৬০ বছর আগেকার সেই দিনটার কথা আজ খুব মনে পড়ছে।

সালটা ১৯৫৮। যে দিন সৌরবায়ু নিয়ে তাঁর সাড়া জাগানো গবেষণাপত্রটি কিছুতেই ছাপতে রাজি হচ্ছিল না আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান-জার্নাল ‘অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল’। কোনও খাদ আছে কি না জানতে তাঁর গবেষণাপত্রটি রিভিউ করানোর জন্য পাঠানো হয়েছিল দুই বিশিষ্ট সৌরপদার্থবিজ্ঞানীকে। এক বার নয়। দু’-দু’বার! আর দু’বারই তাঁরা বাতিল করে দিয়েছিলেন গবেষণাপত্রটিকে!

যাঁর গবেষণাপত্রটি সেই সময় দু’-দু’বার বাতিল করে দিয়েছিলেন দুই বিশিষ্ট সৌরপদার্থবিদ, তাঁর নাম- ইউজিন নিউম্যান পার্কার।

নাসা এখনও পর্যন্ত যে একমাত্র জীবিত কিংবদন্তি বিজ্ঞানীর নামে মহাকাশযানের নাম রেখেছে, তিনি আর কেউ নন, ইউজিন পার্কার। ‘পার্কার সোলার প্রোব’। 

সে দিন পার্কারের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন চন্দ্রশেখর

আর সে দিন পার্কারের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন যিনি, তিনি এক ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক সুব্রহ্মণ্যন চন্দ্রশেখর। ‘অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল’-এর সিনিয়র এডিটর। দুই রিভিউয়ার জ্যোতির্বিজ্ঞানীর মতামতের তোয়াক্কা না করে চন্দ্রশেখর একাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সৌরবায়ু নিয়ে পার্কারের গবেষণাপত্রটি ছাপানোর। ছাপিয়েছিলেন।

ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন জ্যোতির্পদার্থবিদ সুব্রহ্মণ্যন চন্দ্রশেখর

জ্যোতির্পদার্থবিদ চন্দ্রশেখরও এক জন যশস্বী বিজ্ঞানী, মৃত্যুর পর যাঁর নামে মহাকাশযানের নাম রেখেছে নাসা। ‘চন্দ্র এক্স-রে অবজারভেটরি’।

আরও পড়ুন- সূর্যের ‘রাক্ষস’দের বহু আগেই চিনে ফেলার পথ দেখালেন বাঙালি​

আরও পড়ুন- সূর্য থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে গোলা ধেয়ে আসছে পৃথিবীর দিকে

যদিও ঘটনাচক্রে, মার্কিন নাগরিক পার্কারের আগেই ভারতীয় বংশোদ্ভূত চন্দ্রশেখরের নামে মহাকাশযানের নামকরণ করেছে নাসা! ১৯৯৫-এ প্রয়াত হন চন্দ্রশেখর।

গবেষণাপত্রে পার্কারের বিকল্প তত্ত্বের সমর্থক ছিলাম, তবু...

ছাত্রাবস্থাতেই পার্কারের নাম কানে এসেছিল। জ্যোতির্বিজ্ঞানে তাঁর অবদানের কথা তখন গোটা বিশ্ব জেনে গিয়েছে। ওই সময়েই তাঁর কাজকর্ম নিয়ে পড়াশোনা করতে শুরু করেছিলাম। কপালটপাল আমি মানি না, তবে বলতেই হবে বরাত জোরে আমার পিএইচডি’র গবেষণাপত্রটির এক্সটার্নাল এগজামিনার হিসেবে আমি ইউজিন পার্কারকেই পেয়েছিলাম। ভাগ্যিস! উনি আমার গবেষণাপত্রটি পড়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ মতামত, পরামর্শ দিয়েছিলেন। আর পার্কারের মতো এক জন বিজ্ঞানীর দেওয়া সেই মতামতের ভিত্তিতেই আমার গবেষণাপত্রটি ২০০৩ সালে বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সের দেওয়া ‘সেরা গবেষণাপত্র’-এর সম্মান পায়।

আরও পড়ুন- কেন সূর্যের ১০ লক্ষ ডিগ্রিতেও গলবে না পার্কার মহাকাশযান​

ইউজিন পার্কারের (একেবারে ডান দিকে) পাশে লেখক দিব্যেন্দু নন্দী। ফ্লোরিডায়, ‘পার্কার লেকচার’ অনুষ্ঠানে। ২০০৮ সালে। 

আর ওই সময়ে আমাকে আরও এক বার অবাক করে দিয়েছিলেন পার্কার। আমার গবেষণাপত্রে সূর্যের চৌম্বক চক্র (সোলার ম্যাগনেটিক সাইক্‌ল) সম্পর্কে্ যে বিকল্প তত্ত্বকে সমর্থন করা হয়েছিল, তার সঙ্গে পার্কারের সংশ্লিষ্ট তত্ত্বের মিল নেই। এ ব্যাপারে পার্কার সে সময় যে তত্ত্ব দিয়েছিলেন, আমরা সে পথে হাঁটিনি। আমাদের গবেষণাপত্রে পার্কারের তত্ত্বের বিকল্প তত্ত্বকে সমর্থন করা হয়েছিল। কিন্তু গবেষণাপত্রটি পড়ে আমার সঙ্গে আলাপ-পরিচয় না থাকা সত্ত্বেও, বহু দূর থেকে তার সারবত্তা তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। বুঝতে পেরেছিলেন, গবেষণাপত্রে আমরা যা বলেছি, তার স্বপক্ষে আগামী দিনে প্রচুর তথ্যপ্রমাণ মিলবে। এখন যা সত্যি-সত্যিই মিলতে শুরু করেছে। পার্কার সে দিন লিখিত ভাবে অত দূর থেকে আমার মতো অচেনা, অজানা ছাত্রের গবেষণাপত্রটির প্রশংসা করেছিলেন। মানুষ হিসেবে পার্কার কত বড়, সে দিনই প্রথম তা টের পেয়েছিলাম।

আরও পড়ুন- এ বার সূর্যকেও ছুঁতে যাচ্ছি আমরা, নাসার অভিযান পিছল রবিবার পর্যন্ত

ছাত্রাবস্থা থেকেই যে পার্কার আমার শয়নে-স্বপনে-জাগরণে, আজ থেকে ১০ বছর আগে, ২০০৮ সালে পেলাম সেই ‘পার্কার লেকচারারশিপ’। এক বিরল সম্মান। ওই লেকচারারশিপ নিয়েই ২০০৮-এ গেলাম ফ্লোরিডায়, আমেরিকান জিওফিজিক্যাল ইউনিয়নের বৈঠকে। ‘পার্কার লেকচার’-এর আমন্ত্রিত বক্তা হিসেবে। সেখানেই কিংবদন্তি সৌরপদার্থবিদ ইউজিন পার্কারের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হল। কথা হল সামনাসামনি। সেই ফ্লোরিডায় নাসার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকেই সৌর মুলুকে পাড়ি জমাচ্ছে ‘পার্কার সোলার প্রোব’।

পার্কার মহাকাশযান সূর্যের বায়ুমণ্ডলের একেবারে বাইরের স্তর বা ‘করোনা’য় পৌঁছবে। যার দৌলতে এই প্রথম সভ্যতা সূর্যের অত কাছাকাছি পৌঁছবে। সূর্যের করোনার তাপমাত্রা গড়ে ১০ লক্ষ বা তার কিছু বেশি ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে করোনার তাপমাত্রা সর্বত্র সমান নয়। তা বাড়া-কমা করে। করোনায় রয়েছে প্লাজমা। যা ইলেকট্রন আর প্রোটন কণিকায় ভরা।

কেন সৌরবায়ুর জন্মস্থান জানা দরকার?

আর ওই দু’টি কণার ছোটাছুটি থেকেই সোলার উইন্ড বা সৌরবায়ুর জন্ম হয়। জ্যোতির্বিজ্ঞানী পার্কারই প্রথম সেই সৌরবায়ুর পূর্বাভাস দিয়েছিলেন তাঁর তাত্ত্বিক গবেষণাপত্রে। সূর্য থেকে বেরিয়ে আসা শক্তিশালী কণা ওর চৌম্বক ক্ষেত্রগুলিকে নিয়ে সৌরবায়ু বেরিয়ে আসে সূর্যের থেকে। আর তা ছড়িয়ে পড়ে আমাদের সৌরমণ্ডলের একেবারে শেষ প্রান্ত পর্যন্ত। ধেয়ে আসে পৃথিবীর দিকেও।  সৌরবায়ুর গতিবেগ হতে পারে সেকেন্ডে ৫০০ কিলোমিটার। সৌরবায়ুর মধ্যে থাকা চৌম্বক ক্ষেত্র ও শক্তিশালী কণাদের জন্য পৃথিবীর যাবতীয় টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা এবং জিপিএস (গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম) নেটওয়ার্কে বড় ধরনের গোলযোগ ঘটতে পারে। আর সেই সৌরবায়ুর সঙ্গে যদি হাত মেলায় সৌর চৌম্বক ঝড় (সোলার ম্যাগনেটিক স্টর্ম), তা হলে তা আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে আমাদের পক্ষে। কারণ, তা বিশ্বের পাওয়ার গ্রিড তো নষ্ট করে দেয়ই, নষ্ট করে দিতে পারে বিভিন্ন কক্ষপথে থাকা কয়েক হাজার কৃত্রিম উপগ্রহ (স্যাটেলাইট)-কেও।

সৌরবায়ু ও সূর্যের চৌম্বক ক্ষেত্র (সবুজ রং)

৬০ বছর আগে এই সৌরবায়ুর কথা আমাদের জানা ছিল না। পার্কারই প্রথম তাঁর তাত্ত্বিক গবেষণাপত্রে ওই সৌরবায়ুর অস্তিত্বের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন।

‘লাল গ্রহ’ মঙ্গলে পৌঁছতে যত শক্তির প্রয়োজন হয় কোনও মহাকাশযানের, তার ৫৫ গুণ বেশি শক্তি প্রয়োজন হবে পার্কার সোলার প্রোবের সূর্যে পৌঁছতে। পৃথিবীর খুব শক্তিসালী মাধ্যাকর্ষণ বলকে উপেক্ষা করে পার্কার সোলার প্রোবকে কক্ষপথে পাঠাতে তাই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অত্যন্ত শক্তিশালী ‘ডেল্টা ফোর হেভি রকেট’-কে। ওই রকেটের কাঁধে চেপেই মহাকাশে পাড়ি জমাবে পার্কার সোলার প্রোব।

কোন রুটে যাবে সূর্যের করোনায়?

সূর্যের মুলুকে পৌঁছতে পার্কার সোলার প্রোবের প্রথম ‘ডেস্টিনেশন’ হবে শুক্র গ্রহ (ভেনাস)। ফ্লোরিডা থেকে রওনা হয়ে শুক্র গ্রহের কক্ষপথে পৌঁছতে পার্কার সোলার প্রোবের সময় লাগবে ৬ সপ্তাহ। শুক্রে পৌঁছনোর জন্য পাক্কা দেড় মাসের পথ পরিক্রমার পর পার্কার সোলার প্রোব শুক্র গ্রহের অভিকর্ষ বলের সাহায্য নেবে সৌর মুলুকে পৌঁছতে। তবে শুক্র থেকে সৌর মুলুকে পৌঁছতে সময় লাগবে ২ থেকে ৪ বছর। তবে পাক্কা ৭ বছর ধরে সৌর মুলুকে ঢুকে তাকে বিভিন্ন কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করবে পার্কার সোলার প্রোব।

তার আগে নাসার মহাকাশযান যত কাছে পৌঁছবে সূর্যের, ততই তার ওপর বাড়বে সূর্যের অভিকর্ষ বলের টান। ফলে পার্কার সোলার প্রোবের গতিবেগ ওই সময় তুঙ্গে পৌঁছবে। সূর্যকে বিভিন্ন কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করার সময় পার্কার সোলার প্রোবের গতিবেগ পৌঁছবে ঘণ্টায় ৭ লক্ষ কিলোমিটার! ওই গতিতেই নাসার মহাকাশযান ঢুকে পড়বে সূর্যের সেই মুলুকে, যেখান থেকে জন্ম হয় সৌরবায়ুর। ওই সময় সূর্যের পিঠ (সারফেস) থেকে পার্কার সোলার প্রোবের দূরত্ব হবে মাত্র ১০ লক্ষ কিলোমিটার। সূর্যের ভয়ঙ্কর তাপমাত্রার হাত থেকে বাঁচতে মহাকাশযানটির যে দিকটা থাকবে ‘সূর্যমুখী’ হয়ে, সেটা ঢাকা রয়েছে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ‘হিট শিল্ড’-এ। যার ফলে, ওই মহাকাশযান বা তার ভেতরে থাকা যন্ত্রাংশগুলির গলে যাওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। তবে সবচেয়ে চিন্তার কারণ হতে পারে, সূর্যের অত্যন্ত শক্তিশালী ও ক্ষতিকারক বিকিরণ (রেডিয়েশন)। তার হাত থেকে মহাকাশযান আর তার যন্ত্রাংশগুলিকে বাঁচানোরও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে পার্কার সোলার প্রোবে।

পার্কার সোলার প্রোব

কী কী কাজ করবে নাসার এই মহাকাশযান?

এই মহাকাশযানের দৌলতে সভ্যতা এই প্রথম সূর্যের এত কাছাকাছি পৌঁছতে পারছে বলে এই প্রথম অনেক বেশি নিখুঁত ভাবে মাপা সম্ভব হবে সৌরবায়ুর মধ্যে থাকা চৌম্বক ক্ষেত্রের শক্তি, ঘনত্ব ও শক্তিশালী কণাদের গতিবেগ।

তাপগতিবিজ্ঞানের যাবতীয় নিয়ম উপেক্ষা করে কেন সূর্যের পিঠের (যার তাপমাত্রা বড়জোড় ৬ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস) চেয়ে পিঠ থেকে বহু বহু দূরে থাকা সূর্যের করোনার তাপমাত্রা অত বেশি (১০ লক্ষ বা তার বেশি ডিগ্রি সেলসিয়াস) হয়, তা নিয়ে এখনও যে সংশয় রয়েছে, পার্কার সোলার মিশনের পাঠানো তথ্য তা দূর করতে পারে। জানা যাবে কেমন ভাবে জন্ম হয় সৌরঝড়ের। কী ভাবে সূর্যের বায়ুমণ্ডলের একেবারে বাইরের স্তর (করোনা) থেকে বেরিয়ে আসে সৌরবায়ু।

আর দু’বছর পর, ২০২০ সালে আমরাও (ইসরো) মহাকাশযান পাঠাচ্ছি সৌর মুলুকে। তার নাম- ‘আদিত্য-এল-ওয়ান’। আমার জোরালো বিশ্বাস, পার্কার সোলার প্রোব আর আদিত্য-এল-ওয়ান সূর্যের অনেক অজানা তথ্য আমাদের হাতে তুলে দেবে। তবে সূর্য আর পৃথিবীর মধ্যে যে দূরত্ব পেরোবে পার্কার সোলার প্রোব, ‘আদিত্য-এল-ওয়ান’ পেরোবে তার এক শতাংশ পথ।

(লেখক অধ্যাপক দিব্যেন্দু নন্দী দেশের বিশিষ্ট সৌরপদার্থবিজ্ঞানী। ভারতের প্রথম সৌর অভিযান ‘আদিত্য-এল-ওয়ান-এর সায়েন্স অপারেশন টিমের অন্যতম সদস্য। ‘সেন্টার অফ এক্সেলেন্স ইন স্পেস সায়েন্স’-এর অধিকর্তা।)

ছবি সৌজন্যে: নাসা, অধ্যাপক দিব্যেন্দু নন্দী