E-Paper

ইস্কুলের দরজায় দাঁড়িয়ে সাহেব, তাঁর হাতে তোয়ালে আর সাবান

ছাত্রদের গায়ে কাদা ময়লা দেখলে পরিষ্কার করে দিতেন নিজের হাতে। কলকাতার বাবুদের অনুনয় করতেন, যাতে তাঁরা দোল-দুর্গোৎসবে একটু কম খরচ করে দরিদ্র ছেলেদের শিক্ষার জন্য কিছু দান করেন। বাংলায় শিক্ষার আলো জ্বালাতে সর্বস্ব উৎসর্গ করেছিলেন ডেভিড হেয়ার।

কৃষ্ণা রায়

শেষ আপডেট: ২৪ মে ২০২৬ ০৯:২২
শিক্ষাব্রতী: ডেভিড হেয়ার।

শিক্ষাব্রতী: ডেভিড হেয়ার।

উনিশ শতকের গোড়ায় সুদূর স্কটল্যান্ড থেকে এ দেশে এসেছিলেন এক বছর পঁচিশের যুবক। আর স্বদেশে ফিরে যাননি। কলকাতাকে আশ্রয় করে পরাধীন দেশের মানুষের চোখে আধুনিক শিক্ষার স্বপ্ন এঁকেছিলেন, মানুষের সেবায় নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন। এই মানবতাবাদী শিক্ষাবিদের নাম ডেভিড হেয়ার— গত বছর যাঁর জন্মের সার্ধদ্বিশতবর্ষ পূর্ণ হল।

উনিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে কলকাতা শহরে অন্য রকম একটা পালকি প্রায়ই দেখা যেত। পালকি তো নয়, যেন অজস্র জিনিসে ঠাসা আস্ত একটা ঘর। বইপত্র, পেনসিল, কাগজ, খাবার, ঔষধপত্র, তেল, মাজন, তোয়ালে, টাকাকড়ি, মানুষকে বিলিয়ে দেওয়ার জন্য পোশাক-আশাক আর একটি বেত। পালকির মালিক এক সাহেব। এই শহরে ঘড়ির ব্যবসা করে ভাগ্য ফেরাতে এসেছিলেন। কিন্তু কালক্রমে তিনিই হয়ে উঠলেন এক মানবদরদি, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন শিক্ষানুরাগী।

স্কটল্যান্ডের সাধারণ ঘরের ছেলে ডেভিড হেয়ার, ভাগ্য অন্বেষণে ভারতে এসেছিলেন। ১৭৭৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তাঁর জন্ম। ঘড়ির কলকব্জার খুঁটিনাটি, ঘড়ি তৈরি আর মেরামতের কৃৎকৌশল শিখে কলকাতার লারকিন্স লেনে, পরে আড়পুলি অঞ্চলে (অধুনা বিবাদীবাগ অঞ্চলে এক ঐতিহাসিক গলি) ঘড়ির দোকান খুললেন হেয়ার। সস্তায় ঘড়ি কেনার জন্য শহরের সাধারণ মানুষ তাঁর দোকানে ভিড় করে। বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার, মিষ্টি কথাবার্তা দিয়ে হেয়ার ব্যবসা জমিয়ে ফেললেন।

ব্যবসায় সাহায্য করতে এলেন বন্ধু এডওয়ার্ড গ্রে। প্রচুর অর্থ উপার্জন হতে লাগল। কিছু দিনের মধ্যেই হেয়ার বুঝলেন, এ দেশের বেশির ভাগ মানুষ বুদ্ধিমান অথচ অশিক্ষিত। আমোদ-আহ্লাদে দিন কাটায়, মহৎ কোনও আদর্শ এদের চোখের সামনে নেই। দোকানে আসা ক্রেতারা ইংরেজিতে অজ্ঞ, অথচ দেশীয় মানুষ ইংরেজি শিখলে আদালতে কাজ পাবে। শহরে ইংরেজি শিক্ষা শুরু হলেও তেমন ভাবে স্কুল-কলেজ নেই। হেয়ার সাহেবও ব্যস্ত হলেন, কলকাতার মানুষকে অল্প কিছু শিক্ষা দিয়ে যদি উপকার করা যায়।

দেশীয় শিক্ষাব্যবস্থায় পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞান অধরা। প্রথমে নিজের বাড়ির আশপাশের শিশুদের লেখাপড়া করানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেন হেয়ার। এদেশীয় মানুষদের কোনও গরজ নেই। ইতিমধ্যে ব্যবসার সূত্রে পরিচিত হলেন বহু শাস্ত্রে পারদর্শী রামমোহন রায়ের সঙ্গে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তখন ভারতবর্ষের মানুষকে শিক্ষা দিতে এক লাখ টাকা অনুদান বরাদ্দ করেছে। রামমোহনের প্রগতিবাদী ধারণায় হেয়ার নিজের ভাবনার প্রতিফলন দেখতে পেলেন। স্থির করলেন, রামমোহনকে কাজে লাগিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ এক শিক্ষাদান পদ্ধতির প্রচলন করতে, যে শিক্ষায় পাশ্চাত্যের জ্ঞান এবং প্রথাগত ভারতীয় ঐতিহ্যের মধ্যে সমন্বয় থাকবে। ১৮১৭ সালের ২০ জানুয়ারি কলকাতায় স্থাপিত হল হিন্দু কলেজ।

সে বছরেই হেয়ার এবং অন্যান্য শিক্ষাব্রতীদের উদ্যোগে গড়ে উঠল স্কুল-বুক সোসাইটি। শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত খুলে গেল। ছাত্রদের পাঠোপযোগী ইংরেজি এবং বাংলা বই লেখা হল। এই উদ্যোগে শামিল হলেন রামমোহন রায়। পরের বছর হেয়ারকে অন্যতম সম্পাদক নির্বাচন করে সূচনা হল ক্যালক্যাটা স্কুল-সোসাইটির। এই সোসাইটির দৌলতে সাধারণ মানুষ বাংলা-ইংরেজি শিক্ষা পাবে, গড়া হবে নতুন স্কুল, পুরনো স্কুলেরও সাহায্য, রক্ষণাবেক্ষণ চাই। এদিকে ঘড়ির ব্যবসার কাজ অবহেলিত হচ্ছে। হেয়ারের ভ্রুক্ষেপ নেই। বালকদের শিক্ষা তাঁর কাছে সর্বাগ্রে। ১৮২০ সাল থেকেই বন্ধু মিস্টার গ্রে-কে ঘড়ির ব্যবসার পুরো দায়ভার দিয়ে পেলেন এক লক্ষ টাকা। সেই টাকায় শহরে বেশ কিছু জমি কিনলেন, কিছু টাকা রাখলেন নিজের ভরণ-পোষণের জন্য। সংবাদপত্রে খবর প্রকাশিত হল— ওল্ড হেয়ার টার্নড গ্রে।

শুরু হল শহরে ছেলেদের জন্য প্রাথমিক স্কুল তথা পাঠশালা তৈরির কাজ। কিছুটা ক্যালক্যাটা স্কুল-সোসাইটির পরিচালনায়, কিছুটা ইউরোপীয় আর বাঙালি ভদ্রলোকদের সাহায্যে। ঠনঠনিয়া কালীতলা, আড়পুলি প্রভৃতি স্থানে কিছু স্কুল তৈরি হল হেয়ারের নিজস্ব অর্থে। ঠনঠনিয়া অঞ্চলে বাংলা পাঠশালা আর একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল হল। এই দু’টি স্কুল পরে ‘আড়পুলি পাঠশালা’ নামে বাংলা এবং ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষা দিত। হেয়ারের উদ্যোগে গড়ে তোলা সিমলা এবং পটলডাঙায় আরও দু’টি স্কুল ১৮৩৪ সালে একত্রিত হয়ে কলুটোলা ব্রাঞ্চ স্কুল নামে পরিচিত হয়। হেয়ারের মৃত্যুর পঁচিশ বছর পর তাঁর সম্মানে এই স্কুলটিরই নাম হল হেয়ার স্কুল (১৮৬৭)।

কলকাতার দুঃস্থ বালকদের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে তিনি শুধু তাদের স্কুলের ফি মকুব করেননি, ব্যক্তিগত ভাবে প্রতিদিন এই সব স্কুলের কর্মকাণ্ড দেখতেন। পড়ার জন্য বই-খাতা-পেনসিল, যাবতীয় উপকরণের ব্যয় নিজে বহন করতেন। কলকাতার ধনী বাবুদের কাছে অনুনয় করতেন, তাঁরা যেন দুর্গাপুজো, দোল ইত্যাদি সামাজিক অনুষ্ঠানে প্রচুর খরচ না করে দরিদ্র বালকদের শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। নিজে নজর রাখতেন, ছাত্রদের স্বাস্থ্য-সুরক্ষা, শৃঙ্খলাবোধের শিক্ষার দিকে। স্কুলে অনুপস্থিত ছাত্রদের বাড়ি গিয়ে খবর নিত তাঁর ব্যক্তিগত ভৃত্য কলিমসি। কোনও ছাত্রের অসুস্থতার খবর পেলে নিজে গিয়ে ওষুধপত্র দিয়ে আসতেন।

স্কুলের ফটকের সামনে তোয়ালে-সাবান নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন। ছেলেদের গায়ে ময়লা দেখামাত্রই তোয়ালে দিয়ে নিজে পরিষ্কার করে দিতেন। সারা শহরে, গঙ্গার ঘাটে ঘাটে পালকি চেপে ঘুরে নজরদারি করতেন ছাত্ররা কুসঙ্গে পড়েছে কি না। সমকালের মানুষের জবানবন্দিতে উঠে এসেছে ডেভিড হেয়ার নামের এক আশ্চর্য মানুষের কথা, যাঁর কোমল মনের খোঁজ পেয়ে তাঁর পালকির দু’ধারে ছোট ছেলেরা ছুটত। ইংরেজির মতো একটি বিদেশি ভাষা আত্মস্থ করে আধুনিক শিক্ষা পাওয়ার তাগিদে তারা ব্যাকুল হয়েছিল, শুধুমাত্র এই মানুষটির সঙ্গ পাওয়ার জন্য। অভিভাবকেরাও অনুনয় করতেন। দু’মাস ধরে পালকির সঙ্গে দৌড়ে হেয়ারের স্কুলে বিনা বেতনে পড়ার অধিকার আদায় করেছিলেন কৃষ্ণনগর থেকে কলকাতায় আসা বালক, পরবর্তী কালের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ রামতনু লাহিড়ী। বিনা বেতনের ছাত্রদের জন্য অভিভাবকদের কাছে শর্ত ছিল, অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় সন্তানেরা স্কুলে এলে জরিমানা দিতে হবে।

১৮০০ (মতান্তরে ১৮০১) সাল থেকে বিয়াল্লিশটি বছর হেয়ার সাহেব নিঃস্বার্থ ভাবে কলকাতায় কাটিয়ে গেলেন শুধুমাত্র বাংলার কয়েক প্রজন্মকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে। কলকাতায় ১৮৩৫ সালে মেডিক্যাল কলেজ গড়ে তুলতে, ছাত্রদের অ্যানাটমি শেখানোর জন্য পণ্ডিত মধুসূদন গুপ্তকে দিয়ে শব-ব্যবচ্ছেদের প্রচলনে ছিল তাঁর অগ্রণী ভূমিকা। কলেজ স্ট্রিটের একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে তাঁর দান করা জমিতে। বিচিত্রকর্মা সমাজ-সচেতন মানুষটি আদায় করেছেন প্রেসের স্বাধীনতা, বিচার-বিভাগীয় আইনব্যবস্থায় ফারসি থেকে ইংরেজি ভাষার অন্তর্ভুক্তি। তীব্র প্রতিবাদ-প্রতিরোধ করেছেন ১৮৩৫ সাল থেকে ভারতীয় কুলিদের জোর করে মরিশাস বা অন্যান্য দ্বীপে ব্রিটিশ কলোনিতে চালানের ব্যবস্থায়।

একাধিক সংস্থায় এবং দরিদ্র ছাত্রদের অকাতরে দান করতে করতে এক সময় নিজে নিঃস্ব, ঋণগ্রস্ত হয়েছেন হেয়ার সাহেব। ব্যবসায় উপার্জিত অর্থ, মেডিক্যাল কলেজের সেক্রেটারি হিসেবে প্রাপ্য মোটা বেতন ব্যয় করেছেন শিক্ষা-খাতে বা সমাজসেবায়। অর্থসাহায্য গ্রহণে অনিচ্ছুক মানুষটিকে তাই ছোট-আদালতের জুনিয়র কমিশনার নিযুক্ত করে মাসিক হাজার টাকা সাম্মানিক দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। হেয়ারের প্রিয় ছাত্র, বাবু ভোলানাথচন্দ্র স্মরণ করেছেন তাঁর শিক্ষক হেয়ার সাহেবকে— বৈশিষ্ট্যহীন ছোটখাটো চেহারা, প্রায় দন্তহীন, টাকমাথার এক মানবিক বৃদ্ধকে, যার মুখমণ্ডলে খোদাই করা ছিল সীমাহীন ভালবাসা। শিখেছিলেন হিন্দুস্তানি ভাষা আর ভাঙা বাংলা।

দীর্ঘকাল কলকাতার বাঙালিদের ঘরে যাতায়াত করে অনেক হিন্দু বাঙালির চেয়েও মনেপ্রাণে বেশি হিন্দু বাঙালি হয়ে উঠেছিলেন তিনি। নারকেলের দুধ, মিষ্টি, মাগুর মাছের ঝোল-ভাত ছিল প্রিয় খাদ্য। ছাত্রদের ইংরেজি শিক্ষা দিলেও মাতৃভাষাকে সম্মান করার জন্য বাংলা শিক্ষাতেও উৎসাহ দিতেন। এদেশের পণ্ডিতদের মতো নিজে বেত হাতে নিয়ে ঘুরলেও অকারণে ছাত্র-প্রহারে তাঁর অরুচি ছিল, যেমন অরুচি ছিল সুরাপান বা ধূমপানে। বৃদ্ধবয়সেও যুবকদের চেয়ে জোরে হাঁটতে পারতেন। ছাত্র-শিক্ষক সবার কাছে শ্রদ্ধেয় এই মানুষটির কাছে সমকালের রক্ষণশীল সমাজের মেয়েরাও অসঙ্কোচে আসতেন নিজেদের ছেলেদের স্কুলে ভর্তি করার জন্য আবেদন-অনুনয় করতে। ইংরেজি সাহিত্যের বিশিষ্ট অধ্যাপক ক্যাপ্টেন রিচার্ডসন অথবা ছাত্র রাধানাথ শিকদার, দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায় প্রমুখ সবাই ছিলেন তাঁর অনুরাগী। ‘ডার্লিং অব হিন্দু সোসাইটি’ অথবা ‘হাফ হিন্দু’, বন্ধুবৎসল হেয়ার সাহেব বিলেতে শেষজীবনে অসুস্থ রামমোহনের দায়িত্ব দিয়েছিলেন নিজের সহোদর ভাই এবং ভাইঝিকে।

ভারতবর্ষ আক্ষরিক ভাবেই হয়ে উঠেছিল তাঁর দ্বিতীয় স্বদেশ। কলেরায় আক্রান্ত ছাত্র ভোলানাথের সেবা করতে গিয়ে ১৮৪২ সালের মে মাসের শেষ দিনে নিজেই কালব্যাধিতে আক্রান্ত হলেন। মধ্যরাতে রোগ-লক্ষণ দেখে সাতষট্টি বছরের অভিজ্ঞ মানুষটি বেহারাকে দিয়ে নিজের কফিন আনালেন, আর চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে পরদিন, পয়লা জুন সন্ধ্যা ছ’টায় প্রয়াত হলেন।

বহু অসমাপ্ত স্বপ্ন বুকে নিয়ে মানুষটিকে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে। তাঁর মৃত্যুর পর স্বধর্মে উদাসীন মানুষটিকে সমাহিত করার জন্য খ্রিস্টীয় সমাধিক্ষেত্রে জায়গা জুটল না। এদেশীয় হিন্দু অনুরাগীরা তাঁর মরদেহ হিন্দু কলেজের সামনে সমাহিত করেন। কিছু স্থানীয় মানুষ হিন্দুপল্লিতে এক বিধর্মীর মৃতদেহ সমাধিস্থ করাকে ঘোর শাস্ত্রবিরুদ্ধ বলে আপত্তি জানাল। এত সহজে কারও আজীবনের অবদান বিস্মৃত হওয়ার ঘটনা সত্যিই বিস্ময়কর।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy