• নিজস্ব প্রতিবেদন
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

আন্তর্জাতিক

মৃত সমুদ্রের উপর আজও জেগে থাকে দুর্গ, ভিতরে লুকিয়ে থাকে গা ছমছমে রহস্য

শেয়ার করুন
১৮ masada
কাঠ ফাটা রোদ, যে দিকেই তাকানো হয়, শুধু আঁকাবাঁকা দাগের শুকনো মাটি। মাইলের পর মাইল জুড়ে নেই কোনও গাছপালা, মানুষও। মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক মালভূমি, আর তাঁর মাথায় এক প্রাচীন জনহীন দুর্গ। দুর্গের গায়ে লেগে রয়েছে রক্তের দাগ। বছরের পর বছর সবার চোখের আড়ালে থেকে সে আবার জেগে উঠেছে তার কাহিনি বলতে। জেনে নিন সেই রহস্যময় দুর্গের গল্প।
১৮ masada
ছবি দেখেই বোঝা যায় এক অসাধারণ সুন্দর এক জায়গা। কিন্তু এর পিছনের ইতিহাস কী? ইজরায়েলের মাসাদা মালভূমির উপর অবস্থিত এই দুর্গের ঠিক নীচেই যে মাইলের পর মাইল বিস্তারিত ফাঁকা ভূমি, তা এক সময় ছিল সমুদ্র। কালের নিয়মে তা শুকিয়ে গিয়ে তৈরি হয়েছে বিচিত্র নকশা।
১৮ masada
এত উচ্চতায় এই দুর্গ তৈরি করার পিছনেও রয়েছে এক ইতিহাস। খ্রিস্টপূর্ব ৩০ শতকে শত্রুদের হাত থেকে প্রজাদের রক্ষা করার উদ্দেশ্যে রাজা হেরাদের আদেশে দু’টি দুর্গ তৈরি করা হয়। বর্তমানে একটি দুর্গই রয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৩০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই দুর্গে ছিল তিনটি ভাগ। এখনও রয়েছে ভাঙা অস্ত্রাগার, সেনাছাউনি, ধনভাণ্ডার, বিশালাকায় প্রাসাদ ও কুয়ো।
১৮ masada
৬৮ খ্রিস্টাব্দে রোমানদের সঙ্গে বিদ্রোহ শুরু হলে একদল কট্টরপন্থী ইহুদি যাঁরা ‘জিলট’ নামে পরিচিত, জেরুজালেম থেকে পালিয়ে এই দুর্গে আশ্রয় নেন। এই দুর্গই হয়ে ওঠে তাঁদের ঘাঁটি। ৭২ খ্রিস্টাব্দে রোমানরা এই দুর্গ চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলে এবং দীর্ঘ এক বছরের চেষ্টায় মালভূমির পশ্চিম দিকে বিশাল প্রাচীর ও মাটির ঢাল তৈরি করে দুর্গে পৌঁছানোর রাস্তা তৈরি করে।
১৮ masada
দুর্গে বসবাসকারী ৯৬০ জন ইহুদি রোমানদের হাতে আত্মসমর্পণের বদলে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন এবং একে একে সবাই দুর্গের ছাদ থেকে ঝাঁপ দেন। কেবলমাত্র দু’জন মহিলা ও পাঁচ জন শিশু বেঁচে ছিল বলে জানা যায়। ইহুদিদের এই আত্মহত্যার ঘটনাকে আজও সাহস, বীরত্ব ও শহিদের গৌরব এবং স্মৃতি বলে মানা হয়।
১৮ masada
কথিত আছে, রোমানদের আক্রমণে আগুনে পুড়ে একটি দুর্গ সম্পূর্ণ ভাবে ধ্বংস হয়ে যায়। দ্বিতীয় দুর্গটির গায়েও বহু আঘাতের চিহ্ন আজও দেখতে পাওয়া যায়। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সময় অবধি মাসাদা রোমানদের দখলে ছিল। এই সময়ই দুর্গের ভিতরে এক গির্জা তৈরি করা হয়।
১৮ masada
এই জায়গার আরও একটি বৈশিষ্ট্য তথা রহস্য হল ইওরাম গুহা। মাসাদা মালভূমির ১০০ মিটার নীচেই খোঁজ মেলে ইওরাম গুহার যেখানে সেই সময়ে ঢোকা প্রায় অসম্ভব ছিল। এই গুহায় দেখতে পাওয়া যায় বহু গাছ। যেখানে সূর্যের আলো ঠিক ভাবে পৌঁছয় না, সেখানে এত বছর ধরে গাছগুলি প্রায় আলো ও জল ছাড়া কী ভাবে বেঁচে ছিল সেটা এক রহস্য।
১৮ masada
এই গুহাতেই খোঁজ মেলে এক বার্লির বীজের, যার বয়স ৬০০০ বছর। এই বীজের উপরেই গবেষণা চালিয়ে বার্লির আদি রূপের খোঁজ মেলে। কোনও জংলী বীজ নয়, জানা যায় এই ধরনের বার্লির চাষ ১০ হাজার বছর আগে করা হত জর্ডন রিফ্ট উপত্যকায়।
১৮ masada
প্রায় হারিয়ে যেতে বসা মাসাদা উপত্যকাকে ১৮৩৮ সালে এডওয়ার্ড রবিনসন ও এলি স্মিথ প্রথম আবিষ্কার করেন। স্যামুয়েল অলকট ও বিখ্যাত চিত্রশিল্পী ডব্লু টিপিং প্রথম বার মাসাদা মালভূমি চড়তে সক্ষম হন। এরপর পুরাতত্ববিদ সামারা গাটম্যানের নেতৃত্বে ১৯৫৯ সালে প্রথম খনন শুরু করা হয়।
১০১৮ masada
১৯৬৩-’৬৫ সালে মাসাদা উপত্যকার খননকার্য শেষ হয়। জানা যায়, চরম শুষ্ক আবহাওয়ার জন্য প্রায় দুই হাজার বছর ধরে এই উপত্যকায় কোনও জনমানুষের বসবাস ছিল না। দীর্ঘ সময় ধরে খননকার্যের মাধ্যমে এই দুর্গের বেশ কিছু বাড়ি, রাজা হেরাদের দুই প্রাসাদের ছবি, রোমান শৈলীতে তৈরি স্নানাগার, সিনাগগ (ইহুদিদের প্রার্থনার জায়গা) উদ্ধার করা হয়।
১১১৮ masada
দেখা মেলে এক বিশালাকার কুয়োর। জানা যায়, শুষ্ক আবহাওয়ার ফলে জলের জন্য এই বিশাল কুয়ো বানানো হয়েছিল যেখানে জল আসত নীচের ‘ওয়াদি’ থেকে বানানো নালীর মাধ্যমে। নীচের শুকনো উপত্যকায় যখন বর্ষাকালে জল আসত, তখন এই নালীর মাধ্যমেই কুয়োয় এসে জল জমতো, যা পরবর্তী সময়ে ব্যবহারের জন্য রেখে দেওয়া হতো।
১২১৮ masada
রোমানদের তৈরি মাটির প্রাচীর, দুর্গে ওঠার ঢাল আজও বর্তমান। দুর্গের নীচে তৈরি রোমানদের ৮টি সেনা শিবির ও আক্রমণের জন্য তৈরি ঢাল আজও সংরক্ষিত রয়েছে কোনও ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই। এই স্থাপত্যগুলি দেখে পরিচয় পাওয়া যায় সেই সময়ের উন্নত কৌশল পদ্ধতির। ইউনেসকোর তরফ থেকে ২০০১ সালে এই দুর্গ ও দুর্গের নীচের সৈন্য শিবিরগুলিকে ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট’ হিসাবে ঘোষণা করা হয়।
১৩১৮ masada
সিনাগগের ভিতরে পাওয়া গিয়েছে একটি মাটির পাত্রের টুকরো যেখানে বেশ কিছু অক্ষর খোদাই করা ছিল। একে পুরাতত্বের পরিভাষায় ‘ওস্ট্রাকন’ বলা হয়। এ ছাড়াও ‘ডিওটারনমি’ যা খ্রিস্টানদের ওল্ড টেস্টামেন্টের পঞ্চম ভাগ এবং ‘বুক অব এজেকেই’ এই সিনাগগেরই মাটির নীচ থেকে পাওয়া যায়। যদিও এই পুঁথিগুলি মাটির নীচে পুঁতে রাখার কারণ আজও অজানা।
১৪১৮ masada
দুর্গের মাটি খুঁড়ে পাওয়া যায় ২৮টি কঙ্কাল, যার মধ্যে একজন অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। ২৮টির মধ্যে ২৫টি গুহার ভিতর এবং দু’টি পুরুষ ও একটি নারীর কঙ্কাল স্নানাগার থেকে উদ্ধার করা হয়। নারী কঙ্কালের শুধুমাত্র মাথা উদ্ধার করা হয়েছিল। পুরুষ কঙ্কালগুলিও অসম্পূর্ণ অবস্থায় পাওয়া যায়। মনে করা হয়, যাঁরা পালাতে পারেননি, তাঁদের নৃশংস ভাবে বলি দেন রোমানরা।
১৫১৮ masada
এই দুর্গ থেকেই পাওয়া যায় এক প্রাচীন খেজুরের বীজ, যার বয়স ২০০০ বছর। এই বীজ বপন করা হলে তাঁর থেকে অঙ্কুরোদগমও হয়, যা পৃথিবীর সব থেকে প্রাচীন বীজের অঙ্কুরোদগম হিসাবে রেকর্ড গড়ে।
১৬১৮ masada
২০০১ সালে ইউনেসকোর তরফ থেকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসাবে ঘোষণা করার পর ২০০৭ সালে মাসাদা মিউজিয়ামের তরফ থেকে এই দুর্গ সাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়।
১৭১৮ masada
মাসাদা উপত্যকা ও দুর্গে যাওয়ার জন্য দু’টি পথ আছে। প্রথমটি পূর্ব দিকে সর্পিল পায়ে হাটা পথ, যা ডেড সি-র উপর দিয়ে যায়। পশ্চিম দিকে রোপওয়ের মাধ্যমেও মাসাদায় পৌছনো যায়।
১৮১৮ masada
প্রতি দিন বিকেলে একটি ‘লাইট ও সাউন্ড শো’ হয় সাধারণের জন্য যেখানে মাসাদা দুর্গের সম্পূর্ণ কাহিনি অভিনয় করে দেখানো হয়। ইজরায়েল ঘুরতে গেলে মাসাদায় যেতে ভুলবেন না কিন্তু।

Advertisement

সবাই যা পড়ছেন

Advertisement

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
বাছাই খবর
আরও পড়ুন