জো রুট বারবার বলে যাচ্ছিলেন, যখন সকলে ধরে নেয় অ্যালেস্টেয়ার কুক ফুরিয়ে গিয়েছে, ফিরে আসেন তিনি। এক ইংরেজ সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে রুট কয়েক দিন আগে এমনও বললেন যে, ‘‘আমি খুব খুশি হচ্ছি দেখে যে, আপনারা প্রশ্ন তুলছেন। এটাই কুকির ফেরার সময়।’’

রুটের ইংল্যান্ড ফিরে এসেছে। ট্রেন্ট ব্রিজে যশপ্রীত বুমরাদের সামনে কোণঠাসা হয়ে হেরে যাওয়ার পরেও তারা সাউদাম্পটনে সিরিজ জিতে নিয়েছে। কিন্তু কুকের আর সেই সুসময় ফিরল না। সিরিজ জেতার পরের দিনই তিনি ঘোষণা করে দিলেন, অবসর নিচ্ছেন। ওভালেই শেষ টেস্ট খেলবেন তিনি।

টেস্টে ইংল্যান্ডের সর্বকালের সর্বোচ্চ স্কোরার কুক। যাত্রা শুরু করেছিলেন ভারতে। ২০০৬-এর নাগপুরে মাইকেল ভনের পরিবর্তে দলে আসেন তিনি। বিদায়ও নিচ্ছেন ভারতের বিরুদ্ধে শেষ টেস্ট খেলে। ৩৩ বছরের বাঁ হাতি ওপেনার সর্বকালের সর্বোচ্চ রান স্কোরারদের তালিকায় সপ্তম। এখনও পর্যন্ত ১৬০ টেস্ট খেলে করেছেন ১২,২৫৪ রান। সঙ্গে রয়েছে ৩২ সেঞ্চুরি।

‘‘আমার ট্যাঙ্কে আর কোনও এনার্জি নেই। অনেক ভেবেচিন্তেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’’ এক বিজ্ঞপ্তিতে বলেছেন কুক। যোগ করেছেন, ‘‘শুরু করার সময় ভাবিইনি এত কিছু করে উঠতে পারব। এত দিন ধরে অনেক বড় বড় সব ক্রিকেটারের পাশে জাতীয় দলের হয়ে খেলে যেতে পেরেছি বলে আমি গর্বিত।’’ চলতি সিরিজে চার টেস্টে সাত ইনিংসে মাত্র ১০৯ রান করতে পেরেছেন তিনি। গড় ১৫.৫৭। একটা হাফ সেঞ্চুরিও পাননি। ভারতীয় বোলারদের মধ্যে তাঁকে সব চেয়ে বেশি অস্বস্তিতে রেখেছিলেন ইশান্ত শর্মা এবং অশ্বিন। বাঁ হাতির ক্ষেত্রে তাঁদের বল বাইরের দিকে যায়। বিশেষ ভাবে সেই বলের বিরুদ্ধে কুকের দুর্বলতা প্রকট হয়ে উঠেছিল। সম্ভবত সব দিক বুঝেশুনেই তিনি ঠিক করে নেন, টেস্ট জীবনকে আর দীর্ঘায়িত করবেন না।

কুক-বিদায়ে টেস্ট ক্রিকেট তার সাবেকি ওপেনারের পরম্পরা হারাতে বসবে কি না, সেই আলোচনাও উঠে পড়ছে। এমনিতেই এক জোড়া ভাল ওপেনার এখন টেস্ট ক্রিকেটে বিরল প্রজাতি হয়ে উঠেছে। কোনও দেশেই দেখা যাচ্ছে না। হবস-সাটক্লিফ, গ্রিনিজ-হেনস, ল্যাঙ্গার-হেডেনের মতো সফল ওপেনিং জুটি এখনকার টি-টোয়েন্টি যুগে পাওয়া যাচ্ছে না। কুকের মতো টেস্ট ক্রিকেটের জন্য মানানসই ওপেনারও ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। যিনি নতুন বলে অফস্টাম্প কোথায় জানবেন, নতুন বলে সুইং বোলিং সামলাতে দক্ষ হবেন, যেমন খেলবেন তেমন বল ছাড়তেও জানবেন। যাকে বলা যেতে পারে সুনীল গাওস্করের টেস্ট ঘরানা। প্রায় হারিয়ে যাওয়া শিল্প আরও বেশি করে অস্তিত্ব সঙ্কটের মধ্যে পড়বে কুক টেস্ট থেকে অবসর নেওয়ায়।

চলতি সিরিজের দিকে তাকালেই বোঝা যাবে টেস্ট ক্রিকেটে ওপেনারদের কী রকম আকাল চলছে। ইংল্যান্ডের দুই ওপেনার কুক এবং কিটন জেনিংসের চার টেস্ট মিলিয়ে ব্যাটিং গড় যথাক্রমে ১৫.৫৭ এবং ১৮.৫৭। ভারতের দুই ওপেনার শিখর ধওয়ন এবং কে এল রাহুলের ব্যাটিং গড় যথাক্রমে ২৬.৩৩ এবং ১৪.১২। এখনও পর্যন্ত এক বারও সেঞ্চুরি পার্টনারশিপ করতে পারেননি কোনও দলের ওপেনাররা।

এর পাশাপাশি যদি সর্বকালের সেরা ওপেনিং জুটিদের রানের পরিসংখ্যান রাখা যায়, রীতিমতো চমকে উঠতে হবে। গ্রিনিজ এবং হেনস ওপেনিং জুটিতে দু’জনে মিলে করেছেন ৬৪৮২ রান। ল্যাঙ্গার আর হেডেনের আছে ৫৬৫৫ রান। হবস এবং সাটক্লিফ ৩২৪৯ রান তুলেছিলেন মাত্র ৩৮ ইনিংসে। তাঁদের ওপেনিং জুটিতে গড়ের (৮৭.৮১) ধারেকাছে এখনও যেতে পারেননি কেউ। টি-টোয়েন্টির আগমনে এখন ব্যাটসম্যানরা আয় করেন বল খেলে, বল ছেড়ে নয়। ছক্কা মারলে কোটিপতি হওয়া যায়, বল ছাড়লে তাঁকে শুধু টেস্ট ক্রিকেট খেলেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে।

২০১৭ থেকে ধরলে দেখা যাচ্ছে, দশ ইনিংসের বেশি খেলা ওপেনারদের মধ্যে মাত্র ছ’জন ৪০-এর উপরে ব্যাটিং গড়ে পৌঁছতে পেরেছেন। শিখর ধওয়ন পঞ্চাশের উপরে গড় থাকা হাতে গোণা ওপেনারদের এক জন। কিন্তু তাঁর বেশির ভাগ সাফল্যই এসেছে উপমহাদেশের মধ্যে। দক্ষিণ আফ্রিকা বা ইংল্যান্ডে এসে তিনি দল থেকে বাদ পড়েছেন।

কয়েকটি সমীক্ষায় ধরা পড়েছে ক্রিকেটারদের মনের মধ্যে গেঁথে যাওয়া আধুনিক যুগের চাহিদা। কুড়ি ওভারের লিগ খেলে কোটিপতি হওয়া যাবে, শুধুই টেস্ট ক্রিকেট খেললে যেটা হওয়া সম্ভব নয়। একমাত্র ইংল্যান্ড পুরনো স্কুলের ওপেনারদের পরম্পরা ধরে রেখেছিল কুকের মাধ্যমে। অ্যান্ড্রু স্ট্রস এবং কুক সম্ভবত টেস্ট ক্রিকেটের শেষ সফল ওপেনিং জুটি। তাঁরা দু’জনে মিলে সাড়ে চার হাজারের উপর রান তুলেছেন। স্ট্রস অনেক আগেই সরে গিয়েছিলেন। এ বার কুকের পালা।

ইংল্যান্ডের ক্রিকেটমহলে একের পর এক প্রতিক্রিয়া আসতে শুরু করেছে। গ্রাহাম গুচের অনেক অবদান আছে তাঁকে ওপেনার হিসেবে গড়ে  তোলার ব্যাপারে। কুক বিবৃতিতে গুচের নামও করেছেন। গুচও পাল্টা বলেছেন, ‘‘ইংল্যান্ডের স্তম্ভ ছিল কুক।’’ মাইকেল ভন বলেছেন, ‘‘আর কোনও ইংল্যান্ড ক্রিকেটার এত অবদান রাখেনি দলের জন্য।’’ নাসের হুসেনের প্রতিক্রিয়া, ‘‘আমার দেখা মানসিক ভাবে সব চেয়ে শক্তিশালী ক্রিকেটার।’’

কুক চললেন। টেস্ট ওপেনারের বংশকে আরও সঙ্কটে ফেলে দিয়ে।