চিন-পাকিস্তানের ঘুম ওড়াতে ভারতীয় সেনার হাতে ‘বুদ্ধিমান’ ড্রোন! জলদস্যুর দেশে গোপনে বাড়ছে ‘কাল ভৈরব’
ভারতীয় সেনার জন্য কৃত্রিম মেধাভিত্তিক ‘কাল ভৈরব’ নামের এক হামলাকারী ড্রোন তৈরি করেছে বেঙ্গালুরুর সংস্থা। পাইলটবিহীন যানটির বাণিজ্যিক উৎপাদন হবে ইউরোপের পর্তুগালে। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে সেখানকার নাবিকদের জলদস্যু বা ‘হার্মাদ’ হিসাবে যথেষ্ট কুখ্যাতি ছিল।
যুদ্ধের সময় ‘বুদ্ধি’ খাটিয়ে সঠিক নিশানায় হামলা। লুকিয়ে থাকা শত্রুদের খুঁজে খুঁজে নিকেশ। এ-হেন ‘মেধাবী’ সামরিক ড্রোন তৈরি করে খবরের শিরোনামে ভারত! তবে চমকের এখানেই শেষ নয়। স্বদেশে নয়, দেশের বাইরে সেই পাইলটবিহীন যান উৎপাদন করবে নয়াদিল্লি। ফলে সংশ্লিষ্ট ফৌজি ড্রোনটিকে ঘিরে দানা বাঁধছে রহস্য। অস্ত্রটির রহস্য ফাঁস করতে উঠেপড়ে লেগেছেন দুনিয়ার তাবড় সামরিক বিশ্লেষকেরা।
ভারতীয় সেনার বহরে শামিল হতে চলা পাইলটবিহীন যানটির সাঙ্কেতিক নাম ‘কাল ভৈরব’। এর নকশা তৈরি করেছে বেঙ্গালুরুর ‘ফ্লাইং ওয়েজ় ডিফেন্স অ্যান্ড অ্যারোস্পেস’ বা এফডব্লিউডিএ। সম্প্রতি, একটি বিবৃতিতে বেসরকারি প্রতিরক্ষা সংস্থাটি জানিয়েছে, ‘কাল ভৈরব’-এর বাণিজ্যিক উৎপাদন পর্তুগালে করবে তারা। এ দেশের সামরিক সরঞ্জাম নির্মাণের ইতিহাসে এই ঘটনা প্রথম। এই কাজে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছে লিসবনের একটি কোম্পানি।
‘কাল ভৈরব’ উৎপাদনের বরাত নেওয়া পর্তুগালের ওই সংস্থাটির নাম ‘স্কেচপিক্সেল এলডিএ’। বেঙ্গালুরুর ‘ফ্লাইং ওয়েজ় ডিফেন্স’-এর সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছে তারা। প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নির্মাণে বিশ্ব জুড়ে লিসবনের এই সংস্থার খ্যাতি রয়েছে। চতুর্থ প্রজন্মের মার্কিন লড়াকু জেট এফ ১৬-এ ব্যবহার হচ্ছে তাদের তৈরি যন্ত্রাংশ। যুদ্ধবিমানটির মূল নির্মাণকারী সংস্থা হল যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত প্রতিরক্ষা সংস্থা ‘লকহিড মার্টিন’।
সূত্রের খবর, ‘কাল ভৈরব’ ড্রোন উৎপাদনের সময় স্টিমুলেশন সিস্টেম, কৃত্রিম মেধা প্রযুক্তি, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং আন্তঃকার্যক্ষমতার কারিগরি সহায়তা দিয়ে ‘ফ্লাইং ওয়েজ় ডিফেন্স’কে সাহায্য করবে পর্তুগালের ‘স্কেচপিক্সেল’। তবে মূল নকশা ও প্রযুক্তির যাবতীয় স্বত্ব থাকবে বেঙ্গালুরুর সংস্থাটির হাতেই। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ‘অপারেশন ৭৭৭’-এর আওতায় চলবে ‘কাল ভৈরব’-এর বাণিজ্যিক উৎপাদন।
গত বছর (২০২৫ সাল) প্রথম বার ‘কাল ভৈরব’কে প্রকাশ্যে আনে এ দেশের বেসরকারি প্রতিরক্ষা সংস্থা ‘ফ্লাইং ওয়েজ় ডিফেন্স’। ওই সময় ফৌজি ড্রোনটির সক্ষমতার রিপোর্ট ঘিরে হইচই পড়ে যায়। তখনই এর বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য ‘অপারেশন ৭৭৭’-এর পরিকল্পনা সেরে ফেলেন বেঙ্গালুরুর সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা তথা সিইও সুহাস তেজ়স্কন্দ। ৭টি মহাদেশের ৭৭টি দেশে এর উৎপাদন, উন্নত সংস্করণ নির্মাণ এবং মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
আরও পড়ুন:
বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই গণমাধ্যমে মুখ খুলেছেন তেজ়স্কন্দ। তাঁর কথায়, ‘‘সামরিক প্রযুক্তিতে ভারত যে এগিয়ে গিয়েছে, সেটা দেখানোর সময় এসেছে। সেই কারণে ‘কাল ভৈরব’কে ‘অপারেশন ৭৭৭’-এর মাধ্যমে দেশের সীমানার বাইরে নিয়ে যাচ্ছি। আমাদের উদ্দেশ্য হল বিশ্বব্যাপী প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা। এতে আমাদের তৈরি হাতিয়ারের গুরুত্ব আন্তর্জাতিক বাজারে বেড়ে যাবে কয়েক গুণ।’’
বিশ্লেষকদের অবশ্য দাবি, ‘কাল ভৈরব’-এর বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য পর্তুগালকে বেছে নিয়ে এক ঢিলে একাধিক পাখি মেরেছে ভারত। লিসবন মার্কিন নেতৃত্বাধীন ইউরোপীয় সামরিক জোট নেটোর (নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজ়েশন) সদস্য হওয়ায়, তাদের হাতে আছে উন্নত সামরিক প্রযুক্তি। এগুলি আগামী দিনে নিজেদের তৈরি করা ড্রোন বা অন্য কোনও হাতিয়ারে ব্যবহার করার সুযোগ পেতে পারে নয়াদিল্লি।
নেটোভুক্ত দেশগুলি প্রায়ই নিজেদের মধ্যে সামরিক প্রযুক্তি দেওয়া-নেওয়া করে থাকে। সেই তালিকায় প্রায়ই নাম দেখা যায় ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, ইটালি, পর্তুগাল ও স্পেনের। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, লিসবনে ‘কাল ভৈরব’-এর বাণিজ্যিক উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় নেটোর বাস্তুতন্ত্রে প্রবেশাধিকার পাবে ভারত। কারণ, সংশ্লিষ্ট ড্রোনটিতে প্রযুক্তিগত সহায়তা দেবে সেখানকার সংস্থা ‘স্কেচপিক্সেল’।
দ্বিতীয়ত, দীর্ঘ দিন ধরেই ইউরোপের বাজারে অত্যাধুনিক হাতিয়ার বিক্রির চেষ্টা চালাচ্ছে ভারত। নয়াদিল্লির অস্ত্র কেনার ব্যাপারে আগ্রহ রয়েছে গ্রিস ও সাইপ্রাসের। এদের সামনে রেখে ভূমধ্যসাগরীয় এলাকায় পাকিস্তানের ‘বন্ধু’ রাষ্ট্র তুরস্কের উপর চাপ বৃদ্ধির কৌশল নিয়েছে কেন্দ্র। পর্তুগালে ‘কাল ভৈরব’-এর বাণিজ্যিক উৎপাদন ইউরোপের হাতিয়ারের বাজারে ভারতকে পা জমাতে সাহায্য করবে বলে আশাবাদী ওয়াকিবহাল মহল।
আরও পড়ুন:
এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে আরও একটি তত্ত্ব প্রকাশ্যে এসেছে। সেটা হল, ভারতীয় সেনার থেকে ‘কাল ভৈরব’-এর বিপুল বরাত পেয়েছে ড্রোনটির নির্মাণকারী ‘ফ্লাইং ওয়েজ় ডিফেন্স’। কিন্তু, বেঙ্গালুরুর ইউনিটে মূলত গবেষণার কাজ চালিয়ে থাকে তারা। আর তাই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পাইলটবিহীন যানগুলি বাহিনীর হাতে তুলে দিতে পর্তুগালের ‘স্কেচপিক্সেল’-এর সঙ্গে চুক্তি সেরেছে কর্নাটকের এই প্রতিরক্ষা সংস্থা।
সাবেক সেনাকর্তাদের আশঙ্কা, যুদ্ধের সময় ভারতের সামরিক সরঞ্জাম নির্মাণের কারখানাগুলিকে নিশানা করতে পারে চিন বা পাকিস্তান। সে ক্ষেত্রে পর্তুগালে বাণিজ্যিক উৎপাদনের কারণে ‘কাল ভৈরব’-এর গায়ে লাগবে না কোনও আঁচড়। উল্টে দ্রুত সেখান থেকে ঘরের মাটিতে ফিরিয়ে এনে ওই ফৌজি ড্রোনেই পাল্টা প্রত্যাঘাতের সুযোগ পাবে এ দেশের বাহিনী।
বিশ্বের শক্তিশালী সামরিক ড্রোনগুলির মূলত দু’টি শ্রেণি বিভাগ রয়েছে। সেগুলি হল, হাই অল্টিচিউড লং ইন্ডুয়ের্যান্স (এইচএএলই) এবং মিডিয়াম অল্টিচিউড লং ইন্ডুয়ের্যান্স (এমএএলই)। ৫০,০০০ থেকে ৬০,০০০ ফুট উচ্চতায় উড়তে পারে প্রথম শ্রেণির পাইলটবিহীন যান। একটানা কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ ভেসে থাকার সক্ষমতাও রয়েছে। ইরান যুদ্ধে ব্যবহৃত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘এমকিউ-৯ রিপার’ হল এই ধরনের একটি ফৌজি ড্রোন।
‘কাল ভৈরব’ অবশ্য মাঝারি উচ্চতায় দীর্ঘ ক্ষণ উড়তে পারা পাইলটবিহীন যান। এর পাল্লা ৩,০০০ কিলোমিটার। টানা ৩০ ঘণ্টা ভেসে থাকার সক্ষমতা রয়েছে ‘ফ্লাইং ওয়েজ় ডিফেন্স’-এর ড্রোনটির। শুধু তা-ই নয়, পাঁচ কেজি বিস্ফোরক বহন করতে পারে ‘কাল ভৈরব’। মূলত একসঙ্গে ঝাঁক বেঁধে হামলা চালিয়ে শত্রুকে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে এর নকশা তৈরি করেছে বেঙ্গালুরুর সংস্থাটি। লক্ষ্য চিহ্নিত করার জন্য এতে আছে কৃত্রিম মেধা বা এআই প্রযুক্তি।
এ দেশের সেনাকর্তাদের ‘কাল ভৈরব’ পছন্দ হওয়ার নেপথ্যে ড্রোনটির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে সবচেয়ে বড় কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। সূত্রের খবর, ঝাঁক বেঁধে হামলা করার সময় এআই প্রযুক্তিতেই একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে এই পাইলটবিহীন যান। তা ছাড়া শত্রুর আকাশ প্রতিরক্ষা (এয়ার ডিফেন্স) ব্যবস্থা, জ্বালানি এবং হাতিয়ারের ডিপো খুঁজে নিয়ে ওড়ানোর সহজাত সক্ষমতা রয়েছে ‘কাল ভৈরব’-এর।
চলতি বছরের মার্চে কৃত্রিম মেধাভিত্তিক আরও একটি আত্মঘাতী ড্রোনের সফল পরীক্ষা চালায় ভারত। পাইলটবিহীন যানটির পোশাকি নাম ‘শেষনাগ-১৫০’। এর নির্মাণকারী সংস্থা হল বেঙ্গালুরুর ‘নিউস্পেস রিসার্চ অ্যান্ড্রয়েড টেকনোলজিস’। ‘কাল ভৈরব’-এর মতো এটিও ঝাঁক বেঁধে হামলা চালাতে পারে। তবে ড্রোনটির পাল্লা মাত্র ১,০০০ কিলোমিটার। ২৫-৪০ কেজি বিস্ফোরক নিয়ে টানা পাঁচ ঘণ্টা উড়তে পারে ‘শেষনাগ-১৫০’।
এ বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে চলা যুদ্ধে আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে ইরানের ‘শাহিদ-১৩৬’ আত্মঘাতী ড্রোন। অত্যন্ত সস্তা এই পাইলটবিহীন যানটি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক কোটি ডলারের রেডার বা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছে তেহরান। এরই আদলে ‘শেষনাগ-১৫০’কে বেঙ্গালুরুর সংস্থা ‘নিউস্পেস রিসার্চ অ্যান্ড্রয়েড টেকনোলজিস’ তৈরি করেছে বলে খবর পাওয়া গিয়েছে।
২০২৫ সালের মে মাসে ‘অপারেশন সিঁদুর’কে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের সঙ্গে ‘যুদ্ধে’ ড্রোনের উপযোগিতা টের পায় ভারতীয় সেনা। লড়াই চলাকালীন ইজ়রায়েলি পাইলটবিহীন যান হেরন ও হেরপ ব্যবহার করে ইসলামাবাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উড়িয়ে দেয় নয়াদিল্লি। শুধু তা-ই নয়, রাওয়ালপিন্ডির পাঠানো ড্রোনের ঝাঁককেও মাঝ-আকাশে ধ্বংস করে এ দেশের বিমানবাহিনী। এর মধ্যে ছিল তুরস্কের ‘বের্যাক্টার টিবি-২’ও।
‘অপারেশন সিঁদুর’ পরবর্তী সময়ে ড্রোন প্রযুক্তিতে উন্নতি করার প্রভূত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ভারত। এ ব্যাপারে কেন্দ্রের উৎসাহ পাচ্ছে স্টার্টআপ ও প্রতিরক্ষা সংস্থা। ‘কাল ভৈরব’-এর নির্মাণকারী সংস্থা ‘ফ্লাইং ওয়েজ ডিফেন্স’ও তার মধ্যে অন্যতম। আগামী দিনে পর্তুগালের ‘স্কেচপিক্সেল’-এর সঙ্গে হাত মিলিয়ে মহাকাশভিত্তিক হাতিয়ার তৈরির দিকেও ঝুঁকতে পারে তারা, খবর সূত্রের।