একটা সময় অনেকে মনে করেছিলেন, ইংল্যান্ডে বিশ্বকাপ হচ্ছে মানে পেস বোলাররা সাহায্য পাবে। ইংল্যান্ডের পরিবেশে বল সুইং করবে। কিন্তু এই ধারণার সঙ্গে আমি একমত নই। পরিষ্কার বলে দিচ্ছি, ৩০ মে থেকে ইংল্যান্ডে যে বিশ্বকাপ শুরু হতে চলেছে, তাতে ব্যাটসম্যানরাই শাসন করবে। ইংল্যান্ড-পাকিস্তানের মধ্যে যে ওয়ান ডে সিরিজটা চলছে, সেটা চোখে আঙুল দিয়ে সে দিকেই ইঙ্গিত করছে।

কেন এ বার ইংল্যান্ডে বোলাররা সে রকম সাহায্য পাবে না? এখন যে দেশেই খেলা হোক না কেন, ওয়ান ডে পিচের চরিত্র সব জায়গায় মোটামুটি একই রকম। সে অস্ট্রেলিয়া হোক, ইংল্যান্ড হোক কী ভারতে হোক— ব্যাটসম্যানরাই সর্বত্র সুবিধা পেয়ে থাকে। দর্শকরা ব্যাটসম্যানদের মার দেখতেই মাঠে আসে। ইংল্যান্ড বিশ্বকাপেও তাই পিচের চরিত্র বদলাবে না। নিষ্প্রাণ উইকেট খেলতে  হবে বোলারদের। 

এ বার আসি ইংল্যান্ডের আবহাওয়ার কথায়। যদি কোনও দিন আকাশ মেঘলা থাকে, তা হলে আলাদা কথা। না হলে কিন্তু কড়া রোদে সুইংয়ের কোনও নামগন্ধ থাকবে না। জুন মাসে পরিবেশ স্যাঁতস্যাঁতে থাকবে বলে একদমই মনে হয় না। যে কারণে বলও সুইং করবে না। আরও একটা ব্যাপার মাথায় রাখতে হবে। ইংল্যান্ডের মাঠগুলো কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার মতো বড় নয়। বরং আমি বলব, বেশ ছোট। তা হলে সব মিলিয়ে কী দাঁড়াল? নিষ্প্রাণ পিচ, কড়া রোদ, ছোট মাঠ। অর্থাৎ এক কথায় বোলারদের বধ্যভূমি, ব্যাটসম্যানদের স্বর্গ। 

আরও একটা ব্যাপার আছে। সেটা হল, দুর্দান্ত সব হার্ড হিটারের উপস্থিতি। যাদের ব্যাট চলতে থাকলে ৫০ ওভারে চারশো রানও উঠে যাবে। বিশ্বকাপের দলগুলোর উপরে এক বার চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক। ভারতের রোহিত শর্মা, বিরাট কোহালি, মহেন্দ্র সিংহ ধোনি, হার্দিক পাণ্ড্য। অস্ট্রেলিয়ার ডেভিড ওয়ার্নার, গ্লেন ম্যাক্সওয়েল। ইংল্যান্ডের জনি বেয়ারস্টো, জস বাটলার, বেন স্টোকস। দক্ষিণ আফ্রিকার কুইন্টন ডি’কক, ফ্যাফ ডুপ্লেসি, ডেভিড মিলার। পাকিস্তানের ফখর জামান, শোয়েব মালিক, মহম্মদ হাফিজ। আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিস গেল, শিমরন হেটমায়ার, আন্দ্রে রাসেল। 

এই সব বিধ্বংসী ব্যাটসম্যানরা কিন্তু বোলারদের দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠবে বিশ্বকাপে। এই তো সাউদাম্পটন এবং ব্রিস্টলে ইংল্যান্ড বনাম পাকিস্তান ম্যাচের স্কোরকার্ডে চোখ বোলাচ্ছিলাম। ৩৬০-৩৭০ রান হেসে খেলে উঠে যাচ্ছে। মঙ্গলবার ব্রিস্টলে ইংল্যান্ড যে ভাবে প্রায় ৩৬০ রান তাড়া করে জিতল, মনে হল, ওটা কোনও স্কোরই নয়। সে রকমটা বিশ্বকাপে দেখা গেলেও অবাক হব না।

এই অবস্থায় কোন দল তা হলে এগিয়ে শুরু করবে? আমার মনে হয়, যে দলের বোলিং আক্রমণ ভাল, তারাই এ বারের বিশ্বকাপে ফেভারিট। কেন এ কথা বলছি? এটা পরিষ্কার, সাধারণ মানের বোলারদের এই বিশ্বকাপে নাজেহাল হতে হবে। মিডিয়াম পেসাররা বল ফেলার জায়গা পাবে না। কিন্তু যে দলে সত্যিকারের গতিশীল বোলার আছে বা ভাল স্পিনার আছে, তারা ম্যাচ জিততে পারে। এই সব বোলাররা যদি চার, পাঁচ ওভারও ব্যাটসম্যানদের চাপে রাখতে পারে বা কয়েকটা উইকেট তুলে নিতে পারে, তা হলে ম্যাচের ভাগ্য ঘুরে যেতে পারে। 

ঠিক সে জায়গাতেই ভারত বাকিদের চেয়ে এগিয়ে। দারুণ সব স্ট্রোকপ্লেয়ার তো হাতে আছেই, সঙ্গে আছে যশপ্রীত বুমরার মতো বোলার এবং দুই রিস্ট স্পিনার— যুজবেন্দ্র চহাল এবং কুলদীপ যাদব। মনে রাখবেন, রিস্ট স্পিনাররা কিন্তু যে কোনও পিচে বল ঘোরাতে পারে। আর ইংল্যান্ডের আবহাওয়া যদি শুকনো থাকে, তা হলে স্পিনাররা কিছুটা সাহায্য পেতেই পারে। অনেকে হয়তো সদ্য সমাপ্ত আইপিএলে কুলদীপের খারাপ ফর্মের কথা বলবেন। আমি বলব, টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট আর ৫০ ওভারের ক্রিকেটের মধ্যে ফারাক আছে। তাই কুলদীপকে বাতিলের খাতায় ফেলে দিলে ভুল করা হবে।

সব কিছু মাথায় রেখে যদি এই বিশ্বকাপের চার সেমিফাইনালিস্ট দল বাছতে বলা হয়, তা হলে আমি প্রথমেই ভারতের নাম রাখব। কোহালিদের ব্যাটিং নিয়ে কিছু বলার নেই। সঙ্গে ভাল বোলিং। আমার মনে হয়, দুই রিস্ট স্পিনারকেই প্রথম এগারোয় রাখা উচিত। এর সঙ্গে বুমরা, শামি। আর অলরাউন্ডার হার্দিক।

আমার বাকি দুই সেমিফাইনালিস্ট হল, অস্ট্রেলিয়া এবং ইংল্যান্ড। দু’দলেই ভাল ব্যাটিং আছে। বোলিংও খারাপ নয়। তবে ইংল্যান্ডের পেস আক্রমণ নিয়ে প্রশ্ন থাকবে। জোফ্রা আর্চারকে যদি দলে নেয় শেষ পর্যন্ত, তা হলে অন্য কথা। না হলে কিন্তু ইংল্যান্ডের বাকি পেসাররা কেউ ম্যাচ উইনার নয়। 

বাকি থাকল একটা জায়গা। সেখানে পাকিস্তান, নিউজ়িল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজের মধ্যে মনে হয় একটা দল উঠবে। পাকিস্তানকে হিসেবের মধ্যে রাখতেই হবে। ইংল্যান্ডের মাঠে ওদের রেকর্ড ভাল। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জিতেছে, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতেছে। তা ছাড়া ওদের লেগস্পিনার শাদাব খান দলে ফিরে এলে বোলিং শক্তি বেড়ে যাবে। 

পাকিস্তানের পক্ষে আরও একটা ব্যাপার থাকবে। বিশ্বকাপ শুরুর আগে ওরা বেশ কয়েকটা ম্যাচ খেলে নিল ইংল্যান্ডে। এই ম্যাচগুলো ওদের তৈরি করে দেবে চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য।