মাটি কাঁপিয়ে মহাকাশে রকেটযাত্রা ভারতে নতুন কিছু নয়। কিন্তু আকাশ থেকে রকেট যদি সাগরের বুকে নেমে আসে?

দুর্ঘটনা নয়। বরং পরিকল্পনা করেই এমন কাণ্ড ঘটাতে চাইছেন ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (ইসরো)-র ইঞ্জিনিয়ারেরা। উদ্দেশ্য একটাই— আকাশ থেকে ফেরত আসা সেই মহাকাশযানকে আবারও আকাশে পাঠানো।

কম খরচে মঙ্গলের কক্ষপথে যান পাঠিয়ে আমেরিকার নাসা-কে আগেই টেক্কা দিয়েছে ইসরো। এ বার খরচ কমানোর দিকে আরও এক ধাপ এগোতে চাইছে তারা। সেই লক্ষ্যেই পুনর্ব্যবহারযোগ্য মহাকাশযান তৈরি করা হচ্ছে। ইসরো সূত্রের খবর, সেই ধরনের মহাকাশযান বানানোর কাজ প্রায় শেষ। নাম দেওয়া হয়েছে ‘রিইউজেবল লঞ্চ ভেহিকল-টেস্ট
ডেমনস্ট্রেটর’ (আরএলভি-টিডি)। দেখতে অনেকটা
নাসার মহাকাশযানের মতোই। এ মাসের শেষে অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীহরিকোটার সতীশ ধবন মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র
থেকে যন্ত্রটির পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ
করা হবে। ইসরোর দাবি, তা সফল হলে মহাকাশযান উৎক্ষেপণে প্রতি কিলোগ্রামপিছু অন্তত ২ হাজার ডলার বেঁচে যাবে। আমেরিকা, রাশিয়া অবশ্য এর আগেই এই ধরনের পুনর্ব্যবহারযোগ্য মহাকাশযান তৈরি করেছে। পরীক্ষামূলক ভাবে উৎক্ষেপণ করেছে জাপান, ফ্রান্সও। সে হিসেবে, ইসরোর সৌজন্যে ভারত এ বার তালিকায় পঞ্চম সদস্য হিসেবে ঢুকে পড়তে চলেছে।

সস্তায় মঙ্গল অভিযানের পিছনে ভারতীয় ইঞ্জিনিয়ারদের ‘জোড়াতালি ইঞ্জিনিয়ারিং’ (হিন্দি বলয়ের চলতি ভাষায়, জুগাড়)-কেই কৃতিত্ব দিয়েছিল বিশ্ব। এ বারও সেই ‘জুগা়ড়কেই’ কৃতিত্ব দিচ্ছেন ইসরোর একাংশ। তাঁরা বলছেন, বিমানের মতো দু’টি ডানাওয়ালা এবং আকারে-ওজনে একটি বড় মাপের চারচাকার গাড়ির মতো দেখতে এই যানের পুরোটাই এ দেশে তৈরি। এক মুখপাত্র বলেন, ‘‘এটি শুধু পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণের জন্য। বাস্তবে এর থেকে কয়েক গুণ বড় মাপের যান তৈরি করা হবে।’’

কী ভাবে কাজ করবে এই যান? স্পেশ্যাল রকেট বুস্টার দিয়ে প্রথমে মহাকাশযানটিকে আকাশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। ৭০ হাজার মিটার উপরে গিয়ে ফের পৃথিবীর দিকে ফিরতে শুরু করবে ‘আরএলভি-টিডি’। শব্দের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি গতিতে ভেসে এসে শ্রীহরিকোটা উপকূল থেকে ৫০০ কিলোমিটার দূরে নামবে সেটি। নেমে আসার প্রতি মুহূর্তে তার উপরে নজরদারি চালাবে ইসরো। ঠিক মতো নামলেও শেষ পর্যন্ত হয়তো আরএলভি ভেসে থাকতে পারবে না। কিন্তু তা নিয়ে এখনই ভাবছে না ইসরো। সংস্থার এক মুখপাত্রের কথায় ‘‘আরএলভি ভেসে থাকবে কি না, সেটা এই পরীক্ষার মূল বিষয়ও নয়। সে আকাশ থেকে ঠিক মতো নেমে আসছে কি না, সেটাই দেখার।’’

কিন্তু আকাশ এই নেমে আসাটা বেশ ঝুঁকির। ২০০৩ সালে পৃথিবীতে ফেরার সময় আগুন লাগে কলম্বিয়া মহাকাশযানে। পুড়ে ছাই হয়ে যান ভারতীয় বংশোদ্ভূত মহাকাশচারী কল্পনা চাওলা। তাই কয়েক হাজার সেলসিয়াস তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে, এমন ভাবেই তৈরি করা হয়েছে আরএলভি-কে। বসানো হয়েছে সিলিকার বিশেষ আবরণও।

ইসরো জানাচ্ছে, মঙ্গল অভিযান সফল হওয়ায় কদর বেড়েছে ইসরোর বাণিজ্যিক শাখা ‘অ্যানট্রিক্স’-এরও। অনেক দেশই এখন উৎক্ষেপণের ভার ভারতকে দিচ্ছে। ‘মঙ্গলযান-২’, ‘চন্দ্রযান-২’ অভিযানের প্রস্তুতি চলছে। নতুন যন্ত্র বসানোর জন্য পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে সৌর অভিযান ‘আদিত্য’-র উৎক্ষেপণের নির্ঘণ্টও। এই পরিস্থিতিতে নয়া মহাকাশযান ব্যবহার করে আর কোনও চমক দেবে কি ইসরো?

ইসরোর জনসংযোগ অধিকর্তা দেবীপ্রসাদ কার্নিক শুধু, ‘‘বড় লাফ দেওয়ার আগে এটা একটু গা-ঘামিয়ে নেওয়া আর কী!’’