চরম বিপদের পঞ্চাশ গজের মধ্যে এসে পড়েছিলেন বাংলাদেশের ক্রিকেটারেরা। সেখান থেকে তাঁরা বেঁচে ফিরেছেন।

ক্রাইস্টচার্চের মসজিদের সামনে থেকে অক্ষত অবস্থায় ফেরার পরে ক্রিকেটারদের হোটেলে দাঁড়িয়ে এমন মন্তব্যই করেন দলের ম্যানেজার খালেদ মাসুদ। বলেন, ‘‘এটা এমন এক ধরনের দুর্ঘটনা যা কখনও দুঃস্বপ্নেও কেউ ভাবতে পারবে না। বিশ্বের যে কোনও প্রান্তে এমন ঘটনা ঘটুক চাইবে না কেউ।’’ সেই সময়ে তাঁরা বাসের মধ্যে ছিলেন বলেই বেঁচে গিয়েছেন বলে মনে হচ্ছে তাঁর। ‘‘আমরা খুবই ভাগ্যবান কারণ, আমরা ১৭ জন সেই সময় বাসের মধ্যে ছিলাম। আমরা প্রত্যেকে মসজিদে যাচ্ছিলাম প্রার্থনা সারতে। মসজিদের খুব কাছেই চলে এসেছিলাম আমরা। মসজিদটা আমরা দেখতেও পাচ্ছিলাম।’’ সামান্য আগে পৌঁছলেই যে সর্বনাশ হতে পারত, তা স্বীকার করে নিচ্ছেন দলের ম্যানেজারও। আতঙ্কের পরিবেশে টিম হোটেলে দাঁড়িয়ে খালেদ সাংবাদিকদের বলছেন, ‘‘আমরা খুবই ভাগ্যবান। যদি তিন-চার মিনিট আগেও পৌঁছতাম, আমরা হয়তো মসজিদের ভিতরেই থাকতাম। ভয়ঙ্কর ঘটনা অপেক্ষা করত তখন আমাদের জন্যও।’’ মসজিদের বাইরে দাঁড়িয়ে দেখা ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে খালেদ বলেন, ‘‘আমরা যা দেখেছি, তা একেবারে ফিল্মের দৃশ্যের মতো। মসজিদের ভিতর থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় আহতরা বেরিয়ে আসছিলেন। তখন আমরা সকলে আট-দশ মিনিট ধরে বাসের মধ্যে মাথা নিচু করে শুয়ে পড়েছিলাম। পাছে কেউ আমাদের লক্ষ্য করে গুলি করে। আমরা সত্যিই ভাগ্যবান।’’  

বাংলাদেশের দলের সঙ্গে আছেন দুই ভারতীয়। এক জন কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ শ্রীনিবাস। অন্য জন স্পিন বোলিং কোচ সুনীল জোশী। সেই সময় জোশী হোটেলে ছিলেন। কিন্তু শ্রীনিবাস ছিলেন ক্রিকেটারদের সঙ্গে। তাঁর বিবরণেও উঠে এসেছে একই রকম আতঙ্কের কথা। বাংলাদেশের টিম বাস ওই মসজিদের ঢিল ছোড়া দূরত্বে দাঁড়িয়েছিল ঘটনার সময়। হঠাৎই টিম বাসে থাকা ক্রিকেটারেরা গুলির আওয়াজ শোনেন। একটু পরেই সবাই দেখতে পান এক মহিলা মাটিতে পড়ে যাচ্ছে। কয়েক জন ক্রিকেটার মহিলাকে সাহায্য করতে যেতে চাইছিলেন, ঠিক সেই সময় দেখা যায় মসজিদ থেকে হুড়মুড়িয়ে আতঙ্কিত মানুষ বাইরে বেরিয়ে আসছেন। যাঁদের অনেকেই রক্তে মাখামাখি। ‘‘আমরা কী করব প্রথমে ভেবে উঠতে পারিনি। চোখের সামনে এ রকম সাংঘাতিক ঘটনা দেখলে মাথা আতঙ্কে কিছুক্ষণ কাজ করে না। ঠিক সেটাই হয়েছিল আমাদের সঙ্গেও,’’ বলেছেন বাংলাদেশের ক্রিকেট দলের ভারতীয় সাপোর্ট স্টাফ শ্রীনিবাস চন্দ্রশেখরন। 

 দিল্লি দখলের লড়াই, লোকসভা নির্বাচন ২০১৯ 

তিনি পেশায় সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। বাড়ি মুম্বইয়ে। বাংলাদেশ দলের ভিডিয়ো অ্যানালিস্টের কাজ করেন। সামনে যা ঘটছিল, সেটা যে সন্ত্রাসবাদী হানা, প্রথমে বুঝতে পারেননি তাঁরা। বলছিলেন, ‘‘মসজিদের কিছুটা দূর থেকেই আমরা প্রথমে গুলির আওয়াজ শুনি। টিমবাসে থাকা কোনও ক্রিকেটার বা আমি কেউই বুঝতে পারিনি কী চলছে। তখনই দেখলাম এক জন মহিলাকে রাস্তায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে যেতে। আমরা ভাবলাম হয়তো শারীরিক কোনও অসুস্থতার জন্য অজ্ঞান হয়ে গিয়েছেন। কয়েক জন ক্রিকেটার তখন বাস থেকে নেমে তাঁকে সাহায্য করতে যেতে চাইছিল,’’ বলছিলেন শ্রীনিবাস। ঘটনার কথা মনে করে আতঙ্ক যাচ্ছে না তাঁর। বলছেন, ‘‘একটু পরেই আমরা বুঝতে পারি ভয়ঙ্কর কিছু ঘটেছে। দেখলাম মানুষ প্রাণভয়ে দৌড়চ্ছে। চারদিকে রক্ত। সবাইকে বলা হল বাসে চুপচাপ  শুয়ে পড়তে। জানি না কতক্ষণ আমরা ওই ভাবে বাসে শুয়েছিলাম। যা বলা হয়েছে সেই মতো নির্দেশ পালন করে গিয়েছি।’’ এর আগে সানরাইজার্স হায়দরাবাদে সাপোর্ট স্টাফের কাজ করা শ্রীনিবাস ২০১৮ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলে যোগ দেন। ঘটনার পরে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এবং নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটকে ধন্যবাদ দেন তিনি। ‘‘এখন আমরা সবাই বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় আছি। ক্রিকেটারেরা বাংলাদেশে ফিরে যাবে। আমি অপেক্ষা করছি ভারতে ফেরার টিকিটের জন্য।’’ 

বাংলাদেশের ক্রিকেটার মুশফিকুর রহিম টুইট করেন, ‘‘ঈশ্বর রক্ষা করেছেন আমাদের। ভাগ্য খুব ভাল, বেঁচে গিয়েছি। এ রকম ঘটনা আর কোনও দিন দেখতে চাই না।’’ সারা বিশ্বের ক্রীড়ামহল নিন্দা করেছে ঘটনার। ভারত অধিনায়ক বিরাট কোহালির টুইট, ‘‘বেদনাদায়ক ঘটনা। ক্রাইস্টচার্চে এ রকম কাপুরুষোচিত ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য আমরা শোকস্তব্ধ। পাশে আছি বাংলাদেশ দলেরও। সুরক্ষিত থাকুক সবাই।’’ 

২০০৯ সালে পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদী হামলার সাক্ষী থাকা শ্রীলঙ্কা দলের প্রাক্তন ক্রিকেটার কুমার সঙ্গকারা, মাহেলা জয়বর্ধনে ও বর্তমান ক্রিকেটার অ্যাঞ্জেলো ম্যাথাউজ সমবেদনা জানিয়েছেন। শুধু ক্রিকেট বিশ্ব থেকেই নয়, সমবেদনা জানাতে টুইট করেছেন আর্সেনাল তারকা মেসুত ওজ়িলও।