×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

০৪ মার্চ ২০২১ ই-পেপার

ইলিশের বিয়ে

১৯ অগস্ট ২০১৫ ০০:০০

কে বলে ইলিশ শুধু বাঙালের সম্পত্তি!

আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে হাটখোলার দত্তবাড়ির সেই আশ্চর্য বিয়ের গপ্পো শুনুন তবে। তেল-হলুদে চকচকে ‘নতুন বউ’ এসেছেন রান্নাঘরে। বাড়িময় শাঁখ-উলুর হইহই! বউয়ের গায়ে সিঁদুর লেপে দেওয়া হল।

হেঁসেলের নোড়াটিও সিঁদুর-লেপা। একটু পরে ঠাকুরঘরের ধান-দুব্বো ছুড়ে ছুড়ে বিয়েটা হল তার সঙ্গেই। মানে, বর নোড়া ও কনে ইলিশের বিয়ে হয়ে গেল। বর্ষার প্রথম ইলিশকে রাঁধবার আগে এই বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা কোনও কোনও সাবেক ঘটি-বাড়ির দস্তুর। বিয়ের পরে মাছ কুটে কুলগুরুর বাড়ি, পাড়ার কয়েকটি বাছা-বাছা মন্দিরে কয়েক টুকরো ভেট দিয়ে তবে তো রান্নার শুরু। বৃষ্টিতে ঝাপসা রাস্তায় সেই অলৌকিক ঘ্রাণ এ বার পাড়ায় দূরের গ্যাসবাতি অবধি ছড়িয়ে পড়বে।

Advertisement

দত্তবাড়ির বউ সুতপাদেবীর কাছে শোনা এই গল্প। তাঁর শাশুড়ি কমলাদেবীর আমল অবধি এই ইলিশ-পার্বণে কোনও ছেদ পড়েনি। এ বাড়িরই কৃতী পুরুষ যম দত্ত। ইলিশ নিয়ে গবেষণায় তিনি না কি বিস্তর সময়, অর্থ খরচ করেছিলেন। তাতে তাঁর উপলব্ধি, তেলের বহরে পদ্মার ইলিশ এক নম্বর হতে পারে, কিন্তু ঘ্রাণে গাঙ্গেয় ইলিশই এক নম্বর।


—নিজস্ব চিত্র।



কল্যাণী দত্তের লেখাও সাক্ষী, সে-কালের বড়-বাড়ির বউরা না কি কোন ঘাটের ইলিশ শুনেই তার ঠিকুজি-কুষ্ঠি বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে যেতেন। কোনও এক ইলিশদুরস্ত সেনবাড়িতে ইলিশ পাঠানোর দরুণ বিড়ম্বনার কাহিনি শুনিয়েছিলেন কল্যাণীদেবী। মাছটা তক্তাঘাটের শুনে না কি বাড়ির গিন্নি প্রায় নাক সিঁটকে বলেছিলেন, ‘ম্যাগো, তবে তো চিবুতে চিবুতে চোয়াল ব্যথা হয়ে যাবে!’

কুমোরটুলি নইলে বাগবাজার ঘাটের মাছ না-হলে রসিকজন তা মুখে দেবেন কেন? সে-যুগের অটল বিশ্বাস ছিল, ঘাটে ঘাটে ইলিশের ‘তার’ বদলায়। এ শহরের প্রাচীন প্রবাদ অনুয়ায়ী, মা সিদ্ধেশ্বরীর পা-ধোয়ানি জল খেয়ে-খেয়েই বাগবাজারের ইলিশের অদ্ভূত গোলাপি বন্ন, যা চোখে না-দেখলে বিশ্বাস হবে না।

তবে বাগবাজার ঘাটের ‘সুতার’ ইলিশের রহস্যভেদে শোভাবাজার রাজবাড়ির অলককৃষ্ণ দেব মারফত, আর একটি তত্ত্বও কানে এসেছে। শোনা যায়, লাগোয়া খালে ভেসে আসা ময়লা, এমনকী পচা মড়া-টড়ার ডায়েটেও ইলিশ স্বাস্থ্যবান হতেন। লোকে বলত, ওই সব খেয়েই কলকাতায় ঢুকলে ইলিশের স্বাদ আর ধরে না! সে-যুগের ইলিশ-উৎসাহীরা কেউ কেউ দক্ষিণেশ্বরে গিয়ে সটান মাঝির নৌকো থেকে মহার্ঘ বস্তুটি উদ্ধার করে আনতেন। তবে তখন ভুলেও তার নামটি করা চলবে না। সাবেক রীতি অনুয়ায়ী, মাঝির কাছে গিয়ে শুধু বলতে হবে, কী ক-ত্তা, হবে না কী! মাঝি তাতেই যা বোঝার বুঝে নেবেন। এর বেশি বললে মাঝি ফিরেও তাকাবেন না। মৎস্য কুলপতির নাম করলে ইলিশের দেবতা কুপিত হন।

ঘটির দেশের ইলিশপ্রীতির পাশাপাশি বাঙালদেশের কিছু রীতিও স্মরণ করা যাক! সরস্বতী পুজোর শ্রীপঞ্চমীর তরুণ ইলিশের নিরাভরণ ঝোলের কথা পাঁচমুখে বলে গিয়েছেন বুদ্ধদেব বসু। বর্ষার ঢের আগে ইলিশ-বর্ষের সেই তো সূচনা। বাড়ির বড় ছেলে স্বয়ং সেই ইলিশ মাথায় নিয়ে ঘরে ঢুকবেন। স্নান সেরে শুদ্ধ বস্ত্রে তেল-সিঁদুরে লেপা ইলিশ কুলোয় নিয়ে বাড়ি ঢুকবেন তিনি। বাস্তুখুঁটির কাছে সে-মাছ রাখা হবে। এর পরে মাঙ্গলিক আচার মেনে তা ‘কুটা’ হবে।

সরস্বতী পুজোয় যে ইলিশ-পার্বণের সূচনা, বিজয়া দশমীতে তার শেষ ধাপের রীতিটিও চমকপ্রদ। এই কলকাতায় কুমোরটুলিতে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের জন্ম যাদের হাতে সেই ভাগ্যকুলের রায়েরাও বিভিন্ন ডালপালায় আজও শারদীয়া ইলিশ-পরম্পরা রক্ষা করে চলেছেন। ভাগ্যকুলের রায়েরা এখনও গোটা পুজোবাড়িতে ইলিশ খেয়েই কাটান। এর মধ্যে স্পেশাল মেনু, ইলিশের ডিমের ভাপা। লঙ্কা-পেঁয়াজযোগে মাখো-মাখো এই ডিম-ভর্তা যেন বাঙালির কেভিয়ার। ইলিশের ভাজা-ভাপা ইত্যাদির সঙ্গে ইলিশ ডিমের পদটিও গোটা পুজোই সাপ্টে খান রায়েরা। কারণ, বিজয়া দশমীর পরে ইলিশ-বিলাসে ছেদ পড়বে কয়েক মাসের জন্য। ইংরিজি ক্যালেন্ডারের বছর শেষে কেক খেয়ে খেয়ে মুখ মেরে যাওয়ার মতো পুজোর আবহে এই স্লগ ওভারের ইলিশ খেয়ে খেয়েই বাঙালরা কেউ কেউ সাধ মিটিয়ে নেন।

বাঙাল ডায়েটে ইলিশযোগে একটি পঞ্চপদী ডায়েটের ফিরিস্তিও দিয়েছেন বুদ্ধদেব বসু। তাতে ভাজা, ভাপা, ঝোল থেকে শুরু করে শেষপাতে তেঁতুল-পাতিলেবুগোলা দুরন্ত একটা টকঝাল অম্বল থাকত। এ কালের রেস্তোরাঁ-নির্ভর নিছক গাদা-পেটির ইলিশ-চর্চা দেখলে নির্ঘাত কপাল চাপড়াতেন আমাদের পূর্বপুরুষ বা নারীগণ। ইলিশের মুড়ো থেকে শুরু করে ‘ওঁচা’ অংশ ল্যাজা, এমনকী ইলিশের তেলের পুঁটলি বা লিভার তথা বাঙাল লব্জের ‘লুকা’ও কদাচ ব্রাত্য ছিল না।

লুকা-র কথাতেই কস্তুরি হোটেলের প্রাণপুরুষ সদ্যপ্রয়াত বাবলু সাহাকে মনে পড়ে। তাঁর হোটেলের কাচের ঘরের টেবিলে অতি আদরযত্নে যে-ইলিশ খাইয়েছিলেন, তার স্মৃতি কদাচ ভোলার নয়। ইলিশ-ডিম ও লুকার পাতুরির সঙ্গে সেই প্রথম পরিচয়। ভাপানো পাতুরি নয়! এ পাতুরি গরগরে ঝোল ঝোল। বাবলুবাবুর আফশোস ছিল, রেস্তোরাঁর কারবারে অন্তত গোটা দশেক ইলিশ স্টকে রেখে তার পেটের ডিম-লুকা বার করে এই পদটি রেস্তোরাঁর মেনুতে তিনি কখনও রেখে উঠতে পারেননি।

সত্যি কথা বলতে এ সব পদ পরিবেশনের অপারগতার কারণেই গরিব বাঙালির পক্ষে রেস্তোরাঁর ফাইন ডাইনিং আজও অধরা। চিনে বা পঞ্জাবি রান্নায় অনেক সুলভে রেস্তোরাঁয় ঢের বেশি লাভ করা যায়। কিন্তু খাঁটি বাঙালি রান্নার উপস্থাপনায় রইস সমঝদার আবশ্যক। একদা পুবদেশের ছবিটা অন্য রকম ছিল বলেই শোনা যায়। ইলিশের বহু বিস্মৃত পদ ভাতে-মাছে-দুধে ঋদ্ধিশালী সেই সভ্যতায় বাঙালির জীবনচর্যার অঙ্গ ছিল।

মাঝিরা নৌকোয় বসে পেঁয়াজ-রসুনযোগে গরগরে ইলিশ রাঁধতেন। মধ্যবিত্তের হেঁসেলে ইলিশে পেঁয়াজস্পর্শ অবিশ্যি মহাপাপ। ইলিশ নিয়ে এ-সব মতান্তর থাকলেও প্রেমের লাথিঝাঁটার মতো ইলিশের কাঁটার আঘাত কোনও বাঙালিই সহ্য করতে কসুর করত না। সে-যুগের ইলিশ শুধু রাজার ঘরে নয়, টুনির ঘরেও সমান মহিমায় উজ্জ্বল।

Advertisement