অঙ্গ দমদমের বরফকল এলাকায় বাচিক শিল্পী পার্থ ঘোষ ও গৌরী ঘোষের বাড়িতে হামলা---ওই বিশিষ্ট দম্পতির ‘অপরাধ’, তাঁরা শব্দ তাণ্ডবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন। এলাকার মানুষদের বক্তব্য, ওই তল্লাটে ফি বছর সরস্বতী পুজো উপলক্ষে মাইক বাজানোর মাত্রাটা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। সরস্বতী পুজো উপলক্ষেও চার-পাঁচ দিন ধরে চলছে শব্দদৈত্যের অত্যাচার।

কিন্তু এ সব থামাতে অসুবিধেটা ঠিক কোথায়?

কলকাতা হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ভগবতীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য, অধিকাংশ পুলিশ অফিসার ও কর্মী শব্দ দূষণের বিরুদ্ধে আইনটাই পড়েননি, তাঁরা জানেন না, পুলিশকে এই ব্যাপারে কতটা ক্ষমতা দেওয়া রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে শব্দবাজি নিষিদ্ধ করার প্রথম রায় দিয়েছিলেন যিনি, সেই ভগবতীবাবু জানান, রাত ১০টার পর মাইক বাজানো নিষেধ। ওই নির্দিষ্ট সময়ের পর মাইক বাজানো হবে না, এই শর্তেই কিন্তু পুলিশ মাইক বাজানোর অনুমতি দেয়। কিন্তু এখন বহু ক্ষেত্রেই পুলিশ অনুমতির তোয়াক্কা না করেই মাইক বাজছে দেদার। ভগবতীবাবুর কথায়, “শব্দদূষণ করার অপরাধে কারও পাঁচ বছর পর্যন্ত জেল ও এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। কিন্তু আইন যে এত কঠোর, সেটা জানেন ক’জন পুলিশ?”

১৯৯৭ সালে শব্দদূষণের বিরুদ্ধে ভগবতীবাবু কঠোর নির্দেশ জারি করার এক বছরের মাথায় সল্টলেকের এফডি ব্লকে তাঁর বাড়ির সামনে শব্দবাজির তাণ্ডব চলছিল। রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের দুই অফিসার ঘটনাটি শোনামাত্র সেখানে পৌঁছে যান। তাঁরাই পুলিশকে ডেকে বেশ কয়েক জনকে গ্রেফতার করান। ওই দুই আধিকারিকের অন্যতম, রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের অবসরপ্রাপ্ত চিফ ল অফিসার বিশ্বজিৎ মুখোপাধ্যায় তাই শুধু পুলিশি নিষ্ক্রিয়তাকেই এখনকার প্রবল শব্দতাণ্ডবের জন্য দুষছেন না।

বিশ্বজিৎবাবুর বক্তব্য, রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদকেও নড়াচড়া করতে হবে, নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে হবে। তাঁর বক্তব্য, “২০১৩ সালের কালীপুজোর সন্ধ্যায় এক শারীরিক প্রতিবন্ধী যুবক শব্দবাজি ব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন বলে তাঁকে বেধড়ক মারধর করে তাঁর হুইল চেয়ারটি ভেঙে দেওয়া হয়। পর্ষদের কেউ তাঁর কাছে যাননি, তাঁর পাশে দাঁড়াননি।” পর্ষদের অবসরপ্রাপ্ত আধিকারিকের বক্তব্য, “কোনও ঘটনা হলে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ না-ই জানতে পারে। কিন্তু পার্থ ঘোষ ও গৌরী ঘোষের বাড়িতে যা হয়েছে, সেটা জানার পরেও পর্ষদের পক্ষ থেকে কেউ তাঁদের কাছে যাবেন না কেন?” বিশ্বজিৎ মুখোপাধ্যায় মনে করেন, পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা যে অনেক ক্ষেত্রেই রয়েছে, সেটা অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু পুলিশকে তার কর্তব্যের কথা কিন্তু পর্ষদই মনে করিয়ে দেবে, পর্ষদ এ ক্ষেত্রে অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে। পুলিশের সঙ্গে বছরভর নিয়মিত সমন্বয় বৈঠক করে যাওয়াটাও পর্ষদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে বলে মনে করেন বিশ্বজিৎবাবু।

শব্দদূষণ রুখতে একটা সময়ে হাইকোর্ট নিযুক্ত স্পেশ্যাল অফিসার ছিলেন আইনজীবী গীতানাথ গঙ্গোপাধ্যায়। লালবাতি লাগানো গাড়ি নিয়ে গীতানাথবাবুর ঘুরে বেড়ানো কিছুটা হলেও ভীতির

সঞ্চার করেছিল শব্দদূষণকারীদের মধ্যে, আবার অনেকের মধ্যে সচেতনতাও তৈরি করেছিল। সে সব এখন অতীত।

রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের চেয়ারম্যান কল্যাণ রুদ্র অবশ্য বলেন, ‘‘উৎসবের দিনগুলিতে সব সময়ে নজরদারি চলে। কোথাও কোনও অনিয়ম চোখে পড়লেই আমরা পুলিশকে ব্যবস্থা নিতে বলি। মামলা কিন্তু পুলিশকেই করতে হবে।” কল্যাণবাবুর দাবি, ‘‘বছরভরই আমাদের জন-অভিযোগ সেল খোলা থাকে। তাই, আলাদা করে কন্ট্রোল রুম সব সময়ে দরকার হয় না।’’

লালবাজারের এক শীর্ষ কর্তা বলেন, “আমরা অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নিই। তবে পুলিশকে বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন করা প্রয়োজন।”

ব্যারাকপুর কমিশনারেটের গোয়েন্দা প্রধান অজয় ঠাকুরও বলেন, “অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পার্থবাবুদের ঘটনার পরে থানাগুলোকে এই ব্যাপারে আরও সতর্ক হতে বলা হয়েছে।”

প্রশ্ন, সব কিছুই যদি ‘ঠিকঠাক’ চলে তবে পার্থ ঘোষ-গৌরী ঘোষদের আক্রান্ত হতে হয় কেন?