সিরিজের প্রথম দু’টি টেস্টে উত্তেজক ক্রিকেটের পরে যাবতীয় নজর এখন মেলবোর্নের বাইশ গজের উপরে। অ্যাডিলেড এবং পার্‌থে ব্যাট ও বলের মধ্যে দুর্দান্ত লড়াই দেখা গিয়েছে। দু’টো টেস্টেই টানটান উত্তেজনা ছিল এবং শেষ দিনে গিয়ে ম্যাচের নিষ্পত্তি হয়েছে। রুদ্ধশ্বাস সব মুহূর্ত তৈরি হয়েছে।

কিন্তু মেলবোর্নের বাইশ গজের সাম্প্রতিক ইতিহাস কিছুটা হলেও সংশয়ে রাখছে ক্রিকেট মহলকে। গত বছর এমসিজি-তে অ্যাশেজের ম্যাচ ম্যাড়ম্যাড়ে ড্র হওয়ার পর থেকেই আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। সেই ম্যাচে পাঁচ দিনে মাত্র ২৪টি উইকেট পড়েছিল। এমনই বিরক্তিকর ম্যাচ হয়েছিল যে, আইসিসি মেলবোর্নকে ‘পুয়োর’ রেটিং দেয়। বোলারদের জন্য প্রায় কিছুই ছিল না সেই পিচে। 

আইসিসি-র নোটিস আসার পরে পিচকে প্রাণবন্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন মেলবোর্ন ক্রিকেট মাঠের কর্তারা। এমসিজি-র পিচের দায়িত্বে থাকা ম্যাট পেজ প্রবল চাপে। অ্যাশেজের বিপর্যয়ের পরে বাইশ গজকে আবার নতুন করে তৈরি করার চেষ্টা করেছেন তিনি। অফ সিজনে কংক্রিটের উপরে বালির স্তর দিয়ে প্রাণবন্ত করার চেষ্টা করেছেন। তবু সংশয় দূর করার মতো ফল এখনও পর্যন্ত দেখা যায়নি। 

আরও পড়ুন: কোহালির আগ্রাসনে আপত্তি নেই লেম্যানের

চলতি মরসুমে অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া ক্রিকেট প্রতিযোগিতা শেফিল্ড শিল্ডের তিনটি ম্যাচ এমসিজি-তে হয়েছে। নিউ সাউথ ওয়েলসের বিরুদ্ধে খুব ভাল ভাবেই প্রথম ম্যাচ জেতে ভিক্টোরিয়া। দ্বিতীয় ম্যাচে সাউথ অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে তারা জেতার কাছাকাছি এসেও পারেনি বৃষ্টিতে ম্যাচ ভেস্তে যাওয়ায়। কিন্তু এই দু’টি ম্যাচেই ব্যাট এবং বলের মধ্যে অনেক বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা গিয়েছে। অ্যাশেজের মতো ব্যাটসম্যানেরা একপেশে রাজ করেননি। কিন্তু শেফিল্ড শিল্ডের তৃতীয় যে ম্যাচটি এখানে হয়েছে, সেটাই সব চেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে। ভিক্টোরিয়া এবং ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে হওয়া সেই ম্যাচে ফের ঘুমন্ত পিচ দেখা গিয়েছে এবং বোলারদের জন্য অ্যাশেজের ম্যাচের মতোই হাহাকারই শুধু অপেক্ষা করে ছিল। ভিক্টোরিয়ার বোলিং আক্রমণ বেশ ভাল। জেমস প্যাটিনসন আছেন। তিনি জাতীয় দলে ফেরার চেষ্টা করছেন। সেই বোলিং আক্রমণকে মেলবোর্নের পিচে ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার মার্কাস স্টোয়নিস এবং অ্যাশটন টার্নার শেষ দিনে স্বচ্ছন্দে খেলে ম্যাচ ড্র করে দেন। কিউরেটর এই ম্যাচের পরে বলেন, আসন্ন টেস্টের কথা ভেবে তিনি নতুন কিছু ফর্মুলা প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছিলেন। সেটা কাজে দেয়নি। উল্টে শেষ দিনে গিয়ে পিচ নিষ্প্রাণ হয়ে যায়। যদিও শুধু শেষ ম্যাচ বলে নয়, এ বছরে শেফিল্ড শিল্ডের ম্যাচে ব্যাটসম্যানদের রেকর্ড মেলবোর্নে বেশ ভালই। ইতিমধ্যেই পাঁচটি সেঞ্চুরি হয়ে গিয়েছে। তার মধ্যে মার্কাস হ্যারিসের ২৫০ আছে। এই ডাবল সেঞ্চুরির দৌলতেই অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট দলে সুযোগ পেয়েছেন ওপেনার হ্যারিস।

মেলবোর্ন ক্রিকেট মাঠের কর্তারা এখন মরিয়া চেষ্টা করছেন, অতিরিক্ত ঘাস ছেড়ে পিচকে প্রাণবন্ত করে তোলার। অ্যাডিলেড এবং পার‌‌্থের মতো এখানেও ‘ড্রপ-ইন’ পিচ ব্যবহার করা হয়। তবু কেন যে এত ম্যাড়ম্যাড়ে পিচ হচ্ছে মেলবোর্নে, সেটাই সকলের প্রশ্ন। শেফিল্ড শিল্ডে খেলা কয়েক জন ক্রিকেটারের বক্তব্য অনুযায়ী, শুরুর দিকে তা-ও বোলারদের জন্য কিছুটা সাহায্য থাকছে। কিন্তু যত সময় যাচ্ছে, পিচ ব্যাটসম্যানদের স্বর্গ হয়ে উঠছে। 

ইতিমধ্যেই অস্ট্রেলিয়ার পেসার মিচেল স্টার্ক জানিয়েছেন, মেলবোর্নের পিচ নিয়ে তিনিও নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছেন না। অ্যাশেজের সেই টেস্টে খেলেননি স্টার্ক। কিন্তু বাইরে থেকে যা দেখেছিলেন, তাতে পরিষ্কার মনে আছে বোলারদের জন্য কেমন দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠেছিল বাইশ গজ। সেই স্মৃতি ফিরে আসুক, কেউ চান না। 

এ দিন এমসিজি-তে দাঁড়িয়ে  শোনা গেল, এই টেস্ট অগ্নিপরীক্ষা হতে যাচ্ছে ঐতিহাসিক ক্রিকেট কেন্দ্রের জন্য। কোহালি বনাম পেন দ্বৈরথে যদি উত্তেজক পিচ না দেখা যায়, যদি ফের অ্যাশেজের মতো নিষ্প্রাণ ম্যাচ হয়, তা হলে সামনের বছরের বক্সিং ডে টেস্ট ম্যাচ হারাতে পারে মেলবোর্ন। ইতিমধ্যেই পার্‌থ তাদের নতুন স্টেডিয়াম গড়ার পরে দাবি জানাতে শুরু করেছে, আমরা কেন বক্সিং ডে টেস্ট পাব না? 

দেখেশুনে মনে হচ্ছে, কোহালি বা পেনের চেয়েও সান্তা ক্লজের উপহারের দিকে বেশি করে তাকিয়ে এক জন— মেলবোর্নের বাইশ গজের কারিগর ম্যাট পেজ!