Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২২ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

কাজ করি, ব্যস

পারিজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
২৩ নভেম্বর ২০১৪ ০০:০৫

মধ্যবয়সিনি ক্লায়েন্ট যথেষ্ট সাহসিনী। হোটেল-ফোটেল নয়, সোজা বাড়িতেই ভাড়া করে এনেছিলেন পুরুষটিকে। এক রাতের জন্য দশ হাজার টাকায় রফা। দামি হোটেল থেকে খাবার এসেছে। ডিনার শেষ, মিউজিক সিস্টেমে মেহদি হাসান, হালকা গল্প, অতঃপর বেডরুম। বিছানায় ফোরপ্লে শুরু হব-হব, হঠাৎ বোমা! ঘরের দরজায় ক্লায়েন্টের স্বামী-র হাতের টোকা! বিজনেস ট্যুরে ছিলেন, ফিরে এসেছেন কোনও কারণে।

ভাড়া-করা পুরুষের নিশ্বাস টাকরায় আটকে গিয়েছে। কী করে পালাবেন, বুঝতে পারছেন না। কিন্তু চমক তখনও বাকি। ভয় দূরে থাক, উলটে মহিলা রাগে-বিরক্তিতে ফুঁসতে ফুঁসতে, আধা-বসনেই দরজা খুলে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়ালেন। অমনি স্বামী ভদ্রলোক কেমন কেঁচো হয়ে গেলেন। কাঁচুমাচু মুখে ‘সরি’ বলে দরজা টেনে হুড়মুড়িয়ে সরে পড়লেন। সাহসিনী বিছানায় ফিরে নিজের স্টেপকাট চুলে দু’বার আঙুল চালিয়ে, পুরুষটিকে বললেন, ‘রিল্যাক্স। আর কেউ ডিসটার্ব করবে না।’

এইটুকু বলে সিগারেটে একটা আমেজি টান মেরে আমার থতমত খাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে মিচকি-মিচকি হাসতে লাগলেন সম্রাট, গল্পের সেই ভাড়ার পুরুষ, কলকাতার ‘মেল এসকর্ট সার্ভিস’ দুনিয়ার দুর্দান্ত খেলোয়াড়। ‘হজম করতে পারছেন না, না? পৃথিবীটা বেমালুম বদলে গিয়েছে!’ বদলে যাওয়া কলকাতার সেই গল্প শুনতেই আড্ডায় বসেছিলাম সম্রাট, আয়ুষ, শিল্টু, অভিজিৎ, সৌগত, পরাগদের সঙ্গে। চৌকস, মার্জিত কথাবার্তা। ডিজাইনার পোশাক পরা ঝকঝকে চেহারা। বয়স ২৬ থেকে ৪৫-এর মধ্যে। কলকাতার পুরুষ যৌনকর্মীদের মধ্যে এঁরা প্রথম সারিতে। ঘণ্টাপ্রতি তিন থেকে চার হাজার টাকা রেট। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মহিলারা, কখনও-কখনও পুরুষরা এঁদের খদ্দের। এঁদের অনেকের এমনকী নিজেদের নাম প্রকাশেও বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই।

Advertisement

সম্রাটের গল্প

কমার্স গ্র্যাজুয়েট আমি। পড়াশোনায় ভালই ছিলাম। যাদবপুরে বাড়ি। মধ্যবিত্ত পরিবার। ছ-সাত বছর আগে একটা ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি পেলাম। দিল্লিতে পোস্টিং। ফিজিয়োথেরাপির ঝোঁক ছিল। দিল্লির একটা মাসাজ পার্লারে ফিজিয়োথেরাপির কোর্স করতে গিয়ে এই চক্করে ঢুকে পড়লাম। হাই প্রোফাইল সব মহিলা ওই ইউনিসেক্স পার্লারে আসতেন। বেশির ভাগ বিবাহিত, ৩৫-এর উপরে বয়স। বড়লোকের মেয়ে, বড়লোকের বউ। প্রচুর টাকা, কিন্তু যৌন জীবনে সন্তুষ্ট নন। ২৬-২৭ বছরের ছেলেরা ওই পার্লারে কাজ করত। আলাদা আলাদা এসি কেবিন ছিল। প্রথমে মাসাজ দিতে হত, তার পর যৌন কাজ। পারিশ্রমিকের বাইরে মহিলারা দু-তিন হাজার টাকা টিপ্স অনায়াসে মুঠোয় গুঁজে দিতেন। তখন বয়স কম, এত টাকা হাতে আসছে, আর সেক্সটাও কেমন নেশা হয়ে গেল।

কলকাতায় সেক্টর ফাইভে একটা দারুণ চাকরি পেয়ে গেলাম। কিন্তু যৌনপেশা থেকেই গেল। ওটা আমার সাইড বিজনেস। কাঁচা টাকা আসে, ইনকাম ট্যাক্স কাটে না। বাড়ির লোক জানে, আমি আইটি সেক্টরে কাজ করি আর একটা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন চালাই। হয়তো একটু আঁচ করতে পারে, কিন্তু বাড়িতে টাকার অভাব রাখি না বলে আমাকে ঘাঁটায় না।

কলকাতায় হরদম ‘গ্রুপ সেক্স’ বা ‘কাপ্ল সেক্স’-এর জন্য আমাদের ডাক পড়ে। গ্রুপ সেক্স মানে, তিন-চার জন বা তারও বেশি মহিলা এক সঙ্গে থাকবেন। তাঁরা পরস্পরের পরিচিত। তাঁদের সঙ্গে পালা করে সেক্স করতে হবে। আর ‘কাপ্ল সেক্স’-এর জন্য স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে ভাড়া করেন। তখন সঙ্গে করে কোনও কলগার্লকে নিয়ে যেতে হয়। এটা আসলে ‘পার্টনার-সোয়াপিং’। আমার সঙ্গে স্ত্রীটি এবং কলগার্লের সঙ্গে স্বামীটি যৌন সম্পর্ক করবে। সেটা এক ঘরে এক বিছানায় হতে পারে কিংবা অন্য ঘরে। এখন প্রচুর অল্পবয়সি দম্পতি, হয়তো এক-দু’বছর বিয়ে হয়েছে, তাঁরাও আমাদের ভাড়া করছেন! এতে নাকি জীবনে একঘেয়েমি কাটে। আমার এক ঘরে, এক বিছানায়, একই সঙ্গে স্বামী ও স্ত্রী’র সঙ্গে সম্পর্কের অভিজ্ঞতাও রয়েছে।

এক এক সময় মনে হয়, যৌন চাহিদার চেয়েও বেশি তীব্র বোধহয় মানুষের এই একঘেয়েমি থেকে পালানোর ইচ্ছেটাই। মানুষের একা থাকার ভয়, জীবনটায় বোর হয়ে যাওয়ার ভয়, এগুলো বাঘের ভয়ের চেয়েও বেশি। নইলে লোকে ঘণ্টায় দু’হাজার টাকা দিয়ে আমার সঙ্গে ‘ফোন-সেক্স’ করবে কেন? সেখানে তো সে শরীরটাকেও পাচ্ছে না। ভান করছে শুধু।

এই শরীর-চাওয়ার মধ্যে অবশ্যই যৌন খিদে রয়েছে, আর রয়েছে অন্য একটা মানুষকে যেমন করে হোক জাপটে ধরে নিজেকে বোঝানো, ‘সান্নিধ্য পাচ্ছি’। এর কোনও বয়স নেই। বারাসতে ১৪ বছর বয়সি এক স্কুলছাত্রী আমার বাঁধা খদ্দের। কাকা-কাকিমার সঙ্গে থাকে। তার বাবা-মা কাজের জন্য থাকেন কানপুরে। বছর ৪৫-এর আর এক খদ্দের ছিলেন আমার। সেই মহিলা মাঝেমধ্যে আঁচড়ে-কামড়ে দিতেন। চেন স্মোকার। কখনও হাতে সিগারেটের ছ্যাঁকা দিতেন। তার পর এক দিন সুইসাইড করলেন। আর এক জন ছিলেন খড়্গপুরে। বয়স প্রায় ৭০। স্বামী মারা গিয়েছিলেন অনেক দিন। একমাত্র ছেলে বিদেশে। ভদ্রমহিলার সামনের বেশ কয়েকটা দাঁতও পড়ে গিয়েছিল। আমার নিয়মিত ক্লায়েন্ট ছিলেন। তার পর এক দিন ওঁর শ্রাদ্ধের চিঠি পেলাম। উনি নাকি মৃত্যুশয্যায় আমার নাম ঠিকানা বলে গিয়েছিলেন, আর বলেছিলেন, শ্রাদ্ধে যেন আমাকে অবশ্যই ডাকা হয়। আমি অবশ্য যাইনি।

সৌগতর গল্প

আমি বিজ্ঞানে স্নাতক, বেসরকারি ব্যাংকের অফিসার। এসকর্টের কাজটা সাইডে। বাড়ির লোক কিচ্ছু জানে না। বন্ধুদের একটা পার্টিতে কয়েক জন মেল এসকর্টের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল বছর দুই আগে। ওদের উৎসাহেই কিছুটা এক্সপেরিমেন্ট করব বলে প্রথম কাজ করি। তার পর থেকে চলছে।

স্বামী-স্ত্রী’র সম্পর্কে অদ্ভুত সব শেড দেখতে পাই এই কাজে নেমে। ব্যাপক সচ্ছল পরিবার, স্বামী-স্ত্রী সুখী দম্পতির অভিনয় করে যাচ্ছেন, ভিতরে সম্পর্ক কিস্যু নেই। কেউ কারও জীবনে নাক গলাচ্ছেন না। একই বাড়িতে দুই ঘরে দুজনেই ভাড়া করা এসকর্ট নিয়ে ফুর্তি করছেন। তার পর আবার একসঙ্গে হাত-ধরাধরি করে সামাজিক অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন।

কয়েকটা নামীদামি হোটেলে আমাদের কথা বলা রয়েছে। সেখানে হাইপ্রোফাইল মহিলারা চাকরি বা ব্যবসা সূত্রে আসেন। অনেকেই পুরুষ এসকর্ট খোঁজেন। কেউ খুব ডমিনেটিং, কেউ বাইরে কঠিন, ভিতরে ভেঙে পড়া। আমার বারবার মনে হয়েছে, এঁরা আসলে খুব একা। এমনও হয়েছে, সারা রাতের টাকা দিয়ে কেউ শুধু সামনে বসিয়ে মদ খেয়েছেন আর নিজের সুখদুঃখের কথা অনর্গল বলে গিয়েছেন। এঁদের অনেকে খুব অস্থির, মুডি। কখন কী করবেন ঠিক নেই। কখনও প্রেম উপচে পড়ছে, কখনও চিৎকার করে জিনিস ভাঙচুর করছেন। অনেকে আবার চুক্তি করেন দু’দিন-তিন দিনের জন্য। সেই ক’দিন তাঁরা যখন শপিং করবেন, সিনেমা দেখবেন, বেড়াবেন বা হোটেলে খাবেন তখনও সঙ্গ দিতে হবে। মানে, তাঁর শুধু বিছানাসঙ্গী নয়, বন্ধু হতে হবে। তাঁরা হয়তো মনে মনে যেমন একটা সুখী দাম্পত্যের গল্প ভেবে রেখেছিলেন— ফুরফুরে, হাসিখুশি, কোনও চাপ নেই— এই ক’দিন পৃথিবীর কাছে আর নিজেদের কাছেও ভান করবেন, তাঁরা তা পেয়ে গিয়েছেন! প্রচুর টিপ্স দেন এঁরা, তা ছাড়া প্রচুর জিনিস উপহারও দেন। ওই ক’দিন স্বপ্ন-স্বপ্ন খেলার বকশিশ!

অভিজিতের গল্প

উল্টোডাঙার ছেলে আমি। যৌথ পরিবারে বড় হয়েছি। বাবা-কাকার মাছের ব্যবসা। মাধ্যমিকে ৬৫%, উচ্চমাধ্যমিকে ৭৫% পেয়েছি। এখন সংস্কৃতে অনার্স নিয়ে থার্ড ইয়ারের পরীক্ষা দিয়েছি। কবিতা লিখি, গল্প লিখি, নাচি। ক্লাস নাইন-টেনে পড়ার সময় বুঝতে পারলাম, আমার মানসিক গঠন নারীর। শারীরিক ভাবে আমি পুরুষকেই কামনা করি। অন্যরা ক্রমে ব্যাপারটা আন্দাজ করতে পারল। বাড়িতে প্রবল অশান্তি।

ক্লাস ইলেভেনে পড়ার সময় একদিন পাড়ার বান্টিদা বলল, মাসাজের কাজ করবি? ক্লায়েন্টের নম্বর দিচ্ছি। দেড় ঘণ্টার জন্য পাঁচশো টাকা। আড়াইশো তোর, আড়াইশো আমার। রাজি হলাম। দুপুরে গণেশ টকিজের মোড়ে দাঁড়িয়ে ফোন করলাম। কিছু ক্ষণ পর উনি এলেন। বছর পঁয়তাল্লিশের মারওয়াড়ি ভদ্রলোক। আমাকে ওঁর এক বন্ধুর ফ্ল্যাটে নিয়ে গিয়েছিলেন। ফ্ল্যাটটা বন্ধ থাকত বলে খুব একটা সাফসুতরো ছিল না। উনি লস্যি খাওয়ালেন। কিছু ক্ষণ গল্প করেছিলাম। তার পর কাজ হল।

বাড়ির কাছে তেলেঙ্গাবাগানে একটা মাসাজ পার্লার ছিল। সেখানে এই সব কাজ হত। সেখান থেকে আর এক পার্লার, লেকটাউনে। সেখানে কিছু চেনা ক্লায়েন্ট হয়ে গেলে, নিজে ঘর ভাড়া করে কাজ শুরু করলাম। বারুইপুর, সোনারপুরের দিকে কিছু গেস্টহাউসেও যেতাম। এক বার লেকটাউনের মাসাজ পার্লারে লম্বাচওড়া, অসাধারণ দেখতে একটা ছেলে এসেছিল। গুজরাতি, বছর পঁয়ত্রিশ বয়স হবে। কেবিনে ঢুকলাম, সমানে আমার সঙ্গে কথা বলে যেতে লাগল। বাড়ির গল্প, নিজের ফ্রাস্ট্রেশনের গল্প, কী করতে চায় সেই গল্প। আমাকে বলল, তোমার বয়স এত কম, সামনে পুরো জীবন পড়ে আছে। তুমি কেন এই কাজ করো? আমি বললাম, কাজের জায়গায় ব্যক্তিগত আলোচনা কেন? কাজ করুন, টাকা দিন, চলে যান। ছেলেটা কিচ্ছু করল না। ঘন্টাখানেক কথা বলে আমার হাতে টাকা আর কয়েকটা লজেন্স গুঁজে দিয়ে কপালে একটা চুমু খেয়ে চলে গেল।

আয়ুষের গল্প

বাবা রেলে সামান্য কাজ করতেন। ১৯৯৭ সালে মারা যান। তখন আমার মেরেকেটে ১৮-১৯ বছর বয়স। টাকার অভাবে খুব কষ্ট পেয়েছি। ধার-দেনা। মা’র মুখের দিকে তাকাতে পারতাম না। বহু ঘাটের ধাক্কা খেয়ে উপায় না দেখে বাঁচার জন্য শেষে এই লাইনে এলাম। ঠিক করলাম, এসে যখন পড়েছি, কিছুতেই ছাড়ব না। মহিলা এবং পুরুষ— উভয়েই আমার ক্লায়েন্ট। আমি দারুণ কথা বলতে পারি, ভাল মাসাজ জানি, নেটওয়ার্কিংও খুব ভাল। আমাকে জীবনে এক চুল সাহায্য কেউ করেনি। এই কাজ করেই টালিগঞ্জে তিনতলা বাড়ি করেছি। প্রথম প্রথম ভয় পেতাম, সংকোচ হত, এখন ও সব নেই।

এক বার কিছু দিনের জন্য এক মহিলার স্বামীর ভূমিকায় থাকতে হয়েছিল। আবার আলিপুরের এক মহিলার স্বামী আমাকে ভাড়া করে নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর স্ত্রীর জন্য। ভদ্রলোক অসম্ভব পয়সাওয়ালা, কিন্তু অক্ষম। তাই স্বামী-স্ত্রী মিলে আপসে এই ব্যবস্থায় এসেছিলেন। ভদ্রলোকের একটাই শর্ত ছিল। তাঁর সামনে তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে কাজ করতে হবে। আর এক বার খুব বড়লোক বাঙালি বাড়ির ২৪-২৫ বছরের ছেলে তাঁর মধ্য-চল্লিশের মায়ের জন্য আমাকে ভাড়া করেছিলেন। অবশ্যই মায়ের সম্মতিতে। অত্যন্ত সুন্দরী ছিলেন সেই মহিলা। আমাদেরই অন্য এক জনের কাছে শুনেছি, এক বয়স্ক মহিলা তার ক্লায়েন্ট ছিলেন, তিনি তাঁর বিধবা মেয়ের জন্যও তাকে ভাড়া করতেন।

ক্লায়েন্টদের সঙ্গে ফেসবুকে, ই-মেলে, ফোনে, চ্যাটে আমার যোগাযোগ থাকে। সম্বন্ধ করে বিয়েও করেছি। মেয়ে ক্লাস নাইনে পড়ে। বাড়িতে সবাই জানে আমি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করি। তবে বউকে আমি ঠকাইনি। আমার জীবনে সত্যিকারের প্রেম একমাত্র আমার বউ।

(কয়েকটি নাম পরিবর্তিত)

আরও পড়ুন

Advertisement