হ্যাঁ, এমনটাই ছিল পৃথিবীর মানবসভ্যতা। এত দূর পর্যন্ত এগতে পেরেছিল সেই সভ্যতার জ্ঞানগম্যি। বিদ্যেবুদ্ধি। পাণ্ডিত্য-প্রযুক্তি। এর বেশি আর মেধা বা প্রযুক্তির বিকাশ ঘটাতে পারেনি পৃথিবীর মানবসভ্যতা। লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি বছর পর যখন পৃথিবী থেকে অবলুপ্ত হয়ে যাবে মানবসভ্যতা, তখনও সেই সভ্যতার ‘পদচিহ্ন’ থেকে যাবে চাঁদে। আমাদের এক ও একমাত্র উপগ্রহে। যাতে ১০০ কোটি বছর পরেও ব্রহ্মাণ্ডের কোনও না কোনও প্রান্ত থেকে এসে পড়ে পৃথিবী নামে এই সৌরমণ্ডলের একটি গ্রহের সবচেয়ে উন্নত সভ্যতা কেমন ছিল, তা জানতে পারবেন ভিনগ্রহী বা সুপার হিউম্যানরা।

ভিনগ্রহীদের জন্য মানবসভ্যতার সেই ‘স্মৃতিচিহ্ন’ নিয়ে চাঁদের উদ্দেশে রওনা হয়েছে একটি ইজরায়েলি মহাকাশযান। ‘বেরিশিট’। যাতে রয়েছে একটি ল্যান্ডার ও একটি রোভার। গত ২১ ফেব্রুয়ারি। যা মাসছয়েকের মধ্যেই পা রাখবে চাঁদে। সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে মানবসভ্যতার স্মৃতিচিহ্ন একটি লাইব্রেরি। যার নাম দেওয়া হয়েছে, ‘লুনার লাইব্রেরি’। যেখানে থাকবে মানবসভ্যতার প্রায় সবক’টি এগিয়ে থাকা ভাষায় প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য বই ও বিজ্ঞান-ইতিহাস-ভূগোল-রাজনীতি সংক্রান্ত হরেক নথিপত্র। মোট তিন কোটি পাতার। মানবসভ্যতার যাবতীয় জ্ঞানগম্যি, বিদ্যেবুদ্ধি, শক্তি প্রদর্শন আর বিভিন্ন সাম্রাজ্যের জন্ম, বিস্তার ও অবসানের সব ইতিহাসটুকুই ধরা থাকবে ওই তিন কোটি পাতায়। থাকবে গানও। স্বরে, লিপিতেও।

সেই লুনার লাইব্রেরির সামনের অংশ

সেই লুনার লাইব্রেরির চেহারাটা হবে একটি হাতে হাতে ঘোরা ডিভিডি-র মতো। পুরোটাই হবে ধাতব। ওই লাইব্রেরিটি যারা বানিয়েছে, লস এঞ্জেলসের সেই অলাভজনক সংস্থা ‘আর্ক মিশন ফাউন্ডেশন’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা নোভা স্পিভাক জানিয়েছেন, চাঁদের মাটিতে যাবতীয় সৌর ও মহাজাগতিক বিকিরণের ঝাপটা সয়েও ওই লুনার লাইব্রেরি যাতে অন্তত ৬০০ কোটি বছর টিঁকে থাকতে পারে, সেই ভাবেই তা বানানো হয়েছে।

আরও পড়ুন- এ বার মানুষের থাকার ব্যবস্থা করতে চাঁদে যাচ্ছে আমেরিকা, জানাল নাসা​

আরও পড়ুন- ফসল চাঁদের মাটিতে? রহস্যের জট খোলেনি, বলছেন নাসার বিজ্ঞানী​

এও জানিয়েছেন, লুনার লাইব্রেরিতে থাকবে খুব ছোট্ট একটি ‘টাইম ক্যাপস্যুল’ও। তাতে থাকবে ইজরায়েলের ইতিহাস, সংস্কৃতি। ইজরায়েলি শিশুদের আঁকা ও লেখাজোকা। বাকিটা পুরোপুরি এনসাইক্লোপিডিয়া। সেখানে ২০০ গিগাবাইটেরও বেশি এমন সব তথ্য থাকবে যা আদতে উইকিপিডিয়ার ইংরেজি সংস্করণ। থাকবে হাজার হাজার ফিকশন ও নন-ফিকশন বই। পৃথিবীর এগিয়ে থাকা বিভিন্ন ভাষার। থাকবে নামজাদা কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলির পাঠ্যপুস্তকের সংগ্রহ। পৃথিবীর অন্তত ৫ হাজারটি ভাষা কী ভাবে পড়তে হয়, দেওয়া থাকবে তার গাইডলাইনও। থাকবে সেই ভাষাগুলির মধ্যে কম করে দেড়শো কোটি অনুবাদ। সেগুলি ধরা থাকবে লুনার লাইব্রেরির মধ্যে নিকেল দিয়ে বানানো ২৫টি চাকতিতে। যে চাকতিগুলি অসম্ভব রকমের পাতলা। ৪০ মাইক্রন পুরু। যার মানে, এক ইঞ্চির ৬০০ ভাগের মাত্র এক ভাগ।

লুনার লাইব্রেরি নিয়ে ফ্যালকন-৯ রকেটের পিঠে চেপে ‘বেরিশিট’-এর পাড়ি চাঁদের উদ্দেশে। ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ 

স্পিভাক জানিয়েছেন, পৃথিবীর মানবসভ্যতা সম্পর্কে নির্ভুল ভাবে খবর পাওয়ার জন্য চাঁদে আগামী দিনের ভিনগ্রহী পর্যটকদের হাতে তুলে দেওয়া হবে আরও কয়েকটি ‘হাতিয়ার’। কারণ, আমাদের ব্যবহার করা ডিভিডি থাকবে না সেই সুপার হিউম্যান বা ভিনগ্রহীদের হাতে। পৃথিবীতে এখন যত রকমের ভাষায় আমরা কথা বলি, তার কোনওটাই তারা বুঝতে পারবে না। তাই লুনার লাইব্রেরির এই নিকেলে বাঁধানো ডিস্কের উপরিতলে থাকবে মানবসভ্যতার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ বই ও নথিপত্রের ছবি। সেখানে দেওয়া থাকবে মানবসভ্যতার ভাষাগুলি পড়ার সব রকমের কোড। বোঝানো থাকবে কী ভাবে সেই কোডগুলিকে ‘ডি-কোড’ করা যায়। কী ভাবে পড়া যায় লুনার লাইব্রেরির ভিতরে থাকা তিন কোটি পাতার মর্মবস্তু। অণুবীক্ষণের নীচে রাখলে লুনার লাইব্রেরির ডিস্কের সেই উপরিতলকে অন্তত ১০০ গুণ বাড়িয়ে নেওয়া যাবে। যাবতীয় বিকিরণের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য গোটা ব্যবস্থাটাই থাকবে বিশেষ এক ধরনের ‘চাদরে’ মোড়া।

ছবি সৌজন্যে: নাসা