একের পর এক হাতির হানার মানুষের মৃত্যু, ফসল ও বাড়িঘরের ক্ষয়ক্ষতি রুখতে ভারত নেপাল সীমান্ত বরাবর সৌর বিদ্যুত্‌ চালিত তারের বেড়া বসানোর প্রক্রিয়া শুরু করল নেপাল সরকার। সরকারি সূত্রের খবর, বিশ্বব্যাঙ্কের প্রায় ১ কোটি ৩০ লক্ষ টাকায় নেপালের ইলাম থেকে কাঁকরভিটা অবধি প্রায় ১৮ কিলোমিটার হাতির করিডরে লোহার তারের বেড়া বসানো হচ্ছে। গত মাস থেকেই ওই কাজ পুরোদমে শুরু হয়ে গিয়েছে। কয়েক বছর আগে হাতির করিডরের কিছু কিছু এলাকায় এক দফায় বিদ্যুত্‌ চালিত তারের বেড়া বসানো হয়েছিল। কিন্তু বিদ্যুতের সমস্যার জন্যই তা পুরোপুরি কার্যকরী হয়নি। এবার তাই সৌর বিদ্যুত্‌ চালিত বেড়া বেছে নেওয়া হয়েছে।

রবিবার সকালে ভারত-নেপাল সীমান্তের নকশালবাড়িতে কলকাতার নেপালের কনসুলেট জেনারল এবং অ্যাক্ট-হিমালয়ান অরেঞ্জ ট্যুরিজম কাউন্সিলের উদ্যোগে ইন্দো নেপাল ফ্রেন্ডশিপ মিট-২০১৫ হয়। নেপালের কনসুলেট জেনারেল, রাজ্যের উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী গৌতম দেব-সহ দুই দেশের সরকারি এবং বেসরকারি তরফে শিল্প বাণিজ্য, পর্যটন, বন, এসএসবি-র প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। মূলত, সরকারি স্তরে ইন্দো ভুটান ফ্রেন্ডশিপ অ্যাসোসিয়েশনের ধাঁচে নেপালেও একটি ফোরাম গড়ে তোলার লক্ষ্যেই এই মিট বলে উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন।

এদিন শিল্প বাণিজ্য, পর্যটন, সংস্কৃতি ছাড়াও সীমান্ত বরাবর হাতি-মানুষের সংঘাতের বিষয়টিও প্রাধান্য পায়। বিশেষ করে ভরা ফসলের মরসুমে দুই দেশে হাতির দলের হানা, হাতির উপর পাল্টা আক্রমণের ঘটনা উঠে আসে। সেখানেই নেপালের প্রতিনিধিরা জানান, ওই করিডর বরাবর সৌর বিদ্যুত্‌ চালিত তারের বেড়া বসিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা শুরু হচ্ছে। ভারতীয় বন দফতর এবং পশুপ্রেমী সংগঠনগুলির অফিসারেরা জানিয়ে দেন, বেড়া লাগিয়ে হাতির মতো প্রাণীকে কোনও সময়ই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এর জন্য দুই দেশের শক্তিশালী বন দফতরের এলিফ্যান্ট স্কোয়াড, নজর মিনার, ওয়ার্নিং সিস্টেম গড়ে তোলা দরকার। যা দিয়ে মৃত্যু বা ক্ষয় ক্ষতির পরিমাণ অনেকটাই কমিয়ে আনা যায়।

অনুষ্ঠানে কলকাতার অবস্থিত নেপালের কনসুলেট জেনারেল চন্দ্রকুমার ঘিমিরে বলেন, “দুই দেশের মধ্যে মৈত্রীর সম্পর্ক দীর্ঘ দিনের। বন্যপ্রাণী মানুষ সংঘাত-সহ সমস্ত ক্ষেত্রেই আমাদের আলোচনা করে ব্যবস্থা নিতে হবে। নেপালের সীমান্তে লোহার বেড়া দেওয়া হচ্ছে ঠিকই। আমাদের আশা, এই ধরনের আলোচনার মাধ্যমেই সমাধানের পথও সামনে আসবে।” আর উত্তরবঙ্গ উন্নয়মন্ত্রী মন্ত্রী জানান, সমস্ত সমস্যা মিটিয়ে আরও কীভাবে দুই দেশের মানুষের উন্নয়নের পথ প্রশস্ত করা যায়, তাই দেখা হচ্ছে। রাজ্য সরকার, বন দফতর হাতির সমস্যা নিয়ে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল।

সরকারি হিসাবে, ১৯৭১ সালের পর থেকে ভারত-নেপাল সীমান্ত জুড়ে হাতির সমস্যা বাড়তে শুরু করে। ওপারের বামনডাঙি এবং এপারের লোহাগড়, কলাবাড়ি, টুকরিয়াঝাড় জুড়ে মূলত মে মাস থেকে অক্টোবর, নভেম্বর (ভুট্টা ও ধানের লোভে) হাতির পালেরা ঘোরাঘুরি শুরু করে। অসম থেকে সংঙ্কোশ হয়ে মেচি, তোর্সা পার হয়ে হাতির পালের বিচরণ ক্ষেত্র। বন দফতরের কার্শিয়াং ডিভিশনের এটাই হাতির করিডর হিসাবে চিহ্নিত।

কিন্তু অনেক সময়ই হাতিকে ওপারে গুলি করা, বিষ খাওয়ানোর অভিযোগও ওঠে। যদিও নেপালের সরকারির প্রতিনিধিরা অভিযোগগুলি এদিন অস্বীকার করেছেন। গত কয়েক বছরে হাতির হামলায় নেপালের দিকেই অন্তত ৪০ জনের মৃত্যু, ১২ জন বিকলঙ্গ হওয়া ছাড়াও প্রচুর বাড়িঘর এবং শস্যের ক্ষতি হয়েছে। মারা গিয়েছে ১১টির মত হাতিও। তেমনিই এপারেও ৮৪ জনের মৃত্যু ছাড়াও ৮টি হাতির মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। কয়েকটি মৃত হাতির শরীরে গুলির চিহ্নও মিলেছে। অনুষ্ঠানে রাজ্যের বন দফতরের উত্তরবঙ্গের বনপাল (বন্যপ্রাণ) তাপস দাস বলেন, “হাতির কোনও দেশীয় পরিচয় হয় না। আমাদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো ছাড়া, নজর মিনার, ওয়ার্নিং সিস্টেম, গ্রামীণ স্কোয়াড গড়ার উপর জোর দিতে বলা হয়েছে।”

নেপালের বামনডাঙির সরকারি ভিলেজ ডেভলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান ঢুন্ডিরায় পোড়েল, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কর্তা অর্জুন কার্কি বলেন, “হাতির আক্রমণে আমরা দিনের পর দিন ক্ষতির মুখে পড়ছি। বেড়া দিয়ে তা কিছুটা আটকানো যেতে পারে। ভারতের তরফে যে প্রস্তাব সামনে এসেছে, সেগুলিও খতিয়ে দেখা হবে।” স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন অ্যাক্ট-হিমালয়ান ওরেঞ্জ ট্যুরিজম কাউন্সিলের সভাপতি রাজ বসু বলেন, “তারের বেড়া সীমানার রাখলেও তা যাতে চোরা কারবারীদের হাতে নষ্ট না হয়, যৌথ সমন্বয় বাড়িয়ে সেটাও দুই দেশকেই দেখতে হবে।”