ছোট কোচিং থেকে অনলাইন শিক্ষার সম্রাট! বাইজু’সের হাত ধরে হাজার হাজার কোটির মালিক রবীন্দ্রন দেউলিয়া হলেন কী করে?
বর্তমানে পতনের মুখে থাকা রবীন্দ্রনই একসময় স্টার্টআপ সংস্থা বাইজু’স-এর হাত ধরে ১০ হাজার কোটি ডলারের সংস্থার মালিক হয়েছিলেন। নিজেও ছিলেন হাজার হাজার কোটির মালিক।
আদালত অবমাননার অভিযোগ। বাইজু’সের প্রতিষ্ঠাতা বাইজু রবীন্দ্রনকে ছ’মাসের কারাদণ্ডের সাজা শোনাল সিঙ্গাপুরের এক আদালত। জানা গিয়েছে, ২০২৪ সালের এপ্রিল মাস থেকে শুরু হওয়া সম্পত্তি সংক্রান্ত আদালতের একাধিক নির্দেশ অমান্য করার অভিযোগ ওঠে রবীন্দ্রনের বিরুদ্ধে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই সম্প্রতি বাইজু’সের প্রতিষ্ঠাতা তথা প্রাক্তন ধনকুবেরের কারাদণ্ড হয়েছে।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর, সংশ্লিষ্ট কর্তার কাছে রবীন্দ্রনকে আত্মসমপর্ণ করার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। একই সঙ্গে ৯০ হাজার সিঙ্গাপুর ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় ৬৭.৪৫ লক্ষ টাকা) পরিশোধ করতেও বলা হয়েছে।
জানা গিয়েছে ‘বিয়ার ইনভেস্টকো’ নামে সংস্থায় আইনি মালিকানা থাকার প্রমাণপত্রও রবীন্দ্রনকে জমা দিতে বলা হয়েছে আদালতের তরফে। বাইজু’স-এর পতনের পর রবীন্দ্রনের মোট সম্পত্তি শূন্যে নেমে আসার প্রেক্ষাপটে এই পদক্ষেপ করা হল। তবে রবীন্দ্রন সিঙ্গাপুরে আছেন না অন্য কোথাও, তা জানা যায়নি।
বর্তমানে পতনের মুখে থাকা রবীন্দ্রনই একসময় স্টার্টআপ সংস্থা বাইজু’স-এর হাত ধরে ১০ হাজার কোটি ডলারের সংস্থার মালিক হয়েছিলেন। নিজেও ছিলেন হাজার হাজার কোটির মালিক। বলিউডের অন্যতম দামি তারকা শাহরুখ খানকে নিজেদের সংস্থা বাইজু’স-এর ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডরও করেছিলেন তিনি। তবে কয়েক বছর ব্যবসা রমরমিয়ে চলার পরেই পতন হয়!
শূন্য থেকে শুরু বলতে যা বোঝায় বাইজু রবীন্দ্রনের গল্পটাও ঠিক সেই রকম। রূপকথার পক্ষীরাজ ঘোড়ার মতোই তার উত্থান। কিন্তু পতন তার থেকেও দ্রুত। কিন্তু ভারতের তরুণ এই ব্যবসায়ীর ‘পক্ষীরাজের ডানা’ ভাঙল কী ভাবে?
আরও পড়ুন:
রবীন্দ্রন কেরলের ছেলে। বাবা-মা দু’জনেই শিক্ষক। এক জন স্কুলে অঙ্ক শেখাতেন, অন্য জন পদার্থবিজ্ঞান। তিনি নিজেও বিজ্ঞানের ছাত্র। ইঞ্জনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পড়াশোনা শেষ করে চাকরিও করছিলেন। তখন থেকেই তিনি বীজ বুনতে শুরু করেছিলেন হাজার কোটির সংস্থার।
রবীন্দ্রন চাকরি করার সময় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ‘ক্যাট’-এর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল তাঁর এক বন্ধু। অবসরে বন্ধুকে অঙ্কে সাহায্য করতেন তিনি। সেই বন্ধু পরীক্ষায় ভাল ফল করেন। উৎসাহিত হয়ে পরীক্ষায় বসেন রবীন্দ্রনও। দেখা যায়, প্রথম বারের চেষ্টাতেই ক্যাটে শীর্ষ স্থানাধিকারীদের এক জন হয়ে গিয়েছেন তিনি! তবে সেখানেই থামেননি রবীন্দ্রন। ২০০৪ সালে আবার ক্যাট পরীক্ষা দেন তিনি। সে বারও তাঁর স্থান ছিল শীর্ষে। ধীরে ধীরে কোচিং দেওয়ার দিকে ঝোঁকেন রবীন্দ্রন। ধীরে ধীরে ছাত্রসংখ্যা বাড়তে থাকে তাঁর। আয়ও হচ্ছিল ভাল।
দু’বছর পর, ২০০৬ সালে চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন রবীন্দ্রন। তত দিনে তাঁর ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা কয়েকশো পেরিয়েছে। বেড়েছে তাঁর কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে ক্যাটে সফল ছাত্রছাত্রীর সংখ্যাও। ২০০৭ সালে নিজের নামে পড়ানোর ক্লাসের নাম দেন রবীন্দ্রন— ‘বাইজু’স ক্লাস’। সেই ক্লাসের আয়তন অচিরেই বেড়ে যায়। ছাত্রছাত্রীদের সামাল দেওয়াও যাচ্ছিল না। ২০০৮ থেকে ২০০৯ সালের মাঝামাঝি ভিডিয়ো কোচিং শুরু করেন রবীন্দ্রন।
রবীন্দ্রনের স্ত্রী দিব্যা গোকুলনাথও ক্যাটের ছাত্রী। একসময় স্বামীরই ছাত্রী ছিলেন তিনি। সেখান থেকেই প্রেম এবং বিয়ে। শেষে রবীন্দ্রনের ব্যবসার অংশীদার হন দিব্যা। ২০১১ সালে স্ত্রীর সঙ্গে মিলে স্টার্টআপ সংস্থা ‘বাইজু’স’ শুরু করেন রবীন্দ্রন। বাইজু’স-এর ক্রমোন্বতি চোখে পড়ছিল শিল্পজগতের অনেকেরই। এই ধরনের স্টার্টআপ সংস্থাকে অর্থসাহায্য করে তাদের সংস্থায় বিনিয়োগ করে বহু বড় সংস্থা। এই ধরনের সাহায্যকে বলা হয় সিড ফান্ড। বাইজু’স এমন অজস্র সিড ফান্ডিং জোটাতে সমর্থ হয়।
আরও পড়ুন:
২০১৩ সালে বাইজু’সে প্রথম বিনিয়োগ করে আরিন ক্যাপিটাল। আরিন ক্যাপিটাল থেকে ৯০ লক্ষ ডলার সাহায্য পায় বাইজু’স। এর পর একে একে অনেক সংস্থাই এগিয়ে আসে বাইজু’সে বিনিয়োগ করতে। বাইজু’সই ছিল এশিয়ার প্রথম সংস্থা, যাদের বেছে নিয়েছিল ফেসবুক প্রতিষ্ঠাতার বিনিয়োগ সংস্থা। বাইজু’সকে বড় অঙ্কের অর্থসাহায্য করেছিল তারা। এ ভাবেই ২০১৮ সালের মধ্যে ১০০ কোটি ডলারের স্টার্টআপ সংস্থায় পরিণত হয় বাইজু’স।
ঠিক দু’বছরের মাথায় বাইজু’স-এর সংস্থার মূল্য ১০ গুণ বৃদ্ধি পায়। ১০০ কোটি থেকে এক লাফে হাজার কোটির সংস্থায় উত্থান হয় স্টার্টআপ সংস্থাটির। তখন দেশে লকডাউন। অনলাইনে পড়াশোনা করানোর প্রযুক্তি তত দিনে বাইজুর নখদর্পণে। ২০১৫ সাল থেকেই স্মার্টফোনে পড়ানোর যাবতীয় প্রযুক্তি মজুত ছিল বাইজু’স-এর হাতে। বাইজু’সও মোবাইলে পড়াশোনার সুবিধার কথা ভেবে তৈরি করেছিল তাদের নতুন অ্যাপ। ফলে সংস্থাটির চাহিদা আকাশ ছোঁয়। ২০১৮ সালের মধ্যে ব্রিটেন, আমেরিকা-সহ অধিকাংশ ইংরেজিভাষী দেশেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল বাইজু’স-এর ওই অ্যাপ।
করোনাকালে যখন সমস্ত স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইনে পড়াশোনা করানোর দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছে, তখন সাজানো-গোছানো সহজ প্রযুক্তির ডালা নিয়ে তাদের সামনে হাজির হয় বাইজু’স। ২০২১ সালে বাইজু’স-এর সংস্থার মূল্য বেড়ে দাঁড়ায় ১৬৫০ কোটি ডলারে। ভারতের সর্বাধিক মূল্যের স্টার্টআপ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয় বাইজু’স। টেক্কা দেয় পেটিএমকে। ওই বছরই বাইজু’স-এর মূল্য বেড়ে দাঁড়ায় ২২০০ কোটি ডলার। ভারতীয় ক্রিকেট টিমের স্পনসরের দায়িত্বও দেওয়া হয় এই স্টার্টআপ সংস্থাকে। কিন্তু এর পরেই ধাক্কা লাগে পক্ষীরাজের ডানায়।
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে বাইজু’স-এর বড় ক্ষতির রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসে। জানা যায় শেষ অর্থবর্ষে ৪৫৮৮ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বাইজু’স-এর। প্রভাব পড়ে সংস্থার কর্মীদের উপর। বোঝা কমাতে হাজার হাজার কর্মী ছাঁটাই করা হয় বাইজু’সে। কিন্তু কোনও ভাবেই বিপুল ঋণের বোঝা কমে না বাইজু’স-এর। নিজেদের বাঁচানোর কোনও কসুরই বাকি রাখেননি রবীন্দ্রন। ডুবন্ত তরী ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন সকলেই। এর পরেও হাল ছাড়েনি বাইজু’স।
জুলাই মাসে স্টেট ব্যাঙ্কের প্রাক্তন চেয়ারম্যান রজনীশকুমার এবং ইনফোসিসের প্রাক্তন সিএফও মোহনদাস পাইকে উপদেষ্টা বানায় বাইজু’স। এমনকি, নিয়োগ করে নতুন অডিটর। সমস্ত লাভ-ক্ষতির হিসাব জানানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় বিনিয়োগকারীদের। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সুরাহা হয়নি। খড়কুটো আঁকড়ে ধরে বাইজু’স। ১৫ হাজার কর্মীর বেতন দেওয়ারও ক্ষমতা ছিল না তাদের। কর্মচারীদের বেতন দিতে না পারায় সম্প্রতি নিজের বসতবাড়িটিকেও বন্ধক রাখতে হয় তাঁকে। নিতে হয় ঋণ। ইডির তল্লাশিও হয় তাঁর বাড়িতে। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠে বিদেশি মুদ্রা পরিচালনা আইন (ফেমা) ভাঙার অভিযোগ।
২০২৩ সালের এপ্রিলে ভারতে বাইজু’সের বিরুদ্ধে প্রথম ফেমা ভাঙার অভিযোগে তদন্ত শুরু করে ইডি। ২০১১-২০২৩ পর্যন্ত ২৮,০০০ কোটি টাকা প্রত্যক্ষ বিদেশি লগ্নি আসা, বিজ্ঞাপন ও বিপণনে ৯৪৪ কোটি খরচ এবং বিভিন্ন দেশে ৯৭৫৪ কোটি টাকা বিনিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। তার উপরে আবার বিদেশে ঋণ শোধে ব্যর্থ হওয়ার কারণে শাখা সংস্থা হাতছাড়া হওয়া আটকাতে আইনি পথে হাঁটে সংস্থাটি।
বাইজু’স-এর সঙ্কটের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল ২০২১ সালে বিশ্বব্যাপী ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য আমেরিকার থেকে নেওয়া ১২০ কোটি ডলারের ‘টার্ম’ ঋণ। পরবর্তী কালে এই ঋণটি একটি বিশাল আইনি বিবাদের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়, যখন ঋণদাতারা কোম্পানিটির বিরুদ্ধে ঋণের শর্তাবলি লঙ্ঘন, আর্থিক তথ্য প্রকাশে দেরি এবং যথাযথ তথ্য প্রকাশ ছাড়াই লক্ষ লক্ষ ডলার স্থানান্তরের অভিযোগ আনে। মার্কিন ঋণদাতারা অভিযোগ করেন, ঋণের প্রায় ৫৩.৩০ কোটি ডলার এমন সব অস্পষ্ট বিনিয়োগ কাঠামো এবং বেনামি সংস্থার মাধ্যমে স্থানান্তর করা হয়েছিল, যা ঋণদাতাদের নাগালের বাইরে ছিল।
বিবাদটি মার্কিন আদালতে একটি দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে রূপ নেয়, যেখানে ঋণদাতারা প্রতিষ্ঠাতা এবং কোম্পানির কর্তাদের বিরুদ্ধে তহবিল গোপন করা এবং তদন্তে বাধা দেওয়ার অভিযোগ আনেন। আদালত নির্দেশ দেয়, বিতর্কিত তহবিলগুলি কী ভাবে বিভিন্ন সংস্থা এবং বিনিয়োগের মাধ্যমে স্থানান্তর করা হয়েছিল, তার একটি সম্পূর্ণ হিসাব জমা দিতে হবে বাইজু’সকে। যদিও রবীন্দ্রন সে সময় কোনও অন্যায় করার কথা অস্বীকার করেন এবং জানান ঋণ নেওয়া অর্থ ব্যক্তিগত সমৃদ্ধির জন্য নয়, বরং বৈধ ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছিল।
তবে উন্নতির শীর্ষে থাকার সময়ও আগ্রাসী বিক্রয় কৌশল এবং কর্মসংস্কৃতির জন্য সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছিল বাইজু’স। প্রাক্তন কর্মচারী এবং বিভিন্ন প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, শিক্ষার্থীদের পরিবারকে দামি শিক্ষামূলক প্যাকেজ বিক্রি করার জন্য সংস্থার সেলসম্যানদের চাপ দেওয়া হত।
যদিও বাইজু’সের তরফে সে সব অভিযোগ অস্বীকার করা হয় এবং ঘটনাগুলিকে ব্যবসায়িক বৃদ্ধির সময়ের বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসাবে বর্ণনা করা হয়। তবে সেই সব সমালোচনা সংস্থাটির ব্যবসায়িক মডেলের স্থায়িত্ব নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগকে বাড়িয়ে তোলে। কর্মীছাঁটাই বাড়তে থাকায় এবং আর্থিক সঙ্কট চরমে পৌঁছোনোর কারণে পরিচালনগত অস্থিতিশীলতা গ্রাহকদের আস্থাকে আরও আঘাত করে এবং সংস্থার আবার উঠে দাঁড়ানোর সম্ভাবনাকে দুর্বল করে দেয়।
ক্ষতি সামাল দেওয়ার অনেক চেষ্টা করেছিলেন রবীন্দ্রন। কিন্তু কোনও কিছুই বাইজু’সের ক্ষতি ঠেকাতে পারেননি। দেউলিয়াও হয়ে গিয়েছেন রবীন্দ্রন। বাইজু’সের প্রতিষ্ঠাতাকে এ বার ছ’মাসের কারাবাসের নির্দেশ দিল সিঙ্গাপুরের আদালত।