চিনের শিনজিয়াং প্ৰদেশের ঘন নীল আকাশে মাঝে মাঝেই দেখা যায় উড়ে যাচ্ছে এক ঝাঁক পায়রা। বছর দুয়েক আগে যখন প্রথম ওই পায়রা দেখা যেত, অবাক বিস্ময়ে সারিবদ্ধ কপোতগুলির উড়ান দেখত ওই অঞ্চলে বসবাসকারী উইঘুর সম্প্রদায়ের মানুষেরা। ঠিক যেন শান্তির দূত। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই তারা বুঝতে পেরেছিল ওগুলো আসলে পাখি নয়— রোবট চরপক্ষী বা ড্রোন। চিন সরকার এদের নাম দিয়েছে ‘ডাভ’। এই ঝাঁক ঝাঁক ড্রোনের  কাজ আকাশ থেকে উইঘুরদের উপর নজরদারি করা।

স্বাধীনতাকামী সংখ্যালঘু উইঘুরেরা চিন কর্তৃপক্ষের চক্ষুশূল। দেশের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে শিনজিয়াং-এর এই জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বড়জোর লাখ দশেক। সংখ্যাগুরু হানদের থেকে একেবারে আলাদা এরা। তুর্কিজাত উইঘুরদের বসবাস মধ্য এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশে। ধর্মে মুসলমান এই জাতির ভাষা, রীতিনীতি, পোশাক ও লোকাচার স্বতন্ত্র। এদের স্বাতন্ত্র্য মেনেই গত শতাব্দীর মাঝামাঝি এই অঞ্চলকে স্বশাসনের অধিকার দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ষাটের দশক থেকে এদের সঙ্গে চিন সরকারের বিবাদ। ২০০৯ সালে শিনজিয়াং-এর রাজধানী উরুমচিতে বিচ্ছিন্নতাকামী উইঘুরদের এক প্রতিবাদ সভা দাঙ্গায় পর্যবসিত হয়। সংঘর্ষে শ’দুয়েক হান চিনাদের মৃত্যু হয়। ২০১৪ সালে চিনের মূল ভূখণ্ড কুনমিঙের রেল স্টেশনে সন্ত্রাসবাদী হানায় মারা যান বহু হান চিনা। দায়ী করা হয় উইঘুরদের।

নাশকতামূলক এই ঘটনাগুলোর পর থেকেই এই জনজাতির উপর দমননীতি ও কড়া নজরদারি শুরু করে সরকার। ইদানীং এই নজরদারিতে অত্যাধুনিক প্ৰযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। চিন সরকার ও সেই দেশের প্রযুক্তি সংস্থাগুলি এই প্রদেশকে এক বিশাল গবেষণাগারে পরিণত করেছে। সাদা পায়রারূপী ড্রোনগুলি এই প্রযুক্তির সাম্প্রতিক নিদর্শন। ড্রোনে যুক্ত উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ইনফ্রারেড ক্যামেরা রাতের অন্ধকারেও ভিডিয়ো, ছবি তুলতে সক্ষম। এ ছাড়া রয়েছে জিয়োগ্রাফিক্যাল পজিশনিং সিস্টেম বা জিপিএস, যা কৃত্রিম উপগ্রহের সাহায্যে যোগাযোগ স্থাপন করে জেনে নেয় কোনও ব্যক্তি বা বস্তুর অবস্থান। রয়েছে নিয়ন্ত্রিত উড়ানে সহায়ক ফ্লাইট কন্ট্রোল সিস্টেম ও ডানা ঝাপটানোর জন্য বিশেষ মোটর। ড্রোনগুলি ওড়ে নিঃশব্দে। বিমানসন্ধানী রেডারও পাখি ভেবে বোকা বনে যায়।

চিন সরকার প্রায় এক দশক ধরে উইঘুর, তিব্বতি ও অন্যান্য কিছু সংখ্যালঘু নাগরিকের উপর নজরদারির জন্য আরও অনেক রকম প্রযুক্তির উদ্ভাবন করেছে। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং ফ্রিডম হাউস এই সমস্ত প্রযুক্তির উপর দীর্ঘ অনুসন্ধান করে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য সংগ্রহ করেছে। এই তথ্যাবলি জানান দিচ্ছে, শিনজিয়াং-এর আকাশে-বাতাসে এখন অনুরণিত হচ্ছে জর্জ অরওয়েলের লেখা ‘নাইন্টিন এইট্টি ফোর’ উপন্যাসের সেই অমোঘ বাণী ‘‘বিগ ব্রাদার ইজ় ওয়াচিং ইউ’’। অর্থাৎ, একচ্ছত্রবাদী ও দমনমূলক শাসনতন্ত্রে ২৪ ঘণ্টা প্রতিটি নাগরিকের গতিবিধির উপরে নজর রাখা হচ্ছে। 

বিদ্রোহী উইঘুরদের চিহ্নিত করতে শুরু হয় শিনজিয়াং-এর আপামর জনতার ওপর নজরদারি। এই নজরদারি ব্যবস্থার মধ্যমণি ‘ইন্টিগ্রেটেড জয়েন্ট অপারেশনস প্ল্যাটফর্ম’ বা আইজপ। নানা সূত্র থেকে নাগরিকদের সম্বন্ধে তথ্য সংগ্রহ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ চালিত এই বৃহৎ সিস্টেমে পাঠানো হয়। তথ্যের প্রাথমিক সূত্র হল দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা সুরক্ষা চেকপোস্টের তথ্যদ্বার বা ‘ডেটা ডোর’। রাস্তাঘাটে, বাজারে, সিনেমা হলে, রেলস্টেশনে, বিমানবন্দরে লাগিয়ে রাখা এই বিশেষ দরজাগুলিতে নাগরিকদের মুখাবয়বের ত্রিমাত্রিক ছবি তোলার জন্য ‘ফেস রেকগনিশন’ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। এই দরজা পেরনোর সময় নাগরিকের উচ্চতা, আঙুলের ছাপ, চোখের মণির ছাপ ও সঙ্গে মোবাইল ফোনের ‘আইএমইআই’ নম্বরও নথিভুক্ত হয়ে যায় তার অজান্তে। ক্যামেরাগুলো নাগরিকদের গাড়ি বা মোটরসাইকেলের লাইসেন্স প্লেটের ছবি তুলে জেনে নেয় তাদের দৈনন্দিন গতিবিধি। চিনে এখন ১৭ কোটি এ রকম ক্যামেরা কাজ করছে। তথ্যদ্বার ছাড়াও আইজপে ব্যাঙ্ক, পোস্টঅফিস, হাসপাতাল, থানা ও বিচার বিভাগে নথিভুক্ত তথ্য জমা পড়ে। এ ছাড়াও আইজপকে তথ্য জোগায় ‘ওয়াইফাই স্নিফার’ বা এক ধরনের যান্ত্রিক কুকুর। এই প্রযুক্তি কে কোন ওয়েবসাইট বা সোশ্যাল মিডিয়া দেখছে, কাকে ই-মেল বা ইনস্ট্যান্ট মেসেজ পাঠানো হচ্ছে, কোন ই-কমার্স সাইটে কী কেনা হচ্ছে, তার সুলুকসন্ধান দেয়।
এই সমস্ত তথ্য এবং পায়রারূপী ড্রোনের সংগৃহীত ভিডিয়ো ও ছবি বিশ্লেষণ করে কর্তৃপক্ষ সন্দেহজনকদের এক তালিকা তৈরি করেছে। তাদের স্মার্টফোনে জিং ওয়াংউইশি বা ক্লিন নেট গার্ড নামের একটি বিশেষ ‘অ্যাপ’ ডাউনলোড করতে বাধ্য করা হচ্ছে। স্মার্টফোন ব্যবহারকারী কোন জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করে, কতখানি রান্নার গ্যাস বা বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ইত্যাদি নানা খুঁটিনাটি তথ্যের ইনপুট সংগ্রহ করছে এই অ্যাপ। নাগরিকদের যাবতীয় বায়োমেট্রিক তথ্য (ডিএনএ নমুনা, রক্তের গ্রুপ, আঙুলের ছাপ, গলার স্বর, মুখ ও চোখের মণির ছবি) ও নানা ব্যক্তিগত খুঁটিনাটি জেনে যাচ্ছে চিন সরকার।

এ সমস্ত তথ্যের ভিত্তিতেই নাগরিকদের সামাজিক পরিচিতি এবং সোশ্যাল ক্রেডিট সিস্টেম তৈরি করা হয়েছে। এই পদ্ধতিতে নাগরিকেরা এক-একটি নম্বর, যা বলে দিচ্ছে কেউ সরকারের চোখে নিয়মনিষ্ঠ নাগরিক না অপরাধপ্রবণ বা দেশদ্রোহী কি না। আইজপ এখনও পর্যন্ত ৩৬ ধরনের সন্দেহজনক নাগরিককে চিহ্নিত করেছে। এঁদের মধ্যে রয়েছেন, যাঁরা বাড়ির পিছনের দরজা দিয়ে যাতায়াত করেন, ঘন ঘন মসজিদে যান, প্রতিটি ধর্মীয় জমায়েতে যোগদান করেন ইত্যাদি। স্মার্টফোন বা মোবাইল ফোনের সিম কার্ড না থাকলেও সেই ব্যক্তি সন্দেহের তালিকায়। ফোন, সিম কার্ড বা এসডি কার্ড লুকিয়ে রাখলে ইলেকট্রনিক স্নিফার যন্ত্র সেই সমস্ত কার্ড ও ফোনের তথ্য উদ্ধার করে ফেলে। যাঁদের অত্যন্ত বিপজ্জনক মনে করা হয়, তাঁদের প্রথমে পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয়, চলে জিজ্ঞাসাবাদ, শেষে পাঠানো হয় দেশের নানা প্রান্তে বিশেষ ধরনের সংশোধনাগার বা ইন্টার্নমেন্ট ক্যাম্পে। যাঁরা এত কিছুর পরও জব্দ হন না, তাঁদের কখনওই আর খুঁজে পাওয়া যায় না।
 ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ত্বের অধ্যাপক ড্যারেন বাইলার চিনে গণ নজরদারির ক্ষেত্র সমীক্ষা করতে গোপনে বহু বার চিনে গিয়েছেন। ‘দ্য এশিয়া-প্যাসিফিক’ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে তিনি দেখিয়েছেন কী ভাবে শিনজিয়াং প্রদেশের উইঘুরেরা খোলা আকাশের নীচে নজরবন্দি। নজরে রয়েছেন অন্য নাগরিকেরাও।

ইতিমধ্যে ১৮টি দেশে চিন এই প্ৰযুক্তি রফতানি করেছে, যার মধ্যে অন্যতম ইকুয়েডর, বলিভিয়া, ব্রাজিল, আর্জেন্তিনা, ভেনেজুয়েলা, জিম্বাবোয়ে ও অ্যাঙ্গোলা। আইজপের ধাঁচে ইতিমধ্যেই ইকুয়েডর গড়ে তুলেছে ইকু-৯১১। পরিবর্তে চিন পাচ্ছে প্রভূত পরিমাণ অশোধিত পেট্রোলিয়াম। স্বেচ্ছাসেবী মার্কিন মানবাধিকার সংস্থা ফ্রিডম হাউসের দাবি, চিন তাদের প্রযুক্তিভিত্তিক স্বৈরতন্ত্রের মডেল সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিতে চাইছে। বিশ্ব জুড়েই নজরদারি প্রযুক্তি এক নয়া সাম্রাজ্যবাদের অস্ত্রে পরিণত হচ্ছে।

এমন দিন আসবে যখন পৃথিবীর নানা প্রান্তে শিশুরা নীল আকাশে সাদা পায়রার ঝাঁক দেখলে আতঙ্কে মুখে ঢাকা দেবে। লুকিয়ে পড়বে। সরকারি নজরদারি এড়াতে এখন যা করতে শিখেছে উইঘুর শিশুরা। দূরদর্শী লেখক অরওলের ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে ফলে যাবে প্রতিটি দেশেই।