Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

১৯ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

সদর দফতর

২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ ০০:০৪
ছবি: সুব্রত কুমার মণ্ডল

ছবি: সুব্রত কুমার মণ্ডল

মাত্র ক’দিন আগে ভরসন্ধেয় ১০ নম্বর সদর স্ট্রিটের সামনে দাঁড়িয়ে বাড়িটাকে দেখছিলাম আর কষ্ট পাচ্ছিলাম।

সদর স্ট্রিট আগের চেয়ে ঢের বেশি নিয়নদীপ্ত, ঝলমলে। লন্ডনের সোহো পল্লির রকমসকম গায়ে জড়ানো।

চল্লিশ বছর আগে এখানে বছরভর তরতাজা তরুণ হিপি ছেলেমেয়েদের মেলা। ১০ নম্বর বাড়ির সামনের গলিটাই ছিল গাঁজা, বিয়ার, বাংলার খোলা ঠেক। দেশি-বিদেশি জটলায় কোনও হইচই, উত্তেজনা নেই। অফুরন্ত বাতচিত চলছে, আর থেকে থেকে হঠাৎ করে এক স্তম্ভিত শান্তি।

Advertisement

মনে রাখতে হবে, সময়টা এলএসডি, হাসিস অনুপ্রাণিত স্টোনড্ সাইলেন্স, পাথুরে নিস্তব্ধতার যুগ।

ওই সময়েই আনন্দবাজার ঘরের অধুনালুপ্ত ‘সানডে’ পত্রিকার (তখনও সানডে ট্যাবলয়েড এবং ম্যাগাজিন ফরম্যাট মিশিয়ে হত) প্রচ্ছদ কাহিনি লেখার জন্য পর পর কয়েক সন্ধে গিয়ে গলিটায় বসছিলাম।

সেখানে আলাপ হওয়া ইংল্যান্ডের বেডফোর্ডের বুদ্ধিজীবী তরুণ রিক ম্যাকর্মিক-কে কিছুটা চমকে দেওয়ার জন্য ১০ নম্বরের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলেছিলাম, ‘‘জানো তো, ওই বাড়িটার একটা ঘরে বসে আমাদের দেশের সেরা কবি টেগোর অল্প বয়েসে কবিতা লিখেছেন।’’

সঙ্গে সঙ্গে তড়াক করে লাফিয়ে উঠেছিল সোনালি ঝাঁকড়াচুলো অতীব সুদর্শন ছোকরা, ‘‘ইউ মিন টেগোর অব দ্য গীতাঞ্জলি?’’ বললাম, ‘ইয়েস।’’ ও বিয়ার নামিয়ে ক্যামেরা বার করে ছবি তুলতে গেল।

সেই পুরনো চালের ১০ নম্বর সদর স্ট্রিট আর নেই! শহর জুড়ে এজমালি ইমারত সমূহের যা দশা, তাই হয়েছে। স্থাপত্য মেরে, সিমেন্ট লেপে স্রেফ একটা আখাম্বা অট্টালিকা। যার গা ভরে আছে ট্র্যাভেল এজেন্ট, মানি চেঞ্জারদের দোকানপাটে। রোববারের সন্ধেতেও সাইনবোর্ড জ্বালা, দরজা খোলা, কাজ-কারবার চালু। নিরানব্বই ভাগ লোকের কাছেই সদর স্ট্রিট কিন্তু এখনও সাডার স্ট্রিট। যেমন ডাক চালু করে গিয়েছিলেন সাহেবরা।

সে-বৃত্তান্তে পরে যাবখ’ন, আগে ১০ নম্বরের রোম্যান্সে আসি।

রবীন্দ্রনাথ কিন্তু তাঁর ‘জীবনস্মৃতি’র ‘প্রভাতসংগীত’ পরিচ্ছেদে সদর স্ট্রিট অমর করা বর্ণনায় সাহেবদের উচ্চারণের ধার ধারেননি। সদর স্ট্রিটের জীবনকথায় এসেছেনও বড় আবেগ ও যুক্তি বেয়ে। সে-কথা একটু টুকরো-টুকরো করে তুলে দিই...

‘‘গঙ্গার ধারে বসিয়ে সন্ধ্যাসঙ্গীত ছাড়া কিছু-কিছু গদ্যও লিখিতাম। সেও কোনো বাঁধা লেখা নহে— সেও একরকম যা-খুশি তাই লেখা। ছেলেরা যেমন লীলাচ্ছলে পতঙ্গ ধরিয়া থাকে এও সেইরকম।...

বোধ করি, এই সময়েই ‘বউ ঠাকুরানীর হাট’ নামে এক ব়ড় নভেল লিখিতে শুরু করিয়াছিলাম।

এই রূপে গঙ্গাতীরে কিছুকাল কাটিয়ে গেলে জ্যোতিদাদা কিছুদিনের জন্য চৌরঙ্গি জাদুঘরের নিকট দশ নম্বর সদর স্ট্রিটে বাস করিতেন। আমি তাহার সঙ্গে ছিলাম। এখানেও একটু একটু করিয়া বউঠাকুরানীর হাট ও একটি করিয়া সন্ধ্যাসংগীত লিখেতেছি এমন সময়ে আমার মধ্যে হঠাৎ একটা কী উলটপালট হইয়া গেল।...

সদর স্ট্রিটের রাস্তাটা যেখানে গিয়া শেষ হইয়াছে সেইখানে বোধ করি ফ্রী-ইস্কুলের বাগানের গাছ দেখা যায়। একদিন সকালে বারান্দায় দাঁড়াইয়া আমি সেই দিকে চাহিলাম। তখন সেই গাছগুলির পল্লবান্তরাল হইতে সূর্যোদয় হইতেছিল। চাহিয়া থাকিতে থাকিতে হঠাৎ এক মুহূর্তের মধ্যে আমার চোখের উপর হইতে যেন একটা পর্দা সরিয়া গেল। দেখিলাম একট অপরূপ মহিমায় বিশ্ব সংসার সমাচ্ছন্ন, আনন্দে এবং সৌন্দর্যে সর্বত্রই তরঙ্গিত। আমার হৃদয়ে স্তরে স্তরে যে একটা বিষাদের আচ্ছাদন ছিল তাহা এক নিমিষেই ভেদ করিয়া আমার সমস্ত ভিতরটাকে বিশ্বের আলোক একেবারে বিচ্ছুরিত হইয়া পড়িল। সেইদিনই ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতাটি নির্ঝরের মতোই যেন উৎসারিত হইয়া বহিয়া চলিল। ... কিন্তু সেদিন কে জানিত এই কবিতায় আমার সমস্ত কাব্যের ভূমিকা লেখা হইতেছে।’’

হালের সেই সন্ধেয় যখন উল্টো ফুটপাথ থেকে ১০ নম্বরকে দেখছি আমার পাশেই স্বয়ং কবি, থুড়ি, কবির আবক্ষ মূর্তি। বছর তেরো আগে যে-মূর্তির উন্মোচন করেছিলেন কবি শঙ্খ ঘোষ। উদ্যোগটা ছিল ‘স্মৃতিরক্ষা উদযাপন সমিতি’র। বাড়িটা বাঁচানো যায়নি, তবু স্থানমাহাত্ম্যের কিছুটা যে ঘোষণা করা গেছে, সে’ও তো কত।

মূর্তির নীচে পাথরের ফলকে যা লেখা আছে, তা বেশ ঝাপসা হয়ে এসেছে এই ক’বছরে। রিটাচ দরকার। আর একটা ছোট্ট খেদ সেই ১৪০৭ সন থেকে মনে বইছে, সেটা দেখি আজও মরেনি। কবির মূর্তিটা অতখানি পুতুল-পুতুল না হলে কি হত না!



জেনিফারের সঙ্গে শশী।

তবে মূর্তি আর বেদির ধার বেয়ে টাঙানো একটা ব্যানারে বেশ চমক আর স্বস্তি পেলাম। স্মৃতিরক্ষা সমিতির সঙ্গে নিজেদের যোগ করেছেন ‘সদর স্ট্রিট এরিয়া একতা কমিটি’।

১০ নম্বর দেখতে দেখতে মনে পড়েছিল কবির বর্ণনায় ওই বাড়ি থেকে দেখা ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের বাগানের কথা। হায়, কোথায় সে বাগান এখন! শুধুই তো ইটকাঠপাথরের অরণ্য। সবুজ দেখতে হলে জাদুঘর পেরিয়ে জওহরলাল নেহরু ক্রস করতে হবে। কিন্তু আপাতত আমরা কোথাও যাচ্ছি না। সামান্য ক’পা ফেলে কিড স্ট্রিট আর সদর স্ট্রিটের জংশনে অ্যাস্টোরিয়া হোটেলের সামনে এসে রুখতে পারি।

আহা, হোটেলের সেই এডোয়ার্ডিয়ান লুকটা কিন্তু আজও ধরা। এক কালে পাক্কা ব্রিটিশ মেনু সার্ভ করা হত। এ পাড়ার সব চেয়ে আইকনিক হোটেল ফেয়ারলন-এরও আগে থেকে খাড়া দাঁড়িয়ে অ্যাস্টোরিয়া। বিদেশি ট্যুরিস্টরা অনলাইন বুকিং করে ঝাঁকে ঝাঁকে এসে ওঠে।

তবে ১০ নম্বর সদর স্ট্রিট ইতিহাসের অন্ধকারে ঝরে পড়ার পর থেকে ফেয়ারলন-ই সদর স্ট্রিটের প্রাণভ্রোমরা।

বস্তুত, সদর স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট হবার আগে যে-নামে চলত, সেই ফোর্ড স্ট্রিট-এর পিছনে যে উইলিয়ম ফোর্ড, তাঁরই বাসভবন ছিল আজকের ‘ফেয়ারলন’ বাড়িটা। আর ওঁরই নামে রাস্তার নাম হয়েছিল ফোর্ড স্ট্রিট।

পরে কাছেই গড়ে উঠেছিল লোকাল অ্যাপিল’জ কোর্ট বা সদর কোর্ট। তাতে রাস্তার নামও দিনে দিনে, মুখে মুখে বদল হয়ে পড়ে সদর স্ট্রিট।

সদর স্ট্রিট ‘সদর স্ট্রিট’ নামে চালু হওয়ারও প্রায় দেড়শো বছর পর উইলিয়ম ফোর্ডের বাড়ি হাতে আসে জনৈকা রোজি সার্কিজ-এর, যিনি ওই ঠিকানায় পত্তন করেছিলেন আজকের এই অপূর্ব ইন্ডো-অ্যাংলিয়ান মেজাজের বাগান-হোটেল ফেয়ারলন। যার ইতিহাস, বিলিতি সংস্রব ও গল্পগাছার শেষ নেই। ষাটের দশকের শেষ ও সত্তর দশকের গোড়ায় যখন ‘বুটিক হোটেল’ শব্দটার জন্মই হয়নি, আমি ও আমার বন্ধুরা ফেয়ারলনকে ওই ভাবে বর্ণনা করা শুরু করেছিলাম। কেউ কেউ বলত, শশী কপূরের প্রেমের ঠিকানা। সে-গল্পে আসব, তার আগে ফেয়ারলনের আদি ইতিহাস...



যা আবার সদর স্ট্রিটের আরও ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে।...

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রায় পঞ্চাশ হাজার আর্মেনীয় দেশ ছাড়েন অটোমান সরকারের গণহত্যার হাত থেকে বাঁচতে। রোজি সার্কিজ ও তাঁর স্বামী সেই উদ্বাস্তু দলের একটি অংশের সঙ্গে এদেশে এসে পড়েন। প্রথমে ঢাকায়, পরে কলকাতায়।

সে-দলের অনেকেই হোটেল ব্যবসাকে রুজির রাস্তা করেছিলেন। ওঁদেরই উদ্যোগে গড়ে উঠেছিল আর্মেনিয়ান কলেজ, আর্মেনিয়ান চার্চ, আর্মেনিয়ান ঘাট।

শহরের এই সম্প্রদায়টি এখন প্রায় হারিয়েই যেতে বসেছে, যার এক শেষ উজ্জ্বল প্রতিনিধি মিসেস ভায়োলেট স্মিথ গত বছর ৯৩ বছর বয়েসে চলে গেলেন। বিদেশি পর্যটকদের কাছে তাঁর পরিচয় ছিল ‘ডাচেজ অব সাডার স্ট্রিট’। কারণ, তিনিই ছিলেন ফেয়ারলন হোটেলের প্রকৃত রূপকার, এক জীবন্ত কিংবদন্তি। যাঁর আরও একটি পরিচয়— তিনি রোজি সার্কিজের কন্যা।

কাগজপত্র, দলিল, দস্তাবেজ, ইতিহাস হারিয়ে ফেলার এক স্বভাবদোষ আছে বাঙালির। অথচ এই বাংলারই দুই উঠতি যুবা গাঁটের কড়ি খরচ করে মিসেস স্মিথের মৃত্যুর মাত্র কয়েক দিন আগে ওঁকে ও ফেয়ারলন নিয়ে একটা তথ্যচিত্র বানিয়ে ফেলেছিলেন। সেখানে ‘ডাচেস অব সাডার স্ট্রিট’ বলছেন যে, প্রতিদিন লাঞ্চ সেরে নীচে এসে সঙ্গ দিতেন হোটেলের অতিথিদের, তারপর এক সময় শহর ঘুরতে বেরোতেন।

এত বয়েসে কষ্ট করে নীচে নামার কী দরকার?

এটা জিজ্ঞেস করতে সোজাসাপ্টা উত্তর দিয়েছিলেন, ‘‘ওনলি অন মাই ডাইং ডে উইল আই বি কনফাইনড টু মাই বেড।’ নীলাব্জ দাস ও সৌরভ সরকারের ডকুমেন্টারি শেষ হয় মহিলার এই প্রতিজ্ঞা দিয়ে। মিসেস স্মিথ ওঁর কথা রেখেছিলেন, যে দিন বিছানা ছেড়ে গেস্টদের কাছে এলেন না, সে দিনই চিরশয়ানে চলে গেলেন।

আর্মেনীয়রা যখন একে একে শহর ছাড়ছেন, তখনও কী ভেবে তিনি পড়ে রইলেন কলকাতায়? ফেয়ারলনের সফল ব্যবসা? জানিয়েছেন যে, একবার ব্যবসা গুটিয়ে ইংরেজ স্বামীর দেশ ইংল্যান্ডের সমারসেট কাউন্টিতে গিয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু ছ’মাসের বেশি টিকতে পারেননি। বলেছেন ও দেশের জলহাওয়া ‘সুট’ করেনি!



ফেয়ারলনের অন্দরে। ছবি: কৌশিক সরকার

ইংল্যান্ডের ভিজে ঠান্ডা শরীর নেয়নি। কলকাতার মানুষের মনের উত্তাপও হারাচ্ছিলেন। ফেয়ারলনের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে গেলেই ওঁর স্মৃতির অ্যালবামে চোখ বোলানো হয়ে যায়। যার একটি ছবিতে এসে পা থমকে যায়। চোখ আটকে যায়। প্রথম যৌবনের শশী কপূর ও জেনিফার কেন্ডাল। ওঁরা তখন জেনিফারের বাবা জেফ্রি কেন্ডালের ভ্রাম্যমাণ নাট্যদল ‘শেক্সপিয়ারিয়ানা’-র সদস্য হয়ে দেশ ঘুরে নাটক করে বেড়াচ্ছেন। কলকাতায় এলে ওঁদের একটাই ঠিকানা ছিল— ১৩ এ, সদর স্ট্রিট। মানে, ফেয়ারলন হোটেল।

অ্যাদ্দিনে ফেয়ারলনের নিয়মিত গেস্টদের একটা জম্পেশ হুজ হু তৈরি হয়ে গেছে। জর্মান ঔপন্যাসিক গুন্টার গ্রাস, ইংরেজ নাট্যকার টম স্টপার্ড, চলচ্চিত্র পরিচালক-প্রযোজক জুটি জেমস আইভরি ও ইসমাইল মার্চেন্ট (ওঁদের ছবি ‘শেক্সপিয়রওয়ালা’-তে তো শশী কপূর ও জেনিফার কেন্ডাল কিছুটা যেন নিজেদের জীবনটাই অভিনয় করে ফেলেছেন) এবং দমিনিক লাপিয়ের। লাপিয়েরের ‘সিটি অব জয়’ উপন্যাসকে ছবি করার সময় রোলান্ড জফে ফেয়ারলনকেই তুলেছেন গ্রিন একরজ্ হোটেল বলে।

বিখ্যাত ইংরেজ ভ্রমণলেখক এরিক নিউবি এসেছিলেন কলকাতা বেড়াতে। ওঁকে নিয়ে আনন্দবাজারে কড়চা লিখতে দেখা করতে গেলাম পার্ক স্ট্রিটের প্রাচীন গোরস্থানে। খুব মন দিয়ে স্যার উইলিয়ম জোনস্, রোজ এলমার, স্যার ইলাইজা ইম্পের কবর দেখছেন আর কথা বলে যাচ্ছেন।

জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘কোথায় উঠেছেন?’ বললেন, ‘‘এক টুকরো পুরনো কলকাতায়। জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘মানে?’’ নিউবি হেসে বললেন, ফেয়ারলন হোটেল। চেনেন?’’ বললাম, ‘‘বড়ই তো হয়েছি ওই পাড়ার আনাচেকানাচে।’’

কথাটা মিথ্যে নয়, পঞ্চাশ-ষাট দশকের যুবকুলের বিলাতদর্শনই তো হত নিউমার্কেট পাড়ায় ঢুঁ মেরে। পুরনো গ্লোব সিনেমা হলকে ভেঙেচুরে ৭০এমএম স্ক্রিন জুড়ে বিলকুল নতুন মেকওভারে দাঁড় করানো হল ’৬৫-’৬৬ সালে। তাতে নতুন ছবি লাগল এলিজাবেথ টেলর, রিচার্ড বার্টন, রেক্স হ্যারিসনের ‘ক্লিওপাট্রা’। এই গ্লোবের পাশের গলি ম্যাজ লেন, যার লম্বাই একশো গজের বেশি না। আর যা নিউ মার্কেটের সামনের চত্বরকে জুড়ে দেয় সদর স্ট্রিটের সঙ্গে। ওই খুদে ম্যাজ লেনের দুই আকর্ষণ তখন। এক, বাঙালি পরিবারের গড়া ফ্যাশনেবল দর্জির দোকান ফ্রেঞ্চ টেলার্স। যাদের হাতযশ মহিলাদের ব্লাউজ বানানোয়। আধুনিক বাঙালি মেয়েদের মধ্যে তখন কী হুড়োহুড়ি ফ্রেঞ্চ থেকে ব্লাউজ কাটানো আর সেলাইয়ের।

দ্বিতীয় টান, এক চিনা মহিলার ছোট্ট পানভোজের বৈঠকখানা। বাইরে থেকে বিয়ার কিনে নিয়ে গেলে গেলাসের জন্য মাত্র এক টাকা সার্ভিস চার্জ নিতেন। আর ছোট্ট ছোট্ট গেলাসে ওঁর বাড়ির তৈরি সাদা টলটলে চিনে মদের জন্য নিতেন দু’টাকা। কিন্তু ওঁর সেরা অফার ছিল বাড়ির তৈরি স্বর্গীয় পর্ক ভিন্দালু, পর্ক সসেজ ও মোমো। আমরা হা-ঘরের মতো ওই সব খেতাম আর শুনতাম কী ভাবে ওই করে ছেলেমেয়েদের কলেজে পড়িয়ে ইংল্যান্ড, কানাডায় পাঠিয়েছেন। অবশেষে একদিন তিনিও কলকাতা (বলতেন ‘আমার শহর’) ছেড়ে চলে গেলেন।

সদর স্ট্রিট নিজেও বড় লম্বা রাস্তা কিছু নয়। ভদ্র ভাবে হাঁটলেও দশ মিনিটে এধার ওধার করা যায়। আর ওই লেংথের মধ্যেই ইতিহাসের সমারোহ। যে-সন্ধেয় ও রাস্তায় হাঁটছি, ঠিক তখনই বোটানিকাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া-র বার্ষিকী উদযাপন চলছিল জাদুঘর সংলগ্ন প্রেক্ষাগৃহে। বাড়ি ফিরে টিভি খুলতে খবরে দেখলাম বোটানিকাল সার্ভের পত্তনই সদর স্ট্রিটের ওই ঠিকানায়।

সদর স্ট্রিট এলাকা জুড়ে এক সময় প্রায় রাজকীয় উপস্থিতি ছিল স্যালভেশন আর্মির। দুঃস্থ খ্রিস্টানদের প্রত্যহ অন্নবস্ত্রের সংস্থান করতেন আর্মির কর্মীরা। তরুণ বিদেশি পর্যটকদের সামান্য মূল্যে আস্তানা হত। কিন্তু সে স্যালভেশন আর্মি কোথায়? মালুম হল না।

ষাট-সত্তর দশকে যে লিটন হোটেলকে একটা অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান স্টাইল ডেরা মনে হত, তা এখন ঝাঁ-চকচকে বিজনেস হোটেলের চেহারা নিয়েছে। কী কারণে জানি সেই সত্তর দশক থেকেই বাংলাদেশি লেখক-কবি-রাজনীতিবিদরা এখানে এসেই ওঠেন। এখন দরদাম চড়ে কী দাঁড়িয়েছে, জানি না।

কিন্তু সম্প্রতি ঢাকায় কবিতা উৎসবে গিয়ে শুনলাম কলকাতা এলে এ পাড়ার ‘জরঞ্জ’-এ ওঁদের আসা চাই-ই। কারণ একই রেস্তোরাঁয় ভারতের একরাশ সেরা পদ ওঁরা পেয়ে যান। আর পাশেই ফ্রি স্কুল স্ট্রিট তো ছোটখাট ঢাকা। ‘ঢাকা, চাটগাঁ, বরিশাল, ময়মনসিংহের রান্নাই তো খাই ওইখানে বইস্যা’— দিব্যি বলে দিলেন এক বাংলাদেশি কবি। ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে এক চক্কর মারলেই টের পাওয়া যায় তার কতখানি জুড়ে আপাতত বাংলাদেশ।

সদর স্ট্রিটে ঢোকার মুখের বাড়ির ওপরতলায় অপর্ণা সেন ওঁর প্রথম ছবি ‘৩৬ চৌরঙ্গি লেন’-এর প্রথম দিনের শ্যুটিং সেরেছিলেন। বিকেলের দিকে সামান্য ক’মিনিটের জন্য ঢুঁ মেরে দেখেছিলাম জিন্স আর কুর্তা পরে বুকে ভিউ ফাইন্ডার ঝুলিয়ে তিনি লাইট অ্যাডজাস্টমেন্টের তদারকি করছেন। দেখা হল সেট ডিজাইনার বংশী চন্দ্রগুপ্তের সঙ্গে। বললেন, ‘‘বাড়িটাই তো একটা সেটের মতো।’’

ক’দিন আগের সন্ধেয় সদর স্ট্রিট দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এই সব স্মৃতি মনে ভিড় করে আসছিল। মনে পড়ল শংকরের লেখায় কোথায় যেন পড়েছি এই রাস্তারই এক প্রসিদ্ধ ডাক্তারের কাছে সদ্য আমেরিকা-ফেরত ও প্রবল খ্যাতিমান স্বামী বিবেকানন্দ চিকিৎসা করাতে এসেছিলেন। ডাক্তারবাবু ফিজ-এর ব্যাপারে সর্বত্যাগী সন্ন্যাসীকে বিন্দুমাত্র রেয়াত করেননি। সেকালের বিচারে চল্লিশ টাকার মস্ত ফিজ বুঝে নিয়েছিলেন। সেই ডাক্তারের চেম্বার কোন ঠিকানায় জানার কৌতূহল থাকলেও তা শনাক্ত করার উৎসাহ পেলাম না।

ঘুরেফিরে এসে বসলাম ফেয়ারলনের বাগানে। দেশি বিদেশি তরুণ-তরুণী গিজগিজ করছে। রাম-হুইস্কি-ভদকা নয়। এ বাগান-বারের একমাত্র পানীয় বিয়ার। আলাপচারিতার ভাষা ইংরেজি। আর তারই মধ্যে এক কোণে বসেছে ‘শতক একুশ’ নামের এক বাংলা সাহিত্যপত্রের কবিতা ও গানের আসর।—চিরকালের মতো আজও ফেয়ারলন আমাকে অবাক করতে কসুর করে না। কিছু জিনিস যত বদলায়, ততই যেন তা আগের মতোই থেকে যায়। বিশেষ করে ফেয়ারলন, যার এখনকার মালকিন মিসেস ফাউলার, মিসেস স্মিথের কন্যা, ছ’মাস ইংল্যান্ড, ছ’মাস কলকাতা করে ফেয়ারলন ধরে রাখছেন।

সেই উদ্যোগে শরিক হোটেলের অতিথিরাও। হঠাৎ দেখি দুই সুন্দরী বাঙালিনী দিব্যি সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে শশী ও জেনিফারের ছবির পাশে নিজেদের সেলফি তুলছেন।

বুঝে গেলাম আজও ১৩এ সদর স্ট্রিট মানে শশী-জেনিফার। ১০ সদর স্ট্রিট মানে ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’। আর গোটা সদর স্ট্রিট মানে এক টুকরো অ্যাংলো-ইন্ডিয়া, যা আজও তার কথাকার খুঁজে মরছে।

আরও পড়ুন

Advertisement