এক পা এগোয় তো দু-পা পিছোয়। এই দোটানার অন্তে মঙ্গলবার রাতে তারা পাড়ি দিয়েছিল পশি রাজ্য ঝাড়খণ্ডের দিকে। কিন্তু বিধি বাম।

বুধবার আলো ফুটতেই  হুলাপার্টির তাড়া খেয়ে তারা ফের ঢুকে পড়ে মুর্শিদাবাদের সুতিতে।

সেখান থেকে সমশেরগঞ্জ হয়ে মালঞ্চার মাসনা নদী পেরিয়ে সিংপাড়া গ্রামের মধ্যে দিয়ে সন্ধ্যায় নাগাদ শেষতত ফিরতি পথ ধরে দাঁতালেরা। দেড় কিলোমিটার দূরে ঝাড়খণ্ডের পাকুড় জেলার ইলামি গ্রাম। রাতের মধ্যেই ঝাড়খণ্ডের সীমানায় দাঁতালদের ঢুকিয়ে দিয়ে হাঁফ ছাড়েন বনকতার্রা।

মঙ্গলবার রাতভর বীরভূমের জাজিগ্রাম হয়ে মুর্শিদাবাদের বহুতালি-কানুপুর সড়ক পেরিয়ে সুতির পথ ধরে আপন খেয়ালে সাহাজাদপুর, সোনাতলা হয়ে ২০ কিলোমিটার পথ উজিয়ে তারা ঘুরে বেড়াল গ্রাম থেকে গ্রামে। কখনও গ্রামবাসীর উঠোন মাড়িয়ে কখনও  পুকুরে ডুব দিয়ে বিকেলে  বাহাগলপুরে পৌঁছয় তারা।

 সেখানে জমির খেতে দাঁতাল হাতি নামছে দেখেই চিৎকার জুড়ে দেন গ্রামবাসী। জমির কাজ করছিলেন কসিমুদ্দিন শেখ। কিছু দূর দিয়ে হাতি যেতে দেখেই পিঠটান দেন তিনি। নিমেষে খবর ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের গ্রামে। মাইল খানেক দূরে লস্করপুর গ্রামেই থাকেন বন দফতরের কর্মী আব্দুল আজিজ। তিনিই সকাল ৬টা নাগাদ খবর দেন রঘুনাথগঞ্জের রেঞ্জার বাবুকুমার রবিদাসকে। এরপরই জনা আটেক কর্মী নিয়ে ধুলিয়ানের পুটিমারি সেতু দিয়ে হাঁসুপুরের কাছে পৌঁছন রেঞ্জার। দেখতে পান, তিনটি হাতিই ফিডার ক্যানালের পশ্চিমের জঙ্গল ধরে চলেছে ফরাক্কার দিকে। সেখানে তখন কয়েক হাজার মানুষের ভিড়।

মঙ্গলবার সন্ধ্যে লাগতেই রামপুরহাটের রেঞ্জারের নেতৃত্বে হুলাপার্টি মশাল জ্বালিয়ে মুর্শিদাবাদের রঘুনাথগঞ্জ থানার সাহেবনগর থেকে হাতিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। রামপুরহাটের রেঞ্জার জ্যোতিপ্রসাদ গুহরায় বলেন, ‘‘সেই পরিকল্পনা নিয়েই দক্ষিণ বরাবর হাতিদের নিয়ে এগোচ্ছিল হুলা পার্টি। বীরভূমের মিত্রপুরে পৌঁছে হাতিরা হঠাৎই উত্তর দিকে ঘুরে যায়। ফলে হুলাপার্টি বহু চেষ্টা করেও তাদের আর ফেরাতে পারেনি।’’ রঘুনাথগঞ্জের রেঞ্জার বাবুকুমার বলেন, ‘‘হাতিগুলি রাতে বীরভূমে ঢুকে পড়ার পরে রঘুনাথগঞ্জে ফিরে আসি। কিন্তু তারপর দাঁতালগুলি যে ফের সুতি হয়ে সামশেরগঞ্জে ঢুকে পড়েছে বুধবার বীরভূমের বন দফতর বা পুলিশের কোনও কর্তা সে খবর আমাদের জানাননি। তার ফলেই মুর্শিদাবাদে ঢুকে পড়লেও বুধবার ভোর পর্যন্ত হাতিগুলির সঙ্গে বন দফতরের কোনও কর্মী ছিল না।’’

বাহাগলপুরে ভাগীরথীর ফিডার ক্যানেলের পশ্চিম পাড়ের জঙ্গল ধরে হাতিরা বুধবার ক্রমশ এগিয়েছে হাঁসুপুর, মহব্বতপুর, পুটিমারি, মালঞ্চ হয়ে ফরাক্কার দিকে। দুপুর থেকে সন্দেহ দানা বাঁধতে থাকে এ বার ফরাক্কার মানুষও হস্তি দশর্ন করবেন?

মুর্শিদাবাদের সমসেরগঞ্জ পেরিয়ে রাজমহলের পথে দলছুট তিন হাতি।

এরপরেই তাড়া খেয়ে হাতিগুলি পুটিমারি সেতুর পাশ দিয়ে গ্রামের মধ্যেও ঢুকে পড়ে। বাড়ি ছেড়ে পালাতে শুরু করেন লোকজন। ফিডার ক্যানেলের পাড়েই বাড়ি শ্যামফুল বিবির। ঘরের সামনে হাতি দেখে তিন ছেলেমেয়েকে নিয়ে আতঙ্কে ঘর ছেড়ে পালাতে শুরু করেন তিনি। বাড়ির পাশ দিয়ে হাতিদের আসতে দেখে কিছুটা ভয় পেলেও অবশ্য বাড়ি ছেড়ে পালাননি কোহিনূর বিবি। তিনি বলেন, ‘‘বাড়ির সামনে ছিল কয়েক’টি কলাগাছ। তিনটি হাতি সেগুলো সাবার করে দিয়েছে। প্রায় ১০ মিনিট ছিল বাড়ির সামনে। জীবনে কখনও হাতিকে চোখের সামনে এ ভাবে দেখিনি।’’ হাতি ঢোকার খবর পেয়ে ছুটে আসেন সমশেরগঞ্জ থানার ওসি সম্রাট ফণি। সক্রিয় হয় পুলিশ। ফিডার ক্যানেলের পশ্চিম সড়কে হাতিগুলির যাত্রাপথ নিরাপদ রাখতে সামনে পিছনে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকা থেকে গ্রামবাসীকে সরিয়ে দেওয়া হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় যানবাহন। এরপর নির্বিঘ্নেই হাতিগুলি বিকেলের মধ্যেই মালঞ্চ পৌঁছয়। সেখানেই মাসনা নদীতে নেমে পড়ে দাঁতালেরা। নদী থেকে উঠেই ঢুকে পড়ে সিংপাড়া গ্রামে। সন্ধ্যে পেরিয়ে দাঁতালেরা পৌঁছয় ঝাড়খণ্ড-পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত গ্রাম বহরাগাছিতে। সেখান থেকে এক কিলোমিটার দূরে ঝাড়খণ্ডেরই গ্রাম ইলামী পৌঁছয় পৌনে সাতটা নাগাদ। রেঞ্জার বাবুকুমার রবিদাস বলেন, ‘‘আমাদের কাছে হাতি তাড়াবার কোনও ব্যবস্থা নেই। হুলাপার্টিও আসেনি। তাই হাতির পিছনে পিছনে যাওয়া ছাড়া কিছুই করার ছিল না আমাদের।’’

বহু চেষ্টা করেও এ দিন পাকুড়ের ডিভিশনাল বন আধিকারিক নরেন্দ্র বৈঠার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। তবে পাকুড়ের জেলাশাসক কৃষাণকুমার দাস অবশ্য বলেন, ‘‘দাঁতাল হাতি ঝাড়খণ্ডে ঢুকিয়ে দিলেই তো হল না। এখনও পর্যন্ত এ ব্যাপারে কিছুই জানানো হয়নি। তা ছাড়া পাকুড়ে জঙ্গল কোথায়? রাত দুপুরে লোকালয়ের মধ্যে দাঁতাল ঢুকে পড়লে বিপদের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না! তবু পাকুড়ের ডিএফওর সঙ্গে যোগাযোগ করে ব্যবস্থা নিতে বলছি।’’

এখন অপেক্ষা, আজ, বৃহস্পতিবার সকালে তারা আবার মুশির্দাবাদের ঠিকানায় ফিরে আসবে না তো?

ছবি: অর্কপ্রভ চট্টোপাধ্যায়।