Advertisement
২৭ নভেম্বর ২০২২

পঞ্চপাণ্ডব

মহাকাব্যিক পঁচিশ বছর! কখনও লাল-হলুদ, কখনও সবুজ-মেরুন। কখনও নীল জার্সির ভারত। পুরনো সেই সাম্রাজ্য বিস্তার আর তার ভাঙাগড়ার রুদ্ধশ্বাস কাহিনি নিয়ে দীর্ঘ এত বছর বাদে অকপট স্বয়ং প্রদীপ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। আজ চতুর্থ কিস্তি। বহু বিতর্কর পর এই প্রথমবার তিনি বেছে নিলেন তাঁর সেরা পাঁচ ছাত্রমহাভারতে শ্রীকৃষ্ণের অনুগ্রহে পাণ্ডবদের সব কিছু হয়েছিল। আমার উপর নারায়ণ শ্রীকৃষ্ণের আশীর্বাদ আছে কি না জানি না। তবে আমার ফুটবল-মহাভারত থেকে পঞ্চপাণ্ডব বাছতে বসে হিমশিম খাচ্ছি। সবাই আমার স্নেহভাজন শিষ্য। এই লিস্টে যে বাদ পড়বে, সে-ই দুঃখ পাবে। কিন্তু কোথাও না কোথাও বোধহয় অপ্রিয় হতেই হয় মানুষকে। এই কিস্তিটায় আমার ঠিক সেই অবস্থা। সম্পূর্ণ অনাবেগী হয়ে এক জন ফুটবল নির্বাচকের ভূমিকা পালন!

লিগের খেলায় মোহনবাগানের বিরুদ্ধে জয়ের পর

লিগের খেলায় মোহনবাগানের বিরুদ্ধে জয়ের পর

অনুলিখন: সুপ্রিয় মুখোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৪ ০০:০৫
Share: Save:

মহাভারতে শ্রীকৃষ্ণের অনুগ্রহে পাণ্ডবদের সব কিছু হয়েছিল।

Advertisement

আমার উপর নারায়ণ শ্রীকৃষ্ণের আশীর্বাদ আছে কি না জানি না। তবে আমার ফুটবল-মহাভারত থেকে পঞ্চপাণ্ডব বাছতে বসে হিমশিম খাচ্ছি।

সবাই আমার স্নেহভাজন শিষ্য। এই লিস্টে যে বাদ পড়বে, সে-ই দুঃখ পাবে। কিন্তু কোথাও না কোথাও বোধহয় অপ্রিয় হতেই হয় মানুষকে। এই কিস্তিটায় আমার ঠিক সেই অবস্থা। সম্পূর্ণ অনাবেগী হয়ে এক জন ফুটবল নির্বাচকের ভূমিকা পালন!

নিজের সেরা পাঁচ ছাত্র বাছতে বসে খুব কম করে পনেরো জনের নাম এক নিঃশ্বাসে মনে পড়ছে। গোলকিপার ধরা যাক। তরুণ বসু থেকে শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়। ভাস্কর গঙ্গোপাধ্যায় থেকে অতনু ভট্টাচার্য। ডিফেন্ডার? সমর ভট্টাচার্য বলে আশির দশকে এক জন স্টপার আমার কোচিংয়ে খেলেছিল, যে সেন্টার সার্কেল থেকে না দৌড়ে, দাঁড়ানো অবস্থায় এক কিকে বল বারপোস্টের ওপর দিয়ে পাঠাতে পারত। দু’পায়েই পারত। মান্নাদাও (শৈলেন মান্না) যা পারতেন না।

Advertisement

প্রদীপ চৌধুরী! হেডটা বাবলু (সুব্রত ভট্টাচার্য) বা মনার (মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য) মতো ছিল না, কিন্তু ওই স্পিড! স্লাইডিং ট্যাকল! আহা হা! আবার মনার জার্নাল সিংহ-টাইপ পা খুলে নেওয়ার মতো ট্যাকলই বা ভুলি কী করে? আর সুব্রতর সেই রাজসিক কায়দায় জিরাফের মতো গলা উঁচিয়ে হেডিং! মইদুল ইসলামের প্রখর বুদ্ধিমত্তা! কোনওটাই ভোলার নয়!

মাঝমাঠে পিন্টু (সমরেশ) চৌধুরীকে বাদ দিতে হবে? পান চিবোতে চিবোতে যে ছেলেটা দিনের পর দিন ম্যাচ শুরুর দশ মিনিট আগে ইস্টবেঙ্গল টেন্টে ঢুকে আমায় বলত, “ভাবতাসেন ক্যান প্রদীপদা? মাঠে নাইম্মা অগো চিবাইয়া আসুম!”

বলত এবং তার পর ওয়ার্ম আপ ছাড়াই (কারণ এত দেরিতে আসত যে, কোনওক্রমে প্যান্ট-জার্সি-বুট পরার সময়টুকুই পেত!) মাঠে নেমে সত্যিই অপোনেন্টকে চিবিয়ে খেত! আর পাঠক, সুযশ বেরাকে মনে আছে? মোহনবাগানে আমার কোচিংয়ে দু’টো মরসুম সব ক্লাবের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল মাঝমাঠে! অথচ ওরই এক নামী সতীর্থ ডুরান্ডে চড় মেরেছিল ওকে। বেরা পদবিকে টিটকিরি মেরে ভেঙিয়ে ‘ব্যাঁকা’ বলত!

তার পর সুদীপ চট্টোপাধ্যায়। একটু স্লো। তবে যেমন ট্যাকলার, তেমনই পাসার। আর ছিল একটা অদ্ভুত পুশ! যেটা জার্নাল বুটের এক টোকায় চল্লিশ গজ পাঠাত আমাকে বা চুনীকে উদ্দেশ্য করে। সুদীপও ঠিক সে রকমই বুড়ো আঙুল দিয়ে এক টোকায় কুড়ি গজের নিখুঁত পুশ করত।

ভাই গোপালের (প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়) নামটা না নিলেও অন্যায় হবে। সবাই ওর বাঁ পা-কে মাখনের ভেতর চলা ছুরির সঙ্গে তুলনা করত। কিন্তু ছিয়াত্তরে আমি মোহনবাগানে আসার পর সে বারই প্রসূন ডান পায়ে আটটা গোল করেছিল। আর মোহনবাগানে ওর জুড়িদার প্রশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছিল দু’পায়েই আন্তর্জাতিক মানের পাস বাড়ানোর দক্ষতা। ক্লাবের চেয়ে বেশি ভারতের জার্সিতে ঝলমল করত প্রশান্ত।

ফরোয়ার্ডদের কাকে ছেড়ে কার কথা বলব? চিংড়ি (স্বপন) সেনগুপ্ত তিয়াত্তরে ইস্টবেঙ্গল-বিএনআর ম্যাচে অরুণ ঘোষকে দু’বার মাটিতে ফেলে দিয়ে দু’টো গোল করে অত বিরাট মাপের (জার্নালের পরেই আমার মতে ভারতের সর্বকালের সেরা দুই স্টপার অরুণ আর নইম) ডিফেন্ডারকে অবসরই নিতে বাধ্য করেছিল!

সুরজিৎ সেনগুপ্তর খেলার সব কিছুই শৈল্পিক! শুধু পিন্টুর মতো নিজের শরীরের ব্যাপারে অত ভিতু না হলে আরও অনেক-অনেক বড় ফুটবলার হতে পারত। কৃশানু দে-ও তাই। স্কিলে ভরপুর। কিন্তু একটু বেশিই নরমসরম গোছের ফরোয়ার্ড।

বিদেশ-মানসের মতো উইঙ্গার জুটি কোচিং জীবনে আর দ্বিতীয়টি পাইনি। রাইটআউটে খেলে লিগে এক মরসুমে ২৩টা গোল আমিও কোনও দিন করতে পারিনি!

আকবরের মতো সেন্টার ফরোয়ার্ড এখন ভূ-ভারতে নেই। শু্যটারের মতো নিঁখুত লক্ষ্যভেদী শট ছিল পায়ে। বক্সের মাথায় আকবর বল পেলে বিপক্ষের আর রক্ষে নেই!

কসমস-এর পেলের সঙ্গে পিকে-র মোহনবাগান

আর এক জন জেভিয়ার পায়াস। ভারতীয় ফুটবলে আমার দেখা সেরা টার্নার। বল পায়ে পায়াসের মতো মাত্র পাঁচ ফুট ব্যাসার্ধের মধ্যেই টার্নিং নিতে আমি এ দেশে আর কাউকে দেখিনি! ও রকম এক-একটা টার্নিংয়ে কত বার যে পায়াস বিপক্ষের গোলমুখ ওপেন করে দিয়েছে!

কিন্তু আমার পঞ্চপাণ্ডব এদের সবার চেয়ে অন্য রকম! অন্য জাতের ফুটবলার!

যেমন সুধীর কর্মকার।

সুধীর আমার সৃষ্টি নয়। ইস্টবেঙ্গলে সুধীর আমার সংগ্রহও নয়। দুটোর জন্যই আমি কোনও কৃতিত্ব দাবি করতে পারি না। তবু ও আমার প্রিয় পাঁচ ছাত্রের মধ্যে এক নম্বরে। একেবারে টপ ব্র্যাকেট ফুটবলার।

পাঁচ ফুট সাড়ে পাঁচ ইঞ্চি উচ্চতা। যে হাইট নিয়ে বিশ্বের যে কোনও প্রান্তে যে কোনও সাইডব্যাক বড়জোর চলনসই মানের হতে পারে। কিন্তু সুধীর ছিল একেবারে আক্ষরিক অর্থে বিশ্বমানের রাইটব্যাক। বাহাত্তরে ইস্টবেঙ্গলে কোচ হয়ে আসার আগেই ওকে সত্তরের এশিয়াডে আমার টিমে পেয়েছিলাম।

সুধীরের খেলার প্রথমেই যে ব্যাপারটা আমাকে অবাক করেছিল সেটা হল, মাঠে প্রতি সেকেন্ডে ওর মস্তিষ্কে ম্যাচটার বিভাজন ঘটা! অর্থাৎ এখন বলটা মাঠের এই জায়গায় আছে...অমুক প্লেয়ারের দখলে আছে...পরের মুহূর্তেই বলটা তমুক পাবে... পেলে তখন অ্যাটাকটা এ রকম ভাবে হবে... আমাকে তখন অমুক পজিশনে গিয়ে তমুক প্লেয়ারকে মার্ক করতে হবে... অমুক সময় আমি ট্যাকলে যাব... তমুককে না ধরে অমুককে তাড়া করব... ইত্যাদি, ইত্যাদি!

কী ভারতের নীল জার্সি আর কী ইস্টবেঙ্গলের লাল-হলুদ জার্সি, বহু ম্যাচের পর অনেক বার আমি সুধীরের কাছে জানতে চেয়েছি, হ্যাঁরে, তুই যে অপোনেন্টের অমুক অ্যাটাকটার সময় বক্সের মধ্যে ওদের সেন্টার ফরোয়ার্ডের পায়ে বল থাকলেও তাকে ছেড়ে দিয়ে উইঙ্গারটাকে ট্যাকল করতে চলে গেলি। আর সেটাই ঠিক হল, কারণ, পরের সেকেন্ডেই সেন্টার ফরোয়ার্ড নিজে শট না দিয়ে আরও সুবিধেজনক জায়গায় উঠে আসা উইঙ্গারকে পাস দিল। তুই সামনে না থাকলে অবধারিত গোল খেতাম— সেটা বুঝলি কী ভাবে?

বিশ্বাস করুন, সুধীর ঠিক যতটা দাপুটে ফুটবলার, ততটাই গলাটা মিনমিনে। মেয়েলি ধরনের। কুঁইকুঁই করে প্রতি বার অসহায় ভাবে আমাকে বলত, “প্রদীপদা, আমার মনে হল, তাই...!” আর কী আশ্চর্য! সুধীরের ওই ‘মনে হল’টা একশো বারের মধ্যে একশো বারই ঠিক মনে হত! একে ঈশ্বরপ্রদত্ত ক্ষমতা ছাড়া আর কী বলবেন? ফুটবলদেবতার বরপুত্র না হলে কেউ মাঠে এ রকম ম্যাজিক দেখাতে পারে না! এ ব্যাপারে পেলে, মারাদোনা আমার কাছে যা, রিষড়ার ভেতো বাঙালি ফুটবলার সুধীর কর্মকারও তাই!

সুধীরের আর একটা অসাধারণ বিশেষত্ব হল, সাইডব্যাক হলেও ম্যাচে এক মুহূর্তের জন্যও হাঁটত না। সাইডব্যাকরা সাধারণত উইদাউট বল মাঠে হাঁটে। সুশীল গুহ, শৈলেন মান্না, রতন সেনের মতো প্রবাদপ্রতিমদেরও ওই ভাবে ম্যাচে হাঁটতে দেখেছি। কিন্তু সুধীর প্রতিটা সেকেন্ড ঠিক ঘোড়ার মতো ‘ট্রট’ করত। টগবগ-টগবগ করতে-করতে ছুটে চলত। যার জন্য বিপক্ষের অ্যাটাকের সময় অত তাড়াতাড়ি বলের কাছাকাছি পৌঁছে যেতে পারত। আর ছিল দু’পায়েই সমান নিঁখুত আর শক্তিশালী ট্যাকল।

সুধীরকে আমি মাত্র তিনটে ম্যাচ ‘অ-সুধীর’ স্ট্যান্ডার্ডে খেলতে দেখেছি। ঊনসত্তরের শিল্ড ফাইনালে প্রণব গঙ্গোপাধ্যায়ের জোড়া গোলে মোহনবাগান যে ম্যাচে ইস্টবেঙ্গলকে ৩-১ হারিয়েছিল আর তিয়াত্তরের মারডেকায় মালয়েশিয়া ম্যাচে সুধীর কুৎসিত ফুটবল খেলেছিল। অথচ, তার আগের ম্যাচেই ব্রাজিলের বিখ্যাত ফ্লেমিঙ্গো-র সঙ্গে ভারতের ২-২ ড্রয়ে অসাধারণ ফর্মে ছিল সুধীর। এ ছাড়া একাত্তরে ভারতীয় দলের রাশিয়া সফরে একটা ম্যাচে খারাপ খেলেছিল সুধীর। আসলে যত বড় প্লেয়ারই হোক, প্রত্যেকের একটা-দুটো খারাপ দিন আসতেই পারে। সেটাই স্বাভাবিক। নয়তো সে তো মানুষই নয়, অতিমানব!

সুধীরকে অবশ্য অতিমানবও হয়ে উঠতে দেখেছি। ডিসিএম ফাইনালে উত্তর কোরিয়ার ডক রো গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে। যে ম্যাচ পরপর দু’ দিন গোলশূন্য ড্র হওয়ায় বিদেশিরা দেশে ফেরার অজুহাত দেখিয়ে না খেলে পালিয়ে যাওয়ায় ইস্টবেঙ্গলকে ট্রফি দিয়ে দিয়েছিল দিল্লির সংগঠকেরা।

ডিসিএমের আগেই শিল্ডে ইস্টবেঙ্গলের সেই ঐতিহাসিক ৩-১ হারানো পিংয় ইয়ং-কে। ওরাও উত্তর কোরিয়ার ক্লাব। দেশে ফিরে ওরা নাকি ডক রোং গ্যাংকে বলেছিল, ইস্টবেঙ্গলকে হারাতে গেলে ভারতে পুরো শক্তি নিয়ে যেয়ো। নইলে মুশকিলে পড়বে।

সাত জন বিশ্বকাপার নিয়ে ডিসিএমে এসেছিল ডক রো গ্যাং। দীর্ঘ একচল্লিশ বছর পরেও স্পষ্ট মনে করতে পারছি, ফিরতি ফাইনালের একেবারে শেষের দিকে আমার দুই সাইডব্যাক প্রবীর মজুমদার আর সুধীর দু’জনই ওভারল্যাপে উঠে গিয়েছে। যেটা আমার একেবারে ম্যান্ডেটরি নিষেধ ছিল যে, দু’জন সাইডব্যাক কোনও সময় একসঙ্গে ওপরে উঠবে না। না তো না।

পরপর দু’দিন ফাইনালে সেটা মনে রাখলেও ম্যাচ শেষ হওয়ার কয়েক মিনিট বাকি থাকতে সেটা হয়তো আমার ছেলেরা ভুলে গিয়েছিল। সুধীর ওভারল্যাপে গিয়েছে দেখেও প্রবীর আমার নিষেধ ভুলে ওভারল্যাপে উঠে গিয়েছিল। আর সেই সুযোগে ওদের সেন্টার ফরোয়ার্ড তার রাইটআউটকে ইস্টবেঙ্গল ডিফেন্সিভ থার্ডে ফাঁকায় বল পাঠিয়েছে। প্রবীর তখন কোথায়?

রাইটব্যাক সুধীর সেই দেখে চকিতে পিছন ঘুরে লেফট উইং ধরে বিদ্যুতের গতিতে নামতে শুরু করেছে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ইস্টবেঙ্গল পেনাল্টি বক্সে কোরিয়ান সেন্টার ফরোয়ার্ড আর রাইটআউটের মাঝে সুধীর। ততক্ষণে ওদের লেফট আউটও ঢুকে পড়েছে। তিনের বিরুদ্ধে এক! রাইট আউট থেকে বল সেন্টার ফরোয়ার্ডের পায়ে। সামনেই গোল। গোটা স্টেডিয়াম ধরে নিয়েছে সে-ই গোলে মারবে। সুধীর দোনোমনো করছে ট্যাকল করবে কি করবে না!

কিন্তু ধূর্ত সেন্টার ফরোয়ার্ড আরও নিশ্চিত গোল পাওয়ার জন্য নিজে না মেরে বক্সে আরও সুবিধেজনক পজিশনে থাকা তার লেফটআউটকে স্কোয়ার পাস করল। আর করেই হতবাক হয়ে গিয়ে আবিষ্কার করল, তার ঠিক আগের সেকেন্ডেই সুধীর অন্য দুজনকে ছেড়ে লেফটআউটকেই ধরে নিয়েছে। এবং লেফটআউট বল স্পর্শ করতেই তাকে দুর্দান্ত ট্যাকল করে বল কেড়ে নিয়ে লম্বা ক্লিয়ার করে দিয়েছে সুধীর! কী অবিশ্বাস্য রকমের ফুটবল-সেন্স থাকলে তবেই কেউ এ রকম বল পজেশনে বিজয়ী হতে পারে!

গোটা স্টেডিয়াম সেই মুহূর্তে উঠে দাঁড়িয়ে সুধীরকে হাততালিতে ভরিয়ে দিচ্ছে আর আমি সাইডলাইনের সামনে দাঁড়িয়ে শিশুর মতো হাউহাউ করে কাঁদছি! আহা! এ কী দেখিলাম, জন্ম-জন্মান্তরেও ভুলিব না! সাড়ে পাঁচ ফুট নয়, সুধীরের উচ্চতা আসলে পাঁচশো ফুট!

দেশের তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্টের হাত থেকে ট্রফিফ্রফি নিয়ে ড্রেসিংরুমে ফিরে এসে যখন সুধীরের কাছে জানতে চাইলাম, কী করে ও ওই মোক্ষম সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তটা নিল, সুধীর বরাবরের মতো মিনমিনে গলায় বলেছিল, “আমার মনে হল...!” সে দিন ওকে বলেছিলাম, তোকে সোনা দিয়ে মুড়ে দিলেও কম হবে! তার উত্তরে সুধীর কী বলেছিল জানেন? “আমাদের তো সোনার দোকান আছে। বাবা সেখানে চাকরি করে!”

সুধীর যতটাই শান্ত প্রকৃতির, আমার পরের প্রিয় ছাত্রটি আবার ততটাই দামাল!

সুভাষ ভৌমিক!

ইস্টবেঙ্গলে তিয়াত্তরের মরসুমে প্রথম দিনের প্র্যাকটিসেই আমাকে হাউহাউ করে চেঁচিয়ে বলেছিল, “গুরু, ওরা (মোহনবাগান) আমার নামে শনিপুজো দিয়েছে। আমাকে খোঁড়া বদনাম দিয়ে তাড়িয়েছে। তুমি আমাকে যা বলবে আমি তাই-ই করব। তোমাকে জান দিয়ে দেব। শুধু ওদের বদলা নিতে হবে!” আমি সুভাষকে হেসে বলেছিলাম, “তোকে জান দিতে হবে না, ফুটবলটা দিস।”

সুভাষের মধ্যে যেটা আমি প্রথম লক্ষ করেছিলাম, সেটা ওর শরীরের গঠন। একেবারে ইউরোপিয়ান ফুটবলারদের মতো। শরীরের সেন্টার অব গ্র্যাভিটি অর্থাৎ ভরকেন্দ্র নীচের দিকে। যে জন্য মাঠে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। চওড়া উরু। শরীরের পিছনের অংশ বলশালী। তেমনই প্রচণ্ড শক্তিশালী পেশি।

সেন্টার অব গ্র্যাভিটির কারণেই একটু ঝুঁকে হাঁটে। যেটা সবাই ভাবে সুভাষ দারুণ চালে হাঁটাহাঁটি করে! ডান পায়ে কামানের গোলার মতো শট। পরের ছয়-সাত বছরে ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানে আমি ওর বাঁ পা-টাকেও তৈরি করেছিলাম।

সুভাষের আর একটা বিশেষত্ব ওর বিশ্বমানের গতি। প্র্যাকটিস করিয়ে করিয়ে যেটাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছিলাম। সকালে ইস্টবেঙ্গল মাঠে পুরো টিমের সঙ্গে প্র্যাকটিস করিয়ে ফের বিকেলে ওকে আলাদা ভাবে নিয়ে পড়তাম ওয়াইএমসিএ মাঠে।

এক দিন ওকে চোদ্দোটা স্প্রিন্ট টানানোর পর হাউমাউ করে চেঁচাতে লাগল, “আমি আর পারব না... আর খাটাবেন না...এ বার মরে যাব... আমাকে ছেড়ে দিন!”

আমি বলেছিলাম, তা হলে মোহনবাগানকে বদলা নিবি কী করে? ব্যস, যে-ই বলা, ভোম্বলবাবু আবার মাঠে স্প্রিন্ট টানতে শুরু করে দিল। পনেরো..ষোলো...সতেরো....আঠারো .....উনিশ......কুড়িটা পর্যন্ত স্প্রিন্ট টেনেছে তার পর প্রতি দিন।

সুভাষের যাতে মনঃসংযোগে বিন্দুমাত্র চিড় না ধরে সে জন্য ওর সদ্যবিবাহিত স্ত্রীকে এক মাসের জন্য বাপের বাড়িতে গিয়ে থাকতে বলেছিলাম। খুকু আমার কথা শুনেওছিল।

এক মাসের জায়গায় ছ’মাস সুভাষকে ছেড়ে বাপের বাড়িতে ছিল। সুভাষ তো আমার ওপর রেগে কাঁই। সে দিন গুরুটুরু সব চুলোয়! আমাকে চার অক্ষরের গালাগাল দিয়ে এমনও বলেছিল, “লোকটা আমার বৌকে পর্যন্ত আমার থেকে কেড়ে নিয়েছে!”

হাড়ভাঙা পরিশ্রমের হাতেনাতে ফলও পেয়েছিল সুভাষ। টানা তিন মরসুম মোহনবাগানকে নিয়ে প্রায় প্রতি ম্যাচে ছেলেখেলা করেছিল। পঁচাত্তরের শিল্ড ফাইনালে মাঝমাঠ থেকে প্রচণ্ড গতিতে করা একের পর এক ডজে মোহনবাগানের চার-পাঁচজনকে কাটিয়ে বক্সের মধ্যে ঢুকে নিজে ফাঁকা গোলে না মেরে, সতীর্থদের হাত নেড়ে-নেড়ে ডেকে এনে পাস দিয়ে গোল করিয়েছিল।

বড় ম্যাচের সুদীর্ঘ ইতিহাসে ওই দৃশ্য তার আগে কেউ কখনও দেখেনি, পরেও মনে হয় কোনও দিন কেউ দেখবে না! পঁচাত্তরের শিল্ড ফাইনালে সুভাষের ওই ভয়ঙ্কর রূপ দেখে আমার নজরুলের কবিতার সেই বিখ্যাত লাইনগুলো মাঠেই মনে পড়ে গিয়েছিল—‘...গর্জে ওঠে বঞ্চিত বুকে পুঞ্জিত অভিমান...!’

আমি এখনও বিশ্বাস করি, সুভাষ ফুটবল না খেলে অ্যাথলেটিক্স করলে বলে-বলে এগারো সেকেন্ডের কমে একশো মিটার দৌড়ত। প্র্যাকটিসে তিরিশ মিনিটে কুড়িটা স্প্রিন্ট টানতে পারত ও। ঘরোয়া টুর্নামেন্টে সত্তর মিনিটের ম্যাচে স্প্রিন্ট টানত ৩৫ থেকে ৪০ বার। আর আন্তর্জাতিক ম্যাচে নব্বই মিনিটে ৫০-৫৫ বার। বল পায়ে একটু ঝুঁকে আস্তে-আস্তে স্পিডটা তুলে যখন টপ স্পিডে পৌঁছত, মনে হত যেন একটা বুলডোজার সামনে যা পাচ্ছে, সব ভেঙেচুরে এগিয়ে চলেছে।

এর পর যাকে বাছলাম সে আমার পঞ্চপাণ্ডবের অর্জুন! মহম্মদ হাবিব।

হাবিবকেই আমি সবচেয়ে বেশি একট কথা বোধহয় বলেছি। তোমাদের অসাধারণ ফুটবলার হয়ে ওঠার ক্ষমতা তোমাদেরই অন্তর্নিহিত। তোমাদের ভেতরেই সেটা ফল্গুধারার মতো বয়ে চলেছে। আমি শুধু সেটাকে ঝরনা হয়ে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করেছি মাত্র। আসল কৃতিত্বটা তাই তোমাদেরই। তোমাদের সত্যিকারের চ্যাম্পিয়ন ফুটবলার হয়ে ওঠার তীব্র বাসনা, আকাঙ্খাকে আমি শুধু উসকে দিয়েছি। যার নাম প্রেরণা জোগানো।

হাবিবকে বলতাম, কেননা ওর মতো নিষ্ঠাবান ফুটবলার, ওর মতো নিয়মানুবর্তীতা, ওর মতো বছরের পর বছর প্রতিটা ম্যাচে দুর্বার হয়ে ওঠার বাসনা আমার দীর্ঘ পঁচিশ বছরের কোচিং জীবনে আর কোনও ফুটবলারের মধ্যে দেখিনি। না কোনও ভারতীয় ফুটবলার, না এ দেশে খেলতে আসা কোনও বিদেশি ফুটবলারের মধ্যে।

‘পারব না’ শব্দটাই হাবিবের ফুটবল অভিধানে ছিল না। অকুতোভয়। অথচ ধর্মভীরু। রোজ দিনে পাঁচ বার নমাজ পড়ত। নিশ্চয়ই এখনও পড়ে। মুসলমানরা যাকে ‘পাঁচ ওয়াক্ত নমাজ’ বলে। কী মাঠে আর কী মাঠের বাইরে সব সময় ঝকঝকে জামাকাপড় পরা অভ্যাস। হাবিবের পোশাকে সামান্যতম ময়লা আজ পর্যন্ত কেউ আবিষ্কার করতে পারেনি। ধোপা-বাড়ি থেকে কাচা পোশাক পরে প্রতি বার নমাজ পড়ত। উচ্চারণ, কথাবার্তা কোনও দিনই খুব একটা পলিশড্ নয়। কোনও বিষয়েই গভীর জ্ঞানের ধার ধারে না।

কিন্তু মাঠে নামলে একেবারে বাঘের বাচ্চা। কাউকে ভয় পেত না। কসমস ম্যাচের দিন টিম মিটিংয়ে বলেছিল, “আরে প্রদীপদা, ছোড়িয়ে তো! পেলে ভি ফুটবলার হ্যায়, ম্যায় ভি ফুটবলার হু। হাম দোনো একই খেল খেলতা হ্যায়। আউর উসকা নাম ফুটবল। পেলে কো ভি আজ ছোড়েঙ্গে নেহি।”

পেলের বিরুদ্ধে খেলতে নামার আগে গোটা পৃথিবীতে হাবিব ছাড়া এ রকম কথা কেউ কোনও দিন বলেছে কি না সন্দেহ! পেলে নিয়ে কেউ এমন কথা আগে কখনও শুনেছেও কি?

এবং ছোট মুখে বড় কথা মনে হবে হয়তো। কিন্তু সে দিন মাঠে হাবিব বস্তুটি কী, পেলে সেটা খানিকটা বুঝেছিলেন বোধহয়!

পেলের বিরুদ্ধে আমার মোহনবাগান টিমের স্ট্র্যাটেজি ছিল— পেলে নিজের অর্ধে বল ধরলে তাঁকে হাবিবই ট্যাকল করবে। আর মোহনবাগান অর্ধে পেলেকে প্রথম ট্যাকল করবে গৌতম সরকার। ততক্ষণে ওর পাশে হাবিবও এসে যাবে। তার পর প্রদীপ চৌধুরী, সব শেষে সুব্রত। আর তাতেও যদি পেলেকে আটকানো না যায়, তা হলে আর কী করা যাবে! হাজার হোক পেলে তো! কিন্তু সে দিন বৃষ্টি ভেজা ইডেন মাঠের সুবিধে নিয়ে পেলেকে কার্যত আটকে দেওয়া গিয়েছিল। কিন্তু তাতে আমার যত না কৃতিত্ব, তার চেয়ে অনেক বেশি কৃতিত্ব হাবিবের।

সেন্টার ফরোয়ার্ড হওয়া সত্ত্বেও হাবিবের ডিফেন্সিভ কোয়ালিটিও ছিল দুর্দান্ত। অসাধারণ ট্যাকলার। অফুরন্ত দম। দারুণ ধূর্ত। স্কোরার হিসেবে শট বা হেড কোনওটাই অসাধারণ কিছু নয়। কিন্তু যেটাই করত অসম্ভব নিঁখুত করত। ঠিক তেমনই তীক্ষ্ম। যার ফলে হাবিবের পঁচানব্বই ভাগ শট বা হেড থেকে গোল হত। কিন্তু দিনের শেষে দেখা যেত, সেই সব গোলের পিছনে হাবিবের শক্তির চেয়ে রয়েছে বেশি মস্তিষ্ক প্রয়োগ।

সুধীরের মতোই হাবিবকেও আমি তৈরি করিনি বা ক্লাবে তুলে আনিনি। কিন্তু আমার কোচিংয়েই হাবিব ওর জীবনের সেরা ফুটবলটা খেলেছে। একাত্তরে ভারতীয় দলের রাশিয়া সফরে মস্কো ডায়নামোর বিরুদ্ধে আমাদের একটা ০-২ হেরে যাওয়া ম্যাচের সেরা মুহূর্তটা হাবিবের অতুলনীয় দাপটে ভারতেরই হয়েছিল। ম্যাচের পর রাশিয়ানরা সেই মুহূর্তটা নিয়েই বেশি আলোচনা করছিল। নিজেদের দলের দু’গোলে জেতা নিয়ে নয়।

ঘটনাটা কী?

সে কাহিনি তোলা থাক পরের কিস্তির জন্য।

(চলবে)

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement
Advertisement

Share this article

CLOSE
Popup Close
Something isn't right! Please refresh.