হাতির হানায় জেরবার গ্রামবাসীদের ক্ষোভ সামাল দেওয়ার পরে এ বার আবাদি মানুষের বিক্ষোভের মুখে পড়লেন বনকর্মীরা।

সুতির বেশ কয়েকটি গ্রামে গত সপ্তাহ খানেক ধরেই নিরন্তর আনাগোনা দলমার দলছুট তিন দাঁতালের। হাতি সম্পর্কে তেমন ওয়াকিবহাল না হওয়ায় গ্রামবাসীদের অতিউৎসাহে মাঝে মধ্যেই বিরক্ত হয়ে হস্তিকুল মৃদু-মন্দ ‘শাসনও’ করেছে তাঁদের। পাল্টা কোপে পড়ে অসহিষ্ণু গ্রামবাসীর, হাঁসুয়ার কোপে আহতও হয়েছে একটি হাতি।

কিন্তু দলমায় ফেরার ঠিকানা-হারা সেই হাতিটি পথ হারিয়ে কখনও জাতীয় সড়ক কখনও বা লোকালয়ের চৌহদ্দির মধ্যেই গোরাফেরা করছে।

বৃহস্পতিবার দুপুরে স্থানীয় সিমলা, অনুপপুর, খেরুর, শাওরাইল—তার অবাধ গতিবিধির কোনও ছেদ পড়েনি। তবে যেখানেই পা পড়েছে তার ক্ষুব্ধ হাতি-বিমুখ মানুষ জন বিশেষত আবাদি মানুষ ক্ষোভ দেখিয়েছেন এই বলে, জমিতে তাদের বোরো ধানের দফারফা হচ্ছে।

গত কয়েক দিন ধরেই হাতিটিকে দুমকা দিয়ে ঝাড়খণ্ডে পেরানোর চেষ্টা করছেন বনকমীর্রা। এ দিনও দিনভর তাঁরা হাতিটির সঙ্গেই ছিলেন। কিন্তু গ্রামবাসীদের বিক্ষোভের মুখে পড়ে শেষ পর্যন্ত তাঁরা ফিরে যান।

রঘুনাথগঞ্জের রেঞ্জার বাবুকুমার রবিদাস বলেন, ‘‘দলছুট হাতিটিতে জঙ্গলের পথে ফেরাতে গেলে মাঠ দিয়েই ফেরাতে হবে তাকে। গ্রামে ঢুকলে ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়বে। জীবনহানির আশঙ্কাও রয়েছে। সে কথা গ্রামের মানুষ বুঝলে তো, পুলিশের সাহায্যও পাচ্ছি না।’’

সাগরদিঘি ব্লকের উত্তর বহরমপুর রেঞ্জের লালবাগ অফিস থেকে এ দিন সকাল পর্যন্ত কোনও বনকর্মীর আসেননি। ফলে চাষিদের ক্ষোভ আরও বাড়তে থাকে । সন্ধ্যে নাগাদ হাতি সাগরদিঘির দেবগ্রাম হয়ে পুন্ডির মাঠে গিয়ে পৌঁছায় হাতিটি। কিন্তু কী ভাবে, কোথা দিয়ে দাঁতালকে বীরভুমে নিয়ে যাওয়া যাবে তা অনিশ্চিত।  বুধবার রাতে দাঁতাল হাতিটিকে রঘুনাথগঞ্জের উমরপুরে  ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক থেকে কৌশলে সরিয়ে ধরিয়ে দেওয়া হয় বীরভুমের  লোহাপুরের রাস্তাও। কিন্তু দাঁতালটি রাতভর সিমলা  গ্রাম হয়ে  অনুপপুর, খেরুরের  মাঠ পেরিয়ে পৌঁছে যায় সাগরদিঘির কড়াই এলাকায়। চাষিদের অভিযোগ, এই সময় মাঠের পর মাঠ বোরো ধান রয়েছে সাগরদিঘির বিস্তীর্ণ  এলাকায়। সেই ধানে শিষও ধরতে শুরু করেছে। জমির সেই  সব ধান মাড়িয়ে যাচ্ছে হাতি। তার পিছনে চলেছে কয়েকশো মানুষ। ফলে  নষ্ট হচ্ছে ধান। উত্তেজিত চাষিরা বৃহস্পতিবার  বেলা ১০টা নাগাদ মেঘা শিয়ারা গ্রামের কাছে ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক অবরোধও শুরু করেন। দাবি,  অবিলম্বে বন কর্মীদের ঘটনাস্থলে এসে হাতিকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

এরপর স্থানীয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপে  দুপুর নাগাদ  লালবাগ, রঘুনাথগঞ্জ  ও বীরভুমের প্রায় জনা ২৫ বনকর্মী সাগরদিঘিতে আসেন। বিক্ষুব্ধ  চাষিদের সামাল দিয়ে অবরোধ ওঠে  পুলিশের হস্তক্ষেপ। সিয়ারার মুরসালিম শেখ বলেন, ‘‘বোরো ধান হয়েছে। হাতি সেই ধান নষ্ট করছে। শয়ে শয়ে গ্রামবাসি নেমে পড়ছেন জমিতে। তাঁদের রোখা দায়।’’ কিন্তু তার দায় কি হাতির? মেঘা গ্রামের আব্দুল রহমান বলেন, ‘‘বুঝতে পারছি দোষ হাতির একার নয়, গ্রামবাসীদের অতিউৎসাহেও ধান নষ্ট হচ্ছে। কিন্তু বন দফতরই বা কী করছে?’’

কিন্তু বন দফতরের একটি সূত্র বলছে, পয়লা এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া নব্য আইনের গেরোয় বন দফতরের হাতে হাতি খেদানোর টাকা কোথায়? হুলা পার্টি জোগাড় করা, পটকা কেনা হাতি তাড়ানোর জন্য অবিরাম লোক নিয়োগের উপায় কোথায়?

গত সাত বছর ধরে দফতরে কর্মী নিয়োগ বন্ধ। বন দফতরে প্রায় সাড়ে তিন হাজার শূন্য পদ পড়ে রয়েছে।  সেই জায়গায় এত দিন দৈনিক ভাতায় কাজ করতেন অস্থায়ী শ্রমিকেরা। কিন্তু নগদ পয়সা দেওয়া কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই ঠিকা শ্রমিক জোগাড় করাও দুষ্কর হয়ে পড়েছে বন দফতরের পক্ষে।