Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৭ মে ২০২২ ই-পেপার

URL Copied
Something isn't right! Please refresh.

বড় একা লাগে

ছেলে বা মেয়ে পাশে নেই। আছে শুধু স্কাইপ। আর অমোঘ নিঃসঙ্গতা। লিখছেন পারিজাত বন্দ্যোপাধ্যায়চিংড়িমাছটা আর কিছুতেই রাঁধতে পারেন না স্নিগ্ধা! গলা

০৯ অগস্ট ২০১৪ ০০:২০
Save
Something isn't right! Please refresh.
ছবি: সুব্রত কুমার মণ্ডল  মডেল: অঞ্জনা বসু। লোকেশন: সৌজন্য ‘বধূবরণ’-এর সেট।

ছবি: সুব্রত কুমার মণ্ডল মডেল: অঞ্জনা বসু। লোকেশন: সৌজন্য ‘বধূবরণ’-এর সেট।

Popup Close

চিংড়িমাছটা আর কিছুতেই রাঁধতে পারেন না স্নিগ্ধা! গলা দিয়ে নামে না।

বনি বড্ড ভালবাসে খেতে। বেঙ্গালুরুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ক্যান্টিনে চিংড়িমাছ পাওয়াটা গঙ্গায় অ্যানাকোন্ডা পাওয়ার মতো দুর্লভ।

দেড়বছর হল স্নিগ্ধা আর পবিত্র-র একমাত্র মেয়ে বনি সেখানে ভর্তি হয়েছে। ভালমন্দ খেতে গেলেই ওর মুখটা মনে পড়ে যায়।

Advertisement

সার্ভে পার্কের ‘ফাঁকা-ফাঁকা লাগা’ ফ্ল্যাটে টেলিফোনে মেয়ের গলার আওয়াজ, স্কাইপ-এ দেখা তার চেহারাটুকু আঁকড়ে দিন কাটান বাবা-মা।

পুজোয় বনির ছুটি থাকে না বলে বাবা-মা-ই এ বার পুজোয় বেঙ্গালুরুতেই চলে যাবেন ঠিক করেছেন।

বছর তিনেক আগের ঘটনা। খুব হইচই হয়েছিল তখন। সোদপুরের ঘোলার বাসিন্দা এক প্রবীণ বাঙালি দম্পতি। তিন ছেলের কেউ কাছে থাকতেন না, খুব বেশি খোঁজখবরও নিতেন না। দিনযাপনে অপারগ হয়ে শয্যাশায়ী গুরুতর অসুস্থ স্ত্রী-কে খুন করে নিজে আত্মঘাতী হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বৃদ্ধ। তিন দিন বাদে হাসপাতালে তিনিও মারা যান।

পারিবারিক মনোমালিন্যের জেরে সল্টলেকের বাড়ি ছেড়ে টালিগঞ্জে ফ্ল্যাট ভাড়া করে চলে গিয়েছিলেন ছেলে-ছেলের বৌ। তারপর গত সাত বছর ধরে অনল ও সুনন্দা মাইতি একা। ছেলে খোঁজখবর নেয়। এক-দু’সপ্তাহ অন্তর দেখাও করে যায়। তবু বিষণ্ণতা পিছু ছাড়ে না অশতিপর অনল ও সত্তরোর্ধ্ব সুনন্দার। তাঁদের যেন সবই হারিয়ে গিয়েছে। সুনন্দার কথায়, “খাঁ খাঁ করা বিশাল দোতলা বাড়িটার বারান্দায় ভূতের মতো আমরা দুই বুড়োবুড়ি বসে থাকি।”

সল্টলেকের অরবিন্দ নিয়োগী নিউমোনিয়ায় শয্যাশায়ী হওয়ার পর দিশেহারা হয়ে গিয়েছিলেন স্ত্রী নমিতা। হাঁটুর সমস্যায় তিনি নিজে ঘরবন্দি বহু দিন। বাইরের সব কাজ সামলাতেন অরবিন্দবাবুই। তিনিও বিছানায় পড়লেন। ডাক্তার এসে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করতে বললেন।

প্রবীণ দম্পতির চোখে তখন অন্ধকার। একমাত্র সন্তান দেবদত্ত আমেরিকার কলোরাডোর বাসিন্দা বেশ কয়েক বছর। কে হাসপাতালে ছুটোছুটি করবে?

আজকাল আত্মীয়স্বজনদের কারও সময় নেই। শেষ পর্যন্ত বাড়িতেই নার্স আর অক্সিজেনের ব্যবস্থা করে দেন পরিচিত ডাক্তারবাবু।

লেকমার্কেটে বাগানওয়ালা দোতলা বাড়িতে দু’টি মাত্র প্রাণী। নিবেদিতা আর চিন্ময় গঙ্গোপাধ্যায়। চিন্ময় বহুজাতিক সংস্থা থেকে অবসর নিয়েছেন অনেক দিন। বয়স পঁচাত্তর পেরিয়ে গিয়েছে। একমাত্র সন্তান নিরুপমার বিয়ে হয়েছে অষ্ট্রেলিয়ায়।



মাসখানেক ধরে এক প্রোমোটার কিছু ষণ্ডাগণ্ডা লোক নিয়ে এসে বাড়ি বিক্রির জন্য চাপ দিচ্ছেন। সিঁটিয়ে রয়েছেন চিন্ময়বাবুরা। খুব মনে হচ্ছে, এই সময় মেয়ে-জামাই-নাতি কাছে থাকলে অনেকটা ভরসা পেতেন।

একমাত্র সন্তান আদ্রিতার বাইরে পড়তে যাওয়া-কে অবশ্য খুব স্বাভাবিক ভাবে নিয়েছেন সল্টলেকের পিয়ালি আর আশিস মুখোপাধ্যায়। এখন তো এমন যুগ নয় যে, কবে একটা চিঠি আসবে তার জন্য হা-পিত্যেশ করে বসে থাকতে হবে। প্রতিদিনই কথাবার্তা বলা যায়। জানান, মেয়ের অভাববোধটা থাকেই কিন্তু সেটা নিয়ে বেঁচে থাকাটাও একটা সময় অভ্যাস হয়ে যায়। যখন দেখেন যে মেয়ে অনেক স্বাবলম্বী হয়েছে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার শক্তি বেড়েছে, তখন নিশ্চিন্ত লাগে।

দুই ছেলে বিদেশে সংসার পাতার পর পারমিতাও নিজের মতো বাঁচার অবলম্বন খুঁজে নিয়েছেন। স্বামী মারা গিয়েছেন অনেক দিন। নিউ আলিপুরের বাড়িতে গানের স্কুল চালান পারমিতা। ছাত্রছাত্রীরা তো আছেই, তা ছাড়া কিটিপার্টির নিয়মিত আয়োজক।

পার্টির বন্ধুরা মিলে নানা রকম এগজিবিশন করেন, বেড়াতে যাওয়ার দলের সঙ্গে যুক্ত। আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক, প্রয়োজনে তাঁরা পাশে দাঁড়ান। মাঝেমাঝে ছেলেদের কাছে ঘুরে আসেন কয়েক মাস।

সোনারপুরের চিত্রিতার গল্প আবার আলাদা। দুই ছেলে নিশান আর নির্বাণকে নিয়েই জগত্‌ ছিল তাঁর। ওদের স্কুল, টিচার, টিউশন, পরীক্ষা, অসুখ, ফাংশন, টিফিন, বায়না, বেড়াতে যাওয়া নিয়ে বছরগুলো যেন পলকে কেটে গেল। তার পর একসময় চাকরি নিয়ে নিশান সিঙ্গাপুর আর নির্বাণ অষ্ট্রেলিয়ায়। ক্রমবর্ধমান ‘এনআরআইজ পেরেন্টস’-এর তালিকায় ঢুকে পড়লেন চিত্রিতা-রাও। স্বামী দেবরূপ বন্ধুবান্ধব, হাউসিংয়ের কো-অপারেটিভ, তাসের দল নিয়ে মেতে থাকেন। কাজ খুঁজে পান না চিত্রিতা। নিষ্প্রাণ জীবনযাপনে ধীরে ধীরে অবসাদের রোগী হয়ে যেতে থাকেন।

এক সময় বাঙালি পরিবারের একান্নবর্তী চরিত্র বদল নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছিল। এখন পরমাণু পরিবারও অণু-তে ভেঙে যাচ্ছে। একটি, বড়জোর দু’টি সন্তানের দু’জনেই বাবা-মায়ের থেকে ছিটিয়ে যাচ্ছেন অন্য দেশে, অন্য রাজ্যে বা শহরের অন্য প্রান্তে।

বাড়িতে পড়ে থাকা বয়স্ক বাবা-মায়ের কেউ পরিস্থিতি মানিয়ে নিচ্ছেন, কেউ বিশ্বাস করছেন, ছেলেমেয়ে বড় হওয়ার পর তাঁরা নিজের সংসার নিয়ে একটু দূরে থাকলেই বরং সম্পর্ক স্বাস্থ্যকর থাকে। আবার কেউ প্রিয়জনের এই দূরে থাকা মেনে নিতে না পেরে প্রতি পদে ঠোক্কর খাচ্ছেন।



এন্টালির বনানী সেনগুপ্তের মতামত এ ব্যাপারে খুব স্পষ্ট, “প্রতিটি মানুষই আসলে একা। জীবনে ভাল থাকার জন্য অন্যের উপর নির্ভর করলে হবে না। সন্তানেরা এক সময় বড় হবে। নিজের মতো জীবন কাটাবে এটাই স্বাভাবিক। বাবা-মাদের নিজেদের পন্থা খুঁজে নিতে হবে।”

বনানী আর অমল সেনগুপ্তের ছেলে তুষার আমেরিকায় রয়েছেন গত আট বছর। মেয়ে সমৃদ্ধির বিয়ে হয়েছে চেন্নাইয়ে। অমল বলেন, “কেরিয়ারে উন্নতি চাইলে পশ্চিমবঙ্গের বাইরে বেরোতেই হবে। মা-বাবা একা হয়ে যাবে ভেবে বাড়িতে বসে থাকা বোকামি। ইন্টারনেট, চ্যাট, স্কাইপ, হোয়াটস আপ-এর জমানায় দূরত্ব কোনও ব্যাপার নয়।”

বনানী জানান, ছেলে প্রতি রবিবার দু’ ঘণ্টা ফোনে আর স্কাইপে কথা বলে, সব অনুষ্ঠানে-পুজোয়-জন্মদিনে যোগাযোগ করে উইশ করে, যে কোনও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শুধুই পরামর্শ নয়, স্কাইপে তাঁর বলে দেওয়া রেসিপি অনুযায়ী বৌমা কত বার রান্নাও করেছেন। এর মধ্যে একাকীত্বের জায়গা কোথায়?

বনানী বিদেশিদের বাংলা শেখানোর কাজ করেন, কখনও ফিজিওথেরাপির ছোট কোর্স করেন, কখনও যোগব্যায়ামের প্রশিক্ষণ নেন, নিয়মিত আত্মীয়স্বজনের বাড়ি যান, গান করেন, বই পড়েন।

তাঁর কথায়, “ছেলেমেয়েরা শান্তিতে আছে জানতে পারছি, আমরাও জীবনের দ্বিতীয় ইনিংস ইচ্ছেমতো কাটাতে পারছি। এত দিন যে কাজগুলো করতে পারিনি সেই সব করছি। এই সময়টাকে এনজয় করতে না পারলে জীবনের প্রতি অন্যায় হবে।”

এতটা ইতিবাচক স্পিরিটে অবশ্য জীবনের তার বাঁধতে পারেননি সঙ্গীতা আর প্রবীর। কলকাতার উপকণ্ঠে ছোট্ট শিল্পশহরে সংসার ছিল তাঁদের। প্রবীর ইঞ্জিনিয়ার। হোমমেকার সঙ্গীতার জীবনের পুরোটাই আবর্তিত হত ছেলে অভিনন্দনকে কেন্দ্র করে। সেই ছেলে আইআইটি-তে সুযোগ পেয়ে রাজ্যের বাইরে পড়তে গেল। সঙ্গীতার জীবনের উপলক্ষটাই ঘেঁটে গেল। তার পর আরও ধাক্কা। সেই ছেলে চাকরি পেয়ে চলে গেল দক্ষিণ আফ্রিকার প্রত্যন্ত প্রান্তে।

সঙ্গীতার কথায়, “খুব কষ্ট হয়, খুব। অনুভূতিটা ঠিক ব্যাখ্যা করতে পারব না। প্রথম-প্রথম অস্বাভাবিক দুশ্চিন্তা হত। এখন সেটা থিতিয়ে সব সময়ের একটা চিনচিনে মনখারাপ থেকে গিয়েছে। ভাল কোনও জিনিস দেখলে, নতুন খাবার খেলে, নতুন জায়গায় গেলে মনটা মুচড়ে ওঠে। কত বার ছেলেটাকে একটু ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছা করে। মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়াতে ইচ্ছা হয়।”

মনে-মনে অভিনন্দনের ছোটবেলার দিনগুলোয় ফিরে যেতে ভাল লাগে তাঁর। পাতা উল্টে যায় পুরনো অ্যালবামের, অভিনন্দনের স্কুলের বইগুলোর, নেড়েচেড়ে দেখে খেলনা গাড়িগুলো, সময় কেটে যায় ছোটবেলায় তোলা মুভি ছবিগুলো দেখে। মনে হয়, সময় যদি থেমে থাকত, ছেলেটা যদি কোনওদিন বড় না হত, ভাল হত।

ঠিক একই কথা বলেছিলেন বরানগরের দীপ্তি ও শ্যামলেন্দু গুপ্ত। তাঁদের একমাত্র সন্তান ময়ূখ সেন্ট্রাল এক্সাইজের চাকরিতে এখন মহারাষ্ট্রে রয়েছেন।

শ্যামলেন্দু গল্প করছিলেন, “সে দিন আমরা দু’জন হোটেলে খেতে গিয়েছি। পাশের টেবিলে এক তরুণ দম্পতি তাঁদের পাঁচ-ছ’বছরের ছেলেকে নিয়ে এসেছেন। বাচ্চাটা খুব দুরন্ত। ঠিক যেমন ময়ূখ ছোটবেলায় ছিল। বাবা-মা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন, খুব বকা দিচ্ছেন, হাত টেনে জোর করে বসিয়ে দিচ্ছেন।

আমি আর থাকতে না পেরে বললাম, ‘এত বকবেন না ওকে। হঠাত্‌ একদিন দেখবেন দুম করে বড় হয়ে গিয়েছে, শান্ত হয়ে গিয়েছে, চাকরি করতে হয়তো দূরে কোথাও চলে গিয়েছে। তখন চারপাশ ফাঁকা লাগবে। ছোটবেলার এই দুরন্তপনাটাই তখন ভীষণ মিস করবেন। বকুনি দেওয়ার কথা মনে পড়লে তখন দেখবেন গলার কাছে প্রচণ্ড কষ্ট দলা পাকিয়ে উঠছে।”

অতীতের কোনও স্মৃতিই অবশ্য মনে রাখতে চান না পর্ণশ্রী-র রাখি চট্টোপাধ্যায়। একই শহরে একমাত্র ছেলে শরত্‌ থাকা সত্ত্বেও নিজেকে বুঝিয়েছেন তাঁর কোনও সন্তান নেই। বিয়ের কয়েক মাস পর থেকেই স্ত্রীকে নিয়ে আলাদা হয়ে যান ব্যাঙ্কঅফিসার শরত্‌। থাকেন উত্তর কলকাতায়।

বছরে দু’তিন বার নামকাওয়েস্তে ফোন ছাড়া আর কোনও যোগাযোগ রাখেননি বাবা-মায়ের সঙ্গে। রাখি আর শিবনাথের দিন কাটছিল চারটি বিড়াল আর একটি কুকুর নিয়ে। বছর দু’য়েক আগে সেরিব্রাল স্ট্রোকে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন শিবনাথ। অন্য দিকে বাত, হাইপ্রেসার আর সুগারে জর্জরিত রাখি। এমন অনেক দিন গিয়েছে যখন পর পর কয়েক দিন বাড়িতে বাজার হয়নি। পাড়ার লোক খাবার দিয়ে গিয়েছেন। পাড়ার রিকশাওয়ালা ডাক্তার ডেকে এনেছেন।

তার পর একদিন ঘুমের মধ্যেই মারা গেলেন শিবনাথ। ছেলেকে খবর দেননি রাখি। কয়েকজন আত্মীয়কে টেলিফোন করেছিলেন। তাঁরাই শ্মশানে নিয়ে যান। শ্মশানে অবশ্য ছেলে এসেছিল। দাঁড়িয়েছিল এক পাশে। এখন বিড়াল-কুকুরদের নিয়ে বাড়িতে একাই থাকেন রাখি। টেলিভিশন আর বই তার সঙ্গী। হোমসার্ভিসে খাবার আনেন। একটি সংস্থা বাড়িতে সারা মাসের ওষুধ পৌঁছে দেয়। আশ্রমে, বাজারে বা আত্মীয়ের বাড়ি যেতে হলে কাজের মেয়েটিকে সঙ্গে নেন, বদলে কিছু টাকা দিয়ে দেন। বলেন, “ঈশ্বরের কাছে শুধু একটাই প্রার্থনা। পঙ্গু করে বিছানায় যেন ফেলে না রাখেন। কারও বোঝা হতে চাই না।”



এমন নিঃসঙ্গ প্রবীণদের সাহায্যের জন্য কলকাতায় ‘ডিগনিটি ফাউন্ডেশন’ নামে একটি সংস্থা কাজ করে। তার মুখপাত্র সুপর্ণা মিত্র তাঁর নানারকম অভিজ্ঞতার কথা শোনাচ্ছিলেন। উচ্চবিত্ত পরিবারের এক বিধবা ভদ্রমহিলা ত্রিভোলি কোর্টে থাকেন। চার ছেলের চার জনই দেশ-বিদেশে চার জায়গায় ছড়িয়ে। হঠাত্‌ একদিন রাতে ভয়ঙ্কর মাথাঘোরা শুরু হল বৃদ্ধার, তার পর বমি, হাত-পা কাঁপা। সংস্থার নম্বর ছিল তাঁর কাছে। কোনও ক্রমে ফোনে যোগাযোগ করে দরজার লকটা খুলে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন। সুপর্ণাদের সংস্থার স্বেচ্ছাসেবকরাই হাসপাতালে ভর্তি করেন।

তার পর থেকে মাসে এক দিন বা দু’দিন কোনও না কোনও স্বেচ্ছাসেবক ভদ্রমহিলার বাড়ি গিয়ে তাঁকে কয়েক ঘণ্টা সঙ্গ দিয়ে আসেন। মহিলা তাঁদের জন্য খাবার বানিয়ে রাখেন, উপহার দেন, মনে জমে থাকা অনেক কথা ভাগ করে নেন যা কয়েক হাজার মাইল দূরে থাকা সন্তানদের সঙ্গে করা যায় না। “আসলে রক্তের তেজ কমার পর জীবনের অর্থ, লক্ষ্য সব বদলে যায়। ভালবাসার মানুষের কাছে থাকার আকুতি তুমুল হয়। আর এমনই জীবনের ট্র্যাজেডি যে, প্রিয়জনেরা তখন সঙ্গ দিতে পারেন না। তাঁরা তখন নিজেদের জীবনে ব্যস্ত হয়ে যান। ব্যাপারটা চক্রাকারে চলতে থাকে” আক্ষেপ করছিলেন সুপর্ণা।

নিঃসঙ্গ বৃদ্ধবৃদ্ধাদের জন্য স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার মাধ্যমে ‘প্রণাম’ নামে একটি হেল্পলাইন চালায় কলকাতা পুলিশ। সেই লাইনে এক-একদিন ২০-২৫টা ফোন আসে। ওই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার দায়িত্বে থাকা শুক্লা তরফদার জানাচ্ছিলেন, কেউ ফোন করে অ্যাম্বুল্যান্স চান, কেউ কাঁদতে-কাঁদতে বলেন, একা বাড়িতে তাঁর মন কেমন করছে! কেউ অসুস্থতার জন্য বাজার করতে পারছেন না, মিস্ত্রি খুঁজে পাচ্ছেন না। হয়তো লিফট বন্ধ হয়ে গিয়েছে বা ওষুধ ফুরিয়ে গিয়েছে। বাড়িওয়ালা ঝামেলা করে জল বন্ধ করে দিয়েছেন এমন সমস্যা নিয়েও বয়স্ক মানুষেরা ফোন করেন।

এক বার একটা ফোন এল বালিগঞ্জ থেকে। দোতলার ফ্ল্যাটের মাসিমা দেড় দিন বাড়ির বাইরে বেরোচ্ছেন না বলে ফোন করেছিলেন তাঁর এক প্রতিবেশী। মহিলার একমাত্র ছেলে জার্মানিতে থাকেন। স্বামী মারা গিয়েছেন। হেল্পলাইন থেকে স্থানীয় থানায় খবর গেল। পুলিশ এসে দরজা ভেঙে দেখে, মহিলা অচেতন হয়ে পড়ে আছেন।

আরেক বৃদ্ধ কড়েয়া থানা এলাকা থেকে ফোন করে জানালেন, তাঁর বাথরুমের গিজার খারাপ হয়ে গিয়েছে। মিস্ত্রি বলেছেন, রাত আটটার আগে আসতে পারবেন না এবং সঙ্গে এক সহকারীকে নিয়ে আসবেন। ভদ্রলোক একা থাকেন।

স্ত্রী গত হয়েছেন। একমাত্র মেয়ে আমদাবাদের বাসিন্দা। মিস্ত্রি সেজে এসে একাকী প্রবীণদের খুন করে টাকাপয়সা হাতিয়ে চম্পট দেওয়ার বহু ঘটনা ঘটে। ভদ্রলোক ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। তার পর আটটার সময় কড়েয়া থানা থেকে দু’জন কনস্টেবলকে পাঠানো হয়। তাঁদের উপস্থিতিতেই গিজার সারান মিস্ত্রিরা।

অন্যরকম একটা ভয় আজকাল তাড়া করে বেড়ায় পেশায় চিকিত্‌সক রঞ্জিত বসুকে। মরে যাওয়ার আগে যদি মেয়েকে চোখের সামনে দেখে যেতে না পারেন, ছুঁতে না পারেন, তখন? শরীরের একাধিক জায়গায় ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়েছে তাঁর। একমাত্র সন্তান চন্দ্রাবলীর বিয়ে হয়েছে আমেরিকার হিউস্টনে ১৯৯৮ সালে। তিনিই একাধিক বার নিজের কাছে নিয়ে গিয়ে চিকিত্‌সা করিয়েছেন বাবা-র। এখন কলকাতায় নিজের বাড়িতেই রয়েছেন রঞ্জিত আর তাঁর স্ত্রী শ্যামলী। মেয়ের সঙ্গে প্রতিদিনই কথা হয়। তখন তিনজনই কেঁদে ফেলেন। এমন একটা কঠিন সময় কাছে থাকতে না পারার যন্ত্রণা কুড়ে খায় তিন জনকেই।

নিরন্তর এমনই একটা কষ্ট বহতা ছিল লেকটাউনের সঞ্জিত আর নন্দিতা-র মধ্যে। নিঃসন্তান তাঁরা। বয়স ষাট পেরিয়েছে। এক জনের যদি কিছু হয়ে যায় তা হলে যিনি পড়ে থাকবেন তাঁর জীবন কী ভাবে কাটবে সেটা ভেবে অসম্ভব কষ্ট পেতেন দু’জনেই। এক-এক সময় দু’জনে একসঙ্গে আত্মহত্যা করবেন বলেও ভাবতেন। তার পর একদিন তাঁদের বিবাহবার্ষিকীতে বাড়ির ঠিকা কাজের মেয়েটি একবাটি শোলমাছ ভাপে রেঁধে হাজির! “বৌদি বলছিলে না আজকে তোমাদের বিয়ের দিন? কোথাও বেড়াতেও তো যাও না দু’জনে। খালি মুখ ভার করে ঘরের মধ্যে বসা। তাই নিয়ে এলাম। খাও দু’জনে। একটা ভাল শাড়ি পোরো কিন্তু আজ।”

নিঃসঙ্গতা নিয়ে তার পর থেকে আর কষ্ট পান না সঞ্জিত-নন্দিতা। কারণ, এই ঘটমান পৃথিবীতে কে, কখন একাকীত্ব ভরিয়ে দেয় কে বলতে পারে?



Something isn't right! Please refresh.

Advertisement