• সুজয় চক্রবর্তী
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

প্রকৃতিকে মৌলিক স্তরে ব্যাখ্যা করে বিজ্ঞানের অস্কার ভাইনবার্গের

steven weinberg
স্টিভেন ভাইনবার্গ। -ফাইল ছবি।

মৌলিক পদার্থবিজ্ঞানে যুগান্তকারী অবদানের জন্য এ বছরের ‘ব্রেকথ্রু প্রাইজ ইন ফান্ডামেন্টাল ফিজিক্স’ পেলেন নোবেল পুরস্কারজয়ী কণাপদার্থবিজ্ঞানী টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্টিভেন ভাইনবার্গ। ৩০ লক্ষ ডলার অর্থমূল্যের এই পুরস্কারকে বলা হয় ‘বিজ্ঞানের অস্কার’। নোবেল পুরস্কারের পরিপূরক।

৪১ বছর আগে তাঁর আরও একটি যুগান্তকারী গবেষণার জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন ভাইনবার্গ।

কণা থেকে ব্রহ্মাণ্ড, বিচরণ সর্বত্রই

বৃহস্পতিবার সান ফ্রান্সিসকোয় এ বারের পুরস্কারের ঘোষণা করে ব্রেকথ্রু প্রাইজের নির্বাচন কমিটি বলেছে, ‘‘মৌলিক পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণায় লাগাতার পথিকৃতের ভূমিকায় থাকার স্বীকৃতি হিসাবেই ভাইনবার্গেকে দেওয়া হল এই পুরস্কার। যাঁর গবেষণায় উপকৃত হয়েছে পদার্থবিজ্ঞানের অনেকগুলি ক্ষেত্র। কণাপদার্থবিজ্ঞান (‘পার্টিক্‌ল ফিজিক্স’), মহাকাশবিজ্ঞান (‘কসমোলজি’) ও মাধ্যাকর্ষণ সংক্রান্ত গবেষণা। বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান অপরিসীম।’’

এও জানানো হয়েছে, অতিমারির জন্য আপাতত স্থগিত থাকলেও জীববিজ্ঞান, গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানে এ বছরের পুরস্কারজয়ীদের পদক দেওয়া হবে আগামী বছরের প্রথম পর্বের কোনও এক সময়ে।

পদার্থবিজ্ঞানের এক প্রণম্য পথিকৃৎ: য়ুরি মিলনার

ব্রেকথ্রু প্রাইজের নির্বাচন কমিটির চেয়ার জুয়ান ম্যালডাসেনা বলেছেন, ‘‘একেবারে মৌলিক স্তরে গিয়ে প্রকৃতিকে ব্যাখ্যা করার জন্য বহু তাত্ত্বিক হাতিয়ার বানিয়েছেন স্টিভেন ভাইনবার্গ।’’

কর্নেলিয়া বার্গম্যান, অ্যান উজিকি, ফেসবুক প্রধান মার্ক জুকেরবার্গকে নিয়ে গড়া ব্রেকথ্রু প্রাইজ বোর্ডের অন্যতম সদস্য রুশ ধনকুবের য়ুরি মিলনার বলেছেন, ‘‘পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে এতাবৎ সবচেয়ে সফল তত্ত্বগুলির অন্যতম স্ট্যান্ডার্ড মডেলের মূল স্থপতিদের এক জন স্টিভেন ভাইনবার্গ। উনি এক প্রণম্য পথিকৃৎ। মৌলিক পদার্থবিজ্ঞানের বহু শাখায় তাঁর গভীর অন্তর্দৃষ্টির স্বাক্ষর রয়েছে।’’

চার বলকে একসূত্রে গাঁথার স্বপ্নে বিভোর

ভাইনবার্গের কাজের গুরুত্ব কী ও কোথায় তা বুঝতে গেলে আমাদের চলে যেতে হবে সেই ১৩৭০ কোটি বছর আগে বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণের সময়ে।

বিগ ব্যাংয়ের পরপরই জন্ম হয়েছিল চার ধরনের বল বা ফোর্সের। যাদের ‘মৌলিক বল’ বলা হয়। তড়িৎচুম্বকীয় বল, অভিকর্ষ বল, শক্তিশালী (‘স্ট্রং’) এবং দুর্বল (‘উইক’) বল। শক্তিশালী বল সেটাই যা কোনও পরমাণুর মধ্যে প্রোটনগুলিকে বেঁধে রাখে। আর দুর্বল বলের কারণেই ক্ষয় হয় তেজস্ক্রিয় পদার্থের। যার নাম- ‘রেডিওঅ্যাক্টিভ ডিকে’।

মতামতে তিন বিজ্ঞানী। সুবীর সরকার (বাঁ দিক থেকে), পার্থ ঘোষ ও নবকুমার মন্ডল।

যা আইনস্টাইন চেয়েও পারেননি...

ভাইনবার্গের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল চারটি বলের মধ্যে তিনটি বলকে (তড়িৎচুম্বকীয়, দুর্বল ও শক্তিশালী) কোয়ান্টাম ফিল্ড থিয়োরি দিয়ে ব্যাখ্যা করা। ভাইনবার্গের তত্ত্বেই প্রথম দুর্বল বলকে তড়িৎচুম্বকীয় বলের সঙ্গে একত্রিত করা সম্ভব হয়েছিল। যার অর্থ, কোনও একটি ঘটনা থেকেই এই দু’টি বলের জন্ম হয়েছিল। ফলে, তাদের উৎস একই। বিগ ব্যাংয়ের পর এক সেকেন্ডের মধ্যেই একে অন্যের থেকে আলাদা হয়ে যায় দুর্বল বল আর তড়িৎচুম্বকীয় বল। এই কাজের স্বীকৃতিতেই দুই বিজ্ঞানী আবদুস সালাম ও গ্লাসোর সঙ্গে নোবেল পুরস্কার পান ভাইনবার্গ। ১৯৭৯ সালে। যা আইনস্টাইন পারেননি।

তাঁর পূর্বাভাস বহু বার মিলিয়েছে সার্ন

শুধু তাই নয়, ভাইনবার্গের তত্ত্বই প্রথম নিখুঁত ভাবে পূর্বাভাস দিতে পেরেছিল দু’টি মৌল কণা ‘ডব্লিউ বোসন’ ও ‘জেড বোসন’-এর আদত ভরের। পরে আটের দশকে সার্ন-এর গবেষণাগারে যখন ‘ডব্লিউ বোসন’ ও ‘জেড বোসন’-এর আবিষ্কার হয়, তখন দেখা যায় তাদের ভর ভাইনবার্গের পূর্বাভাসের সঙ্গে মিলে গিয়েছে।

ব্রহ্মাণ্ড উত্তরোত্তর আরও বেশি গতিবেগে (ত্বরণ) সব দিকে ফুলেফেঁপে উঠছে, এই তত্ত্বেরও অন্যতম জনক ভাইনবার্গই।

‘হিগস কণা’রও পূর্বাভাস দিয়েছিল ভাইনবার্গের তত্ত্ব। পরে যে কণা আবিষ্কার করেন কণাপদার্থবিজ্ঞানী পিটার হিগস। এদের মধ্য়ে একটু ভারী হিগস বোসন কণা পরে সার্ন-এর লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারে (এলএইচসি) আবিষ্কৃত হয় ২০১২-য়।

কী বলছে অক্সফোর্ড, কলকাতা?

কলকাতার ‘সাহা ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার ফিজিক্স (এসআইএনপি)’-এর ইনসা সিনিয়র সায়েন্টিস্ট ও মুম্বইয়ের ‘টাটা ইনস্টিটিউট ফর ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ (টিআইএফআর)’-এর প্রাক্তন অধ্যাপক কণাপদার্থবিজ্ঞানী নবকুমার মন্ডল বলছেন, ‘‘আমাদের সময়ে বিশ্বের তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানীদের মধ্যে প্রথম যে নামটি মনে আসে, তিনি স্টিভেন ভাইনবার্গ। ব্রহ্মাণ্ডের মূল চারটি বলকে একত্রিত করার যে স্বপ্ন দেখেছিলেন অ্যালবার্ট আইনস্টাইন কিন্তু পারেননি, তাকেই বাস্তব রূপ দেওয়ার প্রথম পদক্ষেপটি করেছিলেন ভাইনবার্গই। ‘ফিজিক্যাল রিভিউ লেটার্স’ জার্নালে প্রকাশিত তাঁর সাড়া জাগানো গবেষণাপত্রে। যার শিরোনাম ছিল ‘আ মডেল অব লেপটনস’। সেটা ১৯৬৭। ভাইনবার্গই প্রথম দেখিয়েছিলেন বিগ ব্যাংয়ের পরপরই দু’টি বল তড়িৎচুম্বকীয় ও দুর্বল, আদতে একটি বলই ছিল। যার নাম ‘ইলেকট্রোউইক ফোর্স’। যা পরে দু’টি বলে আলাদা হয়ে যায়। এ ব্যাপারে আরও অনেক বিজ্ঞানীই চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ভাইনবার্গের কৃতিত্ব, তিনি সকলের তত্ত্বেরই ধাঁধাগুলির জট খুলে দিতে পেরেছিলেন। আমার থিসিসও ছিল গ্র্যান্ড ইউনিফায়েড থিয়োরির সত্যতা খোঁজা নিয়ে। প্রোটনের স্থায়ীত্ব কতটা তা নিয়ে। সাধারণ মানুষের কাছে সহজ ভাষায় বিজ্ঞানকে পৌঁছে দেওয়ার ব্যাপারেও ভাইনবার্গের অবদান অপরিসীম। তাঁর লেখা অসম্ভব জনপ্রিয় বই ‘দ্য ফার্স্ট থ্রি মিনিটস’ ব্রহ্মাণ্ডের জন্ম ও বিবর্তনের এক আশ্চর্য দলিল।’’

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুবীর সরকারের কথায়, ‘‘উনি যখন কাজ শুরু করেছিলেন তখন নতুন নতুন কণা আবিষ্কার হচ্ছে হরবখত। কিন্তু তাদের কোন কোন গোত্রে ফেলা হবে তা নিয়ে ধাঁধায় পড়ে গিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। রাসায়নিক মৌলের ক্ষেত্রে যেমন মেন্ডেলিয়েভের পর্যায় সারণী বা পিরিয়ডিক টেবিল ছিল। তাতে বিভিন্ন রাসায়নিক মৌলের পরমাণুর গঠনকাঠামো ব‌োঝা যেত। কিন্তু কণাদের ক্ষেত্রে তেমন কিছু ছিল না। সেই অত্যন্ত জটিল সমস্যারই সমাধান করেছিলেন ভাইনবার্গ। খুব নিখুঁত ভাবে। আর অভিনব উপায়ে। দু’টি বলকে একত্রিত করতে গিয়েও ওয়েইনবার্গ ‘স্পন্টেনিয়াস্‌লি ব্রোকেন সিমেট্রি’ আর কোয়ান্টাম ফিল্ড থিরোরির ‘রিনরম্যালাইজাবিলিটি’-র মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন অভিনব পদ্ধতিতে। ’’

কী দুর্দান্ত ইনটিউশন এই প্রবাদপ্রতিম বিজ্ঞানীর, তা বোঝাতে একটি গল্প বললেন সুবীর। ভাইনবার্গের একটি পূর্বাভাস ছিল, কোনও পরমাণুর মধ্যে ‘প্যারাইটি সিমেট্রি’ ভেঙে যাবেই একটা সময়ে। আর সেটা দেখা সম্ভব হবে যখন আলো বিসমাথের বাষ্পের মধ্যে দিয়ে যাবে। 

সুবীর বলছেন, ‘‘সেই পরীক্ষাটা হয়েছিল অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেই সময় ডন পারকিন্স ছিলেন অক্সফোর্ডের অধ্যাপক। পরীক্ষা চালিয়ে যা পাওয়া গেল, তা ভাইনবার্গের পূর্বাভাসের ঠিক উল্টোটা। পরে পারকিন্স আমাকে বলেছিলেন, সে কথা শুনে ভাইনবার্গ ফোন করেছিলেন পারকিন্সকে। সার্ন-এর একটি পরীক্ষার সূত্রে ওঁদের চেনা-জানা ছিল।ভাইনবার্গ ফোনে পারকিন্সকে বলেছিলেন, ‘‘তোমাদের পরীক্ষায় নিশ্চয়ই ভুলচুক হয়েছে। এমনটা হতেই পারে না।’’ তাই শুনে পরীক্ষাটা আবার করা হয়েছিল। তাতে ভাইনবার্গের পূর্বাভাসই সঠিক প্রমাণিত হয়েছিল।’’

সুবীরের বক্তব্য, স্ট্যান্ডার্ড মডেলের বেশির ভাগ পূর্বাভাসই পরে সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। সবার শেষে আবিষ্কৃত হয়েছে হিগস বোসন কণা। সেটাও ভাইনবার্গেরই পূর্বাভাস ছিল। ‘‘আবার কসমোলজিক্যাল কনস্ট্যান্ট সম্পর্কে তাঁর ধ্যানধারণা যে একেবারে বিতর্কের উর্ধ্বে, সে কথাও বলব না’’, বললেন সুবীর।

‘‘আমজনতার কাছে পদার্থবিজ্ঞানের সুজটিল বিষয়গুলিকে সহজ করে ঝরঝরে ভাষায় বুঝিয়ে বলার এক আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল ভাইনবার্গের’’, বললেন কলকাতার ‘টেগোর সেন্টার ফর ন্যাচারাল সায়েন্স অ্যান্ড ফিলোজফি’র ডিস্টিংগুইশ্ড‌ ফেলো অধ্যাপক পার্থ ঘোষ। তাঁর বক্তব্য, আমজনতার কাছে বিজ্ঞানকে সহজে পৌঁছে দিতে গিয়ে কিন্তু কোনও আপস করেননি তিনি। কখনওই বিজ্ঞানের অপব্যাখ্যা করেননি। ওঁর মতো বিরাট মাপের বিজ্ঞানীর কাছ থেকে যেটা খুবই প্রত্যাশিত।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন