Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

১৫ অগস্ট ২০২২ ই-পেপার

URL Copied
Something isn't right! Please refresh.

ফিমেল রোল ছেড়ে কমেডিতে অনন্য হয়ে উঠলেন হরিধন

হাতিবাগান বাজারে আলু বেচা ছেড়ে তিনি হয়ে উঠলেন ‘আলিবাবা’ নাটকের মর্জিনা। হরিধন মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে লিখছেন সোমেশ ভট্টাচার্যহাতিবাগান বাজারে আলু

০৭ জুলাই ২০১৮ ০৭:৪০
Save
Something isn't right! Please refresh.
টানা পঞ্চাশ বছর নাট্যভারতী, কালিকা, রঙমহল আর স্টারে অভিনয় করে গিয়েছেন হরিধন।

টানা পঞ্চাশ বছর নাট্যভারতী, কালিকা, রঙমহল আর স্টারে অভিনয় করে গিয়েছেন হরিধন।

Popup Close

বাদুড়ে ভারী ভয় ছোটকর্তার। অথচ গৌরীবাড়ির দালানকোঠার পাশেই কাগজের গুদামে ধাড়ি বাদুড়দের হামেশাই আনাগোনা। এ বাড়িতেও উড়ে আসে যখন-তখন। বিরক্ত ছোটকর্তা দাদাকে বললেন, ‘‘এখানে তো টেকা দায়!’’ দাদা বলাই বক্সার মানুষ। তিনি কি বাদুড়ে ডরান? তাঁর ছেলে অনিলও বক্সার। কাকার খুব ন্যাওটা। দাদা বললেন, ‘‘এক কাজ কর! তোর বক্সার ছেলেকে নিয়ে চলে যা। ও-ই বাদুড়ের বাসা ভেঙে দেবে।’’ ছোটকর্তা বললেন, ‘‘না না, সে হওয়ার নয়। এই বাড়ি বিক্রি করে অন্য কোথাও চলুন।’’

বাড়িতে সবাই জানে, দুনিয়ার লোক ছোটকর্তার অ্যাক্টো দেখে হেসে গড়ালেও তিনি আসলে রাশভারী লোক, তাঁর কথার উপরে কথা চলে না। আর, দাদার তিনি চোখের মণি। সাবেক ভিটে ছেড়ে গৌরীবাড়িতেই নতুন বাসায় উঠে গেল মুখোপাধ্যায় পরিবার। বাড়িটা আগের চেয়ে ছোট, কিন্তু ত্রিসীমানায় বাদুড়ের ছায়া নেই!

এক টাকা নিয়ে লেবেঞ্চুসের কারবার শুরু

Advertisement

সেটা ১৯৪৭ সাল। সবে বছর দু’তিন হল সিনেমায় মুখ দেখিয়েছেন ছোটকর্তা, হরিধন মুখোপাধ্যায়। পেশাদার থিয়েটারে পা রেখেছেন বছর পাঁচেক আগে— শ্রীরঙ্গমে ‘মায়া’ নাটকে গায়ক-নায়ক, দাদার চরিত্রে শিশিরকুমার ভাদুড়ী। পায়ের তলায় জমি যে খুব পোক্ত হয়েছে, তা নয়। টুকটাক করে হলেও হাতে কাজ আসছে, এই যা।



হীরক রাজার দেশে

আর এই করতে-করতেই তো বয়স চল্লিশ ছুঁল। উত্তর ২৪ পরগনার গোবরডাঙার খাঁটুয়া গ্রামে ১৯০৭ সালের ১০ নভেম্বর যে ছেলেটি জন্মেছিল, তার নাম ছিল দীনবন্ধু। বয়স যখন মোটে দুই, বাবা ভুবনমোহন চোখ বুজলেন। দুই ছেলে নিয়ে মা গিরিবালার কষ্টের সংসার। তবু ছোট ছেলেকে ভর্তি করিয়েছিলেন শ্যামবাজার এভি স্কুলে। নট-নাট্যকার অমৃতলাল বসু সেক্রেটারি। বার্ষিক অনুষ্ঠানে ‘সিদ্ধার্থের গৃহত্যাগ’ নাটকের মহলায় ছোট্ট দীনবন্ধুর অভিনয় দেখে তিনি পিঠ চাপড়ে দিলেন।

এ দিকে সংসার চলে না। মা-কে কিছু না জানিয়েই এক টাকা নিয়ে লেবেঞ্চুসের কারবারে নামল দীনবন্ধু। বয়স মোটে এগারো কি বারো। শোভাবাজারের পাইকারের থেকে লেবেঞ্চুস কিনে স্কুলে বন্ধুদের কাছে বিক্রি করে। কিছু দিনের মধ্যে পঁচিশ-তিরিশ টাকা জমে গেল। বাহ, বেড়ে মজা তো! সে ঠিক করে ফেলল, ব্যবসাই করবে। ছাত্রবৃত্তি পাশ করেই স্কুল ছেড়ে দিল।

কিন্তু স্কুল ছাড়া মানে তো লেবেঞ্চুসের কারবার বন্ধ। সাবান-পাউডার নিয়ে মাঠে নামল, পিছলে গেল। ঢেঁকিছাঁটা চাল? উঁহু, তা-ও চলল না! শেষে দাদার বন্ধুর টাকায় শুরু হল হাতিবাগান বাজারে আলু বেচা। আর ফি সন্ধেয় থিয়েটার, কবিগান, কীর্তন, পাঁচালির আসরে হাজিরা। অভিনয়েরও খুব শখ। তবে রামায়ণ গানটাই টানছিল বেশি। ছোট থেকে গলায় ভরা সুর। দু’বার শুনলেই ঝপ করে তুলে ফেলতে পারে। ডালিমতলায় গরিবপাড়ার ছেলেমেয়েদের নিয়ে এক দিন সে খুলে বসল রামায়ণ গানের দল।

আর ভক্তিরসে হাবুডুবু খেতে-খেতেই কখন যেন লোকের মুখে-মুখে দীনবন্ধু হয়ে উঠলেন ‘হরিধন’।



ফুলেশ্বরী

কিন্তু সঙ্গীতের আরও গহনে ডুব দিতে হবে যে! তাই শিবা মিশ্র আর পশুপতি মিত্রের কাছে নাড়া বাঁধলেন। রাগরাগিণীর সাধনা শুরু হল। কিন্তু ‘ও সব গান গাইতে গেলে কলজের জোর দরকার।’ আধপেটা খেয়ে কি ও সব হয়? তাই ফের ও সব ছেড়ে নবদ্বীপ ব্রজবাসীর কাছে কীর্তন শিখতে লাগলেন।

এ দিকে শরীরটারও জুত নেই। মা আর দাদা তাঁকে বেড়াতে নিয়ে গেলেন পুরী। সেখানে সমুদ্রতীরে বসে আপন মনে পূরবী রাগে গান ধরেছেন, কখন যে আশুতোষ মুখোপাধ্যায় এসে দাঁড়িয়েছেন, খেয়ালই করেননি। তাঁর সঙ্গে কাশিমবাজারের মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দীও। হরিধনকে বাড়িতে ডেকে নিয়ে গিয়ে গান শুনলেন তাঁরা। খুব আদর-আপ্যায়নও করলেন।

কলকাতায় ফিরলেন। ক্যাম্পবেল হাসপাতালের (এখন এনআরএস) ডাক্তারদের হস্টেলে সরস্বতী পুজোয় গান গাওয়ার ডাক পড়ল। সেখানে গিয়ে সাক্ষাৎ নলিন সরকার স্ট্রিটের অসিত ঘোষালের সঙ্গে। তাঁরও নাটক করার ভারী শখ। বন্ধু হয়ে গেলেন দু’জনে।

সল্টলেক এ-ব্লকের বাড়িতে বসে হরিধনের ছেলে সুনীল হাসতে-হাসতে বলেন, ‘‘তখন আবার এক কাণ্ড! অসিতকাকু বড়লোকের ছেলে। কিন্তু মাঝে-মাঝে বাবার সঙ্গে বসে আলু বিক্রি করতেন। এক দিন এক আত্মীয় এসে বললেন, ‘দেখে এলুম, হরিধন আর অসিত বসে আলু বেচছে আর ফুকফুক করে সিগারেট টানছে!’ বাড়ির লোকের চোখ তো কপালে।’’

গান শুনে রবি ঠাকুর কাঁথা স্টিচের কাজ করা চাদর দিয়েছিলেন পুরী থেকে ফেরা ইস্তক হরিধনও ভাবছিলেন, স্যর আশুতোষ নিশ্চয়ই আলুওয়ালাকে আপ্যায়ন করেননি, করেছেন এক গানওয়ালাকে। তা হলে? সাতপাঁচ ভেবে আলুর ব্যবসাটা তুলেই দিলেন। কিন্তু খাবেন কী? অর্ডার সাপ্লাইয়ের ব্যবসা ধরলেন। বড়লোকদের বাড়ি থেকে মাসকাবারি ফর্দ এনে দোকান-বাজার করেন। বদলে মেলে পাইকারি রেট আর কমিশন।



পরশপাথর

ইতিমধ্যে ‘মিলনী’ ক্লাবে গিয়ে পরিচয় হয়েছিল অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে। তিনিই এক দিন হরিধনকে সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে। রবীন্দ্রনাথকে গান শুনিয়ে এলেন। পরে ঠাকুরবাড়িতেই কবির সামনে ‘মুক্তধারা’ নাটকে তিনি ধনঞ্জয় বৈরাগী। তাঁর মুখে ‘রইল বলে রাখলে কারে’ শুনে রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘বাহ, তুমি তো বেশ গাও!’

হরিধনের বউমা মমতা বলেন, ‘‘গান শুনে খুশি হয়ে রবি ঠাকুর ওঁকে কাঁথা স্টিচের কাজ করা গায়ের ঢাকা দিয়েছিলেন। কিন্তু সে আর নেই!’’ দেশবন্ধু পার্কের সভায় এলেন মহাত্মা গাঁধী, তাঁকেও গান শোনালেন হরিধন। দেশবন্ধুর মেয়ে, সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের মা অপর্ণা দেবী তাঁর কীর্তন শুনে পাঠিয়ে দিলেন রুপোর মেডেল। বালিকাদের নিয়ে হরিধন গড়লেন কীর্তন আর পাঁচালি গানের দল, কলকাতায় প্রথম।

কিন্তু শুধু গানে যে আর মন ভরছে না। অভিনয়ের কী হবে?

অসিতদের বাড়িতেই খোলা হল ‘দীনবন্ধু সম্মিলনী’। জোরকদমে নাটকের মহলা শুরু হল। বাড়ির গ্যারাজে স্টেজ বেঁধে করা হল প্রথম নাটক ‘ভক্তির ডোর’। কিন্তু স্ত্রী-ভূমিকা বর্জিত ‘নিরিমিষ’ নাটকে কি বেশি দিন মন ভরে? অথচ নারী চরিত্রে অভিনয়ই বা করবে কে?

‘‘এক দিন লুকিয়ে লুকিয়ে মায়ের একখানা শাড়ি পরে, ঘোমটা দিয়ে, কপালে টিপ লাগিয়ে আয়নার সামনে নিজেকে দেখলাম খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। মন্দ লাগছে না তো! হাইটটাও শর্ট আছে,’’ ভোলেননি হরিধন। ব্যস, তাঁকেই সুখদা সাজিয়ে নামিয়ে দেওয়া হল ‘পথের শেষে’ নাটকে। সেই শুরু। এর পর কত নারীচরিত্রে যে অভিনয় করেছেন! ‘বিবাহ বিভ্রাট’-এ ঝি, ‘জোরবরাত’-এ ঘটকি, ‘মানময়ী গার্লস স্কুল’-এ নীহারিকা এবং ‘আলিবাবা’য় ‘মর্জিনা’!

‘মর্জিনা’ কুসুমকুমারী দর্শক-হৃদয়ে হিল্লোল তুলেছিলেন

বিশের দশকের মাঝামাঝি ঠিক হল, দেশবন্ধু স্মৃতি ভাণ্ডারের টাকা তুলতে ‘জনা’ নাটক হবে। কিন্তু রাজমহিষী জনার চরিত্রে অভিনয় কি মুখের কথা? স্টার থিয়েটারের পিছন দিকে রাজাবাগানে থাকতেন ডাকসাইটে অভিনেত্রী তারাসুন্দরী। দু’খানা বাড়ি পরেই থাকেন নটী বিনোদিনী। হরিধন গিয়ে তারাসুন্দরীকে ধরে পড়লেন। ধামা হাতে মুড়ি খেতে-খেতে তিনিই আবৃত্তি করে দেখিয়ে দিলেন, কী ভাবে জনার চরিত্রে উতরোতে হবে।



ধন্যি মেয়ে

বছর পাঁচেক বাদে অসিতের বিয়ে। ঠিক হল ‘আলমগীর’ নাটক হবে। শিশির ভাদুড়ী তখন ওই চরিত্রে মঞ্চ কাঁপাচ্ছেন। মহলার সময়ে দু’-এক দিন চুরুট মুখে দাঁড়িয়ে দেখেও গিয়েছেন। বলেননি কিছু। বিয়ের দিন দর্শকাসনে দেবকী বসু, প্রমথেশ বড়ুয়ারা বসে। অভিনয় শুরুর আগে সাজঘরে এসে আলমগীরের মেকআপ দেখে প্রায় আঁতকে উঠলেন সে দিনের তারকা অভিনেতা ধীরেন গঙ্গোপাধ্যায় ওরফে ডিজি। তড়িঘড়ি সব তুলিয়ে নিজে হাতে হরিধনের গালে দাড়ি লাগিয়ে দিলেন। নাটকের শেষে প্রমথেশ বড়ুয়া গলায় পরিয়ে দিলেন সোনার মেডেল।

তিরিশের দশকে স্টার থিয়েটারে ‘মর্জিনা’ কুসুমকুমারী দর্শক-হৃদয়ে হিল্লোল তুলেছিলেন। কর্নওয়ালিস স্ট্রিটে (এখন বিধান সরণি) তখন ‘দীনবন্ধু ভাণ্ডার’ নামে স্টেশনারি দোকান খুলেছেন হরিধন। শখের চোটে ফাঁকা দোকানে মর্জিনার মতো নাচতে গিয়ে কাচের গ্লাসের উপরে পড়ে হাত কেটে রক্তারক্তি! মা বললেন, ‘দোকান বিক্রি করে দাও।’

ভাগ্য ভাল ছিল, কংগ্রেসের ভোট প্রচারে ‘বন্দেমাতরম’ গাওয়ার সুবাদে ভোটার লিস্ট তৈরির কাজ জুটে গেল কলকাতা কর্পোরেশনে। চল্লিশ টাকা বেতন। কর্তাদের গান শুনিয়ে খুশি করে পরে হয়ে গেলেন ইনস্পেকটর, বেতন বেড়ে পঁয়ষট্টি। কিন্তু কিছু দিন বাদে সে কাজও ফুরোল। এ বার কী করেন?

হঠাৎ ডাক এল শিশির ভাদুড়ীর কাছ থেকে

পঞ্চাশের মন্বন্তর দোরগোড়ায়। ত্রাণের টাকা তুলতে গৌরীবাড়ির দুর্গাপুজোয় নামালেন ‘আলিবাবা’। কিন্তু বৃষ্টিতে মাঝপথে সব ভণ্ডুল। দু’মাস ঘরে বসে। ডিসেম্বরে হঠাৎ ডাক এল শিশির ভাদুড়ীর কাছ থেকে। শ্রীরঙ্গমে ‘মায়া’ নাটক হবে।



সাড়ে চুয়াত্তর

পেশাদার রঙ্গমঞ্চ সেই যে ডেকে নিল, আর ফেরা হয়নি। টানা পঞ্চাশ বছর নাট্যভারতী, কালিকা, রঙমহল আর স্টারে অভিনয় করে গিয়েছেন।

ইতিমধ্যে সিনেমা হাতছানি দিয়েও চুক্কি দিয়েছে। অমৃতলাল বসুর নাটক নিয়ে ‘খাসদখল’ ছবি হল। হরিধনের মোসায়েবের চরিত্র। ছবি ডাহা ফ্লপ! তবে আবার সুযোগ এল। ১৯৪৩ সালে শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় করছিলেন ‘শহর থেকে দূরে’। ছোট্ট বাউল চরিত্র। হরিধনের লিপে ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের গলায় তুমুল হিট— ‘রাধে, ভুল করে তুই চিনলি না তোর প্রেমের শ্যামরায়।’

তখনও কিন্তু কৌতুকাভিনয় করার কথা ভাবেননি হরিধন। তাঁর নিজের কথায়, ‘‘কমেডি অভিনয়কে মনে মনে ঘেন্নাই করতাম।’’ কিন্তু সিরিয়াস রোলে যে ভীষণ প্রতিযোগিতা। অসিতের কাকা মাধব ঘোষাল ছিলেন রাধা ফিল্ম স্টুডিয়োর মালিক। তিনিই হরিধনকে নিয়ে গেলেন টালিগঞ্জে। বোঝালেন, কমেডিতে টক্করটা তত বেশি নয়।

তুলসী চক্রবর্তী এক দশক আগেই এসে গিয়েছেন। ছোটখাটো রোল পাচ্ছেন নবদ্বীপ হালদার আর নৃপতি চট্টোপাধ্যায়ও। ভানু-জহর তখনও এসে পৌঁছননি। অনুপকুমার দাস নামে এক বালক মুখ দেখিয়েছে। বাংলা ছবিতে কমেডির স্বর্ণযুগ আসি-আসি করছে। শুধুই কমেডি? বছর পাঁচেকের মধ্যে ভাগ্যান্বেষণে এসে পড়বেন এক মরিয়া তরুণ, উত্তমকুমার!

সত্যজিতের শুটিংয়ে এত দেরি করে কেউ তো আসেন না

১৯৪৪-এ দেবকী বসু করলেন ‘সন্ধি’। আর সেই ছবিতেই জন্ম হল কমেডিয়ান হরিধনের। তাঁর মুখে ‘জয় মা জাপানযাপিনী’ ডায়লগ বাজারে দারুণ হিট! উত্তম-সুচিত্রা জুটি জন্ম নিল ন’বছর বাদে। ‘সাড়ে চুয়াত্তর’, ১৯৫৩। তুলসী, ভানু, জহর, নবদ্বীপ আর মেসের খিটখিটে বোর্ডার হরিধন চালচিত্তির হয়ে দাঁড়ালেন নবাগত জুটির চারপাশে।



কাঞ্চনজঙ্ঘা

বছর পাঁচ বাদে ডাক এল সত্যজিৎ রায়ের ‘পরশপাথর’ ছবিতে। হরিধন শুনেছেন, তিনি ভারী লম্বা। স্টুডিয়োর বাইরে তেমন ঢ্যাঙা এক জনকে দেখে সত্যজিৎ ঠাউরে বেশ খানিক গল্পটল্প করে ফ্লোরে গেলেন। ভিতরে ততক্ষণ অপেক্ষা করছেন স্বয়ং সত্যজিৎ। তাঁর শুটিংয়ে এত দেরি করে কেউ তো আসেন না!

এই সত্যজিৎই বছর চারেক বাদে ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ ছবির শুটিংয়ের সময়ে দার্জিলিঙে ধরে রাখলেন হরিধনকে। গিয়েছিলেন মঞ্চ থেকে ছুটি ম্যানেজ করে। তাঁর কাজ শেষ। কিন্তু সত্যজিৎ বললেন, ‘থাকুন না। শরীরটা ভাল হয়ে যাক। ক’দিন লাগবে? দিব্যি হোটেলে আছেন, খাচ্ছেন।’ আসলে তত দিনে হরিধন তাঁর বেশ পছন্দের মানুষ।

বছর তিন বাদে ‘মহাপুরুষ’-এ তিনিই বুঁচকির মামা, যাকে না সাধলে বিরিঞ্চি বাবার দর্শন মিলবে না। ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’-এ গাঁয়ের চণ্ডীমণ্ডপে সেই কুটকচালে বুড়ো যে গুপীকে বলছে, ‘‘একখানা গেয়ে শুনিয়ে দাও না!’’ মজার ব্যাপার, সত্যজিতের ছবিতেও কিন্তু হরিধন অভিনয় করছেন নিজের চালেই। সত্যজিৎ-পুত্র সন্দীপ রায় বলেন, ‘‘ওঁর একটা খুব স্বকীয় ধারা ছিল। বাবা সেই স্বাধীনতাটা দিতেন। তবে ‘হীরক রাজার দেশে’র সংলাপ ছিল ছড়ায় বাঁধা, সেখানে তত স্বাধীনতা নেওয়া সম্ভব ছিল না।’’

হেমন্তকে বলেন, তুমি বাপু একগাদা বাজনা বাজিও না। গান নষ্ট হয়ে যাবে আমার ‘মিস প্রিয়ংবদা’য় মামা, ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’-এ সিধু খুড়ো। ‘ধন্যি মেয়ে’। ‘জয় মা কালী বোর্ডিং’। ‘বসন্ত বিলাপ’। ‘অগ্নীশ্বর’। ‘মৌচাক’। তরুণ মজুমদারের ‘পলাতক’, ‘একটুকু বাসা’, ‘বালিকা বধূ’, ‘ফুলেশ্বরী’...

ওই ‘ফুলেশ্বরী’তেই তো দু’হাতে রেলের সিগন্যাল ফ্ল্যাগ নিয়ে নেচে-নেচে গাইলেন সেই গান— ‘আমি তোমায় বড় ভালবাসি’। সিনেমায় প্লেব্যাক তাঁর এই প্রথম নয়। ‘সন্ধি’তে গেয়েছিলেন। পরের বছর নীরেন লাহিড়ীর ‘ভাবীকাল’ ছবিতেও। পরে ‘এন্টনী ফিরিঙ্গী’ আর ‘ভোলা ময়রা’ ছবিতেও গেয়েছেন।



স্টার থিয়েটারে ‘সমাধান’ নাটক দেখতে মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়

কিন্তু ফুলেশ্বরীর গানের সুরও তাঁরই দেওয়া। সঙ্গীত পরিচালক হেমন্ত মুখোপাধ্যায় আপত্তি করেননি। হরিধনের কথায়, ‘‘বললুম হেমন্তকে, ‘তুমি বাপু একগাদা বাজনা বাজিও না। গান নষ্ট হয়ে যাবে আমার। আমি আগে গলা ছাড়ব, তার পর তোমাদের বাজনা-বাদ্যি একটু-আধটু।’ মেনে নিলে।’’

১৯৮১ সালে সুনীল সল্টলেকে বাড়ি করলেন। গৌরীবাড়ির বাস উঠল। হরিধন তখনই ঠিক করে ফেলেছিলেন, আর সিনেমা নয়। বছর দুয়েকের মধ্যে শেষ হয়ে গেল চার দশকের সিনেমা-জীবন।

নাটক কিন্তু তখনও ছাড়েননি। বা বলা ভাল, নাটকই ছাড়েনি তাঁকে। সিনেমা তাঁকে বাড়তি আলো জুগিয়েছে ঠিকই, কিন্তু থিয়েটার ছিল তাঁর শ্বাসবায়ু। ‘কবি’, ‘উল্কা’, ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’, ‘আমি মন্ত্রী হব’, ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’, ‘সমাধান’, ‘দেবদাস’, ‘সাহেব বিবি গোলাম’, ‘রামের সুমতি’... প্রায় বাইশ বছর রঙমহলে, শেষ আঠারো বছর স্টারে। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের ডাকে রেডিয়ো নাটক আকাশবাণীতে।

গৌরীবাড়িতে থাকার সময়ে খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনিই সুনীলকে টিটাগড় পেপার মিলে চাকরিতে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। আসা-যাওয়া করতেন জহর রায়ও। তাঁরা সকলেই তখন রঙমহলে। ‘‘ও বাড়িতে বাবা থাকতেন তেতলার চিলেকোঠায়। ঘরের মধ্য দিয়ে সিঁড়ি। জহর রায় মুখের এক পাশে রুমাল চাপা দিয়ে উঠে যেতেন, নামতেনও সেই একই ভাবে,’’ ভেবে এখনও হেসে ফেলেন সুনীল।



নিজের ঘরে গানে মগ্ন

গোয়াবাগানের একটি ছিপছিপে ছেলে ছিল সুনীলের পাড়াতুতো বন্ধু। সে প্রায়ই রঙমহলে গিয়ে বসে থাকে। খুব ইচ্ছে, অভিনয়ে নামবে। হরিধন এক দিন ছেলেটিকে ডেকে বললেন, ‘‘শোনো হে, পান্তাভাত খেয়ে মাথা ঝুলিয়ে শুয়ে থাকো। মুখটা ফুলবে। শুঁটকো চেহারায় এ সব হয় না!’’ বেশ কিছু দিন তার দেখা নেই। সুনীলের মনে পড়ে, ‘‘হঠাৎ এক দিন সে ফের পাড়ায় হাজির। আমি তো অবাক। তোমার চেহারা এত সুন্দর হল কী করে? সে বলল, কেন? পান্তাভাত খেয়ে!’’

ছেলেটির নাম বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়। রঙমহলে পার্ট জুটে গেল। বহু বছর বাদে তাঁর ছেলে প্রসেনজিৎও স্টার থিয়েটারের মঞ্চে উঠেছেন হরিধনের সঙ্গে।

নাতির সঙ্গে স্কুলের সামনে গিয়ে লাল কুল কিনে খান

সল্টলেকের বাড়িতে আসার পরে কিন্তু লোকটা পুরো পাল্টে গেলেন। গৌরীবাড়িতে থাকতেই স্ত্রী সরস্বতী গত হয়েছিলেন। দুই মেয়ে রেখা আর লেখার বিয়ে হয়ে গিয়েছে। এ বাড়িতে ছেলে, বউমা আর নাতি। তখনও স্টারে যাতায়াত করছেন বটে, কিন্তু যেন অবসরের মেজাজ। আগে বেশির ভাগ সময়ে বাড়িতেই থাকতেন না। যতটুকু বা থাকতেন, ভীষণ গম্ভীর।

সেই লোকটাই ছেলে-বৌমার সঙ্গে আড্ডা দেন। পুরনো দিনের গল্প বলেন। নাতির সঙ্গে স্কুলের সামনে গিয়ে লাল কুল কিনে খান। মাঝে-মাঝেই ছেলেকে বলেন, ‘‘বাজার গেলে চিংড়ি এনো তো!’’ বাগদা চিংড়ির ঝাল তাঁর ভারী প্রিয়। আর পরোটা দিয়ে কচি পাঁঠার ঝোল। তার পরে এক বাটি ক্ষীর। আশি বছর অবধি ফি সপ্তাহে এই চালিয়ে গিয়েছেন। সিগারেট ছেড়েছিলেন আগেই। বৌমা দোক্তা পান সেজে দিতেন। তাই গালে ঠুসে বৈঠকী আড্ডা আর বন্ধু রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের কাছে টপ্পা শোনা।

সব মিলিয়ে কাটছিল ভালই। শেষ বয়সে সম্মান-পুরস্কার আসছিল— কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, বিএফজেএ, পশ্চিমবঙ্গ নাট্য অ্যাকাডেমি, ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ় অব ইন্ডিয়া, যোগেশ মাইম অ্যাকাডেমি।



রাজ্যপাল দিলেন সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি পুরস্কার

’৯১ সালে স্টারে ‘পাশের বাড়ি’ নাটকে অভিনয় করছিলেন হরিধন। ওই বছরই স্টার পুড়ে যায়। হরিধন বাড়িতে বসে যান।পরের বছর বাড়ির সামনে পড়ে গিয়ে কোমরের হাড় ভাঙে তাঁর।পাকাপাকি ভাবে দাঁড়ি পড়ল মঞ্চাভিনয়েও। এ বার সত্যিই অবসর। পরের বছর রাজ্যপাল রঘুনাথ রেড্ডি তাঁর হাতে তুলে দিলেন সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমির পুরস্কার।

তার বছর পাঁচেক আগেই বাড়িতে সাদা-কালো টিভি এসেছে। নাতি বখে যাবে বলে তিনি অবশ্য ঘোরতর আপত্তি করেছিলেন। কিন্তু ছেলে-বৌমার শখ যে!

২০০৪ সালের বড়দিন আসছে। মমতা গিয়েছিলেন বৌবাজারে। মিষ্টি কিনে আনলেন তাঁর পছন্দের দোকান থেকে। হরিধন বললেন, ‘‘ভাল জিনিস খাওয়ালে। মনে থাকবে।’’ পরের দিন জ্বর এল। জ্বরজারি হত না কোনও দিনই। ছেলেকে বলতেন, ‘‘জ্বর হলে কিন্তু আমি আর থাকব না, বুঝেছ?’’

২৬ ডিসেম্বর। সকাল সাড়ে ৭টা নাগাদ নাতি ইন্দ্রনীল ঘরে উঁকি দিতে হরিধন বললেন, ‘‘জল দে তো!’’ তখন জ্বর নেই। জল খাইয়ে ইন্দ্রনীল বললেন, ‘‘একটু শুয়ে নাও।’’ সাড়ে ৮টা নাগাদ ফের উঁকি দিয়ে তিনি দেখেন, বাঁ কাতে দেওয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে শুয়ে। খটকা লাগল। হরিধন কখনও বাঁ কাতে শুতেন না। মৃদু ধাক্কা দিলেন। সাড় নেই। ‘‘দাদাইয়ের গা তখনও গরম!’’

রঙমহলে খানিক তফাত থেকেই হরিধনকে দেখতেন এক অনুজ অভিনেতা। সেই মনু মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘অভিনয়ের ওই রীতি ওঁর একারই। ওঁর আগেও কেউ নেই, পরেও না।’’

ঋণ: আনন্দবাজার আর্কাইভস, নন্দন গ্রন্থাগার, বর্তমান, আজকাল ও গণশক্তি পত্রিকা ও সানন্দা

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)


Something isn't right! Please refresh.

Advertisement