Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৩ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

এক তাজমহল গড়ো

২৮ মার্চ ২০১৫ ০১:৩৩

এখনও স্পষ্ট দেখি সময়টা। আন্দোলনের আগুন ছড়াচ্ছে রাজ্যে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় মহল্লায় নেপথ্য সঙ্গীত হয়েছে বোমা, গুলি ও স্লোগানের আওয়াজ।

কফিহাউসকে সরগরম করে রেখেছে কবিতা, নাটক আর সিনেমার তর্ক।

শহরে পৌঁছে গেছে সাত সমুদ্দুর ওপার থেকে বব ডিলানের ‘ব্লোইং ইন দ্য উইন্ড’ বা ‘দ্য টাইমস দে আর আ-চে়ঞ্জিং’ আর বিটলসদের এক রাশ গান।

Advertisement

আর বম্বে ছেড়ে কলকাতা ফিরেছেন প্রথমে হেমন্ত, পরে সুবীর সেন। গানের প্রোগ্রাম আর ছবিতে অভিনয়ের জন্য আসছেন গীতা দত্ত।

ইউনিভার্সিটির অফ-পিরিয়ডে টেবিল বাজিয়ে গাওয়া চলে মান্নার ‘সেই তো আবার কাছে এলে’। রাজনীতি, হানাহানি, কবিতা (পড়ুন শক্তি, সুনীল, বিনয়) আর গান মিলেমিশে মে বিপ্লবের প্যারিসই যেন কলকাতা ’৬৮।

আর এরই মধ্যে সহসা তদবধি অচেনা এক কণ্ঠে গান বাজতে লাগল এখানে-ওখানে-সেখানে। ‘চলো না দিঘার সৈকত ছেড়ে’। গান তো নয়, একটা গোটা রোম্যান্টিক ডাক। দিঘার সৈকতের এত ভাল বিজ্ঞাপন তার আগে বা পরে আর হয়নি।



একটা অপূর্ব রোম্যান্স-দ্রব, শিক্ষিত, ভদ্র কণ্ঠস্বর। আর গানটা গাওয়া হচ্ছে কেবল এক মধ্যবিত্ত প্রেমিকের পক্ষ নিয়েই নয়, বলা চলে এক স্বপ্নের ফেরিওয়ালার সুরে।

কোথায় ব্যাঙ্কক, ফুকেত, বিলেত তখন? আমাদের দৌড় গঙ্গার নৌকো, ডায়মন্ডহারবারের তট আর দিঘার ঝাউবন। মধ্যবিত্ত প্রেমিক-প্রেমিকাদের স্বপ্নের ছবিটাই গেয়ে দিয়েছিলেন ওই অবাক-কণ্ঠ পিন্টু ভট্টাচার্য।

অচিরে কানাঘুষো শুরু হয়েছিল পিন্টু, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের পুত্র। যেটা ঠিক নয়। আবার খুব ভুলও কি?

ধনঞ্জয়বাবুর গায়ক-পুত্র দীপঙ্কর তো পরিষ্কার বললেন, ‘‘পিন্টুদাকে বাবা ছেলের মতনই দেখতেন। আধুনিকে তালিম দিতেন। শ্যামাসঙ্গীত ধরানোর আবদার মেনেছেন। ওঁর গলাটারও খুব কদর করতেন বাবা।’’

কালীঘাটের পটুয়াপাড়ায় পিন্টুর সঙ্গে বড় হয়েছেন ফুটবল-তারকা সুকুমার সমাজপতি। বললেন, ‘‘কৈশোর আর প্রথম যৌবনে পিন্টু গলায় তুলত সুধীরলাল চক্রবর্তীর গান। যেমন ওর বন্ধু অরুণ বসু গেয়ে যেত মানবদার (মুখোপাধ্যায়) গান। পরে যাওয়া শুরু হল ধনঞ্জয়বাবুর কাছে। গেয়েছে আধুনিক গানই, কিন্তু একটু কান পাতলেই ধরা যায় ক্লাসিকালের ভাল ভিত ছিল।’’

পিন্টু নিয়ে সুকুমারের গল্পের শেষ নেই। পিন্টুর বাবা অকালপ্রয়াত হতে তিন বালকপুত্রকে নিয়ে ওদের মা বড় কষ্টের মধ্যে পড়েছি্লেন। অপূর্ব গানের গলা ছিল তাঁর। কিন্তু কাউকে জানতে দেননি। ছেলেদের মানুষ করায় জীবন দিয়েছেন। সুকুমার বললেন, বহু পরে পিন্টু তখন নামজাদা আর্টিস্ট, একদিন মাসিমার গান শুনে তো তাজ্জব আমরা সবাই। এই মহিলা গানে এলেন না!’’

গানে আসা এবং থাকাটাকেই জীবনের কাজ মেনেছিলেন পিন্টু। স্কুল ফাইনাল পরীক্ষায় বসার আগের দিনও শহরের বাইরে কোথায় জলসায় গেয়ে এসেছেন। তার পরও পরীক্ষায় যথেষ্ট ভাল ফল করেছেন। পরীক্ষার আগের রাতে গাইতে যাওয়ার সবটাই আর্থিক চাপে হয়তো নয়, বলা যায় গানের টানে।

সুকুমার বললেন, ‘‘ওর গানের পাগলামি কীরকম জানেন? শহরের বাইরে জলসা ছিল, সঙ্গে গেছি। ফেরার পথে বলল, আমির খান সাহেবের গান আছে মহাজাতি সদনে। চলো শুনি। ব্যস্, বাকি রাতটা আমাদের কেটে গেল মহাজাতিতে।’’

বলতে নেই, আমারও প্রথম পরিচয় পিন্টুর সঙ্গে এক উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের আসরে। শ্যামশ্রী ঠাকুরের আয়োজনায় রবিশঙ্করের বাজনা ছিল রবীন্দ্র সদনে। উইঙ্গসের ফরাসে বসে বাজনা শুনছিলাম, একটা বিরতির সময় পিঠে টোকা। ঘুরে দেখি পিন্টু ভট্টাচার্য। বললেন, ‘‘‘রাগ-অনুরাগ’ পড়ে মুগ্ধ হয়ে আছি। আপনাকে জানালাম। একটু পণ্ডিতজিকে জানাবেন।’’

জানিয়েওছিলাম। শুধু জানতে পারিনি ওঁর ওই অনুপম আধুনিকের পিছনে কার তালিমের কী ক্লাসিকাল ঘোরাফেরা করছে। সুকুমার সমাজপতি সেই ছবিটাও সুন্দর তুলে দিলেন স্মৃতিচারণায়। বললেন, ‘‘পিন্টুকে ওঁর গানের ইস্কুলে আধুনিক শেখানোর দায়িত্ব দিয়েছিলেন সংগীতাচার্য তারাপদ চক্রবর্তী মহাশয়। ওর গান শেখানো হলে তারাপদবাবু ওকে ডেকে নিয়ে ওর গান শুনতেন। বলতেন, ‘‘আহা কী সুন্দর গলা! ভাবুন, যে-তারাপদবাবুর খেয়ালে আচ্ছন্ন পিন্টু, তাঁর কাছ থেকেই এই কদর।’’

কদর কার না? এরকম একটা গল্প শুনিয়ে ওঁর গানের কথায় যাব। গল্পটা গায়ক-গীতিকার-সুরকার জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের মুখে শোনা। বললেন, ‘‘বজবজ থেকে নৌকো করে আমরা একটা জলসায় যাচ্ছি। হঠাৎ মাঝদরিয়ায় পৌঁছতে পিন্টু বলল, একটা অনুরোধ করব, কথা দাও তুমি রাখবে সেটা? না হলে এই জলে ঝাঁপ দেব।

বুঝতে পারছি না কী অনুরোধ আসবে। বললাম, আগে বলবি তো, কী চাস? ও বলল, না, তুমি আগে কথা দাও।



তো বললাম, ঠিক আছে, দিলাম।

ও বলল, তোমার ওই গানটা — ‘আমি ফুলকে যে দিন ধরে বেঁধে’— আমাকে দাও।

বললাম, এ আর বেশি কথা কি? তুই গাইবি... দিলাম।

আর কী ভালই না গানটা। এমনকী ওর উল্টো পিঠের ‘প্রেমের বাঁশি বাজে রে’। খুব বেশি দিন তো গায়নি। ভূরি ভূরি গানও গায়নি। কিন্তু ওর গানগুলো থেকে গেছে, ওর আওয়াজটা থেকে গেছে। কী সংযত, রোম্যান্টিক আওয়াজ!’’

আওয়াজের কথা এল বলে, বলি। হরিশ মুখার্জি রোড থেকে বেরনো ভবানীপুরের এক পাড়াতে পুজোর মরসুমের সান্ধ্য জলসা। ১৯৮২-৮৩ সাল।

শিল্পী অনেক, গানও শোনা হল প্রচুর। কিন্তু আজ অবধি দুটো গানই কান ও মন ছেয়ে আছে। পিন্টুর ‘শেষ দেখা সেই রাতে’ আর ‘এক তাজমহল গড়ো’।

আজও গায়ে কাঁটা দেয় মনে করলে, কী ভাবে সে-সন্ধ্যায় ‘শেষ দেখা সেই রাতে’ গানে পিন্টু ‘সেই প্রথম, সেই তো শেষ’ কথাগুলো লাগাচ্ছিলেন। আধুনিক প্রেমের কবিতা বলার এক নির্জন, বেদনামেশা উচ্চারণ। গৌরীপ্রসন্নর কথা আর নচিকেতা ঘোষের সুর ওঁর গলায় মিলেমিশে যে কী একটা রসায়ন তৈরি হচ্ছিল বলে বোঝাতে পারব না।

গানটা রেকর্ডে যে ভাবে আমরা শুনি, তাতে সামান্য একটু সেতার বাজিয়ে কথায় আসা হয়। পাড়ার জলসায় যন্ত্র বলতে শুধু হারমোনিয়াম আর তবলা।

কিন্তু পিন্টু যে ভাবে ‘শেষ দেখা সেই রাতে’ কথাগুলোকে হারমোনিয়াম ছাড়া মাইকে ফেললেন তাতেই রচনার পরিবেশ তৈরি হয়ে গেল। পিন্টু সে দিন শেষ করেছিলেন নচিকেতা ঘোষের আরেকটি অপূর্ব কম্পোজিশন দিয়ে। যে-গানটিকে ওঁর সিগনেচার নাম্বার মনে করা হয়— ‘এক তাজমহল গড়ো’। ওঁর কিছু সেরা গানের মতো এই গানটিরও বাণী মিন্টু ঘোষের, বাঙালির থেকে যথেষ্ট সমাদর পাননি যে-নিপুণ, রোম্যান্টিক গীতিকার।

সেই সন্ধ্যার পর আরও বত্রিশ-তেত্রিশ বছর কেটে গেছে। পিন্টু এর মধ্যে দেহরক্ষা করেছেন। ওঁর গান নিয়ে ভাবতে বসে দুটো চিন্তা মাথায় ঘুরছে। সারা জীবন ধরে এত কষ্ট, বিয়োগ, চলে যাওয়া আর চোখের জলের গান গেয়ে গেলেন কেন শিল্পী? আর গানে-গানে এত পিছুটানই বা রেখে গেলেন কী করে? ওঁর একেবারে প্রথম দিকের অনবদ্য রোম্যান্টিক গানে যেমনটি শুনিয়েছিলেন ‘জানি না কখন যে সে কিছু কিছু পিছুটান রেখে গেছে’ (কথা: মিন্টু ঘোষ, সুর: অনল চট্টোপাধ্যায়)।

প্রথম চিন্তার উত্তর খুব সরল নয়। সে-জন্য পিন্টুর জীবনের প্রতি একটা ঝাঁকিদর্শন কাজে দেবে। শিশুকালেই কী এক রোগে ওঁর একটা পা বরাবরের মতো খানিকটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারপর নিতান্ত বাল্যে পিতৃবিয়োগ। ভালবাসা গানকে কায়েম করতে কম মেহনত যায়নি জীবনভর।

তবে হ্যাঁ, বড় বড় শিল্পী ও মানুষের অকুণ্ঠ ভালবাসা ও সমর্থন পেয়েছেন। ভালবাসতেন প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন ধনঞ্জয়বাবুর কাছে। স্নেহ ও সমাদর করতেন মানবেন্দ্র ও শৈলেন মুখোপাধ্যায়। আর সলিল চৌধুরী, নচিকেতা ঘোষ ও অনল চট্টোপাধ্যায় তো গানে গানে, সুরে-সুরে ওঁকে নিজেদের মনের মতো করে গড়ে নিয়েছিলেন।

কিন্তু সব সুরকার, গীতিকার কিন্তু পিন্টুর জন্য ব্যথার সুর ও কথাকেই প্রশ্রয় দিয়েছেন। এর সবটাই আকস্মিক যোগাযোগ তেমন মনে করা ঠিক নয়। পিন্টুর রোম্যান্টিক আওয়াজ তাঁদের টেনেছে ঠিকই, কিন্তু কোথায়ও যেন ওঁর ধ্বনি ও স্বরক্ষেপে তাঁরা কান্নার সুর পেতেন।

সলিলবাবু যেমন ওঁর জন্য চমৎকার গতি ও ছন্দের গান বেঁধেও তাতে বাণী রাখলেন কী? না, ‘আমি চলতে চলতে থেমে গেছি/ আমি বলতে বলতে ভুলে গেছি/ যে কথা তোমাকে বলব।’ তাতে স্যাক্সোফোনের স্ফূর্তি আর ব্যথা মেশানো স্ন্যাচের পর পিন্টুর গলায় বলানো হল: ‘জানি না, জানি না, কত দিন কখন এমন লগন সে আসবে/ দু’চোখ ভ’রে শুধু কাঁদব।’

গীতিকার যেহেতু সলিল চৌধুরী তাই গানটা নিছক প্রেমের না-ও হতে পারে, হতে পারে আন্দোলনের শুভক্ষণের প্রতীক্ষার। কিন্তু যে-মর্মেই বাঁধা হোক, ওই ‘দু চোখ ভ’রে শুধু কাঁদব’ যেন পিন্টুর গলায় তোলার জন্যই। যে আওয়াজকে অনল চট্টোপাধ্যায় কাজে লাগিয়েছেন ‘ফিরে যেতে চাই’ গানে, নচিকেতা ঘোষ ‘দুটি চোখ চেয়ে রয়’-এ, আর জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায় ‘আমি ফুলকে যেদিন ধরে বেঁধে’ কম্পোজিশনে।

শ্যামল গুপ্ত দুটি গান লিখেছিলেন পিন্টুর জন্য। তাদের কথা যথাক্রমে ‘জানি, পৃথিবী আমায় ভুলে যাবে’, আর ‘ভয় হয় এত ভালবেসেছ আমায়’। পিন্টুর গান রেকর্ডিং-এর হ্রস্ব সময়কালে এই চোখের জলের ছোঁয়াটা কিন্ত অবিশ্রান্ত।

গানের মধ্যে রোম্যান্স ও বেদনার এই ধারাটাই পিন্টুর রেখে যাওয়া মস্ত পিছুটান। ফিরে দেখা ও ফিরে শোনার মতো এত আরাম ওঁর গানে যে একেক সময় লজ্জা হয় এমন এক শিল্পীর তেমন কদর কেন হয়নি ওঁর জীবনকালে। যার একটা বড় কারণ ওঁর নিজেকে গুটিয়ে রাখা লাজুক স্বভাব। আর ‘না’ বলতে না পারার ক্ষমতা, দীপঙ্কর ভট্টাচার্য বলছিলেন, ‘‘পার্টি যখন যেখানে যা ফিজ অফার করছে পিন্টুদা না করতে পারছেন না। আর আমি যদি কোনও জলসায় গানের কথা তুললাম, তো সঙ্গে সঙ্গে বলে দিলেন, বলো কবে, কোথায়। বাকি কথা থাক।’’

সুকুমার সমাজপতি বললেন, ‘‘এটা ওর গান ভালবাসার ব্যাপার, গাইতে ভালবাসার ব্যাপার। কী পেল, না-পেল এসব ওর মাথাতেই থাকেনি। একবার এক বড় জলসায় ও সবে ঢুকেছে, সেখানে হেমন্তবাবু, শ্যামলবাবু, মানববাবু, সতীনাথবাবুরা সব বসে। শ্যামলবাবু তারিফের সুরে বলে উঠলেন, ও পিন্টু এ বার তো তুমি আমাদের সব্বাইকে মেরে দিয়েছ। কী বিরাট হিট তোমার গান! বেচারা পিন্টুর মুখে কথা সরছে না তখন। এত লজ্জা!’’

দুঃখের গানে এত সড়গড় যে-পিন্টু তিনি কিন্তু নিজের ব্যক্তিগত দুঃখকষ্ট অন্যের থেকে আড়াল রেখেছেন। দীপঙ্কর বললেন, ‘‘ওঁকে যে ওরকম কালান্তক রোগে ভর করেছে, সেটা কোনও দিন জানতেই দেননি আমাদের। ওঁর মৃত্যুর পরেও যেন ধোঁয়াশা রয়ে গেল।’’

কী জানি, হয় তো সমবেদনা নেবার ব্যাপারেও কুণ্ঠা ছিল পিন্টুর। যদিও আজ, যখন উনি নেই, ওঁর জন্য আমাদের হৃদয়ে এক তাজমহল গড়ার কোনও বাধা থাকার কথা নয়। ১৯৭০-এ বাংলার সেই ক্রান্তিকালে এমনই একটা বিনম্র আবেদনই তো শিল্পী করেছিলেন, ‘এক তাজমহল গড়ো হৃদয়ে তোমার গানে’। আজকের উগ্র ধামাকা গানের দিনে পিন্টু ভট্টাচার্যের গানে কিছুক্ষণের মতো আশ্রয় নিলে বাঙালি মন কিন্তু একটা নির্জন সৈকতে বসার আরাম পাবে। আর এটুকুই তো ওঁর প্রার্থনার তাজমহল।

আরও পড়ুন

Advertisement