ক্রিকেট মহলকে চমকে দিয়ে বারো বছর পরে বিশ্বকাপ দলে প্রত্যাবর্তন ঘটালেন এমন এক জন, যাঁর ক্রিকেট অভিষেক হয়েছিল মহেন্দ্র সিংহ ধোনিরও আগে! প্রায় চৌত্রিশ বছরের সেই দীনেশ কার্তিককে দলে নেওয়া হল ঋষভ পন্থ নামক তরুণ প্রতিভাকে উপেক্ষা করে। যা নিয়ে ভারতীয় ক্রিকেটে নতুন বিতর্কের ঝড় উঠে পড়েছে। 

বিশ্বকাপের দল নির্বাচনে দ্বিতীয় উইকেটকিপারের পদ নিয়েই যে সব চেয়ে বেশি সময় ব্যয় হতে চলেছে, সেই পূর্বাভাস আগেই আনন্দবাজারে দেওয়া হয়েছিল।

এমনও বলা হয়েছিল যে, এই দ্বিতীয় উইকেটকিপারের পদের জন্য বাঁ হাতি ঋষভ পন্থের ম্যাচ জেতানোর ক্ষমতা কিছুটা হলেও এগিয়ে থাকবে ‘বয়স্ক’ কার্তিকের চেয়ে। 

আরও পড়ুন: রায়ুডু-পন্থ নয়, বিশ্বকাপের বিমানে উঠছেন কার্তিক-শঙ্কর-রাহুল

ওয়াকিবহাল মহলের খবর ছিল, ভারতীয় দলের মস্তিষ্করাও কার্তিকের চেয়ে পন্থের দিকে ঝুঁকে ছিলেন। তার কারণ, বাঁ হাতি হিসেবে ঋষভ বাড়তি ঝাঁঝ যোগ করতে পারতেন ব্যাটিংয়ে। কিন্তু সোমবার আরও এক বার প্রমাণ হয়ে গেল ভারতীয় ক্রিকেটের নির্বাচনী বৈঠকে চমকের কোনও শেষ হয় না। শেষ পর্যন্ত নির্বাচকদের গরিষ্ঠ অংশের ভোটেই ইংল্যান্ডের উড়ান ধরছেন কার্তিক। অসামান্য প্রতিভাবান হয়েও পন্থকে অপেক্ষা করতে হবে আরও চার বছর। এই ঘটনা দেখে কারও কারও মনে পড়ে যাচ্ছে অতীতের কয়েকটি উপেক্ষার কথা। যেমন ছিয়ানব্বই বিশ্বকাপে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের সুযোগ না পাওয়া। অথবা ২০১১ বিশ্বকাপে রোহিত শর্মার বাদ পড়া। প্রত্যাশা মতো কে এল রাহুল দলে ঢুকলেন, অন্তিম দৌড়ে এসে ছিটকে গেলেন অম্বাতি রায়ডু। সম্ভাব্য চার নম্বর হিসেবে ভাবা হল বিজয় শঙ্করকে। এই নির্বাচনটি ঘিরেও প্রশ্ন রয়েছে। কারও কারও মতে, বিশ্বকাপের মতো চাপের প্রতিযোগিতায় বিজয় শঙ্করকে চার নম্বর হিসেবে ভাবাটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সব চেয়ে বেশি কথা উঠছে পন্থের বাদ পড়া নিয়ে। 

নির্বাচকেরা দু’টো ব্যাপারকে গুরুত্ব দিয়েছেন। অভিজ্ঞতা এবং চাপের মুখে ম্যাচ শেষ করে আসার দক্ষতা। অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ঘরের মাঠে ওয়ান ডে সিরিজে কার্তিক দলে ছিলেন না। শেষ দু’টি ম্যাচে ধোনি বিশ্রাম নেওয়ায় সুযোগ পেয়েছিলেন পন্থ। সেখানে উইকেটকিপিংয়ে কিছু গলদ তাঁর বিপক্ষে চলে গেল। নির্বাচক প্রধান এম এস কে প্রসাদও বলেছেন, পন্থের উইকেটকিপিং অপেক্ষাকৃত দুর্বল বলেই তিনি ছিটকে গিয়েছেন। যিনি দেশের হয়ে ছ’টি টেস্ট এবং ১৭টি ওয়ান ডে ম্যাচ খেলেছেন। কিন্তু পাল্টা প্রশ্ন উঠছে, উইকেটকিপিং যদি খারাপই হবে তা হলে পন্থ টেস্টে এক নম্বর কিপার হলেন কী করে? পাঁচ দিনের ক্রিকেটেই কিপিং নৈপুণ্য এবং টেকনিক বেশি পরীক্ষার মুখে পড়ে। 

সাধারণত, ওয়ান ডে-তেই উইকেটকিপার নির্বাচনের সময়ে ব্যাটিং দক্ষতা বেশি দেখা হয়। ২০০৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের ভারতীয় দল উইকেটকিপার হিসেবে নিয়ে গিয়েছিল রাহুল দ্রাবিড়কে। যিনি নিয়মিত কিপারই ছিলেন না। সেই সিদ্ধান্ত মাস্টারস্ট্রোক হিসেবেই থেকে গিয়েছে। সৌরভের দল বিশ্বকাপের ফাইনাল পর্যন্ত গিয়েছিল। দ্রাবিড় কিপিং করায় অতিরিক্ত ব্যাটসম্যান খেলাতে পেরেছিল ভারতীয় দল। মহেন্দ্র সিংহ ধোনিও ক্রিকেট দুনিয়ায় বেশি পরিচিত ব্যাটিংয়ের জন্য উইকেটকিপিংয়ের জন্য নয়। 

কার্তিক বিশ্বকাপ দলে সুযোগ পেয়ে কেকেআরের তরফে একটি ভিডিয়ো বার্তায় বলেছেন, তিনি খুব খুশি। পন্থের কোনও প্রতিক্রিয়া এখনও পাওয়া যায়নি। অবিশ্বাস্য শোনালেও সত্যি যে, ধোনির আগমনের তিন মাস আগে কার্তিকের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক ঘটে। ২০০৭ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজে বিশ্বকাপের দলে প্রথম কিপার হিসেবে গিয়েছিলেন ধোনি। সঙ্গে দ্বিতীয় উইকেটকিপার ছিলেন কার্তিক। সেই বিশ্বকাপে বিপর্যয় ঘটেছিল ভারতের। তার পর দু’টি বিশ্বকাপে সুযোগ পাননি। কে ভাবতে পেরেছিল এগারো বছর পরে তিনি ফিরবেন ২০১৯ বিশ্বকাপে। 

কারও কারও মনে প্রশ্ন জাগছে, দিল্লির ঋষভ পন্থ তাঁর শহরের কিংবদন্তি এবং সেরা ‘কামব্যাক ম্যান’ মোহিন্দর অমরনাথের মতো বিড়বিড় করে উঠলেন কি না, ‘‘নির্বাচকেরা ভাঁড়ের দল!’’