বিশ্বকাপ পরবর্তী প্রথম দল নির্বাচনী বৈঠক ঘিরে ক্রমশ উত্তেজনা আর উত্তাপ যেন বেড়ে চলেছে। আর যথারীতি নির্বাচনী তর্ক-বিতর্কের কেন্দ্রে থেকে গিয়েছেন সেই এক জনই— মহেন্দ্র সিংহ ধোনি। 

আগে থেকে ঠিক ছিল, আজ, শুক্রবার ওয়েস্ট ইন্ডিজগামী দল বেছে নেওয়া হবে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা আগে তা পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। বোর্ড সূত্রের খবর, লোঢা কমিটির সুপারিশ মেনে এ বার থেকে নির্বাচনী বৈঠকে আর সচিব বা বোর্ড প্রতিনিধিদের ছড়ি ঘোরাতে দেওয়া হবে না। এত দিন বোর্ড সচিব হতেন সভার আহ্বায়ক। লোঢা সুপারিশে এ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল, কারণ সভায় উপস্থিত থেকে নির্বাচনী বৈঠককে প্রভাবিত করতে পারেন সচিব বা বোর্ড প্রতিনিধি। অতীতে সেই প্রভাব বিস্তারের একাধিক উদাহরণও দেখা গিয়েছে। লোঢা সুপারিশ মেনে তাই এ বার থেকে নির্বাচনী বৈঠকের আহ্বায়ক করা হচ্ছে নির্বাচক কমিটির চেয়ারম্যানকেই। যার ফলে, বোর্ড কর্তাদের ক্ষমতা আরও খর্ব হতে চলেছে বলে মনে করা হচ্ছে। আরও জানা গিয়েছে, সিওএ-র এই নির্দেশের পরে বোর্ড কর্তাদের কেউ কেউ যুদ্ধং দেহি মনোভাব দেখাচ্ছেন। বোর্ড মহলের খবর, এই পরিবর্তন করতে গিয়েই কিছু আইনগত জটিলতা দেখা দিয়েছে। সেই কারণেই বৈঠক পিছোতে হচ্ছে। 

সন্ধে থেকে যদিও ক্রিকেট মহলে জোর জল্পনা ছড়িয়ে পড়ে যে, কোনও এমএসডি নিয়ে সিদ্ধান্তের কারণে সভা পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে কি না। কেউ কেউ জানতে আগ্রহী হয়ে পড়েন, আগে ধোনি তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে কী ভাবছেন, তা জেনে নিয়ে নির্বাচকেরা সভায় বসতে চাইছেন কি না। যদিও রাতের দিকে একাধিক সূত্রে জানা গিয়েছে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের দলে যে ধোনি থাকবেন না, তা নিশ্চিত। নির্বাচকদের কাছে বার্তা পৌঁছেছে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফর থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখছেন ধোনি। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে এর বেশি কিছু এখনও বলেননি। তবে প্রভাবশালী মহলের পর্যবেক্ষণ, বড় কোনও সিদ্ধান্ত যে কোনও সময়ে চলে আসতে পারে। ধোনিকে বেশ কয়েক বছর ধরে কাছ থেকে দেখা এক জন এ দিনও বললেন, ‘‘নিঃশব্দে বিদায় নেওয়াটাই ওর দর্শন। এ বারও চুপচাপ চলে গেলে অবাক হব না। আশ্চর্য হব না যদি ও ভারতের জার্সিতে শেষ ম্যাচ খেলে ফেলে থাকে।’’ ভারতীয় ক্রিকেটের প্রভাবশালী মহল যে তরুণ ঋষভ পন্থকে সামনে রেখে নতুন যুগের দল গড়ে তুলতে চাইছেন, সেই ইঙ্গিতও ধোনির কাছে না পৌঁছনোর কারণ নেই। তাঁদের সেই মনোভাব ভারতের বিশ্বকাপজয়ী প্রাক্তন অধিনায়ককে চরম সিদ্ধান্তের দিকে আরও বেশি করে ঠেলে দিতেই পারে। 

নজরে: দলের ঢোকার লড়াইয়ে এগিয়ে রয়েছেন শ্রেয়স ও শুভমন। 

ভারতীয় ক্রিকেট যাঁদের হাতে এই মুহূর্তে পরিচালিত হচ্ছে, তাঁদের গরিষ্ঠ অংশের কাছে ধোনি নন, পন্থই ভবিষ্যৎ। বিশ্বকাপ পরবর্তী নকশা সে রকম ভাবনা নিয়েই তৈরি করা হচ্ছে। এঁদের মতে, ধোনির রাজকীয় বিদায় প্রাপ্য সন্দেহ নেই। তার জন্য ফেয়ারওয়েল ম্যাচ বা সিরিজেরও আয়োজন করা যেতে পারে ঘরের মাঠে। কিন্তু এর পরেও খেলা চালিয়ে গেলে ভারতের অনেকে কিংবদন্তির মতো নিন্দিত উদাহরণই হয়ে থাকবেন। জোর করে না সরালে যাঁরা যেতে চাননি ক্রিকেট ময়দান ছেড়ে। 

ঠিক কবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের দল বাছার জন্য বসবেন নির্বাচকেরা, তা এখনও জানায়নি বোর্ড। অনুমান করা হচ্ছে, শনি বা রবিবার হতে পারে। কিন্তু যে দিনই সেই নির্বাচন হোক, বিশ্বকাপ পরবর্তী জীবনে নতুন প্রজন্মকে তুলে আনার বিষয় সেখানে সর্বাধিক গুরুত্ব পেতে চলেছে। ম্যাঞ্চেস্টারে নিউজ়িল্যান্ডের কাছে হারের পরে বিরাট কোহালিদের দলের মধ্যে যে রকম আলোচনা হয়েছে, তাতেও নতুন মুখ তুলে আনার প্রসঙ্গ প্রাধান্য পেয়েছে। তার কারণ, আগামী তিন বছরে দু’টি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে হবে ভারতকে। একটি, সামনের বছরেই অস্ট্রেলিয়ায়, তার পরের বছরেরই শেষের দিকে আবার ভারতে। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি তুলে দিয়ে কুড়ি ওভারের বিশ্বকাপ করতে চাইছে আইসিসি। সেই টুর্নামেন্ট ২০২২-এর শেষের দিকে হওয়ার কথা ভারতে। এই দু’টি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ধোনির মতো আটত্রিশের মধ্যবয়স্ক নয়, পন্থের মতো চনমনে তরুণ চাই। 

আরও এগিয়ে কারও কারও মনে হচ্ছে, ভারতীয় ক্রিকেটে ফের এক যুগ পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণ উপস্থিত। একা ধোনি নন, বেশ কিছু সিনিয়র ক্রিকেটারের বিকল্প তৈরি করার দিকে নজর দিতে হতে পারে। যেমন শিখর ধওয়নের হাতের চোট সেরে গেলেও তিনি আর কত দিন খেলবেন, সেই প্রশ্ন থাকছে। পরের দু’টি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে কি তেত্রিশ বছর বয়সি বাঁ-হাতি ওপেনারকে ধরে নিয়ে দল গড়া সম্ভব? তিনি সব চেয়ে ফিট ক্রিকেটারদের মধ্যেও পড়েন না। কেদার যাদব আর এক জন। তিনি শিখরের চেয়েও এক বছরের বড়। তাঁর পক্ষে বলার মতো কিছুই নেই। 

ভবিষ্যৎ গড়ার প্রকল্পে তাই কেদার যাদব বা দীনেশ কার্তিকের নাম নিয়ে বেশি আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এই মুহূর্তে নির্বাচকদের আগ্রহী চোখ রয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজে সফররত ভারতীয় ‘এ’ দলের উপর। যেখানে মণীশ পাণ্ডে দারুণ সেঞ্চুরি করে তাঁর দাবি জোরালো করেছেন। এই মণীশকেই চার নম্বরের জন্য প্রথমে বেছেছিলেন ভারতীয় দলের হেড কোচ রবি শাস্ত্রী। অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে মণীশ দুরন্ত সেঞ্চুরি করে দলকে জেতান। তার পরে কেন এবং কী ভাবে তিনি চার নম্বরের দৌড় থেকে হারিয়ে গেলেন, তা রহস্যই থেকে যাবে। তেমনই চলতি ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে ‘এ’ দলের হয়ে ভাল খেলছেন শুভমন গিল। এই দলের অধিনায়ক হিসেবে গিয়েছেন শ্রেয়স আইয়ার। 

কলকাতা নাইট রাইডার্সের উজ্জ্বল ও সুদর্শন মুখ গিল এবং দিল্লি ক্যাপিটালসের এ বারের অধিনায়ক শ্রেয়স আইয়ার ওয়েস্ট ইন্ডিজগামী দলে না থাকলেই অবাক হতে হবে। মণীশ পাণ্ডের দাবি অগ্রাহ্য করাও কঠিন হবে। বিজয় শঙ্করের চোট লাগার পরে বিশ্বকাপে পরিবর্ত হিসেবে উড়িয়ে আনা হয়েছিল ময়াঙ্ক আগরওয়ালকে। কোহালিদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় রয়েছেন তিনি। প্রয়োজনে ওপেন বা মিডল অর্ডার দু’জায়গাতেই তাঁকে ভাবা যেতে পারে। জল্পনা ছড়িয়েছিল, অধিনায়ক কোহালি ওয়েস্ট ইন্ডিজে টি-টোয়েন্টি এবং ওয়ান ডে থেকে বিশ্রাম নেবেন। শুধু টেস্টে খেলতে চান। বৃহস্পতিবারের খবর, কোহালি পুরো সিরিজই খেলতে চান। সম্ভবত বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে হারের পরে নতুন করে টিমকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ নিজে উপস্থিত থেকে করতে চান। তারকাদের মধ্যে কুড়ি ও পঞ্চাশ ওভারের ম্যাচগুলো থেকে বিশ্রাম দেওয়া হতে পারে যশপ্রীত বুমরাকে। তবে টেস্ট সিরিজে বুম বুম বুমরাকে ছাড়া ক্যারিবিয়ান অভিযানের কথা কেউ ভাবছে না। দীপক চহার, নবদীপ সাইনির মতো প্রতিশ্রুতিসম্পন্ন তরুণ কিছু পেসারকে দেখে নেওয়া হতে পারে। পাশাপাশি নাম উঠছে বাঁ-হাতি স্পিনার ক্রণাল পাণ্ড্যর। ভারতীয় ‘এ’ দলের হয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে পাঁচ উইকেট নিয়েছেন তিনি।   

বঙ্গ ক্রিকেটের দিক থেকে আকর্ষণীয় হয়ে দাঁড়াতে পারে টেস্টের দ্বিতীয় উইকেটকিপারের লড়াই। ঋদ্ধিমান সাহা ফিট হয়ে গেলেও প্রথম উইকেটকিপারের জায়গা ছিনিয়ে নিয়েছেন ঋষভ পন্থ। তাঁর কিপিং নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন থাকলেও ইংল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট সেঞ্চুরি করার পরে তাঁকে বাদ দেওয়ার কথা কেউ ভাবছে না। প্রশ্ন হচ্ছে, দ্বিতীয় কিপার হিসেবে কি ঋদ্ধিমানকে ফেরানো হবে? নাকি এ ক্ষেত্রেও নির্বাচকেরা তরুণ কাউকে বেছে নেবেন? শুধুমাত্র উইকেটকিপিং যদি বিচার্য বিষয় হয়, তা হলে অনেকের মতে, ঋদ্ধির মতো কিপার সারা ভারতে নেই। আবার ওয়েস্ট ইন্ডিজে সফররত ‘এ’ দলের জন্য যে ঈষাণ কিষাণকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তাতে নতুন মুখ খোঁজারই ইঙ্গিত রয়েছে।

কে ইষাণ কিষাণ? না, ধোনির রাজ্যের উদীয়মান উইকেটকিপার। একটা যুগ যখন অস্তাচলের দিকে, অন্য যুগ উদয়ের মুখে। কোথাও পড়ন্ত বেলার ফিকে হয়ে আসা সূর্য, কোথাও নতুন দিনের গনগনে রোদ্দুর। ব্রহ্মাণ্ডের নিয়ম। ক্রিকেটের নিয়ম। জীবনের নিয়ম!