পয়লা নম্বর স্টপেজটা পেয়ে গেলাম আমরা! হাতের নাগালেই!

ভিন গ্রহে প্রাণ খোঁজার মহাকাশযাত্রায় ‘নাম্বার ওয়ান স্টপেজ’ হতে চলেছে প্রক্সিমা সেনটাওরি-বি। সদ্য আবিষ্কৃত এই ভিন গ্রহটিকে নিয়ে বড় আশায় বুক বাঁধছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁদের জোরালো বিশ্বাস, প্রাণের হদিশ মেলার সম্ভাবনা যথেষ্টই আমাদের ঠিক ‘পাশের বাড়ির প্রতিবেশী’ আলফা সেনটাওরি সৌরজগতের এই পাথুরে গ্রহের। অনেকটাই আমাদের পৃথিবীর মতো এই ভিন গ্রহটি। তার সৌরমণ্ডলে যাকে ঘিরে পাক মারছে প্রক্সিমা সেনটাওরি-বি গ্রহটি, সেই তারা বা নক্ষত্র প্রক্সিমা সেনটাওরির বেশ কাছেই রয়েছে এই ভিন গ্রহ। তবে এতটা কাছে থাকলেও, যাকে ঘিরে এই ভিন গ্রহের প্রদক্ষিণ, সেই নক্ষত্র প্রক্সিমা সেনটাওরি আমাদের সূর্যের মতো অতটা গনগনে আঁচে ফুটছে না। বরং সেই ‘সূর্য’টা অনেকটাই যেন নিভু নিভু আঁচের উনুন। আমাদের সূর্যের মতো সেই ‘উনুনে’র চেহারাটাও নয় খুব বড় মাপের। অনেকটাই বামন সে চেহারায়। অনেকটাই শান্তশিষ্ট নক্ষত্র প্রক্সিমা সেনটাওরি। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলে ‘রেড ডোয়ার্ফ স্টার’ বা লাল বামন নক্ষত্র। ফলে, তার চার পাশে পাক মারতে গিয়ে সদ্য আবিষ্কৃত ভিন গ্রহটির গা জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। জল থাকলে তা প্রচণ্ড তাপে উড়ে যাওয়ার শঙ্কাটাও কম নয়া গ্রহ প্রক্সিমা সেনটাোরি-বি-তে। জল যেহেতু জীবনের অন্য নাম, তাই সে ক্ষেত্রে এই ব্রহ্মাণ্ডের অন্য কোথাও প্রাণ খোঁজার যাত্রাপথে আমাদের পয়লা নম্বর স্টপেজটা হতে চলেছে প্রক্সিমা সেনটাওরি-বি। আর মহাকাশের এ মুলুকে সে মুলুকে প্রাণ খুঁজতে ছোটার সফরে প্রথমেই এই ভিন গ্রহে থামতে হবে একটাই কারণে। তা হল, ভিন গ্রহ প্রক্সিমা সেনটাওরি-বি রয়েছে আমাদের সবচেয়ে কাছে। লক্ষ-কোটি নয়, আমাদের সৌরমণ্ডল থেকে মাত্র ৪.২৪ আলোকবর্ষ দূরে। যার মানে, সর্বাধুনিক মহাকাশযানের গতিবেগ যা, তাতে আজ যাত্রা শুরু করলে তা প্রক্সিমা সেনটাওরি-বি ভিন গ্রহে পৌঁছবে ৭০ হাজার বছর পর। তবে আগামী দিনে মহাকাশযান চলবে লেজার রশ্মির তেজে। ফলে তা হয়ে যাবে অনেক দ্রুত গতির। তাই হাতে-কলমে প্রাণ খোঁজার অভিযান শুরু করতে প্রক্সিমা সেনটাওরি-বি গ্রহে পৌঁছনোটাই হবে সহজতম কাজ।


তার নক্ষত্রের সামনে সেই ‘প্রক্সিমা সেনটাওরি-বি’।

মুম্বইয়ের টাটা ইনস্টিটউট ফর ফান্ডামেন্টাল রিসার্চের জ্যোতির্বিজ্ঞানের অধ্যাপক দেবেন্দ্র ওঝা বলছেন, ‘‘আমাদের সৌরমণ্ডলের বাইরে প্রথম ভিন গ্রহের আবিষ্কার হয়েছিল আজ থেকে ২০ বছর আগে। ’৯৬ সালে। তার পর কেপলার স্পেস টেলিস্কোপ প্রায় সাড়ে তিন হাজার ভিন গ্রহের হদিশ পেয়েছে। কিন্তু কোনও সৌরমণ্ডলে কোনও নক্ষত্রের ‘হ্যাবিটেবল জোন’ (জ্যোতির্বিজ্ঞানের পরিভাষায় যাকে বলে ‘গোল্ডিলক্‌স জোন’)-এ থাকা কোনও ভিন গ্রহের হদিশ মিলল এই প্রথম যা আমাদের সৌরমণ্ডলের এত কাছে রয়েছে। তাই প্রক্সিমা সেনটাওরি-বি আমাদের সবচেয়ে কাছে থাকা কোনও ভিন গ্রহ।


কোথায় নতুন গ্রহ? কোনটা গোল্ডিলক্‌স বা হ্যাবিটেব্‌ল জোন?

আমাদের পাশের সৌরমণ্ডল আলফা সেনটাওরিতে আরও একটি গ্রহ রয়েছে আমাদের খুব কাছে। কিন্তু সেটি যে নক্ষত্রকে পাক মারে, তার গনগনে তাপে সেই গ্রহের গা জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে যায়। ফলে, সেই গ্রহটির পক্ষে হ্যাবিটেব্‌ল জোনে থাকা সম্ভব নয়। কিন্তু প্রক্সিমা সেনটাওরির সেই অসুবিধা নেই। যদিও সূর্য থেকে বুধ গ্রহ যতটা দূরে রয়েছে, প্রক্সিমা সেনটাওরি-বি গ্রহটি তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি কাছে রয়েছে তার নক্ষত্র প্রক্সিমা সেনটাওরির। সে ক্ষেত্রে তার গা-ও জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে যাওয়ার কথা ওই প্রক্সিমা সেনটাওরি নক্ষত্রের তাপে। কিন্তু সদ্য আবিষ্কৃত ভিন গ্রহ প্রক্সিমা সেনটাওরি-বি অতটা হতভাগ্য নয়। সে যে নক্ষত্রটিকে পাক মারে, সেই প্রক্সিমা সেনটাওরি আদতে একটি লাল বামন নক্ষত্র বা রেড ডোয়ার্ফ স্টার। মানে, সেই নক্ষত্রের ‘উনুন’টা ছোট। তাই তাকে ‘বামন’ বলা হয়। আর সেই নক্ষত্রের তেজটাও (জ্বালানির পরিমাণ) আমাদের সূর্যের চেয়ে অনেকটাই কম। তাই তার রং লাল। ‘উনুনে’র আঁচটা কম বলে রেড ডোয়ার্ফ স্টার (প্রক্সিমা সেনটাওরি) তাকে ঘিরে পাক মারা ভিন গ্রহ প্রক্সিমা সেনটাওরি-বি’র গা তেমন ভাবে পোড়াতে পারে না। তাই সেই নক্ষত্রের কাছে থেকেও ওই ভিন গ্রহের তাপমাত্রা অনেকটা পৃথিবীর মতো বাসযোগ্য হতে পারে। অন্তত তেমন একটা সম্ভাবনা তো রয়েছেই।’’


আমাদের সূর্যের সাপেক্ষে আলফা সেনটাওরি সৌরমণ্ডলের কুশীলবরা রয়েছে কে কোথায়

তবে এই সব শর্তগুলি নতুন ভিন গ্রহে জলের তরল অবস্থায় থাকার ব্যাপারটা হয়তো সুনিশ্চিত করে ঠিকই, কিন্তু শুধুই জল থাকলে সেখানে প্রাণ পাওয়া যাবে, এটাও ঠিক নয়। প্রাণ সৃষ্টি বা তার বিকাশের জন্য আরও কিছু শর্ত পূরণের প্রয়োজন হয়।

সেগুলো কী কী?

আমেরিকার মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাস্ট্রোনমি ও অ্যাস্ট্রোফিজিক্স বিভাগের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর, জ্যোতির্বিজ্ঞানী জ্যোতির্ময় বসু মল্লিকের কথায়, ‘‘কোনও গ্রহে প্রাণ সৃষ্টির জন্য বায়ুমণ্ডল থাকাটা খুব জরুরি। প্রক্সিমা সেনটাওরি-বি গ্রহে বায়ুমণ্ডল রয়েছে কি না বা তা কোনও কালে ছিল কি না সেখানে, সে ব্যাপারে এখনও কোনও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। তা ছাড়াও চাঁদের একটা পিঠই যেমন পৃথিবীর সামনে থাকে সব সময়, অন্য পিঠটি কোনও দিনই পৃথিবীর মুখ দেখতে পারে না, তেমনই ভিন গ্রহ প্রক্সিমা সেনটাওরি-বি’রও একটা পিঠ সব সময়েই থাকে তার নক্ষত্র প্রক্সিমা সেনটাওরির সামনে। অন্য দিকটিতে নক্ষত্রের আলো বা তাপ সে ক্ষেত্রে পৌঁছতেই পারে না, কস্মিন কালে। তার ফলে, ওই ভিন গ্রহের যে দিকটা তার নক্ষত্রের সামনে রয়েছে, তার ওপর অনবরত এসে আছড়ে পড়ে সৌরঝড়, মহাজাগতিক রশ্মি, নানা রকমের বিকিরণ। তা প্রাণ সৃষ্টির পথে বাধা গড়ে তোলে। তার পরেও যদি প্রাণের জন্ম কোনও কালে হয়েও থাকে বা তার সম্ভাবনা থাকে, তা হলেও সেই প্রাণের বিকাশ কিছুতেই সম্ভব হতে পারে না ওই ভয়াবহ সৌরঝড় আর আছড়ে পড়া মহাজাগতিক রশ্মি ও হরেক রকমের বিকিরণের দৌলতে।’’

নয়া ভিন গ্রহ প্রক্সিমা সেনটাওরি-বি’র অআকখ: দেখুন ভিডিও

সেই সৌরঝড় ও মহাজাগতিক রশ্মির অনবরত ঝাপটা তো সইতে হয় আমাদের এই বাসযোগ্য গ্রহটিকেও। তা হলে কী ভাবে প্রাণ সৃষ্টি ও তার বিকাশ সম্ভব হল পৃথিবীতে?

বেঙ্গালুরুর রমন রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (আরআরআই) অধ্যাপক বিমান নাথের কথায়, ‘‘পৃথিবীর দুই মেরুতে আছড়ে পড়ে সৌরঝড় ও নানা রকমের মহাজাগতিক রশ্মি। কিন্তু পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র খুব শক্তিশালী হওয়ায় তা ওই ‘বিষাক্ত’ কণাগুলিকে পৃথিবীর মর্মে বিঁধতে দেয় না। মহাকাশে ছিটকে, ছড়িয়ে দেয়। তার ফলেই পৃথিবী বাসযোগ্য হয়ে উঠতে পেরেছিল।’’

এই সুবিধাটা কতটা রয়েছে আমাদের পাশের সৌরমণ্ডলে সদ্য আবিষ্কৃত ভিন গ্রহে, সে ব্যাপারে এখনও কার্যত, অন্ধকারেই রয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।

দেবেন্দ্র বলছেন, ‘‘সেই চৌম্বক ক্ষেত্র যদি না থাকে বা তা যদি ততটা জোরালো না হয়, তা হলে প্রাণ সৃষ্টি হলেও বা তার সম্ভাবনা থাকলেও তা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যায় প্রক্সিমা সেনটাওরি-বি ভিন গ্রহে। তবে কেপলার স্পেস টেলিস্কোপের তথ্য যা জানাচ্ছে, তাতে আমাদের থেকে ১০ আলোকবর্ষ দূরত্বের মধ্যে প্রক্সিমার মতো হ্যাবিটেব্‌ল জোনে থাকা অন্তত একটা ভিন গ্রহের হদিশ মিলতেই পারে কোনও না কোনও সৌরমণ্ডলে। সেই যুক্তিতেও, প্রক্সিমা সেনটাওরি-বি’তে প্রাণের সম্ভাবনার আশাটা জোরালো হতে পারে।’’

আমাদের এই বাসযোগ্য গ্রহটির সঙ্গে আর কী কী নৈকট্য বা সামঞ্জস্য খুঁজে পেযেছেন বিজ্ঞানীরা?

গবেষকরা জানাচ্ছেন, আমাদের সৌরমণ্ডলে তিনটি গ্রহ রয়েছে হ্যাবিটেব্‌ল জোনে। শুক্র, পৃথিবী আর মঙ্গল গ্রহ। তার মধ্যে শুক্র রয়েছে হ্যাবিটেব্‌ল জোনের অনেকটাই ভেতরের দিকে। আর মঙ্গল রয়েছে ওই জোনের বাইরের দিকে। পৃথিবীটাই রয়েছে হ্যাবিটেব্‌ল জোনের একেবারে সঠিক জায়গায়। নতুন ভিন গ্রহটিও রয়েছে তার নক্ষত্রের হ্যাবিটেব্‌ল জোনে। ভরের দিক দিয়েও নতুন ভিন গ্রহটি পৃথিবীর প্রায় কাছাকাছি।

এর পরেও একটা অনিবার্য প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। সেটা হল, পৃথিবীর এত কাছে থাকা সত্ত্বেও কেন প্রক্সিমা সেনটাওরি-বি’র মতো গ্রহের আবিষ্কার করতে লেগে গেল এতটা সময়?

জ্যোতির্ময়ের ব্যাখ্যা, ‘‘কোনও নতুন নক্ষত্রের হদিশ পাওয়া যতটা সহজ, ততটা সহজে অন্য সৌরমণ্ডলে ভিন গ্রহ খুঁজে পাওয়া যায় না। তার কারণ, নক্ষত্র আলো দেয়। গ্রহের কোনও নিজস্ব আলো নেই। তা নক্ষত্রের আলোয় আলোকিত হয়। যার জন্য প্রায় দেড় লক্ষ নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে এখনও পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন হাজার ভিন গ্রহ খুঁজে পেয়েছে কেপলার স্পেস টেলিস্কোপ। তাকে অপেক্ষা করতে হয় ও হয়েছে কখন পাক মারতে মারতে কোনও ভিন গ্রহ তার নক্ষত্রের সামনে এসে দাঁড়াবে। তার আলোয় আলোকিত হবে। এটাকেই বলে ‘ট্রানজিট’। যার সুযোগটা আসে মাত্রই এক শতাংশ। কিন্তু নতুন ভিন গ্রহটির একটি পিঠই শুধু তার নক্ষত্রের সামনে থাকে। অন্তত আমরা তেমনটাই দেখতে পাই। কিন্তু আমরা যে তলে দেখি (লাইন অফ ভিশন) যদি শুধু সেই তলেই না থেকে কোনও ভিন গ্রহ আরও অনেক তলে তার নক্ষত্রটিকে পাক মারে, তখন তাকে খুঁজে বের করাটা খুব মুশকিল হয়ে পড়ে। আবার কোনও নক্ষত্রকে পাক মারা কোনও ভিন গ্রহ যদি আমাদের লাইন অফ ভিশনের ৯০ ডিগ্রি কোণে থাকে, তা হলে আমরা সেই ভিন গ্রহটিকে কখনওই তার নক্ষত্রের সামনে এসে দাঁড়াতে দেখব না। টেলিস্কোপও তাকে খুঁজে পাবে না। এই সব কারণেই প্রক্সিমা সেনটাওরি-বি গ্রহটির হদিশ পেতে এতটা সময় লেগেছে। হয়তো আরও এমন ভিন গ্রহ রয়েছে, যাদের দেখা যাচ্চে না। তেমন আরও একটি গ্রহের আভাস দিয়েছেনও গবেষকরা। তবে তার সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানতে না পারায় গবেষকরা তার প্রসঙ্গটি ছুঁয়েই গিয়েছেন শুধু। গভীরে ঢোকেননি। তাই আরও একটি ভিন গ্রহকে আগামী দিনে প্রক্সিমা সেনটাওরির চার পাশে পাক মারতে দেখতে পাওয়ারও সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।’’

প্রক্সিমা সেনটাওরি-বি: ইউরোপিয়ান স্পেস অবজারভেটরির ভিডিও।


 

ছবি ও ভিডিও সৌজন্যে: নাসা ও ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি।