Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৯ মে ২০২২ ই-পেপার

URL Copied
Something isn't right! Please refresh.

শূন্য নীড়

সুরকলি, রুদ্রপলাশ, আনন্দধারা... আরও কত কত নামের সব আবাস! এক কালে ছিল কোলাহলমুখর! আর আজ? শান্তিনিকেতনে বহু স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি দেখে ফিরে তার

১২ নভেম্বর ২০১৬ ০০:০০
Save
Something isn't right! Please refresh.
রামকিঙ্করের এক সময়ের ডেরা —ছবি :অর্ণব ঘোষাল

রামকিঙ্করের এক সময়ের ডেরা —ছবি :অর্ণব ঘোষাল

Popup Close

রেঙ্গুনে বোমা পড়ছে!

বাতাসে বারুদ-গন্ধ, ট্রেঞ্চ খুঁড়ছে সাহেবরা।

ক্রমশ ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে কলকাতা।

Advertisement

শহর ছেড়ে শান্তিনিকেতনে অসুস্থ রবিঠাকুরকে সপরিবার দেখতে গেলেন কবি বুদ্ধদেব বসু।

কবি তখন ‘মৃত্যুকে ছুঁয়ে শান্তচিত্তে ব’সে আছেন অবধারিতের নম্র প্রতীক্ষায়।’

বসু দম্পতির ঠাঁই হল রতনকুঠিতে। কবিপুত্র রথীন্দ্র ও স্ত্রী প্রতিমা সেখানেই তাঁদের জন্য সব ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন।

একদিন প্রাতরাশের টেবিলে রথীন্দ্র শান্তিনিকেতনের নতুন একটি পল্লির মানচিত্র বিছিয়ে বুদ্ধদেবকে বললেন, ‘‘দেখুন কোন জমি পছন্দ, সেটাই নিন!’’

বুদ্ধদেব একটু ঝুঁকে দেখছিলেন মানচিত্রের চৌকো প্লটগুলো। পাশে বসে দূরে পূর্বপল্লির আদিগন্ত শূন্য মাঠের দিকে চেয়ে ছিলেন প্রতিভা।

কলকাতার মানুষদের কাছে শান্তিনিকেতন তখনও ‘ব্রজডাঙ্গা’। যেন খাঁ খাঁ মরুভূমির মতো প্রান্তর। কোথাও কোনও গাছ নেই! ‘পাথুরে দেশ, একেবারেই বন্ধ্যা। ডাঙা শেষ হতেই গড়িয়ে গেছে খোয়াই।... লাল লাল কাঁকরে উঁচুনিচু ঢেউ।’ অদূরে প্রান্তরের বুক চিরে চলে গিয়েছে রেললাইন।

রথীঠাকুর বলে যাচ্ছিলেন, কী ভাবে জমি বণ্টন হবে। নতুন পল্লির জন্য আরও কী কী করা যায়— ইত্যাদি ইত্যাদি। তার কিছু দিন আগেই বিশ্বভারতী কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছিল, দু’ বিঘা জমির বিনিময়ে আড়াইশো টাকা দিয়ে আজীবন বিশ্বভারতীর সদস্য হওয়ার খবর দিয়ে। শেষে পছন্দসই কর্নার প্লটই পেলেন বসু দম্পতি!



বুদ্ধদেব বসুর ‘স্বাগত বিদায়’

জমি কেনার আড়াইশো টাকা খুব কষ্ট করেই জোগাড় করেছিলেন বুদ্ধদেব।

তবে তিনি একা নন, পড়শি বসালেন ২০২ রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ের কবিতাভবন-এর আড্ডাসঙ্গীদের ডেকে ডেকে। জমি কিনলেন কবি অজিত দত্ত, কামাক্ষীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়রা। দেখতে দেখতে একদিন বাড়িও উঠল। গেটে বসল শ্বেতপাথরের ফলক। তাতে বুদ্ধদেবের শেষ বেলার কাব্যগ্রন্থের নাম। ‘স্বাগত বিদায়’!

সে বাড়ির সদর দরজায় এখনও সেই ফলক! বাড়ি আর কই, ফলকের স্মৃতিচিহ্নটুকুই সার। কালের করাল গ্রাসে জঙ্গলে ঘেরা ভগ্ন নীড়। আগাছা আর বুনোলতায় ঢেকেছে সারা চৌহদ্দি। ‘চিঠি’ লেখা ডাকবাক্সটা দেওয়ালে আজও। কিন্তু ডাক আসে না আর!

স্বাগত বিদায়, সোনাঝুরি

সেই সেবারই উত্তরায়ণ-এ কবিকে বুদ্ধদেব একদিন বললেন, ‘‘ভালো হয়ে উঠে আপনি ‘যোগাযোগ’ বইটি শেষ করুন। তা নইলে ওটা তো অসম্পূর্ণই থেকে যাচ্ছে।’’

‘‘তুমিই লেখো না শেষটা।’’

রবীন্দ্রনাথের কথা শুনে সংকোচে-বিস্ময়ে গুটিয়ে যান বুদ্ধদেব।

বলেন, ‘‘আমি!’’

‘‘দোষ কী? আমি ভেবেছিলাম এ ভাবে শেষ করব...!’’

কাহিনির সুতো খুলতে শুরু করেন কবি। স্তব্ধ শ্রোতা বুদ্ধদেব-প্রতিভা। বলতে বলতেই অসুস্থ হয়ে পড়লেন রবীন্দ্রনাথ! সেই শেষ দেখা।

’৪১-এ পত্তন হল পূর্বপল্লির।

তবে রবীন্দ্রনাথ চলে যাওয়ার পরে, বুদ্ধদেবের আর তেমন আগ্রহ ছিল না শান্তিনিকেতন নিয়ে।

প্রতিভা যেতেন। স্বামী ও পুত্রের মৃত্যুর পর শোক ভুলতে প্রায়ই ‘স্বাগত বিদায়’-এ চলে যেতেন। তখনও শান্তিনিকেতনে নিভৃতি ছিল। গাছ-গাছালিতে ঘেরা বাড়ি। লম্বা বারান্দায় সকালের মিঠে রোদ এসে পড়ত। বাগান ছুঁয়ে অমলতাস। দ্বিপ্রহরে ধু ধু খোয়াই থেকে ছুটে আসত হাওয়া। স্তব্ধ রাতের চাঁদের আলোয় চারপাশ কেমন স্বপ্নের মতো মনে হতো। জ্যোৎস্না রাত্তিরে শোনা যেত চাঁদে পাওয়া পাখির অশান্ত কাকলি!

শেষ জীবনে এই শান্তিনিকেতনের সঙ্গে প্রতিভাদেবীর সম্পর্ক হয়ে উঠেছিল পুনর্মিলনের।

তিনি থাকলে ‘স্বাগত বিদায়’ বাড়িতে সান্ধ্য মজলিশ জমে উঠত। হাঁটতে হাঁটতেই বাড়ির লাউ-কুমড়ো হাতে ঝুলিয়ে আসতেন তৎকালীন বিশ্বভারতীর উপাচার্য অম্লান দত্ত। কোনও কোনও দিন শিবনারায়ণ রায় ও তাঁর স্ত্রী গীতাদেবী। পড়ন্ত বেলায় একডালা বাগানের আম নিয়ে ক্ষিতিমোহন সেনের মেয়ে অমিতা সেন! আর রোজই আসতেন পাশের ‘কাঞ্চন’ বাড়ি থেকে পরিচয়ের আড্ডাধারী-লেখক শ্যামলকৃষ্ণ ঘোষ, কবি নরেশ গুহরা। ওপাশের ‘রুচিরা’ বাড়ি থেকে পড়শি প্রবোধচন্দ্র সেনের মেয়ে-জামাইরা।

সঙ্গীতভবনে আসা-যাওয়ার পথে এসে বসতেন আরেকজন। অধ্যাপক অমিয় সেনের স্ত্রী নীলিমা সেন। তাঁর বাড়ির নাম ‘সোনাঝুরি’।



সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘একা এবং কয়েকজন’

একদিন শাল লুটিয়ে হাসতে হাসতে ঢুকে পড়লেন নীলিমা।

‘‘আচ্ছা প্রতিভাদি, তুমি সারাক্ষণ বারান্দায় বসে কী দ্যাখো?’’

প্রিয় বাচ্চুর কথা শুনে হাসছেন বুদ্ধদেবের রাণু। বললেন, ‘‘উপরে আকাশ দেখি, আর নীচে দেখতে আসি কখন তুমি যাও। তোমার সুন্দর মুখখানা দেখে আমার আকাশ দেখারই আনন্দ হয়।’’

নীলিমা প্রণাম করলেন প্রতিভাকে।

এ বাড়ির সর্বাঙ্গে স্মৃতি।

কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত মারা যাওয়ার পরে তাঁর স্ত্রী রাজেশ্বরী দত্ত প্যারিস-লন্ডন ঘুরে ফিরতে চেয়েছিলেন প্রথম জীবনের শান্তিনিকেতনে। তাঁর স্মৃতিজুড়ে তখন লাহোর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ পাশ করে চলে আসা শান্তিনিকেতন, ছুঁয়ে দেখা গানের রবীন্দ্রনাথ। ভেবেছিলেন, শেষবেলায় সেই মানুষটির আশ্রমেই ঘর তুলবেন। বন্ধুজায়া প্রতিভা তাঁকে আশ্বাস দিয়েছিলেন, ‘স্বাগত বিদায়’-এর উঠোন ছেড়ে দেবেন ঘর তুলতে।

হল না, রবীন্দ্রনাথের আপন গানের রাজ-রাজেশ্বরী চলে গেলেন তার আগেই! এখনও তাঁর সুর বাজে ‘শূন্যে শূন্যে অনন্তে অশান্ত বাতাসে’।

সুরকলি, ইতি

দুপুর-দুপুর লোচন মালি হাজির বিশ্বভারতীর সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে। সঙ্গে হাতচিঠি।

লীলা মজুমদার চিঠি পাঠিয়েছেন বিশ্বভারতীর গ্রন্থাগার কর্মী স্বপনকুমার ঘোষকে। চিঠির বয়ান, ‘‘স্নেহের স্বপন, ভোরে পড়ে গিয়ে মাথায় কিঞ্চিৎ চোট লেগেছে। বৈদ্যনাথ দেখে গেছে। তুমি কাজের শেষে অবশ্য একবার এসো। আশীর্বাদিকা লীলাদি।’’

চিঠি পেয়েই সাইকেলে উঠে পড়লেন স্বপন।

‘‘এই জন্য তোকে কোনও খবর দিই না। কিছু হবে না। সামান্য আঘাত।’’

‘‘কী করব, খবর পেয়ে বসে থাকব!’’

‘‘শোন, ছেলেদের কিছু জানাস না যেন। জানালে ওরা আবার এক্ষুনি আমাকে কলকাতায় নিয়ে চলে যাবে। আমার আর শান্তিনিকেতনে থাকা হবে না! এ আমার শেষ আশ্রয়!’’

‘লীলাদি’র কথা শোনেননি স্বপন। বিপদের আশঙ্কায় তাঁর ছেলেদের খবর দিয়েছিলেন। কলকাতায় গিয়েই প্রবল অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। অস্ত্রোপচারও করতে হয়। সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরে স্বপনকে বলেন, ‘‘তোর জন্য ফিরলাম মানিক।’’

প্রতিভা বসুর মতো লীলা মজুমদারেরও শান্তির নীড়, শেষ আশ্রয় ছিল শান্তিনিকেতন।

তাঁর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের প্রথম দেখা শিলং পাহাড়ে।

তার পর লীলাকে একটি চিঠি লিখলেন রবিঠাকুর, ‘‘আশা অধিকারী শিশু-বিভাগ পরিচালনা করেন, তিনি এক বছরের ছুটি নিচ্ছেন, তুমি এসে এক বছরের জন্য তাঁর জায়গা নাও।’’ সেই শান্তিনিকেতন চলে আসা। ১৯৩১-এর জুন মাসের দুপুরে। তারপর একদিন সব ছেড়ে চলেও গিয়েছিলেন! কিন্তু অভিমান, ক্ষোভ, দুঃখ ভুলে সেই ফিরতেই হল শান্তিনিকেতন। আশ্রম হয়ে উঠল তাঁর মনের উজ্জীবন-নিবাস। ফিরলেন বাড়ি করে। বাড়ির নাম ‘সুরকলি’।

এমন নাম কেন? তাঁর স্বামী সুধীনের ‘সু’, ছেলে রঞ্জনের ‘র’, মেয়ে কুমলির ‘ক’ আর লীলার ‘ল’— মিলেমিশে ‘সুরকলি।’

ছায়াময় বাড়িটির জানলার ধারে ছিল তাঁর লেখার টেবিল। বাইরে বাগান। সে বাগানে লোচন মালি কাজ করত। সকালের রোদ এসে পড়ত লেখার কাগজে। বিকেলে বাড়ির বারান্দায়, লনে ছড়িয়ে বসতেন শান্তিনিকেতনের রথী-মহারথীরা। দখিনে মুখ করে চেয়ারে বসতেন লীলা। চমৎকার সব গল্প বলতেন তিনি। সঙ্গে থাকত তাঁর নিজের হাতে রান্না করা নানা খাবার।

একদিন সে বাড়ি হাতবদল হল!

আরেক লীলারও প্রিয় আশ্রয় হয়ে উঠেছিল শান্তিনিকেতন। তাঁর স্বামী সাহিত্যিক অন্নদাশঙ্কর রায়!

‘পথে-প্রবাসে’র দীর্ঘ পাড়ি শেষে তাঁদের ঠিকানা ছিল ‘ইতি’ বাড়ি।



এখানেই থাকতেন শান্তিদেব ঘোষ, অন্নদাশঙ্কর রায়ের আবাস, শিবনারায়ণ রায়ের বাড়ি, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আনন্দধারা’

রাস্কা, জিৎভূম

রবীন্দ্রনাথ সে বার এসে উঠলেন চৌরঙ্গিতে। রেখায় রেখা মিলিয়ে তিনি তখন কেবলই ছবি আঁকছেন।

আর তাঁর পাশটিতে বসে বাংলাদেশের ব্রতকথা শোনাচ্ছেন স্নেহকাঙাল এক পদ্মাপারের মেয়ে। কখনও গুরুদেবও তাঁকে গান শোনাচ্ছেন, ‘জয় যদু লন্দন/ জগত জীবন— / ও’ তুমি— ভবে আইস্যা করল্যা কী?’ রবিঠাকুরের বাঙাল উচ্চারণে খিলখিল হেসে কুটিকুটি হয় মেয়ে। জবাবে সোফায় আধশোয়া রবিঠাকুরকে সেও শুনিয়ে দেয় সুর করে, ‘‘রাইত পোহা, রাইত পোহা, রাইত পোহা,— রাইত পোহাইল।’’ বলে, ‘‘মাত্তর সোওয়া পাঁচ আনার ব্রত, করলেই নির্ধনের ধন হয়!’’

‘‘বটে! এমন?’’

রবিঠাকুর চোখ বড় বড় করে শোনেন আর বাঙাল মেয়ের গল্পের সলতে উস্কে দেন।

পিতৃহীন এই মেয়েই রানী চন্দ।

শেষ বেলায়, রোগশয্যায় কবির মুখে মুখে বলা রচনার অনুলিপিকার!

বম্বে ভ্রমণের সময় কবির একান্ত সচিব অনিলকুমার চন্দর সঙ্গে কবি বিয়ে দিলেন তাঁর। পৌরোহিত্য করলেন কবি স্বয়ং। কবির মৃত্যুর পরে স্বামীর সঙ্গে রানীও দীর্ঘ ২০ বছর দিল্লিতে চলে যান। অবশেষে ১৯৭২ সালে ফিরলেন শান্তিনিকেতনে। শ্যামবাটিতে তাঁর নিজের বাড়ি, ‘জিৎভূম’ হয়ে উঠল তাঁর শেষ ঠিকানা। সে বাড়িতে সতত তাঁর মনে খেলা করত কত মেহগনি স্মৃতি! পাতা ঝরা প্রহর জুড়ে গুরুদেব, অবনঠাকুর, কেদারঘাটের কথা।

অনিল চন্দর ঠিক আগে যিনি কবির একান্ত সচিব ছিলেন, সেই কবি অমিয় চক্রবর্তীর বাড়িও কাছেই!

শখ করে তিনি বাড়ির নাম দিয়েছিলেন ‘রাস্কা’। সাঁওতালি ভাষায় কথাটার মানে আনন্দ।

রবীন্দ্রনাথের উদ্যোগেই এক ড্যানিশ কন্যা, হিয়োর্ডিস সিগার্ড-কে তিনি বিয়ে করেন। কবি নববধূর নতুন নাম দিয়েছিলেন। হৈমন্তী। পরে দীর্ঘ মার্কিন প্রবাসের পাট চুকিয়ে দিনান্ত বেলায় তাঁর শেষ ঠিকানা হয়ে উঠেছিল ‘রাস্কা’।

এ বাড়ি থেকেই চিঠিতে ‘প্রিয়বরেষু’ শিবনারায়ণকে অভিনন্দন জানিয়ে লিখেছিলেন, ‘‘শান্তিনিকেতনে আপনার আলোকোজ্জ্বল কর্মের স্মৃতি কখনই মলিন হবে না!’’



রামকিঙ্করের কোয়ার্টারের ভগ্নদশা

রুদ্রপলাশ, সুরাহা

একবার রব উঠল শিবনারায়ণ রায় দুটি ‘থান ইট’ ছুড়ে মেরেছেন রবিঠাকুরের দিকে!

‘দেশ’ পত্রিকায় তিনি লিখেছেন, ‘‘রবীন্দ্রনাথের কল্পনা মানুষের ভাবরূপকে নিয়েই ব্যস্ত, তার সমগ্র রূপটিকে স্বীকার করবার প্রৌঢ় দুঃসাহস তিনি ক্কচিৎ দেখিয়েছেন।’’ লিখেছেন, ‘‘যে মানুষ সারা জীবন ভালবাসার উপরে এত গান, কবিতা, কাহিনী, নাটক লিখে গেলেন, তাঁর নিজের প্রেমের অভিজ্ঞতার সংবাদ তিনি সযত্নে প্রচ্ছন্ন রেখেছেন।’’

ঘরে-বাইরে সমালোচনায় পড়ে হাসলেন লেখক। কেন না, নিয়ম ভাঙার যাপনে তিনি যে অভ্যস্ত। তিনি তখন লুঙ্গির সঙ্গে ঢিলে পাঞ্জাবি পরে হাঁটছেন রবীন্দ্রভবনের দিকে স্পেশাল অফিসারের দায়িত্ব সামলাতে!

একবগ্গা এই মানুষটিকে বিশ্বভারতীর উপাচার্য সুরজিৎ সিংহ শান্তিনিকেতনে আহ্বান জানান। মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে অবসরের পর স্ত্রী গীতাকে নিয়ে শিববাবু দেশে ফিরলেন। ’৮১-তে প্রথমে উঠলেন আবাগড় রাজবাড়িতে। পরে তাঁর ঠিকানা হল রতনপল্লির একটি কোয়ার্টারে।

একদিন বাগান-ঘেরা ৬৩, পূর্বপল্লিতে তাঁর নিজের ডেরা হল। বাড়ির নাম দিলেন ‘রুদ্রপলাশ’।

সে বাড়ি ঘিরে শান্তিনিকেতনের কত মানুষের সুখ-স্মৃতি।

ঘরজুড়ে শুধু বই আর বই। দেওয়ালে যামিনী রায়। বাগানে বর্ষা দিনের কেয়া ফুল।

লাল বারান্দায় বেতের চেয়ার। মুখোমুখি কখনও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়-প্রকাশ কর্মকার-জয় গোস্বামী-নরেশ গুহ, কবিতা সিংহ, সুশোভন অধিকারী। প্রায় প্রতি শুক্রবার সাহিত্যপাঠের আসর বসাতেন। কেউ কবিতা পড়ছে‌ন। কেউ নতুন লেখা গল্প। কখনও নিখাদ আড্ডা। একবার রবীন্দ্রভবনে দায়িত্বে থাকাকালীন ২২ শ্রাবণ রবীন্দ্র-পাণ্ডুলিপির প্রদর্শনী করলেন। আহ্বান জানিয়েছিলেন ‘দেশ’ সম্পাদক সাগরময় ঘোষকে। যেতে পারেননি সাগরময়।

চিঠিতে শিবনারায়ণকে লিখছেন, ‘‘...অনুশোচনা হচ্ছে কেন ২২ শ্রাবণে শান্তিনিকেতনে গেলাম না। তাছাড়া গৌর ও সুনীলের মুখে বর্ষাদিনের আড্ডার লোভনীয় বর্ণনাও শুনেছি।’’



অর্ঘ্য সেনের নিবাস

শিববাবু চলে যাওয়ার পরে, গোটা বাড়িটা যেন গিলে খেতে আসে।

যেন অপার শূন্যতা ছাদ, উঠোন, সারা চৌহদ্দি জুড়ে! বেড়ার ধারে থেমে গেছে রুদ্রপলাশের গাছের কথাবার্তা। পাতা ছুঁয়ে ছুঁয়ে আলিঙ্গন।

পূর্বপল্লির ছায়া সরণি ধরে এগোলে এমন কত যে মহতী মানুষের বাড়ি। সদরে ফিকে হয়ে আসা কত নাম! শান্তিনিকেতনে বাংলা পড়াতে এসেছিলেন কবি অশোকবিজয় রাহা। তাঁর বাড়িটিও পূর্বপল্লিতে। ‘সুরাহা’। স্ত্রী সুপ্রীতি আর অশোকবিজয় রাহা মিলেমিশে ‘সুরাহা’! আমৃত্যু এ বাড়িতেই ছিলেন। পারুলডাঙার গগনতলে ভোর, ভুবনডাঙার মাঠের পড়ন্ত বিকেল, কোপাইয়ের এলোমেলো ঘূর্ণি হাওয়া তাঁকে মথিত করে রেখেছিল আমৃত্যু!

শ্রীপল্লি, ভুবনডাঙা

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নিত্য যোগ ছিল যাঁদের, তেমন দু’জন রবীন্দ্র-জীবনীকার প্রভাত মুখোপাধ্যায় ও শান্তিদেব ঘোষ।

ভুবনডাঙার একেবারে প্রান্তে বাড়ি ছিল প্রভাতবাবুর। শান্তিনিকেতনের খুদেরা তাঁকে জানতেন ছোট গুরুদেব বলেই। জোব্বা পরে দিনমান রবীন্দ্র-জীবন লিখতেন। বিকেলের পরে আর পড়াশোনা করতেন না। বাইরের বারান্দায় বেতের চেয়ারে বসে থাকতেন চুপ করে। পাশে কখনও তাঁর স্ত্রী সুধাদেবী।

কেউ গেলে গল্প করতেন গুরুদেবের। পুরনো শান্তিনিকেতন, মানুষজনের কথা। ফেলে আসা দিনের কথা বলতেন শান্তিদেবও। তিনি চিরকাল সহজ জীবনে অভ্যস্ত ছিলেন। মাটির বাড়ি, টিনের চালে শ্রীপল্লির ছোট ঘরেই কেটেছে তাঁর জীবন। যখন খালি গলায় গাইতেন, ‘সব দিবি কে, সব দিবি পায়’— কেঁদে উঠত সারা আশ্রম।

কত মানুষের স্মৃতিতে এখনও শান্তিদেব! হলদে লুঙ্গি আর ফতুয়ায় রিকশায় করে কখনও ব্যাঙ্কে চলেছেন। পথে দেখা ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে। কুশল জিজ্ঞেস করছেন। কেবল দেখা নয়। আবার চিঠিও লিখছেন। হাতচিঠি...! সে সব চিঠি চলে যাচ্ছে শান্তিনিকেতনের নতুন নতুন পল্লিতে।

লোচন মালিদের হাত থেকে চিঠি নিয়ে খুলছেন অশেষ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রশান্তকুমার পাল, ভূদেব চৌধুরী, মোহর, মোহন সিং খাঙ্গুরা। চোখের পাতা ভিজিয়ে কেউ কেউ স্মৃতি থেকে শুনতে পাচ্ছেন ‘শান্তিদা’র গলা, ‘চলে গেলে জাগবি যবে/ ধনরতন বোঝা হবে,/ বহন করা হবে-যে দায়/ আয় আয় আয়!’

আনন্দধারা

‘‘কার চিঠি হরিহরদা, কার চিঠি?’’

গুরুপল্লি থেকে একটি মেয়ে শালবন-তিনপাহাড়-মাঠ পেরিয়ে ছুটতে ছুটতে থামল ডাকঘরের সামনে!

‘‘একটু হলেই তোমাকে পেতাম না। বিদেশ থেকে আজ কত চিঠি এসেছে? গুরুদেব, অ্যান্ড্রুজ সাহেব ছাড়া আর কারও চিঠি এল?’’

‘‘যেতে যেতে বলব। আজ ঢের চিঠি এসেছে, তুমি অনেক স্ট্যাম্প পাবে!’’ মেয়েটির চোখের তারায় খুশির ঝিলিক! কে ও? মোহর। তাঁর মেয়েবেলা কেটেছে গুরুপল্লিতে। সে এক অন্য শান্তিনিকেতন।

পথে এত ভিড় ছিল না। শান্তিদেব ঘোষ গান শেখাচ্ছেন মোহরকে। ক্লাসের পরে নিজেই তাকে সাইকেলে চাপিয়ে বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছেন!

একদিন সেই গুরুপল্লির বাড়ি থেকেই বিয়ে হয়ে গেল মোহরের। বর বীরেন বন্দ্যোপাধ্যায়, বিশ্বভারতীতে নতুন চাকরি নিয়ে এসেছে। বিয়ের পরে কোয়ার্টারেই সংসার পাতলেন। বিবাহবার্ষিকী। সকলে মাটিতে বসে খাওয়া হচ্ছে। মাংসের ডেকচি এনে মোহর বললেন, ‘‘দেখো নিজে রেঁধেছি। কেমন?’’

বীরেনবাবু বললেন, ‘‘মোহর, মাংসটায় সামান্য ঝাল হয়েছে।’’



বুদ্ধদেব বসুর বাড়ির জরাজীর্ণ অন্দর

মোহর সঙ্গে সঙ্গে মাংসের ডেকচি তুলে নিয়ে সবটা ফেলে দিলেন বাইরের বাগানে!

বাসা বদল করতে করতে একদিন ওঁরা দুটিতে গেলেন অ্যান্ড্রুজপল্লিতে ‘আনন্দধারা’ বাড়ি করে। দেওয়াল ঘেঁষে বীরেনবাবুর বইয়ের আলমারি। টেবিলেও সাজানো বই। ছোট্ট ফুলদানি। তাতে বাগানের রঙ্গন, কাঞ্চন। ঘরের তক্তাপোশে কল্কা আঁকা হলুদ চাদর। দরজা-জানলাতেও শান্তিনিকেতনি পর্দা। ও ঘরে মোহরের হারমোনিয়ম, তানপুরা। তাক-এ স্বরবিতান, গীতবিতান। রবিঠাকুরের গানে গানে সাজানো সংসার।

একবার মেয়ে বুলবুলকে শান্তিনিকেতনে গান শেখাতে এসে মোহরের সঙ্গে আলাপ করলেন কলকাতার এক লেখক। সমরেশ বসু।

পরে রামকিঙ্করকে নিয়ে সমরেশ ‘দেখি নাই ফিরে’ লিখতে এলেন। লিখছেন আর ‘আনন্দধারা’য় বসে মোহরকে কেবলই বলছেন, ‘‘লেখাটা শেষ করতে পারব তো?’’

হল না শেষ!

দোলপূর্ণিমায় ‘আনন্দধারা’ ভরে উঠত। রবিশঙ্কর থেকে জর্জ বিশ্বাস, হেমন্ত, উত্তমকুমার, সত্যজিৎ, লতা!

প্রায়ই আসতেন সুনীল-শক্তিরা। নিত্য প্রাণের সখা সুচিত্রা মিত্র। বুক খালি করে গোপন-গহন কথা বলতে!

নিজেও বাড়ি ভাড়া নিয়েছিলেন শান্তিনিকেতনের অবনপল্লিতে।

ছিমছাম, একতলা।

লাল সিমেন্টের মেঝে। ছায়া ছায়া উঠোনে অমলতাস। চাঁদের রাতে সারা বাড়ির আলো নিভিয়ে একটার পর একটা গান গেয়ে যেতেন। সুর ছড়িয়ে পড়ত দূরে কোথাও দূরে।

বাড়ি ছিল আরেক সুচিত্রারও!

তিনি অবশ্য সেন! কবেই বিক্রি হয়ে গিয়েছে ভুবনডাঙার সে বাড়ি।

প্রায় জীর্ণ ‘আনন্দধারা’য় এখন মোহরের আপনজন একলা গোরা সর্বাধিকারী থাকেন। স্মৃতিচিহ্ন লোপাট সুচিত্রার অবনপল্লির ঘরের!

২০ নম্বর কোয়ার্টার

রতনপল্লির ভগ্নপ্রায় মাটির বাড়িটাই তখন উলঢাল রামকিঙ্করের ঘর-দুয়ার। পল্লির ঘর। বাঁশ-কঞ্চির বেড়া। এক চিলতে উঠোন। খড়ের চাল। বৃষ্টি পড়লে সেই চালে নিজের ছবি গুঁজে দেন জল আটকাতে! ঘরের মধ্যে ছড়িয়ে চিঠিপত্তর-তারিখ পার হওয়া চেক। চতুর্দিকে বিড়ির টুকরো!

কিঙ্কর কখনও তালা বন্ধ করতেন না দরজার। সবার জন্য অবারিত দ্বার। কেউ এলে মাটির ভাঁড়ে বাংলা, শুয়োরের মাংস। দু’ পাত্তর চড়লে শোনা যাবে, ‘‘ফিলিং ফর এভরিথিং... ফিলিং... যদি ফিলিং দুর্বল হয়, তবে শুধুই নিরাশা।’’

বাইরে যেন রিকশা থামল। কবি শক্তি হাজির গনগনে এক দুপুরে। মাটির দাওয়ায় বসে কিঙ্কর। শক্তি এসে নামিয়ে রাখল রামের পাঁইট। কিঙ্কর প্রবল উৎসাহে নিজেই ঢাললেন দুটো কাপে।

ঢালতে ঢালতেই বলছেন, ‘‘সাহেবসুবোদের মালপত্তর আনলি কেন? এতে যে বিস্তর খরচ।’’



‘‘পরে, নেমে যাব!’’ শক্তি আশ্বস্ত করেন। নেশা ঝিম ঝিম বেলা গড়ায়। একটু পরে শক্তি লিখছেন, ‘‘গেঞ্জি পরা খালি পা চললেন উনি। দৃষ্টি স্থির নয়। একটু এদিক-ওদিক ঘুরছে। যেন দেখে নিতে চাচ্ছেন কিছু-মিছু। হাতে সময় কম। এই শেষ দেখা বলে মনে হল আমার হঠাৎই। মুখে কেমন একটা ছেড়ে যাবার দুঃখ জমেছে!’’

শেষ বিকেলে একবার গল্প সরে গিয়েছিল শিল্পী শর্বরী রায়চৌধুরীর বাড়িতে। দু’পাঁইট আরও। কিঙ্করের গানে গানে মধ্য রাত। এর পরে হয়তো চাঁদের আলোয় ভাস্কর আর কবি হাঁটতে বের হবেন। কালোবাড়ির পাশে ছাতিম গাছের নীচে বসে কিঙ্কর গাইবেন বিশুপাগলের গান। ‘ও চাঁদ চোখের জলে লাগল জোয়ার’।

ঠিকানা বদলাতে বদলাতে শান্তিনিকেতনে কিঙ্কর প্রায় পঞ্চান্ন বছর ছিলেন। ভগ্ন বাড়িটিতে প্রবল অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় অ্যান্ড্রুজপল্লির ২০ নম্বর কোয়ার্টারে।

সামনে মোটা চালের ভাতের থালা! মাছি উড়ছে ভনভনিয়ে! খেয়াল নেই অসুস্থ শিল্পীর! দমকা কাশি হচ্ছে।

জীবনের শেষ ক’টা বছর কেটেছে এ ভাবেই...! জরাজীর্ণ সে কোয়ার্টারে এখন হাওয়া খেলা করে। দরজা হাট। ভাস্করের নাম-নিশানটুকু মুছে গিয়েছে কবেই!

ঠিকানা খুঁজে খুঁজে এখন আর কোনও রিকশা এসে থামে না ২০ নম্বর কোয়ার্টারের সামনে। পলাশের মাসে কেউ ‘কিঙ্করদা বাড়ি আছো?’ বলে কড়া নাড়ে না!

কিঙ্করের মতোই আজীবন রবিঠাকুরের স্মৃতি ছুঁয়ে ছুঁয়ে শান্তিনিকেতনে থেকেছেন নন্দলাল। শ্রীপল্লির কোয়ার্টারে বিনোদবিহারী। দৃষ্টি হারিয়েও তিনি কাগজ জুড়তেন সারা দুপুর। ঘর বাঁধেন মুকুল দে, সোমনাথ হোড়, সুধীর খাস্তগির, কে জি সুব্র্যক্ষ্মণিয়মের মতো শিল্পীরাও।

একা এবং কয়েকজন

শান্তিনিকেতনে পা রেখে শক্তি প্রায়ই ছুটতেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ফুলডাঙার বাড়ি ‘একা এবং কয়েকজন’-এ। পুকুরে ছিপ ফেলে মাছ ধরতে। তাঁর নিজেরও ইচ্ছে ছিল ঘর বানাবার। বলতেন, ‘‘ছাদের উপর ঘর হবে, দূর পর্যন্ত দেখা যাবে।’’

একবার সকাল সাড়ে দশটায় গিয়ে হাজির সুনীলের বাড়ি। সুনীল স্মৃতি—

‘‘আন্দাজ কেউ আমার নাম ধরে ডাকল। শান্তিনিকেতনের বাড়িতে আমি তখন কাগজ-কলম খুলে বসেছি, দোতলার ঘরে। কেউ দেখা করতে এলে একতলা থেকে ডাকে, কিংবা খবর পাঠায়, এই ডাক দ্বিতীয়বার শুনেই চিনতে পেরেছি শক্তির কণ্ঠস্বর, সে সরাসরি ওপরে উঠে আসছে। ঘরে ঢুকে শক্তি বলল, এ কী! আজই লেখাপড়া শুরু করে দিয়েছ?’’ শক্তি গেলে কি আর লেখা হয়! সারা দুপুরজুড়ে চলল মদ্যপান। নতুন করে কৃত্তিবাস করার পরিকল্পনা! গ্লাস শেষ হতেই শক্তির বায়না, আর একটি। তারও পরে...!

সুনীলের বাড়িটি আসলে কয়েক দশকজুড়েই ছিল কবিদের আবদারের আড্ডাস্থল। দোলের দুপুরে ভাত-মুসুর ডাল, গন্ধরাজ লেবু, পাঁঠার মাংসে পাত পড়ত ফি বছর।

সুনীলের পড়শি বলতে ও পাশে ভূমেন্দ্র গূহ, কখনও সৌমিত্র মিত্র, অমিতাভ চৌধুরীরা এসে পড়তেন। সামনে অর্ঘ্য সেনের খোঁয়াড়। গাছপালার ফাঁক দিয়ে সুনীলের পুকুরের জলে আলো এসে পড়লে বোঝা যেত ভূমেন্দ্র এসেছেন। ভূমেনকে ডাকতেন সুনীল, ‘চলে আসুন, রাতে খেয়ে যাবেন।’ তখন ধানের মাঠ পেরিয়ে তাঁকে আনতে যেতেন কবি সমরেশ মণ্ডল, সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়রা। তাঁদেরই একজনের কথায়, ‘‘মাঠ পেরিয়ে তার বাড়ি যেতাম তাকে রাস্তাটুকু গার্ড অফ অনার দিয়ে আনতে। সাদা পাজামা সাদা ফতুয়া। বগলে পাঁচ সেল টর্চ নিয়ে যখন হাঁটতেন মনে হতো বীরভূমের গ্রামের কোনও মোড়ল রামায়ণ মহাভারত শুনতে যাচ্ছেন কথক ঠাকুরের কাছে।’’

কবি সোমনাথ মজা করে তাঁকে জিজ্ঞেস করতেন, ‘‘কত বাক্স কবিতার পাণ্ডুলিপি আবিষ্কার করবেন আর ছাপবেন বলে ঠিক করেছেন?’’

সহাস্যে ভূমেন্দ্র বলতেন, ‘‘স্যার আমার বাড়িটা কিনে নেন একটু বেশি দাম দিয়ে, সেই দামটা শোধ করে দেব!’’ সে বাড়ি কখনও বিক্রি করেননি ভূমেন্দ্র। আমৃত্যু।

•••••••••

কথায় কোহলে গড়িয়ে যেত রাত। একসময় স্তব্ধ চরাচর। সাঁওতাল পল্লির মাথায় উঠত গোল চাঁদ। কোপাই-এর দিক থেকে ভেসে আসত দ্রিমি দ্রিমি মাদলের বোল। উল্টো দিকে বাড়ির সিঁড়িতে বসে একলা রবিঠাকুর গাইতেন অর্ঘ্য সেন!— ‘ভেঙেছে ফুলের মেলা,/ চলে গেছে হাসি-খেলা,/ এতক্ষণে সন্ধ্যাবেলা জাগিয়া চাহিল প্রাণ।/ কখন বসন্ত গেল, এবার হল না গান।’

ঋণ: ‘জীবনের জলছবি’, ‘ব্যক্তিত্ব বহুবর্ণে’ (প্রতিভা বসু), ‘আনন্দধারা’, (কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়), ‘সব-পেয়েছির দেশে’ (বুদ্ধদেব বসু), ‘নানা লেখা’ (রানী চন্দ), ‘আমার এ পথ’, (সুধীর খাস্তগীর), ‘চতুর্দশী’, সম্পাদক (মানস বন্দ্যোপাধ্যায়), ‘মনস্বী বিপ্লবী শিবনারায়ণ রায়’ (সম্পাদনা স্বরাজ সেনগুপ্ত), ‘পুরনো সেই দিনের কথা’, (প্রমথনাথ বিশী), ‘সোনালি দুঃখ’, (সম্পাদক সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়) ‘আমার বন্ধু শক্তি’ (সমীর সেনগুপ্ত), ‘শান্তিনিকেতনের জলছবি’, (প্রসেনজিৎ সিংহ), ‘নতুন কৃত্তিবাস’, ‘উদীচী’ পত্রিকা



Something isn't right! Please refresh.

Advertisement