ভারতকে শাসন করা সেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পুনরায় উত্থান এবং পতন! নেপথ্যে মুম্বইয়ে শৈশব কাটানো এক ভারতীয়
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রায় ৩৮ জন শেয়ার হোল্ডার ২০০৩ সাল নাগাদ শেয়ারগুলি বিক্রি করার জন্য উঠেপড়ে লাগেন। ভারতীয় উদ্যোগপতি সঞ্জীব মেহতা ২০০৩-২০০৫ সালের মধ্যে তাঁদের থেকে একে একে শেয়ারগুলি কিনে নেন। হয়ে ওঠেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নতুন মালিক।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নামটির সঙ্গে কমবেশি সকল ভারতীয়ই পরিচিত। ১৯৪৭ সালের ১৫ অগস্ট ভারত স্বাধীন হয়। কিন্তু তার আগে বহু বছর এই দেশ ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনস্থ।
ষোড়শ শতকে ইংল্যান্ডে বাণিজ্যসংস্থা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। এই সংস্থার সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক ছিল ব্রিটিশ রাজপরিবারের। সেখান থেকে ব্যবসার মূলধন লাভ করত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি।
এর ফলে ভারতে সহজেই আধিপত্য বিস্তার করে ফেলে ওই সংস্থা। প্রথমে কেবল মশলা আমদানি করার উদ্দেশ্য দেখিয়ে ভারতের বিভিন্ন রাজপরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে এই বাণিজ্যসংস্থা। পরবর্তী কালে ধীরে ধীরে ভারতকে কব্জা করে নেয়। শুরু হয় শাসন এবং শোষণ।
১৭৫৭ সালের ২৩ জুন সংঘটিত হওয়া পলাশির যুদ্ধের দ্বারা বাংলায় শুরু হয় ব্রিটিশরাজ। এরই সঙ্গে সমগ্র ভারতের উপর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের ভিতও স্থাপিত হয়।
১৮৫৭ সালে হওয়া সিপাহি বিদ্রোহের দ্বারা ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে। ইতিহাসের পাতায় এই যুদ্ধ ভারতের ‘প্রথম স্বাধীনতার যুদ্ধ’ হিসাবেও পরিচিত। এর পর আমাদের দেশের শাসনভার চলে যায় ইংল্যান্ডের রানির হাতে।
আরও পড়ুন:
দেশ স্বাধীন ১৯৪৭-এ হলেও, তার আগেই ব্যাগপত্তর গুটিয়ে ভারত ছাড়েন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আধিকারিকেরা। যে বিশেষ সনদটি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে অধিকার দিয়েছিল, ১৮৭৪ সালে ব্রিটিশ শাসকেরা তার সম্পূর্ণ বিলুপ্তি ঘটান।
কাট টু। ২০১০ সাল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আবার ব্যবসার দুনিয়ায় ফিরে আসে। কিন্তু এ বার আর ব্রিটিশের হাত ধরে নয়, এক ভারতীয়ের হাত ধরে সংস্থার পুনরুত্থান ঘটে।
বর্তমানে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মালিক কোনও ব্রিটিশ নন। সেই কোম্পানির মালিকানা রয়েছে ভারতীয় উদ্যোগপতি সঞ্জীব মেহতার অধীনে।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রায় ৩৮ জন অংশীদার ২০০৩ সাল নাগাদ শেয়ার বিক্রি করার জন্য উঠেপড়ে লাগেন। সঞ্জীব ২০০৩-২০০৫ সালের মধ্যে তাঁদের থেকে একে একে শেয়ারগুলি কিনে নেন। হয়ে ওঠেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নতুন মালিক।
আরও পড়ুন:
অতীতের বাণিজ্যিক সংস্থার তকমা ঝেড়ে ফেলে ২০১০ সাল থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি একটি বিলাসবহুল খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুতকারী সংস্থা হিসাবে প্রকাশ্যে আসে। ই-কমার্স ওয়েবসাইটের মাধ্যমে চা, কফি, বিস্কুট, জ্যাম, মিষ্টি প্রভৃতি বিক্রির দ্বারা পুনরায় পথচলা শুরু করে এই কোম্পানি।
সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সঞ্জীব জানান, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মালিক হয়ে ওঠা তাঁর কাছে এক অবর্ণনীয় অনুভূতি। যারা একদিন তাঁর দেশকে নিয়ন্ত্রণ করেছে, তাদেরই কিনে ফেলার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষমতা ছিল না তাঁর। এটিকে সঞ্জীব ব্রিটিশদের ভারতবাসীর উপর করা শোষণের ‘প্রতিশোধ’ হিসাবেই দেখেছিলেন।
১৯৬১ সালে মুম্বইয়ে জন্ম সঞ্জীব মেহতার। তাঁর দাদু গফুরচাঁদ মেহতার বেলজিয়ামে হিরের ব্যবসা ছিল। ব্যবসায়িক পরিবারে জন্মানো সঞ্জীবের ছোট থেকেই স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে সফল ব্যবসায়ী বা উদ্যোগপতি হওয়ার।
সঞ্জীব মুম্বইয়ের সিডেনহাম কলেজ থেকে কমার্স এবং ফাইন্যান্সে স্নাতক হন। এর পর তিনি চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্সি নিয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৮৪ সালে সঞ্জীব অহমদাবাদের আইআইএম (ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্ট)-এর ‘এক্জ়িকিউটিভ এডুকেশন প্রোগ্রাম’-এর সদস্যও ছিলেন।
পারিবারিক ব্যবসার কথা মাথায় রেখে সঞ্জীব লস অ্যাঞ্জেলসের জিআইএ (জেমোলজ্যিকাল ইনস্টিটিউট অফ আমেরিকা) থেকে রত্ন বিশেষজ্ঞের কোর্স করেন।
কিন্তু পড়াশোনা শেষ করার পর সঞ্জীব পারিবারিক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হননি। উল্টে লন্ডনে গিয়ে নিজস্ব ব্যবসা স্থাপনে গুরুত্ব দেওয়া শুরু করেন। নিজের ঘরে বসেই ই-কমার্স সাইটে বাগান সাজানোর সামগ্রী, ঘড়ি, জলের বোতলের প্রভৃতি জিনিস বিক্রি করা শুরু করেন।
এ ছাড়া বিভিন্ন নামীদামি সংস্থার হয়ে ডিস্ট্রিবিউটর হিসাবেও কাজ করেন সঞ্জীব। সে সমস্ত পণ্য রাখার জন্য নানা জায়গায় গুদামও ছিল তাঁর। কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কেনার স্বপ্ন সফল করতে তিনি সে সব বিক্রি করে দেন।
২০০৫ সাল নাগাদ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পাকাপাকি ভাবে কিনে ফেলার মধ্য দিয়ে সঞ্জীবের জীবনে বড় পরিবর্তন আসে। তাঁর উদ্যোগপতি হয়ে ওঠার স্বপ্ন পূরণ হয়। ২০১০ সালে লন্ডনের মেফেয়ারে পুনরায় স্থাপিত হয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি।
যদিও সঞ্জীব তাঁর এই স্বপ্নকে বেশি দিন জিইয়ে রাখতে পারেননি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে কোম্পানিটি পুনরায় বন্ধ হয়ে যায়। ব্রিটিশদের কোম্পানি কিনে নিলেও সেটিকে চালাতে গিয়ে হিমশিম খান সঞ্জীব। জানা গিয়েছে, সঞ্জীবের মূল সংস্থা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি লিমিটেড ও ‘ইস্ট ইন্ডিয়া’ নামাঙ্কিত বেশ কিছু সংস্থা ঋণ ও করে জর্জরিত। তার সঙ্গে রয়েছে কর্মচারীদের বেতন দিতে না পারা। সব মিলিয়ে দেউলিয়া হয়ে বন্ধ হয়ে যায় কোম্পানি।